বন্ধকী সম্পত্তি থেকে উপকৃত হওয়া প্রসঙ্গ

সম্পত্তিকে বড় আকারে মোটামুটি দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যথাঃ (১) ভাড়াযোগ্য ও (২) ভাড়ার অযোগ্য।

“ভাড়াযোগ্য” বলতে এমন সব সম্পত্তিকে বুঝায় যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবহার করার পর (স্বয়ং ঐ বস্তুটিই) মালিককে ফেরৎ দেয়া হয় এবং ব্যবহার মূল্য (use value) বাবদ কিছু ক্ষতিপূরণও দিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, হাসান একটি গাড়ীর মালিক। হাবিব দু’ দিনের জন্য হাসানের গাড়ীটি এক হাজার টাকার বিনিময়ে ভাড়া নিল। এটি একটি বৈধ চুক্তি। কারণ, এখানে এমন একটি বস্তু ভাড়া দেয়া হচ্ছে যা মূলত ভাড়া দেয়ার যোগ্য। অর্থাৎ মেয়াদ শেষে মূল বস্তুটিই মালিককে ফেরৎ দেয়া হবে। আর দু’ হাজার টাকা ঐ গাড়িটির ব্যবহার মূল্য (use value)- ‘র ক্ষতিপূরণ  হিসেবে বিবেচিত হবে।

“ভাড়ার অযোগ্য” বলতে এমন সম্পত্তিকে বুঝায় যা নিজে নিঃশেষিত না হয়ে উপকার প্রদান করতে পারে না। আর নিঃশেষিত হওয়ার কারণে হুবহু ঐ বস্তুটি মূল মালিককে ফেরৎ দেয়া আর সম্ভব হয় না। যেমন, টাকা-পয়সা ও খাদ্যদ্রব্য। ধরুন, আমার কাছে উদ্বৃত্ত এক লাখ টাকা আছে। আমার কাছ থেকে এই টাকা নিয়ে আপনি লাভবান হতে চাইলে টাকাগুলো নিশ্চয়ই খরচ করে ফেলতে হবে। আর খরচ করে ফেললে মেয়াদ শেষে আপনি অবশ্যি এর সমপরিমান টাকা দিতে পারবেন; কিন্তু হুবহু ঐ টাকাগুলো আমাকে আর ফেরৎ দেয়া সম্ভব হবেনা (অথচ ভাড়া যোগ্য পণ্য হওয়ার জন্য মূল বস্তুটি ফেরৎ দেয়ার যোগ্যতা থাকা জরুরী।)

ধান, চাল, গমসহ খাদ্যদ্রব্যগুলোর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। এর কোন একটিও নিঃশেষিত না হয়ে উপকার প্রদান করতে পারেনা। আর নিঃশেষিত হয়ে গেলে হুবহু ফেরৎ দেয়ার সুযোগও শেষ হয়ে যায়। অতএব, এসব বস্তু ভাড়া দেয়ার যোগ্য নয়; তবে এগুলো ধার/ঋণ আকারে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু ধার/ঋণ দিয়ে মূল বস্তুর অতিরিক্ত কিছু গ্রহন করাকে হারাম সাব্যস্ত করে রাসূল (সাঃ) বলেন,

كل قرض يجر منفعة فهو ربا”

“যে সকল ধার/ঋণ কোন প্রকার লাভ নিয়ে আসে – তার প্রত্যেকটিই সুদী কারবার”।

আমাদের সমাজে বন্ধক / কট নামে যে চুক্তি প্রচলিত আছে – তা মূলত ১৭৫৭-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত  কার্যকর বৃটিশ শাসনের ঘৃন্য কু প্রভাবগুলোর অন্যতম। ১৮৩৫ সালে প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে রাষ্টের আইন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ থেকে কুরআন-সুন্নাহ কে উৎখাত করে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত বৃটিশ আইন ব্যবস্থা (secular British laws) চাপিয়ে দেয়া হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে পাকিস্তান এবং তা থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করার পরেও মুসলিম অধ্যুষিত এ অঞ্চলগুলোর আইন কাঠামোতে এখনও ঐ সব নোংরা পদার্থ রয়ে গেছে। প্রকাশ্যে আমরা সবাই নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করলেও কুরআন- সুন্নাহ সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে ঐ আইন পরিবর্তন করার জন্য আমরা সরকারের উপর সামষ্টিকভাবে চাপ প্রয়োগ করার কোন প্রয়োজন বোধ করি না। অথচ আমাদের অনেক ছোটখাট প্রয়োজন আমরা সরকারের উপর প্রবল চাপ প্রয়োগ করে আদায় করে নিই। কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী আইন কানুন চালু থাকার ব্যাপারে আমাদের এই নির্লিপ্ততা, নিস্পৃহতা ও ঔদাসীন্যের সামষ্টিক দায় কিয়ামত দিবসে আমরা এড়াতে পারব বলে আমার মনে হয় না।

বর্তমানে প্রচলিত বন্ধক / কট প্রথাটির ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহ নয়; বরং গোলামীর যুগের একটি বৃটিশ আইন। আর তা হল The Transfer of Property Act, 1882 (সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২) – ‘র ৫৮ ধারার ‘ঘ’ দফা। এই দফা’র সার কথাটি পরবর্তী পৃষ্ঠায় ব্যাখ্যা করা হল।

হাসান                                              হাবিব

হাসান তার একখণ্ড জমি হাবিবের কাছে বন্ধক / কট দিয়ে ৫০,০০০ টাকা নিল। যতদিন পর্যন্ত হাসান ৫০,০০০ টাকা শোধ করতে না পারবে ততদিন হাবিব এই জমি থেকে উপকৃত হতে থাকবে। The Transfer of Property Act, 1882 (সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২)-’র  উক্ত ধারায় এই ধরণের বন্ধককে Usufructuary Mortgage নামে অভিহিত করা হয়েছে।

আপাত দৃষ্টিতে এই চুক্তিটি আপত্তিকর মনে হয় না। কারণ এই সময়টাতে দু’পক্ষই (হাসান ও হাবিব) দু’জনের সম্পত্তি থেকে লাভবান হচ্ছে। অর্থ্যাৎ হাবিবের ৫০,০০০ টাকা নিয়ে হাসান ব্যবসা করে যেভাবে লাভবান হচ্ছে  সেভাবে হাসানের জমি চাষাবাদ করে কিংবা পত্তন দিয়ে হাবিবেরও লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। নির্দিষ্ট সময়ান্তে হাসানের জমি যেহেতু পুরোটাই হাসানের কাছে ফিরে আসছে, সেহেতু হাবিবের টাকা পুরোটাই হাবিবের কাছে ফিরে আসাও সম্পূর্ণ যুক্তিসংগত।

কিন্তু একটু গভীর দৃষ্টি দিলেই দেখা যাবে, হাসান ও হাবিব দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী বস্তুর মালিক। হাসানের আছে জমি (যা ভাড়া/lease দেয়ার যোগ্য); অন্যদিকে হাবিবের রয়েছে টাকা (ইসলামের নির্দেশ অনুযায়ী যা ভাড়া/ lease দেয়ার অযোগ্য)। অতএব হাসানকে টাকা প্রদানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সময়টুকুতে হাসানের জমি থেকে উপকৃত হওয়ার কোন বৈধ সুযোগ হাবিবের নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, টাকা থেকে লাভবান হওয়ার বৈধ উপায় কী ? এর উত্তর হল, টাকা থেকে দু’টি উপায়েই বৈধভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে;

(১)  টাকা নিয়ে সরাসরি ব্যবসায় নেমে পড়া (ব্যক্তিগতভাবে কিংবা লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে অংশীদারীত্বের মাধ্যমে। [যথাযথ ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাথে মুদারাবা চুক্তি অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে ব্যবসার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ছোট সাইজের অংশীদারীত্বমূলক কারবারে লোকসানের ঝুঁকি অনেক বেশী। এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশীদারীত্বমূলক প্রজেক্টগুলোতে বিশাল আকারের পুঁজি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করার কারণে সামষ্টিকভাবে লোকসানের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কিছু লোক অবশ্য ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন প্রজেক্টে সুদী কারবারের অভিযোগ আনেন। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, যেহেতু ইসলামী ব্যাংকগুলো আমাদের সামনে পরিপূর্ণ শরীয়াহ মোতাবেক কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের কার্যক্রমগুলোকে প্রতিনিয়ত শরীয়াহ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের কথা বলে, সেহেতু সাধারণ মানুষ তাদের সাথে অংশীদারীত্বের চুক্তিতে যেতে পারে। এতসব প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরেও যদি তারা কোন সুদী কারবারে জড়িত হয়, তাহলে সুদী কারবার + মিথ্যা ওয়াদা/প্রতারনার গোনাহের দায়ভার পুরোপুরি ব্যাংকের উপরই বর্তাবে; গ্রাহকের উপর নয়। কারণ, সাধারণ মানুষের পক্ষে ব্যাংকের মাঠ পর্যায়ের গতিবিধি পুরোপুরি তদারকি করা সম্ভব নয়।] ); অথবা,

(২) টাকা দিয়ে ভাড়াযোগ্য কোন পণ্য কিনে তা ভাড়া দিয়ে লাভবান হওয়া (যেমন কোন পুকুর, জমি কিংবা যানবাহন ক্রয় করে ভাড়া / lease দেওয়া ইত্যাদি)।

মনে রাখতে হবে, উপরোক্ত দু’টি পদ্ধতির প্রতিটিতে লাভের সম্ভাবনা ও লোকসানের ঝুঁকি –   উভয়ই বিদ্যমান। আর এর ফলেই এ সকল কারবার পদ্ধতি ইসলামে বৈধ হিসেবে বিবেচিত। কারণ, কোন লাভ “বৈধ”  হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য লোকসানের ঝুঁকি বহন করাও জরুরী। রাসূল (সাঃ) বলেন,

الغنم بالغرم و الغرم بالغنم

 (Profit is with risk and risk is with profit)

“ঝুঁকি যেখানে লাভ সেখানে এবং লাভ যেখানে ঝুঁকিও ঠিক সেখানেই।”

আমাদের সমাজে অবশ্য একটি কথা প্রচলিত আছে যে, বন্ধকী সম্পত্তির খাজনা আদায় করে দিলে কিংবা প্রতি বছর মূল টাকা থেকে কিছু টাকা কেটে দিলে বন্ধকী সম্পত্তি ভোগ দখল করা বৈধ। আসলে এটি রাসূলের (সাঃ) একটি হাদীসের অসতর্ক ব্যাখ্যার ফল। হাদীসটি হচ্ছে নবী (সাঃ) বলেন,

الظهر يركب بنفقته اذا كان مرهونا و لبن الدر يشرب بنفقته اذا كان مرهونا

অর্থ্যাৎ, “বন্ধকী জন্তুর খাবার ও রক্ষনাবেক্ষন বাবদ যে পরিমাণ অর্থ খরচ করা হবে উক্ত জন্তুর উপর সওয়ার হয়ে ঠিক সেই পরিমাণ সফর করা যাবে এবং  বন্ধকী জন্তু যদি দুগ্ধ প্রদানকারিনী হয় তাহলে তার খাবার ও রক্ষনাবেক্ষন বাবদ যে পরিমান অর্থ খরচ করা হবে উক্ত জন্তু থেকে ঠিক সেই পরিমাণ  দুগ্ধ পান করা যাবে।”  (বুখারী)

এখান থেকে এই ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে যে, বন্ধকী জন্তুর পেছনে কিছু খরচ করলে যদি তা থেকে উপকৃত হওয়া বৈধ হয়, তাহলে বন্ধকী সম্পত্তির খাজনা বাবদ কিছু টাকা খরচ করলে কিংবা প্রতি বছর মূল টাকা থেকে কিছু টাকা কেটে দিলে উক্ত জমি থেকে উপকৃত হওয়া নিঃসন্দেহে বৈধ হবে। আসলে এটি একটি ভুল ধারণা। হাদীসটির দিকে ভাসা ভাসা দৃষ্টি দেয়ার ফলেই এই ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এই হাদীসটিতে খরচ ও উপকৃত হওয়ার পরিমাণের মধ্যে আনুপাতিক ভারসাম্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইবনে কাইয়্যিম আল জাওযিয়্যাহ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, দুধের পরিমাণ যদি খরচের টাকার পরিমাণ থেকে বেশী হয় তাহলে বাড়তি দুধটুকুর দাম মূল মালিককে দিতে হবে। কারণ, বন্ধকী সম্পত্তি মূলত একপ্রকার সিকিউরিটি (অর্থ্যাৎ ঋণের টাকা ফেরৎ পাওয়ার নিশ্চয়তার জন্যই কেবল বন্ধকের বৈধতা দেয়া হয়েছে); এটি ভোগ দখলের বৈধতার সার্টিফিকেট নয়। এই হাদীসের প্রয়োগ জমি জমা সহ অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে ঠিক তখনই সঠিক হবে যখন খাজনা বাবদ যে পরিমাণ অর্থ খরচ করা হবে অথবা প্রতি বছর যে পরিমান অর্থ কেটে রাখা হবে,  ঠিক ততটুকু উপকার ই উক্ত বন্ধকী সম্পত্তি থেকে নেয়া হবে; কোন ক্রমেই এর বেশী নয়।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s