দাদার সম্পত্তিতে নাতির অধিকার

১৪ মে ২০১০ দৈনিক নয়া দিগন্তের ইসলামী দিগন্ত পাতায় সম্পত্তিতে নাতিপুতির অধিকার শীর্ষক একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। লিখেছেন জনৈক মাওলানা সৈয়দ জিল্লুর রহমান। এই প্রবন্ধে তিনি দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে, দাদার উপস্থিতিতে ছেলে মারা গেলে নাতি অন্য ছেলের উপস্থিতিতে দাদার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে কোন অংশ পাবেনা মর্মে যে নিয়মটি চালু আছে তা মোটেই কুরআন সম্মত নয়। তাঁর ভাষায় তাদের (অর্থাৎ যারা উক্ত আইনটির বৈধতার প্রবক্তা) সব দালিলিক ভিত্তিও যৌক্তিকতার দিক থেকে দুর্বল ও ভিত্তিহীন। তারপর তিনি নাতির অধিকার প্রমাণ করার জন্য বেশ কয়েকটি যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। সে সকল যুক্তি প্রমাণের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা ই বর্তমান প্রবন্ধটির মূল উদ্দেশ্য।   

সূচীপত্র

উত্তরাধিকারের মূলনীতিঃ

প্রথম যুক্তিঃ

দ্বিতীয় যুক্তিঃ

তৃতীয় যুক্তিঃ

উত্তরনের উপায়ঃ

প্রথম প্রশ্নঃ

জবাবঃ

দ্বিতীয় প্রশ্নঃ

জবাবঃ

তৃতীয় প্রশ্নঃ

জবাবঃ

নির্দেশ মূলত দু’ ধরণেরঃ

কারণঃ

 

উত্তরাধিকারের মূলনীতিঃ

র্বাগ্রে মনে রাখতে হবে যে, উত্তরাধিকার বন্টনের জন্য কুরআন যে মূলনীতি নির্ধারণ করেছে তা এই নয় যে, যারা অভাবগ্রস্ত অথবা সহানুভুতি পাওয়ার যোগ্য তাদেরকে এই সম্পত্তি দেয়া হবে। বরং তা হচ্ছে এই যে, আত্মীয়তার দিক থেকে যে ব্যক্তি মৃতের “নিকটতর” (الاقرب) কেবল তারাই তার উত্তরাধিকারী হবে। নিকটতর আত্মীয়ের বর্তমানে অপেক্ষাকৃত দূর সম্পর্কের আত্মীয় ওয়ারিস হবে না।

للرجال نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون و للنساء نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون

অর্থাৎ, “মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা যে ধন-সম্পত্তি রেখে গেছে তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছে। আর মেয়েদেরও অংশ রয়েছে সেই ধন-সম্পত্তিতে, যা মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে।” (নিসা ৭)

কারা কারা মৃত ব্যক্তির নিকটতম তা মানবীয় বুদ্ধি বিবেচনার মাধ্যমে উদ্ঘাটনের জন্য ছেড়ে না দিয়ে কুরআন নিজেই তার ব্যাখ্যা প্রদান করেছে (দ্রষ্টব্য সূরা নিসার উত্তরধিকার আয়াতসমূহ)। এখানেই শেষ নয়; ব্যাখ্যার মাঝখানেই কুরআন পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছেঃ

لا تدرون ايهم اقرب لكم نفعا فريضة من الله ان الله كان عليما حكيما

অর্থাৎ, “তোমরা জানো না তাদের কে কে উপকারের দিক দিয়ে তোমাদের বেশী নিকটবর্তী। এসব অংশ আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ অবশ্যী সকল সত্য জানেন এবং সকল কল্যানময় ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন।” (নিসা ১১)

প্রথম যুক্তিঃ

মাওলানা সাহেবের প্রথম যুক্তি হচ্ছে, আরবী ابن (পুত্র) শব্দটি নাতিকেও অন্তর্ভুক্ত করে।অতএব কুরআন পুত্রের জন্য সম্পত্তিতে যে অধিকার রেখেছে তাতে নাতিও সমানভাবে অংশীদার। তাঁর কথাকে প্রমাণ করার জন্য তিনি কুরআনের দু’টি আয়াত উদ্ধৃত করেছেন। প্রথমটি সূরা নিসার এই আয়াত- و حلائل ابنائكم الذين من اصلابكم (তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ)। পুত্রের স্ত্রীর অনুরূপ প্রপৌত্রের স্ত্রীকেও বিয়ে করা হারাম। এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে ابن শব্দটি পুত্র- প্রপৌত্র উভয়কেই বুঝায়। অতএব উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও প্রপৌত্র পুত্রের সমান হিসেবে বিবেচিত হওয়া সম্পূর্ণ যৌক্তিক।

এর উত্তরে বলা যেতে পারে, ধরি কোন এক ব্যক্তির তিনজন পুত্র রয়েছে। তন্মধ্যে একজন চার পুত্র রেখে মারা গেছে।

পিতা

প্রপৌত্র ৪

প্রপৌত্র ২

প্রপৌত্র ৩

প্রপৌত্র ১

পুত্র ২

পুত্র ৩

পুত্র ১ (মৃত)

এক্ষেত্রে সম্পত্তিকে মোট ছয়টি ভাগ করে পুত্র ও প্রপৌত্র প্রত্যেকেই সমান উত্তরাধিকার লাভ করবে। মাওলানা সাহেব কি এই বিভাজন মেনে নিতে প্রস্তুত? উত্তর যদি ইতিবাচক হয় তাহলে জিজ্ঞাস্য হচ্ছে এতিম নাতির প্রতি আরোপিত ‘বেইনসাফি’ (?) ঠেকাতে গিয়ে সরাসরি পুত্রদের প্রতি কোন ধরণের ইনসাফ কায়েম করা হচ্ছে? সরাসরি পুত্র পাচ্ছে মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ, অন্যদিকে নাতিরা পাচ্ছে ছয় ভাগের ৪ ভাগ; অথচ তাদের পিতা জীবিত থাকলে মাত্র এক ভাগের মালিক হতেন।

মাওলানা সাহেব উত্তরাধিকার প্রসংগে বিয়ে সংক্রান্ত আইনের শব্দ (ابن) কে যেভাবে টেনে এনেছেন তাতে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, দাদার জন্য নাতবউ হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে ছেলে বা নাতির জীবিত না থাকার শর্ত না থাকলে নাতি যেহেতু (মাওলানা সাহেবের যুক্তি অনুযায়ী) পুত্রের সমতুল্য, তাহলে নাতি কর্তৃক সম্পত্তি লাভের ক্ষেত্রে তার পিতা জীবিত না থাকার শর্ত কুরআন-হাদীসের কোন জায়গা থেকে বের করা হচ্ছে? কারণ, তার পিতা জীবিত থাকুক বা নাই থাকুক- সর্বাবস্থায়ই সে দাদার(ابن)  পুত্র হওয়ার ক্ষেত্রে তার পিতার সমান। অতএব আমাদের উক্ত উদাহরণে পুত্র ১ যদি জীবিতও থাকতো তাহলেও সম্পত্তিতে  চার প্রপৌত্রের প্রত্যেকেই স্বীয় পিতার সমান অংশ লাভ করত। বাকী ছেলেদের সন্তান সন্তুতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একবার ভেবে দেখুনতো, কুরআন কি সত্যিই উত্তরাধিকার স্কীমের মাধ্যমে কয়েক পুরুষের অধস্তন প্রপৌত্রদেরকে সরাসরি পুত্রদের স্তরে টেনে এনে সমান অংশ দেয়ার অবকাশ রেখেছে? কুরআন-হাদীসের কোথাও এরকম অবকাশ থেকে থাকলে তা আমাদেরকে পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হোক।

আমরা মনে করি, বিয়ে সংক্রান্ত আইনের শব্দকে উত্তরাধিকার আইনে হুবহু প্রয়োগ করা নীতিগতভাবেই ভুল। কারণ, প্রথমটির উদ্দেশ্য বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পারিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এক্ষেত্রে কুরআন কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার উর্দ্ধতন কিংবা অধস্তন পুরুষের বউকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছে। এতদুদ্দেশ্যে অধস্তন পুরুষ বুঝানোর জন্য ‘পুত্র’ (ابن) শব্দটি (যা আরবি বাকরীতি অনুযায়ী পুত্র ও প্রপৌত্র উভয়ের অর্থ প্রকাশে সমর্থ)ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে আইনের প্রকৃতি ই দাবি করে (ابن) দ্বারা কেবল সরাসরি ছেলে উদ্দেশ্য নয়; বরং তার সকল অধস্তন পুরুষও এর অন্তর্ভুক্ত।তাছাড়া বিয়ে সংক্রান্ত আইনে ‘পুত্র’ (ابن) শব্দটির ব্যাপক অর্থ গ্রহন করার মাধ্যমে কারো কোন অর্থনৈতিক স্বার্থ সঙ্কুচিত করা হচ্ছেনা। পক্ষান্তরে উত্তরাধিকার আইন মূলত অর্থনৈতিক আইন, যেখানে কোন একটি শব্দার্থের অসতর্ক সম্প্রসারণের ফলে গোটা কাঠামোটিই ভেঙ্গে পড়ে; দেখা দেয় নানা অনাকাঙ্খিত বেইনসাফি (এ ব্যাপারে আমাদের উপরোক্ত উদাহরনটিই যথেষ্ট)। অতএব বিয়ে সংক্রান্ত আইনের (ابن) শব্দের তাৎপর্যকে উত্তরাধিকার আইনে হুবহু প্রয়োগ করার কোন যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবকাশ নেই।

মাওলানা সাহেব আরেকটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন (و اعلموا انما اموالكم و اولادكم فتنة আনফাল ২৭)-অর্থাৎ, ‘জেনে রাখ তোমাদের সন্তান-সন্ততি পরীক্ষা’। একথা স্বতঃসিদ্ধ যে নিছক সরাসরি পুত্রই পরীক্ষার উপকরণ নয়; প্রপৌত্রগনও এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, এই আয়াতে যে ‘সন্তান-সন্ততি’ (اولاد) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে হুবহু একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে উত্তরাধিকার আইনের আয়াতটিতে – يوصيكم الله فى اولادكم  (নিসা ১১)-অর্থাৎ, ‘আল্লাহ তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন…’। অতএব এখানেও  সন্তান মানে কেবল সরাসরি পুত্র অর্থ না হয়ে নাতিদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। আমরা মনে করি, এখানে আবার সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে যা দেখা দিয়েছিল বিয়ে সংক্রান্ত আইনে ابن (পুত্র) শব্দটির ব্যাপক অর্থকে উত্তরাধিকার আইনে টেনে আনার ক্ষেত্রে। আনফালের ২৭ নম্বর আয়াতটি মূলত একটি সতর্কীকরণ। অর্থাৎ, পৃথিবীতে সন্তান-সন্ততি পরীক্ষার উপকরণ। কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই চলবেনা; অধীনস্ত লোকদের ব্যাপারেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ  করা হবে। তাছাড়া এই মর্মে হুশিয়ার করে দেয়াও এই আয়াতের উদ্দেশ্য যে, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা যেন তোমাদেরকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লংঘনে উদ্বুদ্ধ না করে। এদের মাধ্যমে আল্লাহ মূলত তোমাদেরকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। বক্তব্যের ধরনই এখানে বলে দেয় যে, ‘সন্তান-সন্ততি’ (اولاد) শব্দটি এখানে কেবল সরাসরি পুত্রদেরকে বুঝানো হয়নি; তার অধস্তনরাও এর অন্তর্ভুক্ত। অথচ উত্তরাধিকার আইন মূলত সম্পত্তি বন্টনের আইন যার সুনির্দিষ্ট প্রকৃতিই দাবী করে যে এখানে ‘সন্তান-সন্ততি’ (اولاد) শব্দটি দ্বারা আনফালের ১৭ নং  আয়াতের মত নাতি নাতনিদের অধস্তন সকলকে সন্তান হওয়ার দিক থেকে এক কাতারে হাজির করানো কিছুতেই উদ্দেশ্য হতে পারেনা।

দ্বিতীয় যুক্তিঃ

তাঁর দ্বিতীয় যুক্তিটি সূরা নিসার ৩৩ নং আয়াতকে (و لكل جعلنا موالى مما ترك الوالدان و الاقربون)কেন্দ্র করে। তিনি আয়াতটির অনুবাদ করেছেন এভাবে, “আর পুরুষ নারীর সকলকে আমরা আছাবা বানিয়েছি তাদের পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন যা কিছু রেখে যাবেন তাতে”। অথচ আয়াতটির বিশুদ্ধ অনুবাদ হচ্ছে

Ø      و جعلنا  موالى لكل (شيء) مما ترك الوالدان و الاقربون

অর্থাৎ, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা কিছু রেখে গেছে আমরা তার প্রত্যেকটি বস্তুর জন্য হকদার বানিয়ে রেখেছি।

অথবা,

Ø      و جعلنا  لكل (واحد) من الوالدين و الاقربين موالى لما ترك

অর্থাৎ, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য  আমরা তার পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে হকদার বানিয়ে রেখেছি।

তন্মধ্যে প্রথম অনুবাদটি ই ব্যাকরণ ও বাক্য বিন্যাসের দিক থেকে সর্বাধিক গ্রহনযোগ্য।কিন্তু মাওলানা সাহেব যে অনুবাদ করেছেন (“আর পুরুষ নারীর সকলকে আমরা আছাবা বানিয়েছি তাদের পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন যা কিছু রেখে যাবেন তাতে”) তা কেবল তখনই সম্ভব হত যদি কুরআনের আয়াতটি নিম্নরূপ হত-

و كلا (اى كل واحد من الرجال و النساء) جعلنا موالى لما ترك الوالدان و الاقربون

“আমরা পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে (নারী ও পুরুষের)প্রত্যেক কে হকদার বানিয়ে রেখেছি।”

মাওলানা সাহেব যে অনুবাদ করেছেন কুরআনের বাক্যবিন্যাসের মধ্যে এর কোন সুযোগ নেই। কারণ, তাঁর অনুবাদের ফলে ل  (‘জন্য’) preposition টিকে কুরআনের আয়াত থেকে বিলুপ্ত করে দেয়া জরুরী হয়ে পড়ে। আর দ্বিতীয়ত, কুরআনের এই আয়াতে একমাত্র object (কর্ম) হচ্ছে موالى (হকদার) শব্দটি। অথচ মাওলানা সাহেবের অনুবাদে প্রত্যেক নারী ও পুরুষ শীর্ষক আরেকটি object (কর্ম)-র আমদানী করা হয়েছে যা কুরআনের আয়াতে নেই। অধিকন্তু, এই নতুন আমদানীকৃত object (কর্ম)-র উপর ই মাওলানা সাহেব তাঁর যুক্তির প্রাসাদ নির্মান করে দেড় সহস্রাব্দীর সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিসকে ‘নারীকে নিরংকুশভাবে পুরুষের মত আছাবা (موالى হকদার) হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের’ অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। অতঃপর তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, কন্যার সাথে প্রপৌত্র যেভাবে অংশ পায়, ঠিক সেভাবে পুত্রের সাথেও প্রপৌত্র উত্তরাধিকারে অংশীদার হবে। তাঁর ভাষায়, “এ আয়াতে নারী-পুরুষের সবাইকে আছাবা ঘোষনা করা হয়েছে। সুতরাং নারী সন্তানের সাথে নাতিপুতি পাবে, পুরুষ সন্তানের সাথে পাবেনা- এ রকম বক্তব্য চলবে না”। অথচ আমরা ইতোপূর্বে দেখিয়েছি যে কুরআনের বাক্যটির ‘আমরা নারী-পুরুষের সবাইকে আছাবা বানিয়েছি শীর্ষক অনুবাদটি ভুল। আয়াতটিতে শুধু এতটুকু বলা হয়েছে যে, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়ের পরিত্যক্ত প্রত্যেকটি সম্পদের জন্য আল্লাহ হকদার (موالى আছাবা) বানিয়ে রেখেছেন। হ্যাঁ, এই হকদার কারা- তা এই আয়াতে বলা হয়নি; বরং তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে রাসূলের (সাঃ) হাদীসে। নবী (সাঃ) বলেন, ما ابقت السهام فلاولى عصبة ذكر অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট অংশের মালিকরা স্ব স্ব অংশ নিয়ে যাবার পর অবশিষ্ট অংশ পুরুষ হকদারদের জন্য (বুখারী, হাদীস নং ৬৭৩২; মুসলিম, হাদীস নং ১৬১৫; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৬৫৭)।

তৃতীয় যুক্তিঃ

তাঁর তৃতীয় যুক্তি হচ্ছে, ‘অধিকতর কাছের আত্মীয় তুলনামূলক দূরের আত্মীয়কে বঞ্চিত করে’- মুলনীতিটি ভিন্ন স্তরের আত্মীয়ের ক্ষেত্রে খাটেনা। তাঁর কথা থেকে পরিস্কার বুঝা যায় পিতা ও নাতি যেরকম ভিন্ন স্তরের তিনি পুত্র ও প্রপৌত্রও সেরকম ভিন্ন স্তরের মনে করেন। অতএব, পিতা (অধিকতর কাছের আত্মীয়)জীবিত থাকলে প্রপৌত্র (তুলনামূলক দূরের আত্মীয়) যেভাবে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়না, ঠিক সেভাবে এক পুত্রের  (অধিকতর কাছের আত্মীয়)উপস্থিতি অপর পুত্রের নাতিকে (তুলনামূলক দূরের আত্মীয়)বঞ্চিত করতে পারেনা।

এ যুক্তিটি কয়েকটি কারণে গ্রহনযোগ্য নয়। প্রথমত, ইসলাম উত্তরাধিকার নির্ধারনের ক্ষেত্রে বংশধরদেরকে ascendants ও descendants হিসেবে ভাগ করে দিয়েছে। এ হিসেবে পিতা ascendant ও পুত্র descendant গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। মৃত ব্যক্তির পিতা পুত্র দু’টি স্বতন্ত্র গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে যে আইনগত তফাত সৃষ্টি হয়েছে তা নির্বিচারে পুত্র ও প্রপৌত্রদের (যাদের সবাই একই গ্রুপের descendantঅন্তর্ভুক্ত) ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে দেয়া কিছুতেই সঠিক হতে পারেনা।

Grandfather

Sons = GRADE 1

Father = GRADE 2

Brothers = GRADE 3

Uncles = Grade 4

উপরোক্ত চার্ট থেকে পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে যে, পিতা, ভাই ও চাচাদের তুলনায় পুত্রগন প্রথম গ্রেডে রয়েছে। তার/তাদের উপস্থিতিতে উপরোক্ত কারোরই আছাবা হওয়ার সুযোগ নেই। আবার এটিও স্বতঃসিদ্ধ যে, পুত্র ও প্রপৌত্র প্রথম গ্রেডেই পড়েছে (কারণ, অন্য কোন গ্রেডে তাকে রাখার সুযোগ নেই)। অর্থাৎ, মাওলানা সাহেব পুত্র ও পৌত্রকে যেভাবে ভিন্ন স্তরের প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তা ধোপে টিকছেনা। মোদ্দাকথা হচ্ছে, যেহেতু উভয়েই একই স্তরের এবং পুত্র পৌত্রের তুলনায় মৃত ব্যক্তির অধিকতর নিকটবর্তী, সেহেতু স্বাভাবিক নিয়মে পুত্রের উপস্থিতি পৌত্রকে বঞ্চিত করবে।

মাওলানা সাহেবের চতুর্থ ও পঞ্চম যুক্তি  প্রথম তিনটি যুক্তির বিশুদ্ধতার উপর নির্ভরশীল। অথচ আমরা দেখিয়েছি, তাঁর প্রথম তিনটি যুক্তি টেকসই নয়। তাই, শেষ দু’টি যুক্তির পর্যালোচনা নিস্প্রয়োজন।

 

উত্তরনের উপায়ঃ

দুস্থ নাতির সমস্যা নিরসনকল্পে পেশোয়ার হাই কোর্টের শরীয়াহ বেঞ্চ ১৯৮০ সালে যে পরামর্শ দিয়েছিল তা খুবই যুক্তিসংগত (দ্রষ্টব্যঃ পি.এল.ডি.(১৯৮০)পেশোয়ার, ৪৭)। সেই পরামর্শের সারকথা ছিল, বাধ্যতামূলক ওসিয়্যত (compulsory bequest) ইসলামী আইনের প্রানসত্তার পরিপন্থি। অতএব, এই পথে না গিয়ে আইনের মাধ্যমে দুস্থ নাতিকে জেলা জজের শরনাপন্ন হওয়ার সুযোগ দেয়া হোক। নাতি প্রকৃতপক্ষেই দুস্থ হলে জেলা জজ দাদাকে ওসিয়্যতের বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করানোর চেষ্টা করবেন। তাতে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া গেলে দুস্থ নাতির দেখাশোনা ও ভরনপোষনের যাবতীয় দায় দায়িত্ব দাদা ও (তার অনুপস্থিতিতে) নিকটতর সচ্ছল আত্মীয়ের উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। আর তাদের প্রত্যেকেই অসচ্ছল হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দুস্থ নাতিকে সহযোগিতার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কারন, রাষ্ট্রীয় তহবিলের অন্যতম উদ্দেশ্যই হল দুস্থ লোকদের সহযোগিতা করা।

উপরোক্ত পদ্ধতিতে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে প্রথমেই একটি সার্বজনীন বাধ্যতামূলক আইন তৈরী করে ঢালাওভাবে সকল নাতিকে সম্পত্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহনে বহুবিধ সমস্যা রয়েছে, যেমনঃ প্রথমত, অনেক সময় দেখা যায় নাতি (তার সদ্যপ্রয়াত পিতা কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে) যথেষ্ট সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছে; অথচ তার চাচারা রয়ে গেছে দারিদ্র সীমার নীচে। এ পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে সকল নাতির জন্য বাধ্যতামূলক ওসিয়্যতের (compulsory bequest) আশ্রয় গ্রহন মূলত ‘তেলা মাথায় তেল ঢালা’ ও দরিদ্রকে আরো বেশী দারিদ্রের দিকে ঠেলে দেয়ার নামান্তর। দ্বিতীয়ত, নাতি যদি প্রকৃতই দুস্থ হয়ে থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ব্যয়ভার বহন (অনেকেই যার পরামর্শ দিয়ে থাকেন) করার পূর্বে তার নিকটাত্মীয়দের সামর্থ যাচাই করা উচিত। তারা সমর্থ হলে দুস্থ নাতির ব্যয়ভার তাদেরই বহন করা অধিকতর যুক্তিসংগত। কারণ, রাষ্ট্রীয় তহবিল মূলত আমজনতার সম্পদে সৃষ্টি। নিকটাত্মীয়ের অনুপস্থিতি কিংবা অক্ষমতার প্রেক্ষিতেই কেবল দূরতম আত্মীয়ের (অর্থাৎ, আমজনতার) সম্পদ ব্যবহার করা যেতে পারে। রাসূল (সাঃ) এর একটি বক্তব্য থেকে এ বিষয়ের ইংগিত পাওয়া যায়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবী (সাঃ) বলেন, انا ولى من لا ولى له অর্থাৎ, যার কোন অভিভাবক নেই আমিই তার অভিভাবক। (মুসনাদে আহমদ)

و الله اعلم بالصواب

উপরোক্ত প্রবন্ধ সোনার বাংলাদেশ ব্লগ-এ পোস্ট করার পর চোরাবালি-১৯৮১ ছদ্মনামে এক ব্লগার বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেন। আমি অন্তর্দৃষ্টি নামে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছি। পাঠকদের অবগতির জন্য নীচে তা উল্লেখ করা হল। (http://sonarbangladesh.com/blog/jiaorrahman/18084)

প্রথম প্রশ্নঃ

২২ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ১০:৫১

চোরাবালি-১৯৮১ লিখেছেন : লেখকের কাছে প্রথম প্রশ্নপিতা জীবিত থাকা অবস্থায় পুত্রের মৃত্যুতে পুত্রের সন্তানাদির দায় দায়িত্ব কার? এবং প্রসঙ্গে কোরান থেকে যুক্তি দিবেন দয়া করে

জবাবঃ

২২ ডিসেম্বর ২০১০; সন্ধ্যা ০৭:২৪

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন :“পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় পুত্রের মৃত্যুতে ঐ পুত্রের সন্তানাদিকে আমরা দু’ ভাগে ভাগ করতে পারি; (১) অপ্রাপ্তবয়স্ক ও (২) প্রাপ্তবয়স্ক।
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান কর্মক্ষম হলে তার দায় দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। তবে কর্মক্ষম না হলে অন্যান্য গরীব মানুষের দারিদ্র নিরসনের জন্য ইসলাম যেসব ব্যবস্থা রেখেছে তা তার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হবে। তবে নিকটাত্মীয় হওয়ার প্রেক্ষিতে দাদা, চাচা ও ভাই প্রমুখের কাছ থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে। এসব নীতির ভিত্তি হল নিমোক্ত আয়াতগুলোঃ

و فى اموالهم حق للسائل و المحروم

“আর আল্লাহ-সচেতন লোকদের সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার” (আয যারিয়াত ১৯)
مسكينا ذا متربة

“ধূলি মলিন মিসকিনকে (খাবার খাওয়ানো)” (আল বালাদ ১৬)

و ات ذا القربى حقه

নিকটাত্মীয়কে তার অধিকার দিয়ে দাও” (বনী ইসরাইল ২৬)

و بالوالدين احسانا و بذى القربى

“পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়ের সাথে সদাচরণ করো” (আন নিসা ৩৬)

অন্যদিকে সন্তান যদি অপ্রাপ্ত বয়স্ক হয় তাহলে তার দায় দায়িত্ব আবার দু’ ধরণেরঃ (১) লালন পালন সংক্রান্ত দায় ও (২) আর্থিক দায়। প্রথম প্রকারের দায় পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে ১০ বছর পর্যন্ত আর কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কা হওয়া পর্যন্ত সন্তানের মাকেই পালন করতে হবে। আর আর্থিক দায় প্রথমত বর্তায় পিতার উপর। তার অনুপস্থিতিতে যথাক্রমে দাদা ও চাচার উপর বর্তায়। তারা সবাই আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে ঐসব সন্তানের দায় দায়িত্ব সোজা সাপ্টা সরকারকেই নিতে হবে। এসব নীতির ভিত্তি হল নিমোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহঃ

و الوالدات يرضعن اولادهن

“আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে দুগ্ধ পান করাবে” (আল বাকারাহ ২৩৩)

و على المولود له رزقهن و كسوتهن بالمعروف

“আর সন্তানের পিতার দায়িত্ব মায়েদের খোর পোশ দেয়া” (আল বাকারাহ ২৩৩)

و على الوارث مثل ذلك

“আর (পিতা মারা গেলে তার) ওয়ারিশকে অনুরূপ দায়িত্ব পালন করতে হবে” (আল বাকারাহ ২৩৩)

يتيما ذا مقربة

“নিকটবর্তী ইয়াতীমকে (খাবার খাওয়ানো)” (আল বালাদ ১৫)

ابدا بنفسك ثم بمن تعول

“নিজের প্রয়োজন পূরণ করার পর তাদের অধিকার আদায় কর যাদের দায় দায়িত্ব বর্তেছে তোমার উপর” (নাইলুল আওতার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৩২১-৩২৪)

من ابر قال امك ………ثم الاقرب فالاقرب

“…… আমি কার অধিকার আদায় করবো? রাসূল (সাঃ) বললেন, “তোমার মায়ের ……… অতঃপর তোমার সর্বাধিক নিকটবর্তী আত্মীয়ের, অতঃপর তার পরের অধিক নিকটবর্তী আত্মীয়ের” (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাইলুল আওতার)

انا ولى من لا ولى له

“কারো কোন অভিভাবক না থাকলে আমিই তার অভিভাবক”। (মুসনাদে আহমদ)
Charity begins at home

দ্বিতীয় প্রশ্নঃ

২৩ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ১০:৩০

চোরাবালি-১৯৮১ লিখেছেন : পিতা জীবিত অবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি স্ত্রী সন্তান/সন্ততী রেখে মারা যায়, তাহলে দাদার সম্পত্তি যে নাতী নাতনী পুত্রবধু পাবে না কথাটি কোথাও বলা আছে?

জবাবঃ

২৩ ডিসেম্বর ২০১০; সন্ধ্যা ০৬:৩৯

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : “পিতা জীবিত অবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি মারা যায় স্ত্রী সন্তান/সন্ততী রেখে মারা যায় তা হলে, দাদার সম্পত্তি যে ঐ নাতী নাতনী পুত্রবধু পাবে না এ কথাটি কোথাও বলা আছে?”
এ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর পেতে হলে প্রথমে ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের নীতিমালা ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। ইসলাম পূর্ব আরবে উত্তরাধিকারের কোন স্থায়ী রীতি ছিল না। কখনো বন্ধু বরাবর সমস্ত সম্পত্তি উইল করে নিজের বংশধরদের বঞ্চিত করা হত। আবার কখনো পরিবারের একজন শক্তিশালী লোক সবাইকে বঞ্চিত করে সমস্ত সম্পত্তি একাই দখল করে নিত। এমতাবস্থায় ইসলাম উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে স্থায়ী আইন জারি করার ক্ষেত্রে ক্রমধারা অবলম্বন করে।

প্রথমে নির্দেশ দেয়া হল এভাবেঃ

كتب عليكم اذا حضر احدكم الموت ان ترك خيرا الوصية للوالدين و الاقربين بالمعروف حقا على المتقين

“তোমাদের কারোর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে এবং সে ধন-সম্পত্তি ত্যাগ করে যেতে থাকলে পিতামাতা ও নিকটতম (আত্মীয়)দের জন্য ন্যায়সঙ্গত ভাবে অসিয়ত করে যাওয়াকে তার জন্য ফরজ করা হয়েছে, আল্লাহ-সচেতন লোকদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক” (আল বাকারাহ ১৮০)
দ্বিতীয় ধাপে বলা হলঃ

يوصيكم الله فى اولادكم ……………………………….. وصية من الله
“তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন ……. এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ” (নিসা ১১-১২)

এই ধাপে এসে নিকটাত্মীয় (৮ জন নারী ও ৪ জন পুরুষ) কে কতটুকু অংশ পাবে – আল্লাহ তা সুস্পষ্টভাবে বলে দেন।
তৃতীয় স্তরে পরিস্কার ঘোষণা দেয়া হল:

و لكل جعلنا موالى مما ترك الوالدان و الاقربون
“পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা কিছু রেখে গেছে আমরা তার প্রত্যেকটি বস্তুর জন্য হকদার বানিয়ে রেখেছি।” (নিসা ৩৩)

অর্থাৎ, আইনপ্রণেতা নিজেই “প্রত্যেকটি বস্তুর জন্য হকদার বানিয়ে রেখেছেন” (নিসা ৩৩)। কে পাবে আর কে পাবে না তা আমাদের মর্জি মাফিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হয় নি।

১২ জন (৮ জন নারী ও ৪ জন পুরুষ) ব্যক্তির অংশ কুরআন নির্ধারিত করে দিয়েছে। তন্মধ্যে ছেলে ও তার অধস্তন সন্তানাদি, সহোদর ভাই ও চাচার অংশ কুরআন নির্ধারণ করে নি। কুরআন এর দায়িত্ব দিয়েছে রাসূল (সাঃ) কে। রাসূল (সাঃ) তার বক্তব্যের মাধ্যমে বলে দিয়েছেন যে, কুরআন যাদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে তারা সম্পত্তি নেয়ার পর বাকিটুকুর অধিকারী হবে পুরুষ আত্মীয়রা। [নবী (সাঃ) বলেন, ما ابقت السهام فلاولى عصبة ذكر অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট অংশের মালিকরা স্ব স্ব অংশ নিয়ে যাবার পর অবশিষ্ট অংশ পুরুষ হকদারদের জন্য (বুখারী, হাদীস নং ৬৭৩২; মুসলিম, হাদীস নং ১৬১৫; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৬৫৭)] এসব অবশিষ্টাংশের অধিকারী পুরুষ আত্মীয়দের জন্য হাদীসে “আসাবা / residuary” নামে এক বিশেষ পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।
হাদীসে “আসাবা / residuary” (অবশিষ্টাংশের অধিকারী পুরুষ আত্মীয়) কে নিম্নোক্ত চার গ্রুপে ভাগ করা হয়েছেঃ

(১) পুত্র ও তার অধস্তন সন্তান
(২) পিতা ও তার ঊর্ধতন পুরুষ
(৩) ভাই ও তার অধস্তন সন্তান
(৪) চাচা ও তার অধস্তন সন্তান

এখন প্রশ্ন দেখা দেয় এদের মধ্যে সম্পত্তি বন্টনের ভিত্তি বা মূলনীতি কী? কুরআনের আয়াতে তা স্পস্ট করে বলে দেয়া হয়েছেঃ

للرجال نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون و للنساء نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون
অর্থাৎ, “মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা যে ধন-সম্পত্তি রেখে গেছে তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছে। আর মেয়েদেরও অংশ রয়েছে সেই ধন-সম্পত্তিতে, যা মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে।” (নিসা ৭)
و لكل جعلنا موالى مما ترك الوالدان و الاقربون
“পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা কিছু রেখে গেছে আমরা তার প্রত্যেকটি বস্তুর জন্য হকদার বানিয়ে রেখেছি।” (নিসা ৩৩)

এসব আয়াতের সুস্পষ্ট শব্দ الاقربون (নিকটাত্মীয়রা) দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলে দিচ্ছে যে, উত্তরাধিকার বন্টনের জন্য কুরআন যে মূলনীতি নির্ধারণ করেছে তা এই নয় যে, যারা অভাবগ্রস্ত অথবা সহানুভুতি পাওয়ার যোগ্য তাদেরকে এই সম্পত্তি দেয়া হবে। বরং তা হচ্ছে এই যে, আত্মীয়তার দিক থেকে যে ব্যক্তি মৃতের “নিকটতর” (الاقرب) কেবল তারাই তার উত্তরাধিকারী হবে। নিকটতর আত্মীয়ের বর্তমানে অপেক্ষাকৃত দূর সম্পর্কের আত্মীয় ওয়ারিস হবে না।

অর্থাৎ, এদের মধ্যে الاقرب يحجب الابعد (The nearer in degree excludes the far remote “নিকটবর্তী আত্মীয় অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী আত্মীয়কে বঞ্চিত করবে”) নীতি প্রযোজ্য হবে।

কুরআনের উপরোক্ত আয়াত থেকে উৎসারিত নীতির ভিত্তিতেই এই বিধান বিধিবদ্ধ হয়েছে যে, “দাদার উপস্থিতিতে ছেলে মারা গেলে নাতি অন্য ছেলের উপস্থিতিতে দাদার সম্পত্তি থেকে কোন বাধ্যতামূলক অংশ পাবে না”। কারণ, নাতির তুলনায় উক্ত ছেলে অধিকতর নিকটবর্তী আত্মীয়।

পুত্রবধু আসাবার অন্তর্ভুক্ত নয়; তাই তারও কোন নির্ধারিতঅংশ নেই।[নবী (সাঃ) বলেন, ما ابقت السهام فلاولى عصبة ذكر অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট অংশের মালিকরা স্ব স্ব অংশ নিয়ে যাবার পর অবশিষ্ট অংশ পুরুষ হকদারদের জন্য (বুখারী, হাদীস নং ৬৭৩২; মুসলিম, হাদীস নং ১৬১৫; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৬৫৭)]

তবে তাদের এই বিশেষ অবস্থার সমাধানের জন্য ইসলামের প্রেসক্রিপশন ইতোমধ্যেই আমি আমার মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি। এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন বোধ করছি না।

তৃতীয় প্রশ্নঃ

২৪ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ১০:৩৬

চোরাবালি-১৯৮১ লিখেছেন : নিসা/৮- “আর ভাগাভাগির সময়ে যখন উপস্থিত থাকে আত্মীয়-স্বজন ও এতীমরা ও গরীবরা, তখন তা থেকে তাদের দান করো, আর তাদের সাথে ভালভাবে কথাবার্তা বলো।– এ কথাটিও বলা আছেএটিও একটি নির্দেশ

 

আসলে মানুষ মাত্রই সম্পদ লোভী তাই তার সম্পদ কাউকে দিতে নারাজ; আর কথায় আছে না দেয়ার হাজারো অজুহাত; পুত্রের রেখে যাওয়া সন্তানাদির দায়িত্ব পিতারমৃত সন্তানের অংশ মোতাবেক ঐ এতিম সন্তানাদির দিলে আল্লাহ্ কখনই অখুশি হবেন না বা এটি আল্লাহ্ নির্দেশ অমান্য করার মধ্যেও পরে না; বরং সেটি সমাজ তথা ইসলাম ধর্মের একটি ভাল নিদর্শনকিন্তু আমরা আমাদের স্বার্থের জন্য তাদেরকে বঞ্চিত করছি আর ধর্মকে করে ফেলছি বিতর্কিত
নিতা/৩৩- আর প্রত্যেকের জন্য আমরা উত্তরাধিকার নির্ধারিত করেছি যা পিতামাতা ও নিকট আত্মীয়রা রেখে যায়আর যাদের সঙ্গে তোমাদের ডান হাতের দ্বারা অঙ্গীকার করেছ তাদের ভাগ তা হলে প্রদান করোআল্লাহ নিঃসন্দেহে সব-কিছুতেই সাক্ষ্যদাতা


কোন ব্যক্তি যখন তার পুত্র-সন্তান বিবাহ করায় তখন সে ঐ কন্যার পিতা-মাতা বা নিক আত্মীয়ের কাছে হাতে হাত ধরে অঙ্গীকার করে যে “আজ থেকে এর মান সম্মান দায়-দায়িত্ব আমার” কিন্তু সেটি অলিখিত বলে আমরা কেওকি জীবনে পালন করি? সেটিও কিন্তু তার অঙ্গীকার ছিলআর প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব তার পিতার অঙ্গীকারগুলো পালন করা


তোমাদের কারোর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে এবং সে ধন-সম্পত্তি ত্যাগ করে যেতে থাকলে পিতামাতা ও নিকটতম (আত্মীয়)দের জন্য ন্যায়সঙ্গত ভাবে অসিয়ত করে যাওয়াকে তার জন্য ফরজ করা হয়েছে, আল্লাহ-সচেতন লোকদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক” (আল বাকারাহ ১৮০) —– এই নির্দেশ কি প্রত্যাহার করা হয়েছে? পিতা যদি এটি করে যেতে না পারে তা হলে ভাগ বাটোরার সময় আমরা এটাকে বেজ হিসাবে নিচ্ছিনা কেনন্যায় সঙ্গত ভাবে করে দিলেই তো হয়

জবাবঃ

২৪ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ০৮:৫

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : আপনার মন্তব্যে যে সকল আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন প্রথমে সেগুলোর ব্যাখ্যা করে নেয়া জরুরী। তারপর দেখা দরকার আপনার সাথে একমত পোষণ করা যায় কি না।

আপনার ঊদ্ধৃতির প্রথম আয়াতটি হলঃ

و اذا حضر القسمة اولوا القربى و اليتمى و المساكين فارزقوهم منه و قولوا لهم قولا معروفا

অর্থাৎ “ধন-সম্পত্তি ভাগ বাঁটোয়ারার সময় আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনরা এলে তাদেরকেও ঐ সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে দাও এবং তাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলো।” (নিসা ৮)

সম্পদে ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি দেয়া সত্ত্বেও অসংখ্য আয়াত ও হাদীসের মাধ্যমে সারাক্ষণ দান-খয়রাতে উদ্বুদ্ধ করেছে ইসলাম। নিসার উপরোক্ত আয়াতটি সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। এ আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে আপনি লিখেছেন, “এটিও একটি নির্দেশ।” নির্দেশ তো বটে। তবে কোন ধরণের নির্দেশ তা নির্ণয় করার আগে মনে রাখতে হবে কুরআন-সুন্নাহতে দেয়া নির্দেশসূচক বাক্যগুলো মূলত দু’ধরণেরঃ

নির্দেশ মূলত দু’ ধরণেরঃ

(১)  قضاء legally binding / আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক  (অর্থাৎ  এমন ধরণের নির্দেশ যা কার্যকর করার দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিরই নয়; ইসলামী রাষ্ট্রেরও বটে। সোজা কথায় যা ইসলামী রাষ্ট্রের বিচার প্রশাসনের (Administration of justice) আওতাধীন এবং যার ব্যত্যয় ঘটলে রাষ্ট্র তার سلطان  (বল প্রয়োগকারী শক্তি / coercive authority) ব্যবহার করার পূর্ন অধিকারী)। যেমন, যাকাত দেয়ার নির্দেশ ও সুদী কারবার না করার নির্দেশ ইত্যাদি।

(২)ديانة  morally binding / নৈতিকতা বা তাকওয়ার দিক দিয়ে বাধ্যতামূলক  (অর্থাৎ  এমন ধরণের নির্দেশ যা কার্যকর করার দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিরই; ইসলামী রাষ্ট্রের নয়। সোজা কথায় যা ইসলামী রাষ্ট্রের বিচার প্রশাসনের (Administration of justice) আওতাধীন নয় এবং যার ব্যত্যয় ঘটলে রাষ্ট্র তার سلطان  (বল প্রয়োগকারী শক্তি / coercive authority) ব্যবহার করার পূর্ন অধিকারী নয়। অন্য কথায় এসব বিধি নিষেধের দায়ভার ব্যক্তির তাকওয়ার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সামর্থ থাকার পরও কেউ যদি তা পালন না করে আল্লাহর আদালত তার বিচার করার জন্য প্রস্তুত; দুনিয়ার আদালতকে এসব বিষয় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।) যেমন একে অপরকে সালাম দেয়ার নির্দেশ, ছোট কর্তৃক বড়কে সম্মান করার নির্দেশ – এসবই নির্দেশ; তবে administration of justice এর আওতা বহির্ভূত (beyond jurisdiction)।

কারণঃ

মানুষের স্থূল মস্তিস্ক প্রসূত আইনের মত ইসলামী আইন মানুষের সকল বিষয়ে রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দেয় না। কিছু বিষয় রেখে দেয় তার স্রষ্টার সাথে হিসেব কষার জন্য। এ আইন মানবীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের পুলিশ, মেজিস্ট্রেট ও জজের ভয় দেখিয়ে মানুষকে সংশোধন করার চেয়ে অনেক বেশী জোর দিয়েছে তার স্রষ্টাকে ভয় করার জন্য। কারণ, কিছু নির্দেশকে পুলিশ, মেজিস্ট্রেট ও জজের এখতিয়ারের বাইরে রেখে আল্লাহ পরীক্ষা নিতে চান – যারা বাস্তব জীবনে তাঁর অন্যান্য নির্দেশ (যেখানে রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে) মেনে চলছে তারা কি রাষ্ট্রের ভয়ে তা মেনে চলছে, নাকি আল্লাহর ভয়ে। যদি আল্লাহর ভয়ের কারণে মেনে থাকে তাহলে তাদেরকে এসব নৈতিক নির্দেশও (moral obligations অর্থাৎ যেখানে রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়া হয় নি) মেনে নিতে হবে; কারণ উভয় নির্দেশ আল্লাহরই দেয়া। আর যদি নিছক রাষ্ট্রের ভয়ে আইন মান্য করে থাকে তাহলে আল্লাহর নিকট ঐ আইন মেনে চলারও কোন পুরষ্কার পাওয়া যাবে না। কারণ, আল্লাহর ভয় সেখানে গৌণ হয়ে পড়েছে। [ا تخشونهم فالله احق ان تخشوه ان كنتم مؤمنين  “তোমরা কি তাদেরকে ভয় করো? যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো, তাহলে আল্লাহকে ভয় করাই তোমাদের জন্য অধিক সমীচীন” – তাওবাহ ১৩] এ হচ্ছে আল্লাহর পরীক্ষা। [ليميز الله الخبيث من الطيب  মূলত আল্লাহ কলুষতাকে পবিত্রতা থেকে ছেঁটে আলাদা করবেন – আনফাল ৩৭]। তিনি মূলত দেখতে চান যে, কারা কারা একমাত্র আল্লাহর ভয়ে আইন মেনে চলছে। সকল নির্দেশকে রাষ্ট্র কর্তৃক হস্তক্ষেপযোগ্য করা হলে “আইনের আনুগত্য” আর “তাকওয়ার মানদণ্ড” হিসেবে থাকে না।

এখন বিবেচ্য বিষয় হল সূরা নিসার ৮ নং আয়াতের (“ধন-সম্পত্তি ভাগ বাঁটোয়ারার সময় আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনরা এলে তাদেরকেও ঐ সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে দাও এবং তাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলো।”) নির্দেশটি কোন  প্রকারের নির্দেশ; আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক (legally binding), নাকি নৈতিকতা বা তাকওয়ার দিক দিয়ে বাধ্যতামূলক (morally binding)। এর উত্তর হল, এটি দ্বিতীয় প্রকারের নির্দেশ। অর্থাৎ, সম্পত্তি বন্টনের সময় আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনরা এলে তাদেরকেও ঐ সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে দেয়া উত্তরাধিকারীদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু, তারা ইচ্ছে করে না দিলে তা আদালতের হস্তক্ষেপযোগ্য (cognizable) নয়।

যদি প্রশ্ন করা হয়, কীভাবে বুঝা গেল নিসার ৮ নং আয়াতটি নিছক নৈতিকতা বা তাকওয়ার দিক দিয়ে বাধ্যতামূলক; আইনগতভাবে নয়? তার উত্তরে বলা যেতে পারে, কুরআন উত্তরাধিকার বন্টনের ক্ষেত্রে ১২ জনের ব্যাপারে কে কতটুকু পাবে তা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছে। বাকী অংশ নির্ধারনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে নবী (সাঃ) কে। তিনি হাদীসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিয়েছেন যে, কুরআনে উল্লেখিত ব্যাক্তিবর্গ স্ব স্ব অংশ নেয়ার পর বাকীটুকুর অধিকারী কেবল মৃত ব্যাক্তির পুরুষ আত্মীয়রা। [বিস্তারিত প্রমাণাদি আমার মূল প্রবন্ধ ও দ্বিতীয় জবাবে উল্লেখ করা হয়েছে]। সেক্ষেত্রেও কাউকে দেয়া বা না দেয়ার বিষয়টি আমাদের মর্জির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে কুরআনে উল্লেখিত উত্তরাধিকার নীতির [ الاقرب /doctrine of proximity / নিকটবর্তীতা নীতি] ভিত্তিতে ফায়সালা হয়েছে যে, নিকটবর্তী আত্মীয়ের উপস্থিতিতে দূরবর্তী আত্মীয় বঞ্চিত হবে। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রেই কে কতটুকু পাবে এবং কে কাকে বঞ্চিত করবে তা স্পষ্ট করেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু, যদি নিসার ৮ নং আয়াতের ভিত্তিতে আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনদেরকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে কিছু দেয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হত,  তাহলে কুরআনে অথবা হাদীসে তাদের নির্দিষ্ট অংশ অথবা কমপক্ষে তাদের মধ্যে উত্তরাধিকার বন্টনের নীতি পরিষ্কার করে উল্লেখ করা হত। অথচ কুরআন-সুন্নাহর কোথাও এ বিষয়ে আলোচনা করা হয় নি।

আর এরূপ পরিস্থিতিতে যদি আমরা নিজেরাই এদের অংশ বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারণ করে দিতে যাই তাহলে দু’টি কারণে তা অগ্রহণযোগ্য।

প্রথমত, এভাবে কারো অংশ বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারণ করে দিলে, তা হবে এখতিয়ার বহির্ভুত (ultra vires and beyond jurisdiction)। কারণ, এমতাবস্থায় কুরআন ও সুন্নাহ যার জন্য যে অংশ নির্ধারণ করে রেখেছে সে তার থেকে কম পাবে। শরীয়ত প্রণেতা (অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল) ব্যাতীত এভাবে কারো অংশ বাধ্যতামূলকভাবে কমিয়ে দেয়ার অধিকার অন্য কারো নেই। [প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ্য যে, এভাবে একবার উত্তরাধিকার আইনে এখতিয়ার বহির্ভুত (ultra vires and beyond jurisdiction) ক্ষমতাকে স্বীকার করা হলে তা ভাইরাসের মত ইসলামের আইন কাঠামোর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। কেউ হয়তো বলে উঠবে, ইসলামের যাকাত বিধানেও ন্যায় বিচার করা হয় নি। কারণ, সেখানে মাত্র শতকারা আড়াই ভাগ যাকাত দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ হারটি পুনঃনির্ধারণ করে কমপক্ষে শতকরা দশ ভাগ করা উচিত। এমন দাবীকে আমরা এখতিয়ার বহির্ভুত (ultra vires and beyond jurisdiction) বলে প্রত্যাখ্যান করি। আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।]

দ্বিতীয়ত, নিসার ৮ নং আয়াতে দুস্থ নাতি ও পুত্রবধু কারো উল্লেখ নেই; সেখানে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে “আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনদের” কথা। এদের সংখ্যা অগণিতও হতে পারে। কুরআনের উদ্দেশ্য কখনো এটি নয় যে উত্তরাধিকার বন্টনের সময় যত আত্মীয় স্বজন [চাই সে অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হোক না কেন (কারণ, আয়াতটিতে তাদের গরীব হওয়ার কোন শর্ত লাগানো হয় নি)], ইয়াতীম ও মিসকীন হাজির হবে তাদের সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট অংশ দিতে হবে। একবার ভেবে দেখুন, এ আয়াতটিকে “আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক” ধরে নিলে কী অদ্ভূত অবস্থার সৃষ্টি হয়! ।

অতএব, ১২ জন উত্তরাধিকারী ও ৪ শ্রেণীর আসাবার উত্তরাধিকার আইনগত নির্দেশ; অন্যদিকে আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনদের কিছু অংশ পাওয়ার বিষয়টি নিছক নৈতিক নির্দেশ এবং সাধারণত আদালতের এখতিয়ার বহির্ভুত।

তারপর আপনি লিখেছেন, “মৃত সন্তানের অংশ মোতাবেক ঐ এতিম সন্তানাদির দিলে আল্লাহ্ কখনই অখুশি হবেন না বা এটি আল্লাহ্ নির্দেশ অমান্য করার মধ্যেও পরে না

আসলে আল্লাহ কিসে খুশি এবং কিসে খুশি নন তা আমরা জানি কুরআন থেকে; কোন ব্যক্তি বিশেষের ভালো লাগা না লাগা থেকে নয়। আমি জানি না, আপনি যা লিখেছেন তার তাৎপর্য জেনেশুনে লিখেছেন, নাকি ইসলাম বিদ্বিষ্ট বর্ণচোরাদের একপেশে ও স্বল্প অধ্যয়ন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখেছেন।

স্থূল মস্তিস্কের কিছু লোক বলে, “কই, স্থলাভিষিক্ত নীতি (Doctrine of representation) কুরআন-হাদীসের কোথায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে?” অতঃপর তারা অনুসন্ধানে লাগে এমন একটি আয়াত খুঁজে বের করার জন্য যেখানে গুরুগম্ভীর ভাষায় বলা হয়েছে, “ওহে ইমানদারেরা! সাবধান, উত্তরাধিকার আইনে তোমাদিগের জন্য স্থলাভিষিক্ত নীতি কঠোরভাবে নিষেধ করিয়া দেওয়া হইলো; যাহারা ইহার অন্যথা করিবে আমি অবশ্যই তাহাদিগকে নরকের আগুনে পুড়িয়া অঙ্গার বানাইবো”। কুরআনের কোথাও অনুরূপ গুরুগম্ভীর বাক্য না পাওয়ার ফলে তারা বলতে থাকে, “কুরআন স্থলাভিষিক্ত নীতি (Doctrine of representation)কে নিষিদ্ধ করে নি। মোল্লারাই অযথা দেড় সহস্রাব্দি ধরে ইয়াতীম নাতিকে ঠকিয়েছে”। এদের কূপমণ্ডুকতা দেখে বিধাতাও হয়তো হাসেন। আরো মজার ব্যাপার হল, এদের  কারো কারো আবার আধুনিক ইউরোপীয় আইনে পাণ্ডিত্য হাসিলের সনদও রয়েছে। অথচ, উত্তরাধিকার আইনের এ অংশে তারা আইনবিজ্ঞানের ন্যুনতম জ্ঞানটুকুও কাজে লাগাতে পারেননি। আইনবিজ্ঞানের একটি অতি সাধারণ নীতি হল এই যে, দেশে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে রকমারী প্রথা চালু থাকলে রাষ্ট্র যদি ঐসব প্রথার পরিপন্থী সুনির্দিষ্ট কোন আইন জারি করে তাহলে তা হবে ঐ বিষয়ে সিদ্ধান্তকরী আইন; এ কথা স্পষ্টভাবে বলে দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই যে, এতদ্বারা অমুক অমুক প্রথাকে নিষিদ্ধ করা হল।

আইনবিজ্ঞানের উপরোক্ত নীতি মাথায় রেখে ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দিন। এ আইন যখন নাযিল হচ্ছিল তখন পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নিজেরাই নিজেদের পছন্দমত আইন কানুন মেনে চলছিল। সে সময় হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত ছিল (যা এখনো আছে) স্থলাভিষিক্ত নীতি (Doctrine of representation)। এ নীতি অনুযায়ী ছেলে মারা গেলে নাতি ছেলের জায়গায় চলে আসে এবং চাচা ভাতিজা সমান উত্তরাধিকার লাভ করে। রোমান, মিশরীয়, পারস্য প্রভৃতি জাতিসমূহের মধ্যেও বিভিন্ন রকমের প্রথা কার্যকর ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ গোটা বিশ্বের সংস্কার সাধনের উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে আইন নাযিল করেছেন। উত্তরাধিকার আইন সেই স্থায়ী আইনের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। এ আইনে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির প্রথাগুলোকে বাদ দিয়ে কুরআন তার নিজের স্টাইলে উত্তরাধিকার নীতি ঘোষণা করেছে। আর তা হল, নিকটবর্তীতার নীতি (Doctrine of Proximity)। [للرجال نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون و للنساء نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون অর্থাৎ, “মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা যে ধন-সম্পত্তি রেখে গেছে তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছেআর মেয়েদেরও অংশ রয়েছে সেই ধন-সম্পত্তিতে, যা মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে” (নিসা ৭)]  অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল উত্তরাধিকারের কেবল হকদার বলে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি; الاقربون দ্বারা আইনের সুস্পষ্ট নীতিও বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের মূলনীতি হল “মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তীরাই তার উত্তরাধিকারে আইনগত হকদার এবং অধিকতর নিকটবর্তী আত্মীয়ের উপস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী আত্মীয় বঞ্চিত হবে”। ইসলামী আইনে “স্থলাভিষিক্ত নীতি”র কোন স্থান নেই। এরপরও যদি কারো কাছে হিন্দুয়ানী “স্থলাভিষিক্ত নীতি” ভালো লাগে, তাহলে অযথা তাকে কে বলেছে ইসলামের অনুসারী হতে? ইসলাম “স্থলাভিষিক্ত নীতি”কে সজোরে প্রত্যাখ্যান করে।

আল্লাহ ঘোষণা করেছেন নিকটবর্তীতার নীতি; কিন্তু আপনি চাচ্ছেন স্থলাভিষিক্ত নীতি। এবার আপনার বিবেককেই জিজ্ঞাসা করুন, এমনটা করলে আল্লাহ্ কখনো খুশি হবেন কিনা বা এটি আল্লাহ নির্দেশ অমান্য করার মধ্যে পড়ে কি নাআপনার বিবেক যদি বলে, আল্লাহ এরপরও খুশি হবেন এবং তা আল্লাহর আইন অমান্য করার মধ্যে পড়বে না, তাহলে কী করলে আল্লাহ অখুশি হন এবং কী ধরণের পদক্ষেপ নিলে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার মধ্যে পড়ে – তা দয়া করে একটু জানাবেন কি?

আপনি লিখেছেন, কিন্তু আমরা আমাদের স্বার্থের জন্য তাদেরকে বঞ্চিত করছি আর ধর্মকে করে ফেলছি বিতর্কিত

জানি না আপনি “আমরা” বলে কাদেরকে বুঝাচ্ছেন। তবে আমি পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই যে, গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে কুখ্যাত স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের ঘাড়ের উপর সওয়ার হয়ে যেসব গণবিচ্ছিন্ন কুশীলব “মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (The Muslim Family Laws Ordinance (MFLO), 1961)” নামে চরম ইসলাম বিদ্বেষী আইন জারি করিয়েছে এবং তা টিকে থাকতে যে বা যারাই সহযোগিতা করছে – তারাই হল সেসব লোক যারা নিজেদের হীন স্বার্থকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে জনগনের টাকায় গড়ে উঠা রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ভাণ্ডার থেকে দুস্থ নাতি ও পুত্রবধুসহ গরীব দুখী মানুষকে তাদের কুরআন প্রদত্ত ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে; আর ইসলামকে করে ফেলেছে বিতর্কিত।

আপনি লিখেছেন, “পুত্রের রেখে যাওয়া সন্তানাদির দায়িত্ব পিতার

এ ব্যাপারে আপনার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। তবে মনে রাখতে হবে, পিতার এ দায়িত্ব কীভাবে পালিত হবে, ইসলাম তার যথেষ্ট সুন্দর ব্যবস্থা করে রেখেছে [যা আমি আমার মূল প্রবন্ধে এবং আপনার প্রথম মন্তব্যের জবাবে বিস্তারিত তুলে ধরেছি]; আপনি যে স্থলাভিষিক্ত নীতির কথা বলছেন তা ইসলামী আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলাম নিজেই সার্বজনীন। অতএব, ইসলামী সমাধান বাদ দিয়ে হিন্দু বা অন্য কোন জাতির কাছ থেকে মূলনীতি ধার করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা মূলত আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা ছাড়া আর কিছু নয়।

এরপর আপনি জিজ্ঞাসা করেছেন, “তোমাদের কারোর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে এবং সে ধন-সম্পত্তি ত্যাগ করে যেতে থাকলে পিতামাতা ও নিকটতম (আত্মীয়)দের জন্য ন্যায়সঙ্গত ভাবে অসিয়ত করে যাওয়াকে তার জন্য ফরজ করা হয়েছে, আল্লাহ-সচেতন লোকদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক” (আল বাকারাহ ১৮০) —– এই নির্দেশ কি প্রত্যাহার করা হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলবো যে, উইল সংক্রান্ত উপরোক্ত আয়াতটি পুরোপুরি প্রত্যাহার/বাতিল করা হয়নি; তবে এর প্রয়োগ সীমিত করা হয়েছে। নিসার ১১-১২ আয়াতে উত্তরাধিকারের বিস্তারিত বিধি বিধান নাযিল হওয়ার পর নবী পাক (সাঃ) উইলের ব্যাপারে দু’টি বিধান জারি করেছেন; (১) কোন উত্তরাধিকারী বরাবর উইল করা যাবে না, এবং (২) এক তৃতীয়াংশের বেশী সম্পদ উইল করা যাবে না।

তারপর আপনার মন্তব্য মিশ্রিত সর্বশেষ প্রশ্নটি হল, পিতা যদি এটি করে যেতে না পারে তা হলে ভাগ বাটোরার সময় আমরা এটাকে বেজ হিসাবে নিচ্ছিনা কেনন্যায় সঙ্গত ভাবে করে দিলেই তো হয়

ন্যায় সঙ্গত ভাবে করে দিলেই তো হয়” – আপনার এটুকু অংশের সাথে আমারও কোন দ্বিমত নেই। নবী পাক (সাঃ) উইল সংক্রান্ত আয়াতকে পুরোপুরি রহিত না করে মাত্র দু’টি শর্ত দিয়েছেন যাতে আমাদের আলোচ্য সমস্যা সহ অন্যান্য স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে অসহায় মানুষ বরাবর উইল করার সুযোগ থাকে। আমিও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দাদার উইলের মাধ্যমেই এ সমস্যার প্রাথমিক সমাধান সম্ভব। কিন্তু, আপনি “ন্যায় সঙ্গতভাবে” বলার আগে লিখেছেন, “পিতা যদি এটি করে যেতে না পারে তা হলে ভাগ বাটোরার সময় আমরা এটাকে বেজ হিসাবে নিচ্ছিনা কেন” অর্থাৎ, আপনি বাধ্যতামূলক অসিয়ত (compulsory bequest) এর কথা বলছেন। কিন্তু, তা সম্ভব নয়। কেন সম্ভব নয় – তা আমার মূল প্রবন্ধের শেষ দু’টি প্যারাতে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে আবার তা তুলে ধরছিঃ

“দুস্থ নাতির সমস্যা নিরসনকল্পে পেশোয়ার হাই কোর্টের শরীয়াহ বেঞ্চ ১৯৮০ সালে যে পরামর্শ দিয়েছিল তা খুবই যুক্তিসংগত (দ্রষ্টব্যঃ পি.এল.ডি.(১৯৮০)পেশোয়ার, ৪৭)। সেই পরামর্শের সারকথা ছিল, বাধ্যতামূলক ওসিয়্যত (compulsory bequest) ইসলামী আইনের প্রানসত্তার পরিপন্থি। অতএব, এই পথে না গিয়ে আইনের মাধ্যমে দুস্থ নাতিকে জেলা জজের শরনাপন্ন হওয়ার সুযোগ দেয়া হোক। নাতি প্রকৃতপক্ষেই দুস্থ হলে জেলা জজ দাদাকে ওসিয়্যতের বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করানোর চেষ্টা করবেন। তাতে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া গেলে দুস্থ নাতির দেখাশোনা ও ভরনপোষনের যাবতীয় দায় দায়িত্ব দাদা ও (তার অনুপস্থিতিতে) নিকটতর সচ্ছল আত্মীয়ের উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। আর তাদের প্রত্যেকেই অসচ্ছল হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দুস্থ নাতিকে সহযোগিতার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কারন, রাষ্ট্রীয় তহবিলের অন্যতম উদ্দেশ্যই হল দুস্থ লোকদের সহযোগিতা করা।

উপরোক্ত পদ্ধতিতে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে প্রথমেই একটি সার্বজনীন বাধ্যতামূলক আইন তৈরী করে ঢালাওভাবে সকল নাতিকে সম্পত্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহনে বহুবিধ সমস্যা রয়েছে, যেমনঃ প্রথমত, অনেক সময় দেখা যায় নাতি (তার সদ্যপ্রয়াত পিতা কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে) যথেষ্ট সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছে; অথচ তার চাচারা রয়ে গেছে দারিদ্র সীমার নীচে। এ পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে সকল নাতির জন্য বাধ্যতামূলক ওসিয়্যতের (compulsory bequest) আশ্রয় গ্রহন মূলত ‘তেলা মাথায় তেল ঢালা’ ও দরিদ্রকে আরো বেশী দারিদ্রের দিকে ঠেলে দেয়ার নামান্তর। দ্বিতীয়ত, নাতি যদি প্রকৃতই দুস্থ হয়ে থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ব্যয়ভার বহন (অনেকেই যার পরামর্শ দিয়ে থাকেন) করার পূর্বে তার নিকটাত্মীয়দের সামর্থ যাচাই করা উচিত। তারা সমর্থ হলে দুস্থ নাতির ব্যয়ভার তাদেরই বহন করা অধিকতর যুক্তিসংগত। কারণ, রাষ্ট্রীয় তহবিল মূলত আমজনতার সম্পদে সৃষ্টি। নিকটাত্মীয়ের অনুপস্থিতি কিংবা অক্ষমতার প্রেক্ষিতেই কেবল দূরতম আত্মীয়ের (অর্থাৎ, আমজনতার) সম্পদ ব্যবহার করা যেতে পারে। রাসূল (সাঃ) এর একটি বক্তব্য থেকে এ বিষয়ের ইংগিত পাওয়া যায়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবী (সাঃ) বলেন, انا ولى من لا ولى له অর্থাৎ, “যার কোন অভিভাবক নেই আমিই তার অভিভাবক”। (মুসনাদে আহমদ)”

এর সাথে মিলিয়ে পড়তে হবে বর্তমান জবাবের প্রথম অংশটি, যেখানে আমি “আইনগতভাবে বাধ্য ও নৈতিকভাবে বাধ্য” – এ দু’ ভাগে কুরআনের নির্দেশগুলোকে ভাগ করেছি। উইলের বিষয়টি মূলত দ্বিতীয় প্রকারের নির্দেশ যা আদালতের এখতিয়ার বহির্ভুত।

পরিশেষে, মনে রাখতে হবে প্রায় দেড় সহস্রাব্দি কুরআনের উত্তরাধিকার আইন অবিকৃত অবস্থায় চলার পর গত শতকের ষাটের দশকে “স্থলাভিষিক্ত নীতি (Doctrine of representation)” প্রবর্তন করার পেছনে ইসলামকে অজ্ঞ মানুষের সামনে কুৎসিতভাবে উপস্থাপন করা ও নিজেদের হীন স্বার্থকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে জনগনের টাকায় গড়ে উঠা রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ভাণ্ডার থেকে দুস্থ নাতি ও পুত্রবধুসহ গরীব দুখী মানুষকে তাদের কুরআন প্রদত্ত ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা – এ দু’টি উদ্দেশ্য ছাড়া তৃতীয় কোন উদ্দেশ্য আছে বলে আমার জানা নেই; আপনার জানা থাকলে আমাদেরকে জানিয়ে কৃতার্থ করবেন আশা রাখি।

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

 

চতুর্থ প্রশ্নঃ

২৬ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ০৯:৪১

চোরাবালি-১৯৮১ লিখেছেন : প্রথমেই বলিয়াছিলাম, না দেয়ার হাজার অজুহাত, হাজার ব্যাখ্যা। আপনি যেহেতু না দেয়ার পক্ষে তাই এ প্রসঙ্গে আপনার যত ব্যাখ্যা বেরুবে সবই না দেয়ার পক্ষে; আপনার মত আমি আরবীতে পন্ডিত না; আমি যা পড়া লেখা করেছি বাংলায়; তাই আপনার সাথে আমি যুক্তিতে যাব না। নেয়ার সময় সেটি বাধ্যতামূলক হয়ে গেল আর দেয়ার সময় সেটি বাধ্যতামূলক না; প্রয়োগ সীমিত কি কোথাও বলা আছে যে এইটার প্রয়োগ সীমিত। আপনাদের মত এই সব ব্যাখ্যাবাজরাই ধর্মটাকে বিতর্কিত করে চলেছে যুগে যুগে।

জবাবঃ

২৭ ডিসেম্বর ২০১০; বিকেল ০৪:৫৩

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : আপনি লিখেছেন, “তাই আপনার সাথে আমি যুক্তিতে যাব না”। অথচ পরের লাইনেই যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছেন এই বলে, “নেয়ার সময় সেটি বাধ্যতামূলক হয়ে গেল আর দেয়ার সময় সেটি বাধ্যতামূলক না; প্রয়োগ সীমিত কি কোথাও বলা আছে যে এইটার প্রয়োগ সীমিত।”
আপনার অসংলগ্ন কথাবার্তাই প্রমাণ করে যে সুস্থ বিতর্ক করার ন্যুনতম যোগ্যতাটুকুও আপনি অর্জন করেননি।
গভীর মনোযোগ সহকারে প্রশ্নোত্তরগুলো পাঠ করে দেখুন, কুরআন-সুন্নাহ ও মানবীয় যুক্তি প্রয়োগ করে কতভাবে আপনার প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে আপনার কাছে না আছে কুরআন-সুন্নাহর কোন প্রমাণ, আর না আছে কোন সুস্থ যুক্তি। কোনরূপ প্রমাণ ছাড়াই আপনি গো ধরে আছেন আপনার কথা মেনে নেয়ার জন্য।

মনে রাখবেন। প্রশ্নোত্তরের এই বিষয়টি আমাদের দু’ পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ইতোমধ্যেই পঠিত হয়েছে শতাধিক পাঠক কর্তৃক। এভাবে বক্তব্য দিয়ে আপনার পাণ্ডিত্য জাহির করছেন, নাকি দেড় সহস্রাব্দি জুড়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের বিপরীতে অযৌক্তিক কথা বলে নিজেকে কুপমণ্ডুক প্রমাণ করছেন – তা বিচার করবে সাধারণ পাঠকরাই।
দাদা নাতির ক্ষেত্রেও ইসলামের সমাধান সর্বাধিক গ্রহনযোগ্য সমাধান। তারপরও ইসলামের সমাধান পছন্দ না হলে, যার সমাধান পছন্দ হয় তার উম্মত বলে নিজেকে পরিচিত করানোই অধিকতর যুক্তিসংগত। কুপমণ্ডুক ইসলামবিদ্বিষ্টদের মতের অনুসারী হয়ে ইসলামের দরদী সেজে “ধর্মটাকে বিতর্কিত” করা থেকে রক্ষা করার ভান করা স্থুলমাত্রার প্রতারণা।
ফাউল তর্ক না করে আপনার কাছে কোন যুক্তিসংগত প্রমাণ থাকলে তা ধুলে ধরুন। ইসলামের সোজা পেরেক অবশ্য মানসিকতার বাঁকা ছিদ্রপথে ঢুকার কথা নয়।
ধন্যবাদ।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s