ইতিহাসের আয়নায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

ইখতিয়ার উদ্দিনের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ শতকে (১২০৪) বাংলায় মুসলমানেরা শাসন ক্ষমতা লাভ করে। মুঘল শাসনামলে (১৫২৬১৭৫৭) এই ক্ষমতা আরো সুসংহত হয়। বিচ্ছিন্ন কিছু সময়ের কথা বাদ দিলে এই দীর্ঘ সময় জুড়ে রাষ্ট্রীয় আইনের উৎস ছিল কুরআন, সুন্নাহ তা থেকে উৎসারিত ফিকহ (law) মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর (১৬১৮ ১৭০৭) যথারীতি চল্লিশ জন আইন বিশেষজ্ঞের একটি কমিশন (Law Commission) তৈরী করেন। বেশ কয়েক বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এই কমিশনআল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহনামে একটি আইন সংহিতা (law code) তৈরী করেন। ছয় খণ্ডে সমাপ্ত এই আইন গ্রন্থে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য বিষয়াবলীর আইনগত দিকসমূহ আলোচিত হয়েছে। সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর উক্ত আইনগ্রন্থটিকেরাষ্ট্রীয় আইন” (law of the land) হিসেবে কার্যকর করেন। সে সময় আল্লাহর আইনকে মসজিদ মাদরাসায় সীমাবদ্ধ রেখে রাষ্ট্র শাসনের ক্ষেত্রে মুসলমানরা নিজেদেরকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করার কোন দাবী করেছে বলে ইতিহাসে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাদেরই বংশধর আমরা। অথচ আমাদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে  “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”, “রাষ্ট্র হতে হবে সম্পূর্ণ ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত” “প্রগতিশীল বাংলাদেশের জন্য ধর্ম রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ অপরিহার্যধর্মীয় রাষ্ট্র নয়, ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত (secular) রাষ্ট্রই মানবাধিকারের নিশ্চায়কইত্যাদি ধারণার উৎসাহী প্রবক্তা প্রচারক। এদের প্রায় সবাইকে আবার আদমশুমারী ভোটার তালিকায় মুসলিম হিসেবে নিবন্ধিত হতে দেখা যায়। প্রতি ওয়াক্তে না হলেও শুক্রবারে জুমআর নামাজে বছরে দুইবার ঈদের নামাজেও তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। এমন লোকের সংখ্যাও একেবারে কম নয় যারা উপরোক্ত শ্লোগানসমূহের আগ্রহী প্রচারক না হলেও এসবের প্রতি নিষ্ঠাবান বিশ্বাসী। এই বিবর্তন কী করে হল? বক্ষ্যমান নিবন্ধে এই জিজ্ঞাসারই জবাব খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

শাসন ক্ষমতায় ইংরেজঃ

­­­­­

১৭৫৭ সালে পলাশীর নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে বঙ্গ রাজ্যের রঙ্গমঞ্চে মহানায়ক রূপে আবির্ভূত হয় ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী । ১৭৬৫ সালে সংঘটিত বক্সারের যুদ্ধের পর দিল্লী সম্রাটকে কিছু বাৎসরিক বখশিসের ওয়াদা দেয়ার মাধ্যমে ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী  বাংলা, বিহার ও উরিষ্যার দেওয়ানী (revenue) আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। সূচনা হয় বস্তুবাদী (materialistic) ইংরেজ শাসনের। তবে, ‘ইংরেজ’ – এক দূরদর্শী জাতির নাম। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত ভারতীয় মুসলিমদের মাইন্ড সেট দেখে তারা পরিস্কার বুঝতে পারে যে, ঠিক এই মুহুর্তে পুরোপুরি ধর্মহীন বস্তুবাদী আইন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা বুমেরাং হতে পারে। কারন, তখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জনতার মধ্য থেকে একটি ধর্মহীন ও নিরেট বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থার সমর্থক দালাল গোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়নি। ‘ধীরে চলো’ নীতির ভিত্তিতে প্রায় পৌনে এক শতাব্দী (১৭৫৭-১৮৩৫) ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলতে থাকে বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থার সমর্থক দালাল গোষ্ঠী গড়ে তোলার কাজ। এই সময়ে আদালতে বিচারক পদে অধিষ্ঠিত হয় বস্তুবাদী ইংরেজ। তিনি অবশ্য বৃটিশ বস্তুবাদী আইনের পরিবর্তে ইসলামী আইন অনুসারে মুসলিমদের বিচার ফায়সালা করে দিতেন। কিন্তু, আরবী ভাষা ও ইসলামী আইনের সাথে পরিচিতি না থাকার কারণে তাকে সহযোগিতা করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয় মুসলিম মৌলভী। এই প্রেক্ষিতে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস চার্লস হেমিলটনকে দিয়ে ইসলামী আইনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিদায়া’র ইংরেজি অনুবাদ করিয়ে নেন, যাতে ইসলামী আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইংরেজ বিচারককে আর মুসলিম মৌলভীর সহযোগিতা নিতে না হয়।

শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে বিতর্কঃ 

­­­­­­

১৮১৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর চার্টার নবায়নের সময় এ এলাকার লোকদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। এ অর্থ কোন শিক্ষার পেছনে খরচ করা হবে – এ নিয়ে যথারীতি বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। মুসলিমদের একটি অংশ দাবী করলো, এতদিন ধরে চলে আসা আরবি শিক্ষার পেছনে এ অর্থ খরচ করা হোক। হিন্দুদের পক্ষ থেকে একটি গ্রুপ সংস্কৃত এবং অপর গ্রুপ ইংরেজি শিক্ষার প্রস্তাব দিল।

স্থানীয় বস্তুবাদী ইংরেজ তৈরীর উদ্দেশ্যে শিক্ষা ও আইনব্যবস্থার পুনর্গঠনঃ 

 

ইতোমধ্যে লর্ড বেন্টিঙ্ক গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পাশ্চাত্যের খোদাদ্রোহী ও বস্তুবাদী জীবন দর্শন এ এলাকার জনগোষ্ঠীর উপর আনুষ্ঠানিকভাবে চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ড থেকে খ্যাতনামা আইনজ্ঞ লর্ড ম্যাকলে (Macaulay) কে পাঠানো হয়। আইন ও শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান লর্ড ম্যাকলে বৃটিশ পার্লামেন্টের নিকট Minute on Indian Education নামে একটি প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। তাতে তিনি ইংরেজদের স্বার্থে এ এলাকায় কী ধরনের জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা দরকার তা বিশদভাবে তুলে ধরেন। উক্ত রিপোর্টের এক জায়গায় তিনি বলেন, “We must at present do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern; a class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect.”  অর্থাৎ, “বর্তমানে আমাদেরকে এমন এক শ্রেণীর লোক তৈরীর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে যারা আমাদের এবং আমাদের লক্ষ লক্ষ প্রজার মধ্যে দোভাষীর কাজ করেতে পারবে; এমন এক শ্রেণী যারা রক্ত-মাংসে ভারতীয় হলেও রুচিবোধ, মতামত, নীতি – নৈতিকতা ও বুদ্ধিমত্তায় হবে পরিপূর্ণ ইংরেজ।” এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৮৩৬ সালে উপমহাদেশের আইন ও শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী প্রভাবকে খতম করে পাশ্চাত্যের খোদাবিমুখ ও নিরেট বস্তুবাদী ধ্যান ধারনা প্রয়োগ হতে থাকে।

পাশ্চাত্যে নাস্তিক্যবাদ ও সেক্যুলারিজমের উৎপত্তিঃ

 

এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, চতুর্দশ শতকে ইউরোপে রেনেসাঁ শুরু হবার পর থেকে পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের একটি বড় অংশ নাস্তিক্যবাদকে (atheism) প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আরেকটি অংশ ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রকাশ্যে অস্বীকার না করে তাঁকে নিষ্ক্রিয় ঈশ্বরে পরিণত করে নাস্তিক ও আস্তিকের মধ্যে সমঝোতার পথ বেছে নেয়। এই মধ্যপন্থী মতের নাম দেয়া হয় ‘সেক্যুলারিজম’ (Secularism)।

সেক্যুলারিজম’: ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মহীনতা

 

আমাদের দেশে ‘সেক্যুলারিজমের’ অনুবাদ ও তাৎপর্য নিয়ে সেক্যুলারদের পক্ষ থেকে প্রায়শঃ বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। সাধারণত শব্দটির বাংলা অনুবাদ করা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। আর তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘সেক্যুলারিজমের’ তাৎপর্য হল,  “প্রত্যকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার সুযোগ পাবে; একজনের ধর্ম আরেকজনের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া যাবে না”।

অনুদিত শব্দটি মূল শব্দের তাৎপর্য তুলে ধরতে কতটুকু সক্ষম তার উপর নির্ভর করে  কোন বিদেশী শব্দ অনুবাদের স্বার্থকতা। এদিক থেকে বিবেচনা করলে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি secularism এর স্বার্থক অনুবাদ নয়। কারণ, এ অনুবাদটি সেক্যুলারিজমের সঠিক তাৎপর্যের পরিবর্তে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দ থেকে মনে হয় যে, এই দর্শন ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, অর্থাৎ, প্রতিটি ধর্মকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়। আসলে তা নয়। সেক্যুলারিজমের সঠিক তাৎপর্য হচ্ছে, সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থার বৃহত্তর পরিমন্ডলে ধর্মের প্রভাব (আগে থেকে থাকলে  তা ) উৎখাত করা এবং (আগে থেকা না থাকলে) নতুন করে উপরোক্ত পরিমণ্ডলে ধর্মের নির্দেশাবলী যাতে কিছুতেই ঢুকতে না পারে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংস্থাসমূহকে ব্যবহার করা।* অর্থাৎ, সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ধর্মকে উৎখাত (eviction) ও প্রতিরোধ (prevention) করা ই  সেক্যুলারিজমের মূল উদ্দেশ্য। এ দৃষ্টিকোণ থেকে “ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত সমাজ/রাষ্ট্র তত্ত্ব” হতে পারে secularism এর সঠিক উদ্দেশ্য জ্ঞাপক অনুবাদ।

* Oxford Advanced Learners Dictionary তে প্রদত্ত secularism ও secularise শব্দের অর্থ নিম্নে দেওয়া হলঃ

Secularism: the belief that religion should not be involved in the organization of society, education, etc. (সেক্যুলারিজমঃ সমাজ, শিক্ষা ইত্যাদির গঠনে ধর্ম জড়িত হওয়া উচিত নয় – শীর্ষক চিন্তাধারা।)

Secularise: to make sth SECULAR; to remove sth from the control or influence of religion: a secularized society (সেক্যুলারাইজঃ কোন কিছুকে সেক্যুলার বানানো; কোন কিছুকে ধর্মের নিয়ন্ত্রন ও প্রভাব থেকে সরিয়ে দেয়া, যেমন সেক্যুলার সমাজ।)

বাংলাদেশের বাস্তব উদাহরণঃ

সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ধর্মকে উৎখাত (eviction) ও প্রতিরোধ (prevention) করা ই যে সেক্যুলারিজমের মূল উদ্দেশ্য তা বুঝার জন্য ইউরোপের কোন ইতিহাস গ্রন্থ পড়তে হবে না; খোদ বাংলাদেশের ইতিহাসেই তার বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ১৯৭২ সালে গণপরিষদ কর্তৃক যে সংবিধান গৃহীত হয় তাতে ‘সেক্যুলারিজম’ (তাদের ভাষায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’) কে মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ঘোষণা করে তাকে সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হল। [আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা) ]

সেক্যুলারিজমকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ঘোষণার পর তা বাস্তবায়নের জন্য ধর্ম উৎখাত ও প্রতিরোধ (eviction and prevention) – উভয়বিধ পদক্ষেপই নেয়া হল। ঐতিহ্যবাহী কবি নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে ‘ইসলাম’ শব্দ কেটে কবি নজরুল কলেজ করা হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে ‘রাব্বি যিদনী ইলমা’ [অর্থাৎ, হে প্রভু, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও (আল কুরআন, সূরা ত্বা-হা, আয়াত ১১৪)] কেটে দেয়া হল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও ফজলুল হক মুসলিম হল থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেয়া হল। [সম্প্রতি অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মুসলিম শব্দটি ফিরে এসেছে]। অথচ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল থেকে ‘জগন্নাথ’ (যা হিন্দুদের ঈশ্বরের নাম) শব্দটি কাটা হল না। [আমরা বলছি না যে, এ শব্দটি কেটে দেয়া উচিত ছিল। আমরা শুধু এটুকুই বুঝাতে চাচ্ছি যে, এদেশের ইতিহাসে সেক্যুলারিজম মানেই শুধু ইসলামের প্রতি একতরফা উগ্র বিদ্বেষ পোষণ এবং অপর দিকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির নাম দিয়ে হিন্দু ধর্মের রীতি-নীতির অনুসরণ।] রেডিও টেলিভিশনে সালাম – কুরআন তেলাওয়াত বন্ধ করে দেয়া হল। আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও অখণ্ড পাকিস্তানের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ  সে সময়ের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে ‘অতি প্রগতিবাদী নেতৃত্ব’  শিরোনামে লিখেছেন,

প্রবাসী সরকার ঢাকায় ফিরার সঙ্গে – সঙ্গে প্রমাণিত হইল যে এটা (অর্থাৎ, যুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশ একটি সেকিউলার রাষ্ট্র, মুসলিম রাষ্ট্র নয়) সরকারী অভিমত। দেশে ফিরিয়াই তাঁরা যা দেখাইলেন, তাতে রেডিও-টেলিভিশনে কোরান-তেলাওয়াত, ‘খোদা হাফেয’, ‘সালামালেকুম’ বন্ধ হইয়া গেল। তার বদলে ‘সুপ্রভাত’, ‘শুভ সন্ধ্যা’ ও ‘শুভ রাত্রি’ ইত্যাদি সম্বোধন প্রথা চালু হইল। [আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, বাংলা একাডেমী ২০০১, পৃষ্ঠা ৪৫৯]

এগুলো ছিল উৎখাত নীতি (eviction policy) বাস্তবায়নের কিছু দিক। আর ভবিষ্যতে যাতে ইসলামের নির্দেশাবলী সমাজ ও রাষ্ট্রে কিছুতেই প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সে উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হল প্রতিরোধ নীতি (prevention policy)। এ নীতি বাস্তবায়নের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যই হল সংগঠনের স্বাধীনতা। অর্থাৎ, কোন উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য যে কোন ব্যক্তিরই সংগঠন তৈরী করার অধিকার রয়েছে।  জনগনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সেই সংগঠনের উদ্দেশ্যের সাথে একমত পোষণ করলেই কেবল তা রাষ্ট্র ও সমাজে কার্যকর হবে। গণতন্ত্রের এই স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বজন স্বীকৃত নীতিকে লংঘন করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন গ্রুপ ইসলামী আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার যে কোন আন্দোলনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ’৭২ এর সংবিধানে ৩৮ অনুচ্ছেদটি ছিল নিম্নরূপঃ

জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে;

 

     তবে শর্ত থাকে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোন সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সঙ্ঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোন সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোন প্রকারে তাহার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোন ব্যক্তির থাকিবে না।

অর্থাৎ, রাষ্ট্র ও সমাজে কার্যকর করার জন্য যে কোন দর্শন (চাই তা উগ্র নাস্তিক্যবাদ, শোষণমূলক পুঁজিবাদ কিংবা সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্রের নামে চরম একদেশদর্শী গুণ্ডা রাষ্ট্রতত্ত্বই হোক না কেন) নিয়ে রাজনীতি ও সংগঠন করা যাবে; কিন্তু কিছুতেই ধর্মীয় নির্দেশাবলী বাস্তবায়নের জন্য সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চালানো যাবে না। এখন প্রশ্ন হল, যে দেশের সিংহভাগ মানুষ আল্লাহকে নিজেদের ইলাহ (সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী) হিসেবে স্বীকার করে ও আল্লাহর নির্দেশ সর্বাগ্রে শিরোধার্য মনে করে সে দেশে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য সঙ্ঘবদ্ধ হওয়া যাবে না অথচ আল্লাহর নির্দেশাবলীকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে মানুষ নিজেরাই আইন প্রণয়নের পূর্ণ অধিকারী এমন দর্শন প্রতিষ্ঠা করার জন্য অসংখ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্থা তৈরী করার উন্মুক্ত লাইসেন্স থাকবে – এহেন নীতি কার কারা, কেন এবং কার স্বার্থে প্রণয়ন করেছিল?

সেকুলারিজম কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা?

এখন প্রশ্ন হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী ছিল? বীর জনগণকে কিসে মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও প্রাণোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল? তাদের উদ্দেশ্য কি এই ছিল যে, “ইনশাল্লাহ, আমরা যদি দেশকে মুক্ত করতে পারি তাহলে আল্লাহ প্রদত্ত আইন কানুনগুলোকে নির্বাসনে পাঠিয়ে সেক্যুলারিজম কায়েম করে আমরা নিজেরাই আইন প্রণয়নের সর্বময় ক্ষমতার মালিক-মোক্তার বনে যাবো”? এই প্রশ্নের উত্তর মুক্তিযুদ্ধের নয় নম্বর সেক্টর কমাণ্ডার মেজর জলিলের ভাষায় শুনুন,

“আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বিশেষ একটি মহলের ধারণা – ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা কি হবে তার মীমাংসা হয়ে গেছে। এ ধরণের উদ্ভট খেয়ালী মন্তব্য কেবল  দুঃখজনকই নয়, বিবেক এবং ‌‌‌‌‍‍ জ্ঞান বিবর্জিতও বটে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং নেতৃত্বদানকারী একজন সেক্টর কমাণ্ডার হিসেবে আমি ঐ সকল বন্ধুদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯৭১ সালে আমরা বাঙ্গালী জনগন পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক  আকস্মিকভাবে চাপিয়ে দেয়া একটি অঘোষিত যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং রক্ষা করার জন্যই যুদ্ধ করেছি কেবল। এটা ছিল স্বাধীনতা আদায়ের যুদ্ধ, কোন ধর্মযুদ্ধ নয় যে, যুদ্ধ বিজয়ের পরবর্তীকালে বিশেষ কোন ধর্মকে পরাজিত বলে বিবেচনা এবং বর্জন করতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের আওতায় ধর্ম সংকুচিত কিংবা পরাভূত হতে যাবে কেন, কোন যুক্তিতে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মীয় অনুপ্রেরণা মোটেও অনুপস্থিত ছিলনা। প্রতিটি যোদ্ধার শ্বাসে-নিঃশ্বাসে, রণক্ষেত্রের প্রতিটি ইঞ্চিতে স্মরণ করা হয়েছে মহান স্রষ্টাকে – তার কাছে কামনা – প্রার্থনা করা হয়েছে বিজয়ের জন্য, নিরাপত্তার জন্য। অধিকাংশ যোদ্ধাই যেহেতু ছিল এদেশের সংখ্যাগুরু মসলিম জনগণেরই সন্তান, সেহেতু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর বুলেট, মর্টারের সন্মুখে আল্লাহ এবং রসূলই ছিল তাদের ভরসাস্থল। সুতরাং  ’৭১ –এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ইসলাম অনুপস্থিত ছিল বলে যারা যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন, তারা কেবল বাস্তবতাকেই অস্বীকার করছেন।” (মেজর (অবঃ) এম এ জলিল, কৈফিয়ত ও কিছু কথা, পঞ্চম প্রকাশ, ঢাকা, পৃষ্ঠা ২৫-২৬)

সেক্যুলারিজমকে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে প্রচার করে তাদের পরিচয় বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন,

তবু যারা মুক্তিযুদ্ধে ধর্মীয় চেতনার অনুপস্থিতি আবিষ্কার করতে চান, তাদের অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের ধারে কাছেও ছিল না। (প্রাগুক্ত ২৬)

মুক্তিযুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রতত্ত্ব কতভাগ লোকের প্রেরণা যুগিয়েছিল সে প্রসঙ্গে মেজর জলিলের বিশ্লেষণ নিম্নরূপঃ

“‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনারর নির্দিষ্ট রূপ যে ছিল না তা নয়, তবে সে চেতনা সীমাবদ্ধ ছিল একটা বিশেষ মহলের মধ্যে এবং তারা হচ্ছে তৎকালীন ছাত্র সমাজের সর্বাধিক সচেতন মহলেরও একটা ক্ষুদ্র অংশবিশেষ – বিশেষ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সেই অংশটি যার নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র নেতা সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ প্রমুখ। এই অংশটির চিন্তা-চেতনায় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানী চক্র থেকে মুক্ত করে এই অঞ্চলকে বাঙালীর জন্যে একটি স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল। (মেজর (অবঃ) এম এ জলিল, অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা, সপ্তম প্রকাশ, পৃঃ ৩২)

অন্যান্য সংগঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

এর বাইরে যে ছাত্র সমাজ বা রাজনৈতিক সংগঠন ছিল তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ছিল গতানুগতিক দেশপ্রেমিকদের দায়িত্বস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধের উপরিউক্ত নির্দিষ্ট চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়। (প্রাগুক্ত)

অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধার চেতনাবোধ প্রসংগে তিনি লিখেছেন,

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সেই সুনির্দিষ্ট চেতনার ধারাবাহিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়নি বলেই অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই জানত না তারা কোন লক্ষ্য অর্জনেরে স্বার্থে ঐ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা কেবল একটা কথাই জানতো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীসহ সকল অবাঙ্গালীকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাড়িয়ে দেশকে মুক্ত করতে হবে। পুনরায় বাপ-দাদার ভিটায় স্বাধীনভাবে ফিরে যেতে হবে। এর অধিক তারা আর কিছুই জানতনা বা বুঝত না। (অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা, সপ্তম প্রকাশ, পৃঃ ৩৩)

 

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সেক্যুলারিজমঃ

অনেকসময় সেক্যুলারিজমের প্রবক্তাদেরকে এ যুক্তির অবতারনা করতে দেখা যায় যে, ধর্ম ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়; সামস্টিক জীবনে এর কোন প্রয়োজন নেই। এটি একটি হাস্যকর যুক্তি। কারণ, মানুষের ব্যক্তিজীবন সামস্টিক জীবনেরই একটি অপরিহার্য অংশ। একটি ব্যক্তি ব্যক্তিগত জীবনে সৎ, আর সামাজিক জীবনে অসৎ – তা কিছুতেই সম্ভব নয়। কারণ, কেউ ব্যক্তি জীবনে সৎ হতে চাইলে তাকে সামাজিক জীবনে সততার পরিচয় দিয়েই সৎ হতে হবে। অনুরূপভাবে সত্যবাদিতা, আমানতদারী, বিশ্বস্ততা, ধার্মিকতা ও পরোপকার ইত্যাদি গুণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ, এসকল গুনে গুনান্বিত হতে চাইলে সামাজিক জীবনে এ সকল গুণের পরিচয় দিতে হবে। যদি কোন রাষ্ট্র আইন করে বলে দেয় যে, সামাজিক জীবনে এ সকল গুনের চর্চা করা যাবেনা এবং জনগনও নিষ্ঠার সাথে রাষ্ট্রের এই আইন মেনে চলে তাহলে সে সমাজে এ সকল গুণের অধিকারী লোক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সুদের বিষয়টি ধরা যাক। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে নির্দেশ দেয় সুদী কারবার থেকে দূরে থাকতে। [لا تاكلوا الربا তোমরা সুদ খেয়ো না– (আলে ইমরান ১৩০)   فان لم تفعلوا فاذنوا بحرب من الله و رسوله অর্থাৎ, সুদী কারবার পরিত্যাগ না করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও (আল বাকারাহ – ২৭৯)] এখন যতক্ষন পর্যন্ত রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে সুদী কারবারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করবে ততক্ষন পর্যন্ত কোন ব্যক্তির পক্ষে সুদমুক্ত জীবন যাপন করা সম্ভব হবে না। অতএব, রাষ্ট্র যদি সেক্যুলারিজমের দোহাই দিয়ে ইসলামের “সুদ খেয়ো না” – শীর্ষক নিষেধাজ্ঞাটি রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর না করে, তাহলে দেশের কেউ সুদমুক্ত জীবন যাপন করতে পারবে না । [1] অর্থাৎ, সামাজিক জীবনে এ আইন কার্যকর না থাকলে ব্যাক্তি জীবনেও তা কার্যকর রাখা অসম্ভব। কারণ, ব্যক্তি একাকী কোন বানিজ্যিক চুক্তি করতে পারে না।

অনুরূপভাবে যাকাত প্রসঙ্গ। আল্লাহ ধনী মানুষের সম্পদে গরীব মানুষের অধিকার ঘোষণা করেছেন। (و فى اموالهم حق للسائل و المحروم অর্থাৎ, ধনী মানুষের সম্পদে রয়েছে গরীব মানুষের অধিকার আয যারিয়াত ) ইসলামী আইনের পরিভাষায় তার নাম যাকাত। রাষ্ট্র আইন করে বাধ্যতামূলক ভাবে যাকাত আদায় না করলে গরীব মানুষ তার ইসলাম প্রদত্ত অধিকার যথাযথ ভাবে পেতে পারে না। অনেকে হয়তো বলতে পারেন, লোকজন স্বেচ্ছায় যাকাত আদায় করে দিলেই তো গরীব মানুষ তার অধিকার পেয়ে যায়; বাধ্যতামূলক আইন প্রনয়নের মাধ্যমে যাকাত আদায়ের কী প্রয়োজন?  আমাদের উত্তর হলো- স্বেচ্ছায় যাকাত আদায় করে দিলে তো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ না করলেও চলে। কিন্তু, আমরা দেখতে পাচ্ছি লোকজন স্বেচ্ছায় তা আদায় করছে না। এর কারণ কী? এর সুস্পষ্ট কারণ হল, মানুষ আদতেই স্বার্থপর। আর্থিক বিষয়ে মানুষের এই স্বভাব আরো প্রকট হয়ে উঠে। আর রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ঠিক এখানেই। এজন্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্রকে বলা হয় “বল প্রয়োগকারী সংস্থা” (agency with coercive power) । জনগন স্বেচ্ছায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে না চাইলে রাষ্ট্রকে তার বল প্রয়োগকারী শক্তির (coercive power) প্রয়োগ করতে হয়। অন্যথায় রাষ্ট্র নিস্প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

এদেশে আয়কর কায়েম আছে কিন্তু যাকাত কায়েম নেই

বাংলাদেশের একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে আরো সহজ হবে। এদেশে আয়কর (income tax) কায়েম আছে; অথচ যাকাত কায়েম নেই। কারণ, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের (The Income Tax Ordinance, 1984) মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমানের বেশী উপার্জনকারীর উপর আয়কর প্রদান বাধ্যতামূলক করা ও অনাদায়ে জেল-জরিমানাসহ বিভিন্ন দণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে কারো পক্ষেই আয়কর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে সরকার এ খাত থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করে নিতে পারছে। অন্যদিকে ১৯৮২ সালে প্রণীত হয় যাকাত তহবিল অধ্যাদেশ (The Zakat Fund Ordinance, 1982)। এরপরও প্রায় নব্বই শতাংশ সচ্ছল লোক যাকাত আদায় করছে না। কারণ, এ আইনের কোন বাধ্যতামূলক (binding) দিক নেই। এ আইনে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিকরা ইচ্ছা করলে তাদের যাকাত এই তহবিলে জমা দিতে পারবে। ব্যস! অর্থাৎ, কেউ ইচ্ছে করলে যাকাত দিবে, কেউ ইচ্ছে না করলে দিবে না; রাষ্ট্র এ নিয়ে কোনপ্রকার মাথা ঘামাবে না। কেউ না দিলে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা কিংবা অন্য কোন দণ্ডের ব্যবস্থা করবে না (যার ব্যবস্থা রয়েছে আয়কর প্রদান না করার ক্ষেত্রে)। একবার চিন্তা করে দেখুন তো, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (VAT = Value Added Tax) যদি যাকাত তহবিল অধ্যাদেশের মত ঐচ্ছিক হতো, তাহলে জনগনের শতকরা দশ ভাগের বেশী লোক কি স্বেচ্ছায় তা আদায় করতো? আর সরকারও কি এ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে পারতো?

শাসকগোষ্ঠী যে কারণে যাকাতকে বাধ্যতামূলক করেনিঃ

১৯৮২ সালের যাকাত তহবিল অধ্যাদেশ (The Zakat Fund Ordinance, 1982) ও ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ (The Income Tax Ordinance, 1984) – দু’টি আইনই মুসলিম নামধারী শাসকেরাই প্রবর্তন করেছিল। এখন প্রশ্ন হল, যাকাতকে ঐচ্ছিক (optional) আর আয়করকে বাধ্যতামূলক (compulsory) করার কারণ কী?  তার কারণ মূলত দু’টি; (১) বৃটিশের গোলামির শাসনামল থেকে চলে আসা সেকুলারিজম (সমাজ, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় আইন কানুন থাকবে সম্পূর্ণ ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত) নীতি, ও (২) যাকাতের গরীব বান্ধব (poor friendly) নীতি।

প্রথম নীতিটির (Secularism) কারণে আমাদের সমাজের মেধাবী ও সম্ভাবনাময় ছাত্রদের বৃহত্তম অংশ ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ধর্মের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের জ্ঞানটুকু অর্জন না করেই বড় হয়ে উঠেছে এবং কালক্রমে তারাই আমাদের শাসনযন্ত্রের উপর আসন গেড়ে বসেছে। লর্ড ম্যাকলে প্রবর্তিত সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থায় তারা ধারাবাহিক এই শিক্ষাই পেয়ে এসেছে যে, – “যুক্তিবাদের (Rationalism) দাবী অনুযায়ী কোন বস্তু সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবার আগ পর্যন্ত তাকে অস্তিত্বহীন (non-existent), অথবা কমপক্ষে সংশয়পূর্ণ (doubtful), মনে করতে হবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে স্রষ্টার অস্তিত্ব সংশয়পূর্ণ; অর্থাৎ, এখনো তা প্রমাণিত সত্য নয়। আর মহাবিশের স্রষ্টা যদি থেকেও থাকে তাহলে তিনি কেবল ‘প্রথম কার্যকারণ’ (First Cause)। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করে   থাকলেও তিনি কিছু চিরন্তন ‘প্রাকৃতিক আইন’ (natural laws) তৈরী করে দিয়েছেন যার অধীনে মহাবিশ্ব সক্রিয় রয়েছে। তিনি সেই  প্রাকৃতিক আইনে আর কোন হস্তক্ষেপ করছেন না; কিংবা চেষ্টা করলেও তিনি আর হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। [2] ধর্মগুলো স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত কোন নির্দেশমালা নয়; এগুলো বরং সামাজিক উদ্ভাবনীরই (social inventions) একটি অংশ। সমাজের মানুষকে নিয়ন্ত্রন করার উদ্দেশ্যে জ্ঞানী লোকেরা যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম আবিস্কার করেছে। ধর্ম কেবল মানুষের আধ্যাত্মিক  বিষয়াবলী (spiritual affairs) নিয়ন্ত্রন করার মন্ত্র বিশেষ। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিষয়াবলীর কোন সমাধান ধর্মে নেই; আর থাকলেও তা আলোকিত যুগের (The Age of Enlightenment) ইউরোপীয় নাস্তিক দার্শনিকদের প্রদত্ত সেক্যুলার সমাধানের তুলনায় অনেক নিম্ন মানের”। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রে আসীন হয়ে তারা ধর্ম সম্পর্কে ছাত্রজীবনে রপ্ত করা বিশেষ দৃষ্টিভংগীর প্রতিফলন ঘটাতে থাকে। মুসলিম জনতার চাপের মুখে মাঝে মধ্যে ইসলামী বিষয়েও তারা আইন প্রণয়নে বাধ্য হয়। কিন্তু এ বিষয়ের প্রতি আন্তরিকতা না থাকার ফলে আইন প্রণয়নের মধ্যেও অসচেতন মুসলমানদেরকে প্রায়ই সুকৌশলে ধোঁকা দিয়ে থাকে। যাকাত অধ্যাদেশ সেই ধোকারই একটি অংশ। মুসলিম জনতাকে তারা একথা বুঝানোর চেষ্টা করে যে, “আরে মিয়া! আমরাও তো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রবক্তা। দেখছো না, আয়কর আদায়ের মত করে যাকাত আদায়ের জন্যও আমরা অধ্যাদেশ জারি করেছি”? বস্তুত, এটি একটি শুভংকরের ফাঁকি। কারণ, যাকাত অধ্যাদেশের বাধ্যতামূলক দিক (binding aspect) না থাকার ফলে যাকাত পরিত্যাগকারীদের গায়ে আঁচড়টুকু লাগারও সুযোগ নেই।

আর দ্বিতীয় নীতিটির মূলকথা হল

(চলবে)


[1] আমাদের দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার বাস্তব সাক্ষী। বস্তুবাদী বৃটিশ প্রবর্তিত খোদাদ্রোহী আইনের বিষাক্ত শিকড়টি এখনো আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থা থেকে সমূলে উৎপাটিত  না করার ফলে আপনি সুদ না নিলেও অনেক ক্ষেত্রে আপনি সুদ দিতে বাধ্য থাকবেন। অথচ, রাসূল (সাঃ) এর হাদীস অনুযায়ী  لعن رسول الله صلى الله عليه و سلم اكل الربا و مؤكله    সুদ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের উপর রাসূল (সাঃ) অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন  (সুনানুত তিরমিযি, ৩য় খণ্ড, হাদীস নং ১২০৬)। কারণ, সুদ দাতা সুদ প্রদানের মাধ্যমেই সুদখোরের রমরমা ব্যবসা জিইয়ে রেখেছিল। তাছাড়া, সব সমাজেই সুদ গ্রহীতার তুলনায় সুদ দাতার সংখ্যা বেশী। তারা যদি সংঘবদ্ধভাবে রুখে দাড়াতো, তাহলে সমাজে মুষ্টিমেয় সুদখোরের সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পারতো না।

[2] Science seems to have uncovered a set of laws that, within the limits set by the uncertainty principle, tell us how the universe will develop with time, if we know its state at any one time. These laws may have originally been decreed by God, but it appears that he has since left the universe to evolve according to them and does not intervene in it.  Stephen Hawking, A Brief History of Time,            pp

Leave a comment

Filed under Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s