Power of a state vis-a-vis its citizens

নাগরিকের বিপরীতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা

সূচীপত্র

মানুষের প্রকৃতি নির্ণয়ে রুশোঃ  

দ্বন্দমুখর স্বার্থের ক্ষেত্রে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ

জেরেমি বেন্থাম জন স্টুয়ার্ট মিলের সমাধানঃ

উপযোগবাদের (Utilitarianism) সমালোচনায় কার্ল মার্কসঃ

উপযোগ নীতি (Principle of utility) কুরআন কর্তৃক প্রত্যাখ্যাতঃ

রাষ্ট্র-সমাজের একমাত্র বল প্রয়োগকারী (coercive) সংস্থাঃ

ম্যাক্স ওয়েবারের বিশ্লেষণঃ

রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাঃ

মদীনা সনদ (the Charter) কুরআনে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবী (সাঃ) এর নিরংকুশ ক্ষমতাঃ

রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগে নবী (সাঃ) এর সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতাঃ

দ্রব্য মূল্য নির্ধারণ (price fixation):

গোপনীয়তা (confidentiality) রক্ষাঃ

রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাগিরির (espionage)সীমারেখাঃ

হযরত উমরের কার্যপদ্ধতিঃ

বিয়ের ন্যুনতম বয়স নিয়ে বিতর্কঃ

বিয়ে

বিয়ের উদ্দেশ্য

বিয়ে করা না করার এখতিয়ার

বিয়েতে ছেলে কিংবা মেয়ে কারো উপরই কোন প্রকার জবরদস্তি চলবে না

ইসলাম যে কারণে বিয়ের ন্যুনতম বয়স (minimum age of marriage) বাধ্যতামূলক করে নি

ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য নানা হাতিয়ারঃ

বিয়ের ন্যুনতম বয়স” ধারণাটির উৎপত্তি

যেসব জাতি “বিয়ের ন্যুনতম বয়স” ধারণাটি প্রবর্তন করেছে এবং যারা তা মেনে নিয়েছে তাদের চারিত্রিক অবস্থা

বিয়ের ন্যুনতম বয়স (minimum age of marriage) বাধ্যতামূলক করার তথাকথিত ‘সুফল’

বিয়ের ন্যুনতম বয়স (minimum age of marriage) বাধ্যতামূলক করার সর্বনাশা কুফল

যেসব কারণে মানুষ তথাকথিত “ন্যুনতম বয়স” এর নীচে বিয়ে দিয়ে দেয়

দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ

১।যে রাষ্ট্র যাকাত ব্যবস্থা কার্যকর পূর্বক নাগরিকদের দারিদ্র নিরসন করতে পারে নি সে রাষ্ট্র চুরির  ইসলামী শাস্তি কার্যকর করার অধিকার রাখে কি?

২। অনুরূপভাবে যে রাষ্ট্র বিয়ের ন্যুনতম বয়স (minimum age of marriage) বাধ্যতামূলক করে দেয় সে রাষ্ট্র ব্যভিচারের ইসলামী শাস্তি কার্যকর করার অধিকার রাখে কি?

 

 

 

মানুষের প্রকৃতি নির্ণয়ে রুশোঃ 

মানুষ একাকী পৃথিবীতে আসে; চলেও যায় একাকী।[1] মাঝখানের এ সময়টিতে মানুষকে হয়ে থাকতে হয় অসংখ্য আইন-কানুন ও শৃংখলার অধীন। অথচ মানুষের মন ও ব্যক্তিত্ব অন্য কারো অধীন থাকতে বড়ই নারাজ। মন ও বাস্তবতার এই বিস্তর ফারাক দেখে মহান ফরাসী সমাজতত্ত্ববিদ জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো (Jean Jacques Rousseau) লিখেছেন, “Man is born free; and every where he is in chains. One thinks himself the master of others, and still remains a greater slave than they.”[2] অর্থাৎ মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়; অথচ সে সর্বত্র শৃংখলিত। কেউ হয়তো মনে করছে যে, সে স্বাধীন; অথচ সে-ই অন্যদের তুলনায় বেশী পরাধীন।

দ্বন্দমুখর স্বার্থের ক্ষেত্রে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ

মানুষ আদতেই একটি স্বার্থপর প্রাণী। সর্বত্র তার নিজের স্বার্থকে বিজয়ী দেখতে সে বেজায় আগ্রহী। সমস্যা হল, মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে একজন নয়; ছয় শ’ কোটিরও বেশী। তাদের সবার স্বার্থ একরকম নয়। অনেক সময় একজনের স্বার্থের সমাধির উপর নির্মিত হয় আরেকজনের স্বার্থের ইমারত। চোরের স্বার্থ হাসিল হয় সাধারণ মানুষের সম্পদ চুরি করার মাধ্যমে। চৌর্যবৃত্তিকে বন্ধ করা হলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ নিরাপদ থাকে বটে; তবে তাতে চোরের স্বার্থ হয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিপরীত দিকে চোরের স্বার্থ সংরক্ষনের উদ্দেশ্যে চৌর্যবৃত্তিকে বৈধ রাখা হলে সাধারণ মানুষের স্বার্থের নিরাপত্তা আর অবশিষ্ট  থাকে না। স্বার্থ দু’টি পরস্পর বিপরীত হওয়ার কারণে উভয়টিকে সংরক্ষন করার কোন উপায় নেই।অতএব, একটি স্বার্থকে বহাল রেখে অপরটিকে নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু,এক্ষেত্রে দু’টি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। প্রথমত, এই বহাল রাখা ও নিষিদ্ধকরণ হবে কীসের ভিত্তিতে? দ্বিতীয়ত, মানব পরিবারের প্রতিটি সদস্যই যেহেতু সমান স্বাধীনতা নিয়ে জন্ম লাভ করেছে[3], সেহেতু তাদের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয়ার বা নিষিদ্ধ করার দুরুহ কাজটি সমাধা করবে কে?

জেরেমি বেন্থাম জন স্টুয়ার্ট মিলের সমাধানঃ

প্রথম প্রশ্নটির ব্যাপারে জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham) ও জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) এর ন্যায় দার্শনিকদের উদ্ভাবিত সমাধানটির নাম “উপযোগবাদ” (utilitarianism)। এই দর্শনের মূলকথা হল, সুখ ও দুঃখ-ই হচ্ছে বৈধতা ও অবৈধতার একমাত্র মানদণ্ড। অর্থাৎ,যা সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সর্বোচ্চ মাত্রার সুখ (greatest happiness of the greatest number) নিশ্চিত করতে সক্ষম তা-ই সমাজে কার্যকর রাখা হবে।বেন্থামের ভাষায় শুনুন, Nature has placed mankind under the governance of two sovereign masters, pain and pleasure. It is for them alone to point out what we ought to do, as well as to determine what we shall do. On the one hand the standard of right and wrong, on the other the chain of causes and effects, are fastened to their throne. They govern us in all we do, in all we say, in all we think: every effort we can make to throw off our subjection, will serve but to demonstrate and confirm it. In words a man may pretend to abjure their empire: but in reality he will remain subject to it all the while. The principle of utility recognises this subjection, and assumes it for the foundation of that system, the object of which is to rear the fabric of felicity by the hands of reason and of law. Systems which attempt to question it, deal in sounds instead of sense, in caprice instead of reason, in darkness instead of light.

But enough of metaphor and declamation: it is not by such means that moral science is to be improved.

The principle of utility is the foundation of the present work: it will be proper therefore at the outset to give an explicit and determinate account of what is meant by it. By the principle of utility is meant that principle which approves or disapproves of every action whatsoever, according to the tendency which it appears to have to augment or diminish the happiness of the party whose interest is in question: or, what is the same thing in other words, to promote or to oppose that happiness. I say of every action whatsoever; and therefore not only of every action of a private individual, but of every measure of government.

By utility is meant that property in any object, whereby it tends to produce benefit, advantage, pleasure, good, or happiness (all this in the present case comes to the same thing), or (what comes again to the same thing) to prevent the happening of mischief, pain, evil, or unhappiness to the party whose interest is considered: if that party be the community in general, then the happiness of the community: if a particular individual, then the happiness of that individual. [4]

উপযোগবাদের (Utilitarianism) সমালোচনায় কার্ল মার্কসঃ

 

উপযোগবাদের সমালোচনায় কার্ল মার্কস লিখেছেন, “Not even excepting our philosopher, Christian Wolff, in no time and in no country has the most homespun commonplace ever strutted about in so self-satisfied a way. The principle of utility was no discovery of Bentham. He simply reproduced in his dull way what Helvétius and other Frenchmen had said with esprit in the 18th century. To know what is useful for a dog, one must study dog-nature. This nature itself is not to be deduced from the principle of utility. Applying this to man, he who would criticise all human acts, movements, relations, etc., by the principle of utility, must first deal with human nature in general, and then with human nature as modified in each historical epoch. Bentham makes short work of it. With the driest naiveté he takes the modern shopkeeper, especially the English shopkeeper, as the normal man. Whatever is useful to this queer normal man, and to his world, is absolutely useful. This yard-measure, then, he applies to past, present, and future. The Christian religion, e.g., is “useful,” “because it forbids in the name of religion the same faults that the penal code condemns in the name of the law.” Artistic criticism is “harmful,” because it disturbs worthy people in their enjoyment of Martin Tupper, etc. With such rubbish has the brave fellow, with his motto, “nulla dies sine line!,” piled up mountains of books. Had I the courage of my friend, Heinrich Heine, I should call Mr. Jeremy a genius in the way of bourgeois stupidity.”[5]

মার্কস এর মতে, বেন্থাম মানুষের পরিবর্তনশীল প্রকৃতিকে আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন; ফলে তাদের জন্য যে জিনিসটিকে ‘ভাল’ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে তা-ও যে পরিবর্তনশীল সে বিষয়টি অনুধাবন করতে বেন্থামের ব্যার্থতাও একই পর্যায়ের। মানুষের প্রকৃতি মূলত গতিশীল। অতএব, একটি উপযোগকে সব মানুষের উপযোগ বলে চালিয়ে দেয়ার ধারণাটি একপেশে ও অনুপযোগী।  (Bentham fails to take account of the changing character of people, and hence the changing character of what is good for them…….human nature is dynamic, so the concept of a single utility for all humans is one-dimensional and not useful.[6])।

উপযোগ নীতি (Principle of utility) কুরআন কর্তৃক প্রত্যাখ্যাতঃ

“যা কিছু সুখকর তা-ই কল্যানকর ও সমাজে কার্যকর হওয়ার উপযুক্ত আর যা কিছু কষ্টদায়ক তা-ই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত” –  বৈধতা ও অবৈধতার এ মানদণ্ডকে কুরআন প্রত্যাখ্যান করে। কুরআন  বলে,

و عسى ان تكرهوا شيئا و هو خير لكم و عسى ان تحبوا شيئا و هو شر لكم و الله يعلم و انتم لا تعلمون

অর্থাৎ, “হতে পারে কোন জিনিস তোমরা অপছন্দ করো অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যানকর ৷ আবার এও হতে পারে যে, কোন জিনিস তোমরা পছন্দ করো অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যানকর৷ আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না”[7]

সারকথা,ভালো ও মন্দের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিবেন আল্লাহ নিজেই; ইচ্ছে মাফিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য মানুষকে ছেড়ে দেয়া হয় নি।

রাষ্ট্র-সমাজের একমাত্র বল প্রয়োগকারী (coercive) সংস্থাঃ

 

দ্বিতীয় প্রশ্নটির ব্যাপারে (অর্থাৎ, মানব পরিবারের প্রতিটি সদস্যই যেহেতু সমান স্বাধীনতা নিয়ে জন্ম লাভ করেছে[8], সেহেতু তাদের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয়ার বা নিষিদ্ধ করার দুরুহ কাজটি সমাধা করবে কে?) বুদ্ধিমান মানুষ রাষ্ট্র (state) নামক একটি বলপ্রয়োগকারী সংস্থা (agency with coercive power) তৈরী করে নিয়েছে (a state is the compulsory political institution that maintains a monopoly of the legitimate use of force within a certain territory [9])। এ তত্ত্বের মূলকথা হল, যেহেতু মানব সমাজে স্বার্থের দ্বন্দ বিরাজমান, সেহেতু কোন ব্যক্তির স্বার্থচর্চা যাতে অপর ব্যক্তির স্বার্থকে বিঘ্নিত করতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য এমন একটি সংস্থা থাকা দরকার যা লোকদের মধ্যে রেফারী বা আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করবে।শৃংখলা বিধানের এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেখানে বল (force) প্রয়োগ করা প্রয়োজন সেখানে একমাত্র রাষ্ট্র-ই তা প্রয়োগ করার বৈধ অধিকারী।

ম্যাক্স ওয়েবারের বিশ্লেষণঃ

রাষ্ট্রের সাথে বল প্রয়োগের (coercion /use of force / violence) কী সম্পর্ক তা বিশদভাবে ফুটে উঠেছে জার্মান সমাজতত্ত্ববিদ ম্যাক্স ওয়েবারের (Max Weber) বর্ণনায়।(‘Every state is founded on force,’ said Trotsky at Brest-Litovsk. That is indeed right. If no social institutions existed which knew the use of violence, then the concept of ‘state’ would be eliminated, and a condition would emerge that could be designated as ‘anarchy,’ in the specific sense of this word. Of course, force is certainly not the normal or the only means of the state–nobody says that–but force is a means specific to the state. Today the relation between the state and violence is an especially intimate one. In the past, the most varied institutions–beginning with the sib–have known the use of physical force as quite normal. Today, however, we have to say that a state is a human community that (successfully) claims the monopoly of the legitimate use of physical force within a given territory. Note that ‘territory’ is one of the characteristics of the state. Specifically, at the present time, the right to use physical force is ascribed to other institutions or to individuals only to the extent to which the state permits it. The state is considered the sole source of the ‘right’ to use violence.) [10]

রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাঃ

 

উপরের আলোচনা থেকে পরিস্কার বুঝা গেল যে, রাষ্ট্র কোন শৌখিন প্রতিষ্ঠান নয়; বরং বাধ্য হয়েই মানুষ এই দানবীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে। এ কারণেই সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ টমাস হবস (Thomas Hobbes) রাষ্ট্রকে এক  মহা দৈত্যের (Leviathan) সাথে তুলনা করেছেন। [… by art is created that great LEVIATHAN called a COMMONWEALTH, or STATE, in Latin CIVITAS, which is but an artificial man; though of greater stature and strength than the natural, for whose protection and defence it was intended; and in which the sovereignty is an artificial soul, as giving life and motion to the whole body][11]।ভাল-খারাপ যে কোন ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র শক্তি ব্যাবহৃত হতে পারে। উভয়টির ফলাফলও অনেক সুদূরপ্রসারী।

নবী (সাঃ)সম্পূর্ণ বৈরী রাষ্ট্র শক্তির বেষ্টনীতে টানা তের বছর মক্কায় প্রচারাভিযান অব্যাহত রাখেন। শেষের বছরগুলোর দিকে বাহ্যদৃষ্টিতে তাকালে মনে হবে যে, তাঁর মিশন ব্যর্থ। কারণ, বেশ কিছু অনুসারীকে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করা হল। একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাণভয়ে সুদূর ইথিওপিয়ায় পাড়ি জমাল।দিন যত যাচ্ছে, রাষ্ট্রশক্তি ততই বৈরী হয়ে উঠছে। নবী (সাঃ) কে হত্যা করার ষড়যন্ত্রও প্রায় পাকাপোক্ত। এরকম একটি মুহুর্তে তাঁকে নিম্নোক্ত দোয়া করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে,

و قل رب ادخلنى مدخل صدق و اخرجنى مخرج صدق و اجعل لى من لدنك سلطانا نصيرا

অর্থাৎ, “আর দোয়া করোঃ হে আমার রব ! আমাকে যেখানেই তুমি নিয়ে যাও সত্যতার সাথে নিয়ে যাও এবং যেখান থেকেই বের করো সত্যতার সাথে বের করো৷এবং তোমার পক্ষ থেকে একটি কর্তৃত্বশীল পরাক্রান্ত শক্তিকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও” [12]এর কিছু দিন পর নবী (সাঃ) হিজরত করে মদীনায় চলে যান এবং সেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে এক নয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথিবী থেকে অন্যায়ের মূলোৎপাটনের জন্য নিছক উপদেশই যথেষ্ট নয়; মাঝে মধ্যে শক্তি প্রয়োগ অনিবার্য হয়ে উঠে। এ বিষয়ের প্রতি ইংগিত করে নবী (সাঃ) বলেন,

ان الله يزيغ بالسلطان ما لا يزيغ بالقران

“আল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বলে এমনসব জিনিসের উচ্ছেদ ঘটান কুরআনের মাধ্যমে যেগুলোর উচ্ছেদ ঘটান না”।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবী (সাঃ) এর নিরংকুশ ক্ষমতাঃ

 

মদীনাতে নবী (সাঃ) রাষ্ট্র শাসনের যে নিরংকুশ ক্ষমতা লাভ করেন “মদীনা সনদ” (the Madina Charter) এর নিম্নোক্ত ধারা গুলোতে তার কিছুটা বর্ণনা পাওয়া যায়।

وأنه ما كان بين أهل هذه الصحيفة من حدث أو اشتجار يخاف فساده فإن مرده إلى الله وإلى محمد رسول الله (صلى الله عليه وسلم)[13]

“এ চুক্তির পক্ষসমূহের মধ্যে সমস্যা সৃষ্টিকারী কোন দ্বন্দ দেখা দিলে তা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট নিয়ে যেতে হবে”। [If any dispute or controversy likely to cause trouble should arise it must be referred to God and to Muhammad the apostle of God[14].]

و انكم مهما اختلفتم فيه من شيء فان مرده الى الله عزوجل و الى محمد صلى الله عليه و سلم[15]

 “চুক্তি সংক্রান্ত কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট নিয়ে যেতে হবে” [Whenever you differ about a matter it must be referred to God and to Muhammad [16](May Allah bless him and grant him peace)]

و انه لا يخرج منهم احد الا باذن محمد صلى الله عليه و سلم [17]

“চুক্তিবদ্ধ কেউই মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুমতি ব্যতীত কোন যুদ্ধে যেতে পারবে না” [None of them shall go out to war save the permission of Muhammad[18].]

এ তো গেল মুসলিম – অমুসলিম নির্বিশেষে মদীনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের উপর নবী (সাঃ) এর নিরংকুশ ক্ষমতার কিছু নমুনা। মুসলিম নাগরিকদের জন্য তিনি কেবল রাষ্ট্র প্রধান হিসেবেই অবশ্য মান্য নন; বরং তাঁর প্রতিটি নির্দেশের সামনে বিনা বাক্য ব্যায়ে আনুগত্যের মাথা নত করে দেয়াকে তাদের জন্য ঈমানের পূর্বশর্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

و ما اتاكم الرسول فخذوه و ما نهاكم عنه فانتهوا

“রাসূল যা কিছু তোমাদের দেন তা গ্রহণ করো এবং যে জিনিস থেকে তিনি তোমাদের বিরত রাখেন তা থেকে বিরত থাকো” [19]

و ما كان لمؤمن و لا مؤمنة اذا قضى الله و رسوله امرا ان يكون لهم الخيرة من امرهم من يعصى الله و رسوله فقد ضل ضلالا مبينا

“যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ্ন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷[20]

فلا و ربك لا يؤمنون حتى يحكموك فيما شجر بينهم ثم لا يجدوا فى انفسهم حرجا مما قضيت و يسلموا تسليما

“না, হে মুহাম্মদ ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মুনিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পারিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফায়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্য যে কোন প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে”।[21]

রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগে নবী (সাঃ) এর সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতাঃ

এবার আমরা দেখতে চাই, এ নিরংকুশ ক্ষমতা লাভ করা সত্ত্বেও নবী (সাঃ) রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে জনগণের উপর সে ক্ষমতা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করতেন ও মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত ও গোপনীয় (confidential) বিষয়গুলোকে কতটুকু সম্মান করতেন এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের তথাকথিত শৃংখলা ও নিরাপত্তার ধুয়া তুলে মানবাধিকার কতটুকু লংঘন করতেন।

দ্রব্য মূল্য নির্ধারণঃ (price fixation)

 

সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর দ্বীনকে গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে জীবনের সিংহভাগ সময় যুদ্ধ জিহাদে কাটিয়ে দিচ্ছিলেন।যুদ্ধফেরৎ সাহাবীরা মদীনায় এসে প্রায়ই দেখতেন দুষ্টু প্রকৃতির অতি মুনাফা প্রত্যাশী কিছু লোক পণ্য মজুদ পূর্বক বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে দ্রব্য মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।একবার তাঁরা নবী (সাঃ) এর কাছে এ নিবেদন জানালেন যে, তিনি যেন রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিটি পণ্যের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ (price fixation) করে দেন যাতে ক্রেতা সাধারণের ভোগান্তির অবসান ঘটে।নিরংকুশ রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নবী (সাঃ) অত্যন্ত অসহায়ের মত তাঁদের আবেদনে সাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানান।

غلا السعر على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم فقالوا يا رسول الله قد غلا السعر فسعر لنا فقال ان الله هو المسعرالقابض الباسط الرازق انى لارجو ان القى ربى و ليس احد يطلبنى بمظلمة فى دم و لا مال[22]

অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর শাসনামলে দ্রব্য মুল্য বেড়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিবেদন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! দ্রব্য মূল্য তো অনেক বেড়ে গেছে। আপনি সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দিন”। নবী (সাঃ) বলেন, “আল্লাহই তো ফলন কম ও বেশী দেয়ার মাধ্যমে পণ্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি করে তোমাদের রিযকের ব্যবস্থা করে থাকেন। আমি আমার রবের সাথে এমনভাবে সাক্ষাত করতে চাই যাতে কোন ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্রাণ বা সম্পদহানির অভিযোগ দায়ের করতে না পারে”

অর্থাৎ, দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার পেছনে সবসময়ই সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের মজুদদারী (hoarding) কিংবা কারসাজি দায়ী নয়। অনেকসময় ফলন কম হওয়ার প্রেক্ষিতে পণ্য দুর্লভ হয়ে উঠে। ফলে তার দাম বেড়ে যায়। আবার ফলন বেশী হলে পণ্য সুলভ হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে তার দাম কমে আসে। ফলন কম ও বেশী দেয়া সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হাতে ন্যস্ত। তিনি কম দিতে চাইলে উন্নত প্রযুক্তির ব্যাবহার সেখানে সুফল দিতে পারে না; মাঝে মধ্যে উল্টো ফসল ও জমি উভয়ের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার আল্লাহ চাইলে অতি অল্প খরচের চাষেও বাম্পার ফলন দিতে পারেন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নবী (সাঃ) যা বুঝাতে চেয়েছেন তা ছিল এই যে,আমার পক্ষে কী করে জানা সম্ভব যে, কোন একটি পণ্য ফলাতে কোন চাষীর কী পরিমাণ খরচ হয়েছে? এদের প্রত্যেকের উৎপাদন খরচের নিখুঁত তথ্য ব্যতিরেকে আমি যদি পণ্যের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দেই তাহলে যে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেশী পড়েছে তাতে সে লোকসান সহকারে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবে। কেয়ামতের দিন তো সে ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে এই মর্মে জুলুমের অভিযোগ উত্থাপন করবে যে, আমার নির্দেশের কারণে সে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

অতএব দ্রব্যমূল্য সরাসরি নির্ধারণ (price fixation) না করে বাজার পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার জন্য রাসূল (সাঃ) ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। আর তা হল, মজুদদারীর কুফল ও স্বল্প মুনাফায় পণ্য ছেড়ে দেয়ার সুফল সম্পর্কে জনগনকে সচেতন করে তোলার ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে তিনি নিম্নোক্ত নির্দেশনাসমূহ প্রচারণার ব্যাবস্থা করেনঃ

الجالب مرزوق و المحتكر ملعون[23]

অর্থাৎ, স্বল্প মুনাফায় পণ্য বিক্রেতা (আল্লাহর পক্ষ থেকে) রিযক প্রাপ্ত; পক্ষান্তরে মজুদদার অভিশপ্ত।

لا يحتكر الا خاطئ[24]

অর্থাৎ, একমাত্র পাপিষ্ঠরা-ই মজুদদারীর কাজ করে।

من احتكر على المسلمين ضربه الله بالجذام و الافلاس[25]

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মজুদদারীর মাধ্যমে মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাকে রোগাক্রান্ত ও রিক্তহস্ত করে ছাড়বেন।

এলোপাতাড়ি মূল্য নির্ধারণের (price fixation) পরিবর্তে জনসচেতনতা সৃষ্টির এই প্রচারণা বেশ ইতিবাচক ফল বয়ে আনল। মদীনার বাজার পণ্য প্রাচুর্যে ভরে উঠল। দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক হয়ে আসল।

এখান থেকে যে মৌলিক শিক্ষাটি আমরা পাই তা এই যে,মানুষের ভিতরে দায়িত্বানুভূতি সৃষ্টি ও সুবিবেচনাবোধ জাগ্রতকরণ ব্যতিরেকেই নিছক রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কোন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা মূলত একপ্রকার বোকামী। উল্লেখিত সমস্যার ক্ষেত্রে স্থূলদৃষ্টির অধিকারী রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রতিভূরা সচরাচর যে কাজটি করে থাকে তা এই যে, মানুষের ভিতরে দায়িত্বানুভূতি ও আল্লাহ ভীতি জাগ্রত করার প্রচেষ্টাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে রাষ্ট্রশক্তিবলে একটি আইন জারী করে দেয় যে অমুক অমুক পণ্য এর চেয়ে বেশী দামে বিক্রি করা যাবে না। তারপর, সেই আইন কার্যকর করার জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে তার বাহিনীকে বাজারে প্রেরণ করে। অতঃপর সেই বাহিনী নির্বিচারে সকল বিক্রেতাকে একই মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করে। সর্বসাকুল্যে ফলাফল যা দাঁড়ায় তা এই, সৎ ব্যবসায়ীদের একটি দল লোকসানের সম্মুখীন হয়ে বাজার থেকে বিদায় নেয়। দুষ্টু প্রকৃতির ব্যাবসায়ীরা হয় নানা ভাবে বাজার পরিদর্শক বাহিনীকে খুশী (!) করার মাধ্যমে বহাল তবিয়তে নিজেদের ব্যাবসা অব্যাহত রাখে, নতুবা একজোট হয়ে আপাতত বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এসকল কর্মকাণ্ডের ফলে পণ্যদ্রব্য আরো দুর্লভ হয়ে উঠে এবং দ্রব্যমূল্য আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। পরিশেষে ভোগান্তি পোহাতে হয় সেই ক্রেতাসাধারণকেই যাদের স্বার্থ সংরক্ষনের জন্য সরকারের এই মহা আয়োজন।

গোপনীয়তা (confidentiality) রক্ষাঃ

 

মানুষের গোপনীয়তাকে সুরক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে কুরআন  ও হাদীসের নির্দেশনাসমূহের কিয়দংশ নিম্নরূপঃ

يا ايها الذين امنوا لا تدخلوا بيوتا غير بيوتكم حتى تستانسوا و تسلموا على اهلها ذلكم خير لكم لعلكم تذكرون

“হে ঈমানদাগণ ! নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তাদেরকে সালাম করো ৷ এটিই তোমাদের জন্য ভালো পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এদিকে নজর রাখবে” [26]

এ হুকুমটি নাযিল হবার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তার (Privacy) এ অধিকারটিকে কেবলমাত্র গৃহের চৌহদ্দীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং একে একটি সাধারণ অধিকার গণ্য করেন। এ প্রেক্ষিতে অন্যের গৃহে উঁকি ঝুঁকি মারা, বাহির থেকে চেয়ে দেখা এমনকি অন্যের চিঠি তার অনুমতি ছাড়া পড়ে ফেলা নিষিদ্ধ।[27]

“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া তার পত্রে চোখ বুলালো সে যেন আগুনের মধ্যে দৃষ্টি ফেলছে”। [28]

و لا تجسسوا

“মানুষের গোপন বিষয় / দোষ তালাশ করো না” [29]

নবী ( সা) তার খোতবায় দোষ অন্বেষণকারীদের সম্পর্কে বলেছেনঃ

“হে সেই সব লোকজন, যারা মুখে ঈমান এনেছো কিন্তু এখনো ঈমান তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলমানদের গোপনীয় বিষয় খুঁজে বেড়িও না । যে ব্যক্তি মুসলমানদের দোষ-ত্রুটি তালাশ করে বেড়াবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটির অন্বেষণে লেগে যাবেন । আর আল্লাহ যার ক্রুটি তালাশ করেন তাকে তার ঘরের মধ্যে লাঞ্ছিত করে ছাড়েন । “[30]

হযরত মুয়াবিয়া ( রা) বলেন, আমি নিজে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ

“তুমি যদি মানুষের গোপনীয় বিষয় জানার জন্য পেছনে লাগো । তাদের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করবে কিংবা অন্তত বিপর্যয়ের দ্বার প্রান্তে পৌছে দেবে । “[31]

অপর এক হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“তোমাদের মনে কারো সম্পর্কে সন্দেহ হলে, অন্বেষণ করো না । ” [32]

অপর একটি হাদীসে নবী ( সা) বলেছেনঃ

“কেউ যদি কারো গোপন দোষ-ত্রুটি দেখে ফেলে এবং তা গোপন রাখে তাহলে সে যেন একজন জীবন্ত পূঁতে ফেলা মেয়ে সন্তানকে জীবন দান করলো । “[33]

 

রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাগিরির সীমারেখা

“দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান না করার এ নির্দেশ শুধু ব্যক্তির জন্যই নয়, বরং ইসলামী সরকারের জন্যেও । ইসলামী শরীয়াত নাহী আনিল মুনকারের ( মন্দ কাজের প্রতিরোধ) যে দায়িত্ব সরকারের ওপর ন্যস্ত করেছে তার দাবী এ নয় যে, সে একটি গোয়েন্দা চক্র কায়েম করে মানুষের গোপন দোষ-ক্রুটিসমূহ খুঁজে খুঁজে বের করবে এবং তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবে । বরং যেসব অসৎ প্রবণতা ও দোষ-ত্রুটি প্রকাশ হয়ে পড়বে কেবল তার বিরুদ্ধেই তার শক্তি প্রয়োগ করা উচিত । গোপনীয় দোষ-ত্রুটি ও খারাপ চালচলন সংশোধনের উপায় গোয়েন্দাগিরি নয় । বরং শিক্ষা, ওয়াজ-নসীহত, জনসাধারণের সামগ্রিক প্রশিক্ষণ এবং একটি পবিত্র সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করাই তার একমাত্র উপায় ।

…………… এ থেকে প্রমানিত হয় যে, খুঁজে খুঁজে মানুষের গোপনীয় দোষ-ত্রুটি বের করা এবং তারপর তাদেরকে পাকড়াও করা শুধু ব্যক্তির জন্যই নয়, ইসলামী সরকারের জন্যও জায়েয নয় । একটি হাদীসও একথা উল্লেখিত হয়েছে । উক্ত হাদীসে নবী ( সা) বলেছেনঃ

“শাসকরা যখন সন্দেহের বশে মানুষের দোষ অনুসন্ধান করতে শুরু করে তখন তাদের চরিত্র নষ্ট করে দেয় । ” ( আবু দাউদ) ।

তবে কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে যদি খোঁজ-খবর নেয়া ও অনুসন্ধান করা একান্তই প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তবে সেটা এ নির্দেশের আওতাভুক্ত নয় । যেমনঃ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আচার-আচরণে বিদ্রোহের কিছুটা লক্ষণ সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে । ফলে তারা কোন অপরাধ সংঘটিত করতে যাচ্ছে বলে আশংকা সৃষ্টি হলে সরকার তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে পারে”।[34]

হযরত উমরের ( রা) কার্যপদ্ধতিঃ

একবার রাতের বেলা তিনি এক ব্যক্তির কণ্ঠ শুনতে পেলেন । সে গান গাইতেছিল । তাঁর সন্দেহ হলো । তিনি প্রাচীরে উঠে দেখলেন সেখানে শরাব প্রস্তুত , তার সাথে এক নারীও । তিনি চিৎকার করে বললেনঃ ওরে আল্লাহর দুশমন, তুই কি মনে করেছিস যে, তুই আল্লাহর নাফরমানী করবি আর তিনি তোর গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করবেন না৷ জবাবে সে বললোঃ আমীরুল মু’মেনীন , তাড়াহুড়ো করবেন না । আমি যদি একটি গোনাহ করে থাকি তবে আপনি তিনটি গোনাহ করেছেন। আল্লাহ দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়াতে নিষেধ করেছেন । কিন্তু আপনি দোষ-ত্রুটি খুঁজেছেন । আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন, দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করো । কিন্তু আপনি প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছেন । আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, নিজের ঘর ছাড়া অনুমতি না নিয়ে অন্যের ঘরে প্রবেশ করো না । কিন্তু আমার অনুমতি ছাড়াই আপনি আমার ঘরে পদার্পণ করেছেন” । এ জবাব শুনে হযরত উমর ( রা) নিজের ভুল স্বীকার করলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করলেন না । তবে তিনি তার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন যে, সে কল্যাণ ও সুকৃতির পথ অনুসরণ করবে ।[35]

বিয়ের ন্যুনতম বয়স নিয়ে বিতর্কঃ

মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের অন্যতম হল বিয়ে। এটিকে উপেক্ষা করা যেমন এক প্রান্তিকতা, তেমনিভাবে বিয়েকে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বানিয়ে নেয়া কিংবা একে আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জমকালো করে তোলাও আরেক প্রান্তিকতা। এর মাঝামাঝি অবস্থান নিয়েছে ইসলাম।এখানে পারিবারিক জীবনের ব্যয়ভার বহনে কিছুটা সামর্থ থাকলে স্বাভাবিকভাবে বিয়েতে উৎসাহিত করা হয়েছে।

و انكحوا الايامى منكم

অর্থাৎ, “তোমাদের মধ্যে যারা একা ও নিঃসংগ তাদের বিয়ে দাও”। [36]

অভাব থাকলেও আল্লাহ সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

ان يكونوا فقراء يغنهم الله من فضله

অর্থাৎ, “যদি তারা গরীব হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ আপন মেহেরবানীতে তাদেরকে ধনী করে দেবেন” [37]

একেবারে অসমর্থ হলে অপেক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

و ليستعفف الذين لا يجدون نكاحا حتى يغنيهم الله من فضله

অর্থাৎ “আরা যারা বিয়ে করার সুযোগ পায় না তাদের পবিত্রতা ও সাধুতা অবলম্বন করা উচিত, যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন”৷[38]

বিয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষেরই প্রয়োজন। আর বয়ঃপ্রাপ্তির কোন সার্বজনীন বয়স সীমা নেই। এটি ব্যক্তি, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও ভোগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। এ কারণেই ইসলামে বিয়ের ন্যুনতম বয়স বলে কোন বয়স নেই।প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষ বিয়ের ব্যাপারে স্বাধীন। কোন অভিভাবক বিয়ের ব্যাপারে ছেলে কিংবা মেয়েকে বাধ্য করার এখতিয়ার রাখেন না।মুহাম্মদ কুতুবের ভাষায়, “Islam recognizes the strength and importunity of sex but it tries to satisfy the sexual instinct through legal means i.e. marriage. Therefore Islam advocates early marriage and provides aid from the Public Treasury for those who wish to get married yet cannot afford to do so.” [39]

কিন্তু হাল আমলে বিভিন্ন দেশে বিয়ের ন্যুনতম বয়সের ব্যাপারে বাধ্যতামূলক কিছু আইন তৈরীর প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা হচ্ছে মূলত কার চেয়ে কে কত বেশী বয়সকে বিয়ের জন্য বেধে দিতে পারে – সে ব্যাপারে।প্রথমবারের মত ১৯২৯ সালে বৃটিশ ভারতে শিশু বিবাহ নিয়ন্ত্রন আইন  (The Child Marriage Restraint Act, 1929) জারী করে পুরুষের ক্ষেত্রে ১৬ এবং নারীর ক্ষেত্রে ১৪ বছরকে বিয়ের ন্যুনতম বয়স নির্ধারণ করা হয়। এই বয়সের আগে বিয়ে করলে তাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করা হয়।১৯৪৭ সালে ইংরেজ চলে গেলেও ১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলে প্রবর্তিত বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থায় গড়ে উঠা এদেশীয় ম্যাকলের বাচ্চারা[40] (Macaulay Children) ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন  অধ্যাদেশ (The Muslim Family Law Ordinance, 1961) জারী করে পুরুষের জন্য ১৮ ও নারীর জন্য ১৬ বছরকে বিয়ের ন্যুনতম বয়স সাব্যস্ত করেছে। আবার বাংলাদেশ আমলে ১৯৮৪ সালে আরেকটি অধ্যাদেশ জারী করে পুরুষ ও নারীর জন্য যথাক্রমে ২১ ও ১৮ কে ন্যুনতম বয়স নির্ধারণ পূর্বক এর ব্যত্যয়কে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করেছে। গত পঞ্চাশ বছরে (১৯২৯-১৯৮৪) বিয়ের ন্যুনতম বয়স বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র শক্তির হর্তাকর্তারা যেভাবে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, তাতে “বুড়ো হওয়ার আগে বিয়ে করা দণ্ডনীয় অপরাধ” – শীর্ষক হুকুম জারী হতে কত দেরী হবে তা পাঠকবর্গ কিছুটা মালুম করতে পারবেন আশা রাখি। মানুষের গোপনীয় (confidential) ব্যাপারে রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতদের এই হাস্যকর হস্তক্ষেপ দেখে “নেই কাজ, তো খৈ ভাজ” – প্রবাদটি আমার বার বার মনে পড়ে।

 

যেসব কারণে মানুষ তথাকথিত “ন্যুনতম বয়স” এর নীচে বিয়ে দিয়ে দেয়

 

গ্রাম-গঞ্জের অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত ও দারিদ্রপীড়িত মানুষ সাধারণতঃ তাদের সন্তানদেরকে (বিশেষ করে মেয়েদেরকে) বয়ঃপ্রাপ্তির পরপরই বিয়ে দিয়ে দেয়।  তার পেছনে কারণ মূলত দু’টিঃ (১) আর্থিক অসঙ্গতি ও (২) চারিত্রিক দুর্ঘটনা থেকে সুরক্ষা লাভের ইচ্ছা।  আমাদের সামগ্রিক সামাজিক চুক্তির (social contract) ভিত্তিতে যে রাষ্ট্র গড়ে উঠে তার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে নামাজ কায়েমের মাধ্যমে গণমানুষের চারিত্রিক সংশোধন, যাকাত কার্যকর করার মাধ্যমে মানুষের আর্থিক সমস্যার সমাধান, উত্তম কাজের আদেশ এবং মন্দ ও অশ্লীল কাজ নিষিদ্ধকরণ।  কুরআন বলছে,

الذين ان مكناهم فى الارض اقاموا الصلاة و اتوا الزكوة و امروا بالمعروف و نهوا عن المنكر

অর্থাৎ, (এরা এমন সব লোক যাদেরকে আমি যদি পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করি তাহলে এরা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ নিষেধ করবে৷) [41]

আমাদের রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা কুরআন বিঘোষিত প্রথম নীতির (অর্থাৎ, নামাজ কায়েমের মাধ্যমে গণমানুষের চারিত্রিক সংশোধন) ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কোন বাধ্যতামূলক আইন তৈরী তো দূরের কথা কোন ইতিবাচক পদক্ষেপও গ্রহণ করে নি। অথচ মানুষের চারিত্রিক সংশোধনের সবচেয়ে বড় ঔষধ হল নামাজ।

ان الصلاة تنهى عن الفحشاء و المنكر

“নিশ্চিতভাবেই নামায অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে” [42]

যাকাতের ব্যাপারে এরা অবশ্য আইন প্রনয়ন করেছে। তবে তা যে খোদার সাথে কতবড় মস্করা তা বুঝার জন্য আমার আগের লেখা এক প্রবন্ধের অংশবিশেষ তুলে ধরছি, অনুরূপভাবে যাকাত প্রসঙ্গ। আল্লাহ ধনী মানুষের সম্পদে গরীব মানুষের অধিকার ঘোষণা করেছেন। (و فى اموالهم حق للسائل و المحروم অর্থাৎ, ধনী মানুষের সম্পদে রয়েছে গরীব মানুষের অধিকার[43]) ইসলামী আইনের পরিভাষায় তার নাম যাকাত। রাষ্ট্র আইন করে বাধ্যতামূলক ভাবে যাকাত আদায় না করলে গরীব মানুষ তার ইসলাম প্রদত্ত অধিকার যথাযথ ভাবে পেতে পারে না। অনেকে হয়তো বলতে পারেন, লোকজন স্বেচ্ছায় যাকাত আদায় করে দিলেই তো গরীব মানুষ তার অধিকার পেয়ে যায়; বাধ্যতামূলক আইন প্রনয়নের মাধ্যমে যাকাত আদায়ের কী প্রয়োজন?  আমাদের উত্তর হলো- স্বেচ্ছায় যাকাত আদায় করে দিলে তো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ না করলেও চলে। কিন্তু, আমরা দেখতে পাচ্ছি লোকজন স্বেচ্ছায় তা আদায় করছে না। এর কারণ কী? এর সুস্পষ্ট কারণ হল, মানুষ আদতেই স্বার্থপর। আর্থিক বিষয়ে মানুষের এই স্বভাব আরো প্রকট হয়ে উঠে। আর রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ঠিক এখানেই। এজন্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্রকে বলা হয় বল প্রয়োগকারী সংস্থা (agency with coercive power) । জনগন স্বেচ্ছায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে না চাইলে রাষ্ট্রকে তার বল প্রয়োগকারী শক্তির (coercive power) প্রয়োগ করতে হয়। অন্যথায় রাষ্ট্র নিস্প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ………… এদেশে আয়কর (income tax) কায়েম আছে; অথচ যাকাত কায়েম নেই। কারণ, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের (The Income Tax Ordinance, 1984) মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমানের বেশী উপার্জনকারীর উপর আয়কর প্রদান বাধ্যতামূলক করা ও অনাদায়ে বিভিন্ন দণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। [44] সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে কারো পক্ষেই আয়কর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে সরকার এ খাত থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করে নিতে পারছে। অন্যদিকে ১৯৮২ সালে প্রণীত হয় যাকাত তহবিল অধ্যাদেশ (The Zakat Fund Ordinance, 1982)। এরপরও প্রায় নব্বই শতাংশ সচ্ছল লোক যাকাত আদায় করছে না। কারণ, এ আইনের কোন বাধ্যতামূলক (binding) দিক নেই। এ আইনে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিকরা ইচ্ছা করলে তাদের যাকাত এই তহবিলে জমা দিতে পারবে।[45] ব্যস! অর্থাৎ, কেউ ইচ্ছে করলে যাকাত দিবে, কেউ ইচ্ছে না করলে দিবে না; রাষ্ট্র এ নিয়ে কোনপ্রকার মাথা ঘামাবে না। কেউ না দিলে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা কিংবা অন্য কোন দণ্ডের ব্যবস্থা করবে না (যার ব্যবস্থা রয়েছে আয়কর প্রদান না করার ক্ষেত্রে)। একবার চিন্তা করে দেখুন তো, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (VAT = Value Added Tax) যদি যাকাত তহবিল অধ্যাদেশের মত ঐচ্ছিক হতো, তাহলে জনগনের শতকরা দশ ভাগের বেশী লোক কি স্বেচ্ছায় তা আদায় করতো? আর সরকারও কি এ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে পারতো?

“মন্দ ও অশ্লীল কাজ নিষিদ্ধকরণ” শীর্ষক সর্বশেষ এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের আচরন সম্পূর্ণ উলটো প্রকৃতির। অশ্লীল সিনেমা নির্মাণ ও প্রদর্শনী, নাচ-গান, ও কুরুচিপূর্ণ সিডি ভিসিডি ও অশ্লীল সাইবার ক্যাফের রমরমা কারবার চলছে সেই হর্তাকর্তাদের নাকের ডগার সামনেই যারা বিয়ের জন্য ন্যুনতম বয়স বাধ্যতামূলক করে দিলেও ঐসব অপকর্মের জন্য ন্যুনতম বয়স নির্ধারণ করে দেয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করেন নি। সিনেমা শিল্পকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য ১৯৬৩ সালে ছায়াছবি নিয়ন্ত্রন আইন  (The Censorship of Films Act, 1963 ) জারী করে সিনেমার সার্টিফিকেট দেয়া – না দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সেন্সর বোর্ডকে।সেন্সর বোর্ড যদি মনে করে যে, কোন ছায়াছবি জনসমক্ষে প্রদর্শনযোগ্য নয় তাহলে তার অনুমোদন দিবে না।[46] কিন্তু, হতাশার কথা হল,সমগ্র আইনটির কোথাও একথা পরিস্কার করে বলা হয় নি যে, কীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে যে সংশ্লিষ্ট সিনেমাটি জনসমক্ষে প্রদর্শনযোগ্য কি না। অশ্লীলতার কথা একবারও ঐ আইনটির কোথাও উল্লেখ করা হয় নি। কুরআন –সুন্নাহতে যেসব কাজকে অশ্লীল ও মন্দ বলা হয়েছে যেসব কাজকে অশ্লীলতার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ না করে বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে সেন্সর বোর্ডের মর্জির উপর ছেড়ে দেয়ায় আজ পর্যন্ত তারা একমত হতে পারেন নি যে কোন কাজটি অশ্লীল। সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ঘোষণা না করায় ইবলিসের কিছু সুচতুর শিষ্য তো এতো দূর পর্যন্ত শ্লোগান তোলার দুঃসাহস দেখিয়েছে যে, “অশ্লীলতার কোন সংজ্ঞা নেই; নগ্নতাই অশ্লীলতা নয়”। আসল কথা হল,যেখানে কোটি কোটি মানুষের চারিত্রিক পুনর্গঠন ও উন্নতি সাধনের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে কোনটি অশ্লীল আর কোনটি অশ্লীল নয় – তা স্বার্থান্বেষী মানুষের (হোক সে সেন্সর বোর্ডের সদস্য, অথবা সিনেমার পরিচালক কিংবা সাধারণ মানুষ ) খামখেয়ালির উপর ছেড়ে দেয়া যেতে পারে না। এ বিষয়টির মীমাংসা এমন এক সত্তার পক্ষ থেকে হওয়া দরকার যিনি মানবীয় স্বার্থ ও দোষত্রুটির সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে অবস্থান করছেন। বলা বাহুল্য, এই যোগ্যতা মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। মানদণ্ডের অভাবে অশ্লীলতার বিষয়টি কতটুকু দোদুল্যমান, তা অনুধাবন করার জন্য বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী আইন প্রণেতার বক্তব্য শুনুন,

“A decade ago, wearing shirt and pant by a female seemed indecent and inconsistent. But now this is very normal. So, the film sensor board should demonstrate such generosity so that our films can survive,” said Obaidul Quader, chief of the parliamentary body, at a press briefing after the meeting at the Jatiya Sangsad Bhaban. But the filmmakers must give attention to the country’s culture and heritage in making the films, he added. “But in the name of generosity, excessive scenes like kissing, indecency, violence and vulgarity cannot be tolerated.” [47]

ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য নানা হাতিয়ারঃ

মুসলিম বিশ্বে অবাধ যৌনাচারের রাস্তা উন্মুক্তকরণ ও বিয়েকে কঠিন করে তোলার লক্ষ্যে ইউনিসেফ যেসব প্রচারণার পেছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে নিম্নোক্ত প্রচার পত্রটি তার খণ্ডরূপ তুলে ধরে মাত্রঃ

Strategies and Challenges in Muslim Societies[48]

Any campaign to reduce the practice of early marriage in traditional Muslim societies may face particular criticisms and challenges from the conservative religious perspective. The usual arguments used include:

  • It is against the authentic hadith as it was reported in Sahih al-Bukhari and Sahih Muslim that the Prophet Muhammad saw married Aishah when she was six years old and consummated the marriage when she reached puberty at the age of nine. Muslims must therefore follow the Sunnah of the Prophet saw and any effort to outlaw early marriage can be considered unIslamic.
  • Sex outside of marriage is forbidden in Islam. Since humans develop sexual urges at puberty, early marriage is the Islamic solution to deal with natural sexual desire. Marriage should be allowed when a girl reaches puberty because “Puberty=Maturity=Marriage”.
  • Puberty is an age old symbol of adulthood in all cultures and religions. People were considered ready for marriage when they reached puberty. From an Islamic point of view, many problems in society today can be traced back to the abandonment of early marriage.
  • Men and women were created to be attracted to one another. For Muslims living in societies where there is no or little gender segregation and where they are continually exposed to sexual promiscuity in the media and the larger society, early marriage ensures that sex happens only within marriage.
  • Muslims who are embarrassed that the Prophet saw married Aishah at such a young age, deny the authentic sources or question their authenticity or just ignore the Sunnah, while still claiming to be followers of the Ahl as-Sunnah. Such Muslims are “Westoxicated”, their minds still colonized by the West.

In the face of such challenges, activists in Muslim communities need to address some of the more pertinent arguments with facts and data and new research.

  • On the Hadith: There are now studies which challenge the accuracy of Aishah’s age at the time of her marriage to the Prophet saw. Two studies assert that it is more likely that Aishah was 19-years-old at the time of her marriage.
  • The question needs to be posed to those who support early marriage on the basis of the practice of the Prophet saw: Why is the Prophet’s marriage to Aishah selected as the exemplary age of marriage for Muslims while his marriage to Khadija, a widow 15 years older than him or his marriage to other widows and divorcees ignored as exemplary practices? Moreover, the marriage practice of the Prophet saw should not be regarded as normative for the ummah. There is an explicit verse in the Qur’an that refers to his marriages as exceptional.
  • Those who support early marriage on the basis of the Sunnah of the Prophet saw also argue that the practice was not criticized by his contemporaries as marriage at the time of a girl’s puberty was the norm of his times in all cultures and religions. This means the practice should be contextually understood. Given a changing set of circumstances with available data on the harmful impact of early marriage on a girl’s well-being, then the practice can change and that it is not unIslamic to campaign to reduce the incidence of early marriage. There is a principle developed by Muslim jurists to close the door to negative consequences. This is one such door.
  • Does puberty = maturity = marriage? Much research is available to challenge this assumption from economic, health, social and individual development perspectives. Marriage is not just about biology.[49]

“বিয়ের ন্যুনতম বয়স” ধারণাটির উৎপত্তি

যেসব জাতি “বিয়ের ন্যুনতম বয়স” ধারণাটি প্রবর্তন করেছে এবং যারা তা মেনে নিয়েছে তাদের চারিত্রিক অবস্থা

 

বিয়ের ন্যুনতম বয়স (minimum age of marriage) বাধ্যতামূলক করার তথাকথিত ‘সুফল’

বিয়ের ন্যুনতম বয়স (minimum age of marriage) বাধ্যতামূলক করার সর্বনাশা কুফল

যেসব কারণে মানুষ তথাকথিত “ন্যুনতম বয়স” এর নীচে বিয়ে দিয়ে দেয়

দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ

১।যে রাষ্ট্র যাকাত ব্যবস্থা কার্যকর পূর্বক নাগরিকদের দারিদ্র নিরসন করতে পারে নি সে রাষ্ট্র চুরির  ইসলামী শাস্তি কার্যকর করার অধিকার রাখে কি?

২। অনুরূপভাবে যে রাষ্ট্র বিয়ের ন্যুনতম বয়স (minimum age of marriage) বাধ্যতামূলক করে দেয় সে রাষ্ট্র ব্যভিচারের ইসলামী শাস্তি কার্যকর করার অধিকার রাখে কি?

“…the law in restraint of child marriage has always been a toothless paper tiger. The Sarda Act and its provisions shared by other statutory family laws have failed to eradicate the menace of child marriage. Whatever improvement one sees – the percentage of child marriages is now considerably lower than in 1929 – is the result of educational advancement; it has not come about by virtue of the Sarda Act or any other parallel law.”[50]


[1] و لقد جئتمونا فرادى كما خلقناكم اول مرة

[2] Jean Jacques Rousseau, The Social Contract and the Origin of Inequality among Men, London, J.M. Dent & Sons Ltd. 1913, p. 5

[3] “God has sent all men into the world free, and nature has made no man a slave” Will Durant, Story of Civilization, Vol. II, The Life of Greece, Simon and Schuster, New York, 1944, p. 280

[4] Jeremy Bentham, Principles of Morals and Legislation, London, Oxford at the Clarendon Press, 1823, pp 1-2

[7] বাকারাহ ২১৬

[8] “God has sent all men into the world free, and nature has made no man a slave” Will Durant, Story of Civilization, Vol. II, The Life of Greece, Simon and Schuster, New York, 1944, p. 280

[10] Max Weber, Politics as a Vocation, p. 1

[11] Thomas Hobbes, Leviathan, London, John Bohn, Henrietta Street, Covent Garden, p ix

[12] বনী ইসরাইল ৮০

[13] االسيرة النووية لابن هشام , مكتبة الصفا , القاهرة , ٢٠٠١ , ج ٢ , ص ٩٥

[14] A. Guillaume, The Life of Muhammad — A Translation of Ishaq’s Sirat Rasul Allah, Oxford University Press, Karachi, 1955; pp. 231-233

[15] االسيرة النووية لابن هشام , مكتبة الصفا , القاهرة , ٢٠٠١ , ج ٢ , ص ٩٥

[16] A. Guillaume, The Life of Muhammad — A Translation of Ishaq’s Sirat Rasul Allah, Oxford University Press, Karachi, 1955; pp. 231-233

[17] االسيرة النووية لابن هشام , مكتبة الصفا , القاهرة , ٢٠٠١ , ج ٢ , ص ٩٥

[18] A. Guillaume, The Life of Muhammad — A Translation of Ishaq’s Sirat Rasul Allah, Oxford University Press, Karachi, 1955; pp. 231-233

[19] হাশর ৭

[20] আহযাব ৩৬

[21] নিসা ৬৫

[22] سنن ابن ماجة للحافظ القزوينى , كتاب التجارة , باب من كره ان يسعر  , دار الحديث , القاهرة , ١٩٩٨ , ج ٢ , ص ٢٨٢ ح ٢٢٠٠

[23] سنن ابن ماجة للحافظ القزوينى , كتاب التجارة , باب الحكرة و الجلب , دار الحديث , القاهرة , ١٩٩٨ , ج ٢ , ص ٢٦٦ ح ٢١٥٣

[24] سنن ابن ماجة للحافظ القزوينى , كتاب التجارة , باب الحكرة و الجلب , دار الحديث , القاهرة , ١٩٩٨ , ج ٢ , ص ٢٦٦ ح ٢١٥٤

[25] سنن ابن ماجة للحافظ القزوينى , كتاب التجارة , باب الحكرة و الجلب , دار الحديث , القاهرة , ١٩٩٨ , ج ٢ , ص ٢٦٧ ح ٢١٥٥

[26] নূর ২৭

[27] মাওলানা মওদুদী, তাফহীমুল কুরআন, সূরা নূর, টীকা ২৫

[28] আবু দাউদ

[29] হুজুরাত ১২

[30] আবু দাউদ

[31] আবু দাউদ

[32] আহকামুল কুরআন-জাস্সাস

[33] আহকামুল কুরআন-জাস্সাস

[34] মাওলানা মওদুদী,তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুজুরাত, টীকা ২৫

[35] মাকারিমুল আখলাক -আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে জা’ফর আলী খারায়েতীর উদ্ধৃতিতে তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুজুরাত, টীকা ২৫

[36] নূর ৩২

[37] নূর ৩২

[38]  নূর ৩৩

[39] Muhammad Qutub, Islam: the Misunderstood Religion, p. 98 @ http://islam4all.com/newpage18.htm

[40] The term Macaulay’s Children is used to refer to people born of Indian ancestry who adopt Western culture as a lifestyle, or display attitudes influenced by colonisers.  It is used as a pejorative term, and the connotation is one of disloyalty to one’s country and one’s heritage. This frame of mind or attitude is also referred to as Macaulayism. The passage to which the term refers is from his Minute on Indian Education, delivered in 1835. It reads, “We must at present do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern; a class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect.  অর্থাৎ, বর্তমানে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে এমন এক শ্রেণীর লোক তৈরী করার জন্য যারা আমাদের এবং আমাদের লক্ষ লক্ষ প্রজার মধ্যে দোভাষীর কাজ করতে পারবে; এমন এক শ্রেণীর লোক যারা রক্ত ও রঙে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচিবোধ, মতামত, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তায় হবে ইংরেজ। (http://en.wikipedia.org/wiki/Thomas_Babington_Macaulay)

[41] হাজ্জ ৪১

[42] আনকাবূত ৪৫

[43] আয যারিয়াত ১৯

[44] দেখুনঃ Sections 123 – 133 of the Income Tax Ordinance, 1984 under the title IMPOSITION OF PENALTY

[45] “There shall be established a Fund to be called the Zakat Fund which shall consist of voluntary payment of Zakat by the Muslims” (Section 3 (1) of the Zakat Fund Ordinance, 1982)

[46] দেখুনঃ Section 4 (5) of The Censorship of Films Act, 1963

[47] Wed, Jan 20, 2010, The Daily Star/Asia News Network

[48] Campaign against Early Marriage in Muslim Countries and Communities @ http://www.sistersinislam.org.my/index.php?Itemid=298&id=575&option=com_content&task=view

 

[50] Tahir Mahmood, Leave the kids alone, The Hindustan Times , August 1, 2002

Leave a comment

Filed under Uncategorized

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s