স্টক মার্কেট ও ফটকাবাজিঃ একটি বিশ্লেষণ

সুদ যদি প্রথাগত ব্যাংকসমূহের “প্রাণ” হয়, তাহলে স্টক মার্কেটের প্রাণ হল ফটকাবাজি (speculation) If interest is the “guiding soul” of conventional banks, so is speculation for the stock markets.
ফটকা (speculation) হল বাস্তবে পণ্য আদান প্রদানের কোন লক্ষ্য ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয়ের একটি প্রক্রিয়া। এখানে সরাসরি “পণ্য (commodity)” কোন উদ্দেশ্য নয়। বাস্তবে এর উদ্দেশ্য কেবল স্বাভাবিক কিংবা কৃত্রিম মূল্য পরিবর্তন (price differences) থেকে ফায়দা হাসিল করা এবং স্বল্প মেয়াদে মূল্য পরিবর্তনের আগাম ধারণা (prediction) সঠিক হলে তা থেকে মুনাফা (capital gain) অর্জন করা। হোক সে আগাম ধারণা তথ্য, অভিজ্ঞতা ও সতর্ক পর্যবেক্ষন প্রসূত; কিংবা নিছক গুজব, ভাগ্য অথবা কেবল কাকতালীয় ঘটনা থেকে উদ্ভুত। Speculation  is  a  fake  reverse  process  of  selling  and  buying  not  aiming  a physically  exchanging  commodities  (no  actual  “commodity”  is  desired  for itself). In reality, it aims at benefiting from natural or artificial price differences and capital gains if the predictions of price changes in the short-term proved to be true. No matter, this prediction comes out of information, experience and study or merely out of rumors, luck or even coincidence.
ফটকা ও ব্যবসার মধ্যে পার্থক্য The Difference between Speculation and Trade
  • ব্যবসায়ী পণ্য দখলে রাখে; অন্যদিকে ফটকাবাজের দখলে কোন পণ্য থাকে না, সে কেবল মূল্যের ব্যবধান পেয়ে/দিয়ে থাকে। পণ্য দখলে না রাখার বিষয়টি ফটকাবাজির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তাছাড়া, ফটকাবাজিতে ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারটি ভূয়া ও উলটো প্রকৃতির; কারণ, সেখানে সরাসরি পণ্যের কোন প্রয়োজন নেই। [আধুনিক অর্থনীতির জনক] স্যামুয়েলসন বলেনঃ “ফটকাবাজরা নিছক মধ্যস্বত্বভোগী যাদের আগ্রহ কেবল স্বল্পমূল্যে কিনে চড়ামূল্যে বিক্রি করার মধ্যে। সর্বশেষ এই জিনিসটিই তারা দেখতে চায় যে, গম ও শুকরের মাংস বোঝাই ট্রাক তাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে (…)। ফটকাবাজদেরকে কখনো কোন শস্যের আটি কিংবা কোন সিমের ব্যাগও স্পর্শ করা নাও লাগতে পারে। পণ্যের গুদামঘর, ভাড়া কিংবা ডেলিভারী – এসব জানার কোন প্রয়োজনও নেই তাদের। তারা কেবল কাগজের ক্রয়-বিক্রয় করে থাকে।”
  • The merchant possesses goods; whereas, the speculator does not. He only gets or pays the price differences (clearing). This non-possession of goods is a distinguished characteristic of speculation.  Besides,  in  speculation, selling or buying  is  fake and  reversed as  the good  in  itself  is unwanted. Samuelson (1985, pp.  214  and  215)  says:  “They  (the  speculators)  are simply middlemen who  are  interested  in buying  cheap  and  selling dear. The last thing they want to see the wheat or hog truck roll up to their door (…). The  speculators  themselves may never  touch a kernel of corn or a bag  of  cocoa,  nor  need  know  anything  about  storage,  warehouse,  or delivery. They merely buy and sell bits of paper”.
  • ব্যাবসা উৎপাদনমুখী; পক্ষান্তরে ফটকা উৎপাদনমুখী নয়। এদিক থেকে ফটকার ঝুঁকি ব্যাবসার ঝুঁকি থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। কিছু লোক হয়তো যুক্তি দেখাবে যে, যারা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ফটকা তাদের কাছে ঝুঁকি হস্তান্তর করে দেয় এবং এ ক্ষেত্রে এ সকল লোক ঝুঁকি নেয়ার বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠে। তবে, এ যুক্তি বাস্তবে ফটকার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে প্রকাশ করার পরিবর্তে তার অলংকরণের চেষ্টা কেবল।
  • Trade is productive while speculation is not, thus, the speculation’s risk differs from that of commerce.  Some people would argue that speculation is also productive in the sense that it transfers risks to those who are willing to undertake them and in this case these people specialize in undertaking risks. However, this argument may actually aim at embellishing speculation rather than revealing the truth about its hidden purposes.
ফটকা ও বিনিয়োগের পার্থক্যঃ

 

একজন বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনে ডিভিডেন্ডের আশায় রেখে দেয়। প্রয়োজন দেখা দিলে মুনাফা অর্জনের জন্য সে তার শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারে। কিন্তু, এটি তার স্বাভাবিক অবস্থা নয়। পক্ষান্তরে, একজন ফটকাবাজ শেয়ার কিনে মূলত কিছু দিনের মধ্যে দাম বাড়লে তা বিক্রি করে দেয়ার জন্য। তার উদ্দেশ্যই হল, অতি দ্রুত উচ্চ মাত্রার মুনাফা হাতিয়ে নেয়া।The Difference between Speculation and Investment

An investor buys the stock and keeps it to get dividends. He may sell his stock, when needed, to attain a capital gain although this does not represent the normal case. On  the  other  hand  the  speculator  buys  the  stock  to  sell  it  in  the short-term  when  the  price  increases,  aiming  at  cashing-in  a  high  and  rapid capital gain.ফটকা ও জুয়াঃ

ফটকার সমর্থকরা ফটকা ও জুয়ার মধ্যে এভাবে পার্থক্য নিরুপণ করে যে, ফটকাবাজি নির্ভর করে তথ্য, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষনের উপর। জুয়াবাজির ধরণ তা থেকে আলাদা; কারণ, তা নির্ভর করে নিছক ভাগ্য ও কাকতালীয় ঘটনার উপর। তবুও কিছু লোক মনে করেন যে, ফটকাবাজির দু’টি ধরণ রয়েছেঃ

–        প্রথম প্রকারের ফটকা নির্ভর করে অভিজ্ঞতার উপর। এর সংখ্যা অনেক কম (যেমন বড় বড় পেশাদারদের ফটকাবাজি);

–        দ্বিতীয় প্রকারের ফটকা নির্ভর করে ভাগ্যের উপর। এটিই তুলনামূলকভাবে বেশী জনপ্রিয়/বহুল প্রচলিত (যেমন ক্ষুদ্র আনাড়িদের ফটকাবাজি)

দু’য়ের মধ্যে ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও উভয়টিকেই ফটকাবাজি হিসেবে গন্য করা হয়। অনুরূপভাবে, আধুনিক জুয়াবাজিও তথ্য, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষনের উপর নির্ভরশীল হতে পারে।

ফটকাবাজির সমর্থকরা মনে করেন যে, জুয়াবাজ নিজেই ঝুঁকি সৃষ্টি করে; পক্ষান্তরে ফটকাবাজ কেবল বিদ্যমান ঝুঁকি নিজের কাঁধে নিয়ে আরেকজনের কাছে তা হস্তান্তর করে দেয়। অন্যদিকে, ফটকাবাজির বিরোধীরা মনে করেন যে, ফটকাবাজি ও জুয়াবাজির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই; বরং এটি জুয়াবাজির আধুনিক সংস্করন। তাদের যুক্তি হলঃ ফটকা ও জুয়া – উভয় ক্ষেত্রেই সিংহভাগ সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী অতি দ্রুত প্রচুর মুনাফা লুটে নেয়। ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটির মুনাফা মূলত  সিংহভাগ সদস্যের হেরে যাওয়া থেকেই উদ্ভূত। অধিকন্তু, ক্ষুদ্র গোষ্ঠী কর্তৃক মুনাফা অর্জনের সুযোগও অনেক কম; অনেকটা লটারী জেতার সুযোগের মত। সুতরাং উভয় অবস্থায় তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। অন্যদিকে বড় বড় ফটকাবাজদের মুনাফার পরিমাণ প্রচুর যা অর্জিত হয় স্টক মার্কেটে শোষণের শিকার খুদে ফটকাবাজদের মূল্যের বিনিময়ে। আর এই খুদে ফটকাবাজরাই স্টক মার্কেটে একইসাথে জ্বালানী ও শিকারের ভূমিকা পালন করে।Speculation and Gambling:

The  proponents  of  speculation  differentiate  between  speculation  and gambling  on  the  basis  that  speculation  depends  upon  information,  experience and  study unlike gambling  that  leans merely on  fortune and coincidence. Yet, some believe that there are two types of speculation:

–  The  first  type  depends  upon  experience.  This type is few in number (speculation of big professionals).

–  The  second  type  which  is  more  popular  depends  upon  fortune (speculation of small amateurs).

Despite the differences between them, both types are considered speculation. Likewise, modern gambling could also depend upon information, experience and study.

The  proponents  of  speculation  believe  that  the  gambler  himself  creates risks, while  the  speculator only  transfers  risks  as he undertakes  existing ones. On  the  other  hand,  the  opponents  of  speculation  believe  that  there  is  no difference between speculation and gambling, but rather it is a new version of it. They argue  that  in  speculation as well as  in gambling a  few people gain huge and  rapid  fortunes  while  the  majority  loses  and  whatever  is  gained  by  the minority comes at  the expense of  the majority.  In addition, the chance of the minority’s making a profit is very small, very close to their chances of winning the lottery. Accordingly, they are more liable to loss in both cases. On the other hand, big  speculators’ profits are huge  and guaranteed at  the expense of  small speculators who  are being  exploited  in  the  stock market  to  act  as  its  fuel  and victims at the same time.

 ফটকাবাজির সমর্থকদের যুক্তিঃ

 

v      বিপুল পরিমাণ শেয়ারের আবর্তনকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে ফটকাবাজি স্টক মার্কেটকে সচল রাখে। পালাক্রমে এটাই স্টক মার্কেটের বিকাশ সাধন, এর ভূমিকার সম্প্রসারণ এবং দ্রুত ও সহজে তারল্যের সুযোগ সৃষ্টি – এসব দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে থাকে। এভাবেই ফটকাবাজরা স্টক মার্কেটের বিনিয়োগকারীদের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। তারা তাদের দ্রুত ও বহুবিধ ফটকাবাজির মাধ্যমে স্টক মার্কেটকে সচল রাখে। অনুরূপভাবে, [স্টক মার্কেটে] তিন ধরণের লেনদেন/চুক্তি চালু রয়েছে; যথাঃ স্পট চুক্তি, আগাম চুক্তি ও ফটকা চুক্তি। এমতাবস্থায় যদি ফটকা চুক্তিকে বাতিল করে দেয়া হয়, তাহলে স্টক মার্কেটের কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়বে। একইভাবে, আগাম চুক্তি বাতিল করা হলেও স্টক মার্কেটের কার্যক্রম দুর্বলতর হয়ে পড়বে; কারণ, ঋণ ও ফটকা-ই স্টক মার্কেটের কার্যক্রমকে বহুগুণে বাড়িয়ে থাকে। সুতরাং ঋণের মাধ্যমে ফটকাবাজিকে সহযোগিতা দেয়া হলে স্টক মার্কেটের কর্মদক্ষতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।

একজন ফটকাবাজ তার ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন করতে চায়- এতে তো আপত্তির কোন কারণ নেই; কারণ, অর্থনৈতিক  যে কোন প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হল মুনাফা। যে কোন উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রধান উদ্দীপকও এটি। মুনাফা সবসময়ই মূল্য পরিবর্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে। অতএব কোন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পই ফটকা এড়াতে পারে না।The Proponents’ Arguments

 

v      Speculation activates the stock market as it encourages the circulation of large amounts of stocks. This in turn flourishes the stock market, enlarges its role and helps in providing liquidity easily and rapidly. Thus, the  speculators  are  added  to  the  investors  in  the  stock  market.  They activate the stock market with their rapid and multiple speculations. Accordingly,  there  are  three  types  of  deals  or  contracts:  spot  contracts, forward  contracts  and  speculative  contracts,  so  that  if  the  speculation contracts  were  cancelled,  the  stock  market  activity  would  weaken. Similarly,  if  the  forward  contracts  were  cancelled,  the  stock  market activity  will  get  weaker  as  debts  multiply  activity  and  likewise  the speculations  greatly multiply  it.  Thus, if speculation was supported by debts or credit, the stock market would increase more and more.

v      The  speculator  seeks  to  obtain  a  personal  profit  and  there  is  nothing wrong with  that, as profit represents  the main cause  for establishing any economic project and it is the main incentive for any production process. Profit  always  depends  upon  price  changes  and  fluctuations  so  that  no economic or commercial project can avoid speculation.ফটকা বিরোধীদের যুক্তিঃ

v      ফটকা মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির প্রকোপকে বাড়িয়ে দেয়। কারণ, এ ধরণের হ্রাস-বৃদ্ধিই হল ফটকাবাজির মূল ভিত্তি; মূল্য স্থিতিশীল থাকলে ফটকাবাজির কোন সুযোগ থাকে না। ফটকাবাজিতে শেয়ার বা পণ্যের প্রকৃত মূল্য এবং শেয়ার ইস্যুকারী কোম্পানীর কর্মদক্ষতা বিবেচনা না করেই মূল্যের এতদূর পর্যন্ত হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে যা অর্থনৈতিকভাবে একেবারে অযোক্তিক। সুতরাং ফটকাবাজি হল এক ধরণের কৃত্রিম উত্তাপ এবং একটি বাড়তি ও অবাঞ্ছিত পরাশ্রয়ী কর্ম।

চলবে

The Opponents Arguments

v      Speculation  aggravates  price  fluctuations  as  it  originally  relies  on  such fluctuations  and  it  finds  no  room  if  the  prices  stayed  stable.  In speculation,  prices  rise  and  drop  to  economically  unjustified  levels regardless  of  the  real  value  of  the  stock  or  good  and  of  the  actual performance  of  the  stock-issuing  company.  Thus, speculation is an artificial heating up and an unwanted additional parasite activity.

v      The brokers and the well-informed speculators are the ones who benefit from the intense heat produced by speculation. On the contrary, this heat brings no benefit to the public but rather it is a source of harm to them as it is an attractive but intriguing activity.

v      Speculation  does  not  differ  from  gambling  but  rather  it  is  one  of  its modern  forms.  In  fact,  stock  markets  are  nothing  but  dubious  houses protected  by  law  or  gambling  casinos  where  people  gain  unbelievable fortunes at a wink and at the same time it witnesses overwhelming losses in  seconds  causing  disastrous  impacts  like  bankruptcy,  family  disputes, divorce, heart attacks and sudden deaths. So, it is more like lottery where the minority of dominant organizers wins while the majority masses lose. In other words, the small speculators fall as an easy prey in the clutches of the stock markets’ tycoons. Such dominant tycoons are very powerful and they  are  aware  of  all  the  stock market’s  secrets  and  they  are  associated with  the  top  government  leaders.  In addition, they work together under cover using intrigues, plots and rumors and they control media. They also exploit  credit  to  support  speculation  and  they  affect  heated  and  wild speculations  to  the  extent  that  speculation  becomes  more  like  a  Crazy Market.  Some others argued that the people’s movements in the stock market look like they are working under a spell.

Leave a comment

Filed under Uncategorized

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং : বৈধতার সংকট

জিয়াউর রহমান মুন্সী

 

সূচীপত্র

 

প্রথম প্রবন্ধঃ Multi Level Marketing: Crisis of Legality 

Illustration

Illustration II:  

Exploitation with consent:

Statements of Commentators of the Quran

দ্বিতীয় প্রবন্ধঃ মাল্টি লেভেল মার্কেটিংবৈধতার সংকট

যাদের জন্য প্রবন্ধঃ

ভিত্তিগত দিক (substantive and theoratical aspect)

শ্রমের বহুস্তর সুবিধাকে বৈধ প্রমাণ করার রকমারী উপমাঃ

সদকায়ে জারিয়াঃ

পুত্রের আয়ে পিতার অধিকারঃ

অনাথ শিশুকে শিক্ষিত কর্মক্ষম করে তোলাঃ

বাড়ী ভাড়া প্রসঙ্গ

অলস বসে থেকে মুনাফা লাভের দৃষ্টান্ত থেকে প্রমাণ সংগ্রহঃ

সম্মতির বাহানাঃ 

পদ্ধতিগত দিক (Procedural Aspects)

বর্ধিত মুল্যে বিক্রয়ঃ

ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টলেভেল মার্কেটিং শীর্ষক সেমিনারের উপাখ্যানঃ

মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থানঃ

বিশেষজ্ঞদের মতামতঃ

শেষকথাঃ

 

তৃতীয় প্রবন্ধঃইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংশীর্ষক বইয়ের পর্যালোচনাঃ

প্রথার  (عرف Custom) আইনগত মর্যাদাঃ

শরীয়তের পরিপন্থী কোন প্রথা-ই গ্রহনযোগ্য নয়ঃ

ডঃ আব্দুল আজিজ আযযাম এর ব্যাখাঃ

“প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে বৈধ করে দেয়” – মূলনীতিটির তাৎপর্যঃ

তিনটি কঠিন শর্ত পূরণসাপেক্ষেই কেবল একটি নিষিদ্ধ কাজ সিদ্ধ হয়ঃ

রশীদ রেজার ব্যাখ্যাঃ

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের বৈধতার প্রবক্তাদের সবচেয়ে বড় ত্রুটিঃ কমিশন ও চেইন পিরামিডাল কমিশনের মধ্যকার সূক্ষ্ণ পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যার্থতাঃ

মধ্যস্বত্ত্বভোগীর রকমফেরঃ

মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বনাম মুদারাবা (Profit Loss Sharing), মুশারাকা (Partnership), কাফালা (Bailment) ও ওয়াকালা (Agency):

শ্রমবিহীন মুনাফাকে হালাল করার এক অদ্ভূত যুক্তিঃ

 

ব্লগ বিতর্ক

 

Multi Level Marketing:

Crisis of Legality

ABC Ltd. is a company doing the business of Multi-level Marketing. As its nature demands, it deals with NETWORKING BUSINESS i.e. a person, in order to get involved with it, has to buy certain products from the Company ensuring for himself certain BUSINESS POINTS with which he will be BLESSED with the OPPORTUNITY of recruiting new buyers for the products of the Company in his right and left sides. Thus starts the CHAIN REACTION of his labour that means the new buyers in his right and left sides will buy certain products from the Company and thereby become entitled to recruit new buyers under them. And from every new transaction the members of upper level will get commission. The task of the earlier person towards the latter is to supervise and encourage him to recruit more and more buyers. The severity of tension of the supervisor varies from time to time depending upon the activeness and consciousness of the new buyers. If they are lazy, inactive or unconscious, he has to spend his time and money in MANIPULATING them. On the other hand if they are active enough, the senior(s) may sit idle or may continue his MANIPULATING work.

Mr. X is a curious observer of this business. As a Muslim he has been critically analyzing it and poses certain questions regarding its validity.

The first objection is about the sale price. ABC Co. Ltd. is selling goods at a price which is approximately double the market price. For example the Company sells a bottle of oil at 600 Taka. while the same amount of oil with same components in ordinary market is sold at 300 to 350 Taka.

Now M. X wants to know from the Company  what are the reasons behind such a great difference of price (approximately double the ordinary market price). The Company shows the following reasoning:

Though the buyer has to pay approximately double the market price the Company gives him certain BUSINESS POINTS on the basis of which he can earn money LATERON by providing new buyers. When the new buyer will buy the bottle of oil the earlier buyer will be given a portion of benefit arising out of the later transaction and thereafter the CHAIN REACTION OF HIS FIRST LABOUR will begin ensuring more and more commission from every new transaction beneath his line.

But Mr. X says, it is not acceptable for the following reasons:

It is an implied CHEATING, because the Company behaves in such a way that the buyer thinks that with such a transaction he is getting goods AT THE ORDINARY MARKET PRICE as the Company propagates

As in the Traditional Marketing System advertisement cost and numerous intermediaries multiply the price of goods (otherwise people could buy goods at a very lesser price than the present market price) and

As in the Traditional Marketing System the difference money between the production cost and the market price is enjoyed by a very few portion of the society

And therefore the Multi-Level Marketing System has come into existence as a MERCY to “MANY” instead of “FEW” (as Multi-Level Marketing System does not believe in advertisement and therefore it will just distribute the difference money between the production cost and the market price among MANY and it NEED NOT INCREASE the ordinary market price).

But the practice is that the present ABC Co. Ltd. sells its oil bottles AT A PRICE HIGHER THAN THE ORDINARY MARKET PRICE ensuring huge benefits vis-à-vis the ordinary businessmen in the guise of MERCY to “MANY” instead of “FEW”. (Imagine the scenario that despite so much advertisement cost the traditional businessmen with the existing market price, we are told by the proponents of MLM, are gathering huge profits. Now what’s about the amount of profit the ABC Co. Ltd is gathering without any advertisement cost and with so much high price i.e. approximately double the ordinary market price?). Is it not a cheating to hide one’s such exploiting character and to express his artificial philanthropic character?

Illustration 1:

 

X buys a set of oil bottles (10 in number) directly from the ABC Co. Ltd. with 6000 Taka whose actual market price is at best 3500 to 3800 Tk. Here the Company tells Mr. X to be glad enough that in ordinary markets with such money he may gain only 10 bottles of oil and nothing else. And here he gets along with 10 bottles of oil certain LUCRATIVE BUSINESS POINTS to gain benefit after benefit. But two points are very CLEVERLY CONCEALED that (1) here Mr. X is exploited to the extent of 2200 Taka (6000-3800 =2200) at a single transaction of 6000 Taka only and (2) he will be entitled to get certain commission only when he can help the Company to EXPLOIT 2200 in every new transaction of 6000 Taka from the new buyers. Had these points been revealed, no person of sound mind would have accepted such a plan.

NOW Mr. X manipulates Y to buy bottles of oil from the Company. Y comes and buys 10 bottles of oil with 6000 Taka. Here Mr. Y is exploited to the extent of 2200 (6000-3800) Taka at a single transaction. His exploitation money is now shared by the Company and Mr. X. Both of them are now happy with eating the money exploited from Y. Y, to have happiness like X, encourages  Z to buy goods from ABC Ltd. Z answers positively and buys goods from the Company. Now Z is exploited in the same way as both Y and X were exploited before. The money exploited from Z (2200 Taka) is now very happily shared by ABC Co. Ltd., X and Y. Then starts the journey of Z in encouraging and manipulating new buyers to be exploited by the Company, himself and his seniors

From the illustration it is clear that IN EVERY NEW TRANSACTION A NEW BUYER IS EXPLOITED AND HIS EXPLOITATION MONEY IS HAPPILY SHARED BY THE COMPANY AND HIS SENIORS.

How can a man of sound mind accept such exploitation in every new phase?

Furthermore, X raises the question that whenever a person pays 6000 Taka he gets goods of 3800 Taka. But what does he get in lieu of his EXTRA MONEY i.e. 2200 Taka (6000-3800)? The Company readily answers that he gets LUCRATIVE BUSINESS POINTS.

3800 Taka in lieu of 10 bottles of oil

6000 Taka

2200 Taka in lieu of BUSINESS POINTS

But X is not convinced that BUSINESS POINTS may be the CONSIDERATION for the EXTRA MONEY, because CONSIDERATION is basically a DETRIMENT of a party to the contract.  Here the Company does not suffer any DETRIMENT / LOSS by giving abstract BUSINESS POINTS, because it ensures a chronological BENEFIT instead of any DETRIMENT. For full understanding let’s go through the following illustration.

Illustration 2:

The ordinary market price of potato is 24 Taka per kg. P, a new businessman in the market, claims 40 Taka for every kg of potato arguing that

Those who sell potato at 24 Taka per kg are the TRADITIONAL POTATO SELLERS.

Originally potato is 8 Taka per kg. As there are, along with the advertisement cost, three intermediaries (at least) between the producer and the general consumer namely, the AGENT, the WHOLESELLER and the RETAILER each claiming a specific amount of profit at every stage resulting in the rise of price and ultimately people are bound to buy potatoes at a very high price i.e. with 24 Taka per kg.

And therefore we have invented a new scientific system and that is to cut up advertisement cost and the intermediaries and distribute THAT MONEY among our customers.

The customers ask if you don’t have any advertisement and other unnecessary costs then why are you claiming more price than the ordinary market price? They give no straight cut answer. Rather they say for the extra money you will be given some BUSINESS POINTS to income more money.

At first the buyer does not understand its real significance but ultimately it becomes clear to him that the Company by selling 1 kg potato to him exploits 16 Taka (40-24) and just to mitigate his grievance the Company allures him to manage new buyers from whom the Company will similarly exploit 16 Taka per kg of which the new buyers will not be aware at the first instance and he will be given a portion of that EXTRA MONEY. And the Company says this opportunity to exploit new buyers is the CONSIDERATION for EXTRA MONEY taken from him.

Will the people at large tolerate such activity of the potato seller in the market in the guise of honest businessman? And will they accept that OPPURTUNITY TO EXPLOIT other prospective potato buyers as a valid CONSIDERATION?

X, now, comes to the point of validity of BUSINESS POINTS as CONSIDERATION from the side of the ABC Co. Ltd. for the EXTRA MONEY taken from a buyer. He thinks it can not be a VALID CONSIDERATION because it does NOT cause any DETRIMENT to the Company. Rather it opens the door of further BENEFIT (and it is universally accepted that CONSIDERATION is always a DETRIMENT and not a BENEFIT).

Thus the whole proposition of Mr. X (that this type of business transaction can not be treated as invalid) is based upon the following two reasons:

v      In every new transaction the Company ensures its EXTRA BENEFIT (i.e. the extra money) but the benefit of the other is hanged with another uncertain future transaction leading to two vices

ü       absence of CONSIDERATION from the part of the Company for the EXTRA MONEY, and

ü       violation of the PROHIBITION of Muhammad, the Messenger of Allah, (Peace Be Upon Him) on amalgamating two independent contracts into a single one (here one contract is for the goods and another is regarding dealership or distributorship of the Company) that paves the way for  ربا (usury). The text of the hadis is “

نهى رسول الله صلى الله عليه و سلم عن البيعتين فى بيعة

i.e. the Prophet (PBUH) has forbidden (the amalgamation of) TWO CONTRACTS INTO A SINGLE ONE. (Nasaai, Tirmiji, Ibnu Majah and others)

ü       To claim such an EXTRA MONEY (of which most of the buyers are not made aware at the time of the transaction) is both a DECEPTION and EXPLOITATION.

Now ABC Co. Ltd. says,

“I am at liberty to claim for my goods as high a price as I wish. The Shariah does not prohibit me to do so. Who are you to call my price EXPLOITATION? Am I compelling any one to buy my goods? People are buying goods from my Company being satisfied with my price. And their satisfaction is manifest in their behaviour, because whenever they come to buy my goods they sign a CONTRACT with my Company, they give their CONSENT to the CONTRACT leading to a VALID BUSINESS TRANSACTION as per the following Quranic verse:

لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل الا ان تكون تجارة عن تراض منكم 

i.e. Don’t eat the property of one another in a wrong way but (eat it) when it will be a BUSINESS WITH YOUR MUTUAL CONSENT.

 

X replies:

The Company has shown basically two arguments in favour of its non-exploiting character, i.e.

  • There is no limitation in price hike and
  • His contract is on the basis of MUTUAL CONTRACT and therefore no question of EXPLOITATION can arise.

First of all whether something is EXPLOITATION or not depends upon circumstances regard being had to the particular socio-economic conditions of a given society. For better understanding we have to differentiate between PROFIT and EXPLOITATION. Profit is the general goal of any business. Without it no business can run. But there is a tolerable limit though it varies with the variance of time and place. Whenever it crosses the limit it turns into EXPLOITATION. The ordinary businessmen are accruing enough profits from the general market price, then why should the EXCESSIVE PRICE fixed by the Company unilaterally not be treated as EXPLOITATION?

As to the first base of their argument (i.e. there is no limitation imposed by the Shariah on price hike) it can be said that it is not tenable. Because

ü       This type of opinion will bring about a catastrophe for the common people, as there will remain no authority to protect them from the clutches and exploitation of the millionaire businessmen

ü       Secondly, then the authority of the Government to interfere in the market becomes nullified. If this power can not be exercised by the Government then what is the necessity of this institution? Is it just to protect the few   millionaire businessmen against the mass people?

ü       Lastly, the thousand year old institution of الحسبة  (MARKET INSPECTION AUTHORITY) of Islamic law is sufficient to nullify the Company’s argument. Because this institution was created just to protect the mass people from the exploitation of the businessmen of the market.

[Furthermore the Company argues that their standing (i.e. they can demand as high a price as they wish) is based upon tradition related to Hazrat Ali. According to this tradition, Ali went to the market and bought a horse with 60 dirhams. On his way him, a man asked the price of the horse and Ali replied accordingly. The man wanted to buy it and requested Ali to fix the price. Ali said, “I will say nothing. It is upto you”. The man replied: I will pay 129 dirhams for it. Ali said, “I have no problem”. Then the contract was concluded.

Here from the Company argues that Ali demanded double the buying price and therefore it is a clear indicative that they have the right to demand the price which is approximately double the market price.

But X says, this type of conclusion can not be drawn from the above tradition. Because here Ali did NOT DEMAND ANY PRICE and it was the buyer who willingly gave 120 dirhams for the horse. On the other hand it is the Company who demands the EXCESSIVE PRICE and the buyer has NO BARGAINING POWER. Thus the two are different from each other.]

Their second argument is that as the contract is concluded on the basis of MUTUAL CONSENT it is absolutely valid as per the Quranic verse يا ايها الذين امنوا لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل الا ان تكون تجارة عن تراض منكم i.e. do not eat up your property among yourselves in a wrong way but (eat it) if it be (the consequence of) a valid business contract on the basis of your MUTUAL CONSENT.

X’s reply:

Mere the presence of MUTUAL CONSENT can not validate a transaction which is per se invalid. Otherwise lottery, speculation and riba (usury) all are to be treated as valid because all of them are concluded with mutual consent. First of all you have to acknowledge that this type of business contains two vices

 

1. EXPLOITATION by demanding EXCESSIVE PRICE and

2. CONCEALMENT of such exploitation to the ignorant people.

These two vices are of such a grave nature that the presence of any one of them in a contract is sufficient to invalidate it. Because the first one (EXPLOITATION) is a clear ظلم   (injustice) while the second (i.e. CONCEALMENT) is a حداع (DECEPTION). AND BOTH OF THEM ARE ILLEGAL UNDER ISLAMIC LAW.

Now for better understanding of my point you have to go through the following quotations of prominent interpreters of the Quran regarding the EXPLANATION of the verse ( يا ايها الذين امنوا لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل الا ان تكون تجارة عن تراض منكم  i.e. O’ you who believe do not eat up your property among yourselves in a wrong way but (eat it) if it be as a consequence of a valid business contract on the basis of your MUTUAL CONSENT) which is the prime basis of their argument.

Ibn Jarir Tabari quotes the eminent interpreter SUDDI

( يا ايها الذين امنوا لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل )  نهى عن اكلهم اموالهم بينهم بالباطل و بالربا و القمار و البخس و الظلم الا ان تكون تجارة ليربح فى الدرهم الفا ان استطاع

i.e.  (O’ you who believe do not eat up your property among yourselves in a wrong way but (eat it) if it be as a consequence of a valid business contract on the basis of your MUTUAL CONSENT) Allah has forbidden (the believers) eating their property among themselves in a wrong way i.e. with riba, lottery, VERY LOW PRICE or VERY HIGH PRICE but there is no problem if he achieves profit of thousand dirhams in a single dirham provided that it be the outcome of a valid business.           

 جامع البيان)  vol. IV p. 42)

 

After few lines the interpreter mentions the statement of QATADAH

التجارة رزق من رزق الله و حلال من حلال الله لمن طلبها بصدقها و برها ….ان التاجرالامين الصدوق مع السبعة فى ظل العرش يوم القيامة

i.e. Business is a sustenance from Allah and it is a valid thing recognized by Allah. This validity is only for those who perform their BUSINESS WITH TRUTH and RIGHTEOUSNESS ….  And the businessmen who are HONEST and TRUTHFUL  will be placed under the shade of the Throne of Allah with the class of chosen seven in the day of resurrection.

(ibid p.45)

And the Prophet (Peace Be Upon Him) says,

البيع عن تراض و الخيار بعد الصفقة و لا يحل لمسلم ان يغش مسلما

i.e. The contract of sale is to be concluded with mutual consent. After the agreement there should be the option (of return and repudiation etc.). And it is not legitimate for a Muslim to DECEIVE another Muslim.

(ibid p.46)

Muhammad Asad interprets:

 

The believers are prohibited from devouring another person’s possessions wrongfully even if that other person –being the weaker party – agrees to such a deprivation or EXPLOITATION under the stress of circumstances.

 (The Message of the Quran, pp. 142-144)

Abul A’la Maududi:

The expression wrongfully embraces all transactions which are opposed to righteousness and which are either legally or morally reprehensible….. Fraudulent transactions also seem to be based on the MUTUAL CONSENT of the parties concerned that kind of CONSENT, however, is based on the false assumption that no fraud is involved in the transaction. No body who knew that he would be subjected to fraud would consent to be a party to that transaction.

 

 (Towards Understanding the Quran, New Delhi, vol. II p. 32)

Mufti Muhammad Shafii:

 

To explain the first condition we can say that trade is the name of the exchange of one commodity with the other. Having commodity on one side and having no commodity against it is not TRADE. IT IS DECEPTION….The same tjhing happens in speculation and gambling. Here, the commodity does exist on one side, but the existence of a commodity against it is doubtful. [PONDER OVER THAT THE COMPANY’S INTEREST HAS BEEN ENSURED BUT THAT OF THE CLIENT IS VERY MUCH DOUBTFUL].

(Ma’aariful Quran)

 

Under the caption “The reality of the condition of MUTUAL CONSENT” the interpreter writes,

However, there is a third kind in which there is commodity on both sides, and apparently the transaction has been effected with MUTUAL CONSENT, but the consent of one party has been obtained by compulsion and not by his free will. Therefore, this third kind is also included in the second one. For example, a person or company collects articles of daily use from all over the market, builds up a stock, raise prices on the higher side and starts selling. Since this is not available elsewhere in the market, the customer has no choice but to buy it from him at whatever price he may be selling it. In this situation, though the customer himself walks into the store and, obviously, buys it with his consent, but this “consent” is an outcome of compulsion and therefore, it is null and void.

 (ibid)

At this stage Mr. X raises the question regarding the validity of the benefit of CHAIN REACTION OF LABOUR (i.e. the Company gives the buyer certain BUSINESS POINTS on the basis of which he can earn money LATERON by providing new buyers. When the new buyer will buy the bottle of oil the earlier buyer will be given a portion of benefit arising out of the later transaction and thereafter the CHAIN REACTION OF HIS FIRST LABOUR will begin ensuring more and more commission from every new transaction beneath his line.)

The Company tries to defend himself by referring to صدقة جارية (charity with continuous effect) and the Father-Child Relationship. They say if one can gain ثواب   (spiritual reward) for his deeds in a CHAIN REACTION WAY and a father can claim the benefit of his son’s income, then what’s the problem if the Company introduces the concept of BENEFIT OF CHAIN REACTION  OF LABOUR in MLM business?

X says, the example of صدقة جارية (charity with continuous effect) is totally irrelevant in business transactions, because the first one is an ABSTRACT AND SPIRITUAL GAIN which has NO MERCANTILE OR FINANCIAL VALUE while the latter is a purely MATERIAL QUESTION involving MONETARY ISSUES. These are too different to be compared. When Allah gives ثواب   (spiritual reward) of صدقة جارية (charity with continuous effect) in a chain reaction way, Allah gives it from his own treasure which is not financed by human wealth; Allah does not give it by snatching from human being and therefore no question of EXPLOITATION of people is involved in صدقة جارية (charity with continuous effect). On the other hand the Company gives the benefit of benefit of chain reaction of labour by EXPLOITING EVERY NEW BUYER IN A SEVERE WAY and not out of his own treasure. Remember that for every new transaction the Company has fixed its own interest while the interest of the distributors are hanging and varies from time to time. Thus by giving the benefit from the pockets of new buyers and not of his own pocket the Company does not have any LEGITIMATE RIGHT to compare it with صدقة جارية (charity with continuous effect) where Allah gives it from his own treasure and not from the treasure of any man.

Now remains the point of PARENT-SON RELATIONSHIP. This logic seems to have some weight. But a closer look will reveal that such comparison of a BUSINESS TRANSACTION with PARENT-SON RELATIONSHIP and application of the legal consequence of one on the other are not correct from several aspects:

  • First of all, father’s right in the property of his son is not the result of a BILATERAL AGREEMENT. Rather it is the Shariah itself who declares rights of the father in the property in an unambiguous term. The Prophet (PBUH) says,

انت و مالك لابيك

i.e. both you and your property are for the benefit of your father.

Here the Shariah does not speak about a general rule to validate the claim of one person in the property of other.

  • Secondly, father has NO BENEFIT OF THE CHAIN REACTION OF LABOUR, his right is limited to the property of his son only; he can not claim any thing from the property of his daughter though she has been raised and taught with his money. In the same way father can not claim any benefit from the property of his grandson and great grandson how low so ever in the presence of a son. So it is not a case of CHAIN REACTION OF LABOUR.

Moreover it is to be mentioned here that if once the DOCTRINE OF CHAIN REACTION OF LABOUR is introduced in our society without any support from the Quran and the Sunnah, it should be applied in all cases. Then just imagine the scenario where the primary school teachers are claiming a share/commission in the income of their previous students (who are millions in number) and in the same way thousands of people from different sectors of our society demanding the benefit of CHAIN REACTION OF LABOUR.

At last Mr. X raises the question about the validity of the TREE PLANTATION PROJECT where it is said that after 12 years you will get not less than 30000 Taka. X says, then what is the difference between ربا  (prohibited interest) and such type of predetermining the benefit of one party in any business transaction? The Company is yet to answer the question.

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংবৈধতার সংকট

 

পাশ্চাত্যে উদ্ভূত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা নেটওয়ার্কিং বিজনেস  মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সপ্তদশ শতক থেকে বৈশ্বিক রাজনীতি অর্থনীতির নেতৃত্ব থেকে বিতাড়িত হয়ে মুসলিম অঞ্চল গুলো হয়ে পড়ে পাশ্চাত্যের সেবাদাসগোলাম। জ্ঞান চিন্তাগত বন্ধ্যাত্ব ছিল এর অপরিহার্য পরিণতি। নতুন শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ লোক তৈরী হলো বটে; তবে তা পাশ্চাত্যে উদ্ভূত তত্ত্বগুলোর অন্ধ অনুকরণের ক্ষেত্রেই কেবল। সৃষ্টিশীল চিন্তা তো দূরের কথা, প্রচলিত চিন্তাদর্শন মতবাদ গুলোকেও খালেস ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার মতো যোগ্য লোকের সংখ্যা মারাত্মক ভাবে হ্রাস পেতে লাগলো।  আর ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এমন সব আলেম খোঁজার মানসিকতা সৃষ্টি হয়ে গেলো যারা কোন রকম গোজামিল দিয়ে যেকোন বিষয়কে ইসলাম সম্মতবলে ঘোষণা দিতে পারে।

 

জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের জনবহুল দেশগুলোর  অন্যতম। সামগ্রিক ভাবে যাই হোক কিছু লোকের মধ্যে এখনো ইসলামের হালাল হারামের অনুসন্ধিৎসু মন অবশিষ্ট আছে। অর্থনৈতিক টানাপড়েনে তারা একদিকে জড়িত হতে চাচ্ছে নেটওয়ার্কিং বিজনেসে আবার অন্যদিকে অবৈধতার শংকাও মনে খটকা সৃষ্টি করছে। বক্ষমান নিবন্ধটি মূলত তাদের উদ্দেশ্যেই লেখা। নিবন্ধ এমন লোকদের জন্য নয় যারা বাড়তি আয়ের স্বার্থে ইসলাম বহির্ভূত পন্থায়ও কুছ পরওয়া নেহিঅথবা আজকের দুনিয়ায় এতোসব ইসলামী নিয়ম মেনে চলা সম্ভব নাকিংবা আরে! কত হারাম কাজ করে যাচ্ছি, তুলনায় এটা তো মামুলি ব্যাপারইত্যাকার রোগে আক্রান্ত।

মাল্টিলেভেল মার্কেটিং মূলত ডিস্ট্রিবিউটরদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করার একটি প্রক্রিয়া (A process of selling of goods and services through a network of distributors) । এ প্রক্রিয়ায় আপলাইন ও ডাউনলাইন নামে বহু স্তরের (Multi level) ডিস্ট্রিবিউটর তৈরি হয়।

ডাউনলাইনের কোন ব্যক্তি (চাই সে এক হাজার স্তর নিচের ডিস্ট্রিবিউটর হোক এবং সর্বোচ্চ আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটর তাকে নাই বা চিনুক) কর্তৃক বিক্রিত পণ্যদ্রব্যের একটি কমিশন আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটররা পেয়ে থাকে। এই  স্ট্রাকচারটি দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো।

কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত ব্যবসা ও শ্রম নীতির সাথে প্রচলিত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর বিরোধ বেশ কয়েকটি দিক থেকে। এগুলোকে সাধারণত দু’টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে – (১) ভিত্তিগত (substantive and theoretical), (২) পদ্ধতিগত (procedural) ।

ভিত্তিগতদিক (substantive and theoratical aspect) :

 

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর ‘পদ্ধতি’ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের হলেও এর তত্ত্বগত ভিত্তিটি (theoretical basis) সবসময়ই এক রকম। আর তা হলো, নিম্ন লেভেলের ডিস্ট্রিবিউটর কর্তৃক বিক্রিত পণ্যের একটি কমিশন সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া। এই নীতিটি ইসলামের সাথে কতটা সাংঘর্ষিক তা বুঝার জন্য ইসলামের শ্রম নীতিটি প্রথমে ভালোভাবে বুঝে নেয়া প্রয়োজন।  সূরা নাজমের ৩৯ নং আয়াতটি (وان ليس للانسان الا ما سعي  অর্থাৎ মানুষ ঠিক ততো টুকুরই ফল পাবে যততুকু  সে নিজে করেছে) শ্রমনীতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। এর পরের আয়াতে বলা হচ্ছে (لا تزر وازرة وزر اخري  অর্থাৎ একজন আরেকজনের বোঝা বহন করবেনা) । এ দু’টি আয়াত অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির আয় ও দায় (income and liability) সবসময় ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তবে, শরীয়ত প্রণেতা নিজেই অন্যান্য আয়াত ও হাদীসে এ সাধারণ নীতিটির (general principle) কয়েকটি ব্যতিক্রম (exceptions) উল্লেখ করে দিয়েছেন। তন্মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধনী লোকদের সম্পদে অভাবী মানুষের অধিকার এবং আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে সদকায়ে জারিয়া, গোনাহে জারিয়া ও জীবিত লোক কর্তৃক কোন ভালো কাজের সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পাঠানো (ঈসালে সওয়াব) অন্যতম। এখানে উল্লেখ্য যে, শরীয়ত প্রণেতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সকল ব্যতিক্রম উল্লেখ করেছেন সেগুলো বাদ দিলে সুরা নাজমের ৩৯ নং আয়াতটি ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও শ্রমনীতির একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি (established rule) ।

নাজমের ৩৯ নং আয়াত থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, মানুষ কেবল তার নিজের শ্রমের প্রত্যক্ষ ফল লাভের অধিকারী। কারো নিযুক্ত কর্মচারী [1] না হলে একজন আরেকজনের শ্রমের ফলে অংশীদার হতে পারেনা। একই ভাবে মানুষ তার শ্রমের ফল কেবল নিকটবর্তী লেভেল থেকেই আশা করতে পারে; কোন ক্রমেই তা বহুস্তর (multi level) পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারেনা ইসলামের এই নীতিটি মানবীয় বুদ্ধি বিবেচনার সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। এমনকি যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করেনা, তারাও অবচেতন ভাবে এই নীতিটি অনুসরণ করে চলছে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার ভাবে বুঝা যাবে।

মানুষ সামাজিক জীব (social being)। কথাটির পেছনে মানবিকতার তুলনায় অসহায়ত্বের দিকটিই প্রবল। অর্থাৎ, মানুষ পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় প্রাণী। তার এই অসহায়ত্ব তাকে বাধ্য করে সামষ্টিক জীবনযাপন করতে। তার পরিধেয় এক টুকরো বস্ত্রের পেছনে অসংখ্য বনী আদমের শ্রম জড়িত। অগণিত লোকের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ পরিশ্রমের ফলে এক মুঠো ভাত তার খাবার প্লেটে হাজির হয়। এক কথায়, মানুষ তার মৌলিক প্রয়োজনের একটিও অসংখ্য মানুষের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ শ্রম ছাড়া পূরণ করতে পারেনা। এখন একজন ব্যক্তি কতজন লোককে পারিশ্রমিক দিতে নীতিগতভাবে বাধ্যমানবীয় সুস্থ বিবেক বলছে তাকে কেবল ব্যক্তির পারিশ্রমিক দিতে বাধ্য করা যেতে পারে, যে তার পেছনে প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়েছে; পরোক্ষ শ্রম নয়। আর এই নীতিটিই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে সুরা নাজমের ৩৯ নং আয়াতটিতে (وان ليس للانسان الا ما سعي  অর্থাৎ মানুষ ঠিক ততো টুকুরই ফল পাবে যা সে নিজে করেছে) ।

একজন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক তার প্রত্যক্ষ শ্রমের ফল দাবী করতে পারে, যা সাধারণত তাকে বেতন আকারে প্রদান করা হয়। কিন্তু কোন চুক্তি মূলে শিক্ষকের এ দাবী বৈধ হিসাবে বিবেচিত হতে পারেনা যে, তার ছাত্ররা যত জনকে শিক্ষিত করে কর্মক্ষম করে তুলবে এবং তারা ভবিষ্যতে যাদেরকে যোগ্য করে তুলবে তাদের প্রত্যেকের আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ উর্ধ্বতন শিক্ষককে কমিশন আকারে দিতে হবে।

বলুন তো দেখি, শ্রমের বহুস্তর সুবিধাকে (multi level benefit of labour) মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে বৈধ ও নির্দোষ মনে করা হলে শিক্ষক সম্প্রদায়ের উক্ত দাবীকে কেন মেনে নেয়া হবেনা ? পৃথিবীর কোন সভ্য ও সুস্থ মনের অধিকারী জাতি এমন উদ্ভট দাবী মেনে নিবে বলে আমার মনে হয়না। কারণ এ নীতির ফলাফল তখন কেবল শিক্ষক সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেনা। একই রকম দাবী উঠতে থাকবে কুলি, মজুর, শ্রমিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী- এক কথায় শ্রমজীবি মানুষের প্রতিটি সেক্টর থেকেই। কারণ ইতোপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানব সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিই অসংখ্য মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শ্রমের উপর নির্ভরশীল। ঠাণ্ডা মাথায় একবার ভেবে দেখুনতো, সমাজের প্রতিটি সেক্টর থেকে এরকম দাবী উঠতে থাকলে আমাদের সামগ্রিক জীবনে কী ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে ? আর  যদি বলা হয় শ্রমের বহুস্তর সুবিধাকে (multi level benefit of labour) সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবেনা, তাহলে জিজ্ঞাস্য হচ্ছে এই সীমিতকরণ হবে কিসের ভিত্তিতেবিশেষ করে সব ক্ষেত্রেই যখন আমরাশ্রমের খেলা’- দেখতে পাচ্ছি ?

এতোক্ষণের আলোচনায় এ বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে শ্রমের বহুস্তর সুবিধা (multi level benefit of labour) কিছুতেই বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারেনা। অথচ এ অবৈধ নীতিটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ভিত্তি (theoretical basis)। এ ভিত্তি সরিয়ে ফেললে এ প্রকারের বিজনেস টিকে থাকতে পারে না।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং  শ্রমের বহুস্তর সুবিধা (multi level benefit of labour) তত্ত্বটি কিভাবে জড়িয়ে আছে অংশে আমরা তা আলোচনা করবো।

আমি কোন সাধারণ কোম্পানী থেকে পণ্য কিনে অপরজনের কাছে বিক্রির মাধ্যমে লাভবান হওয়ার বৈধ অধিকার রাখি। অনুরূপ ভাবে কোন ক্রেতা সংগ্রহ করে দেয়ার মাধ্যমে কোম্পানীর কাছ থেকে দালালীর কমিশন (brokerage fee) নেয়ার অধিকারও আমার রয়েছে। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই আমার প্রত্যক্ষ শ্রম জড়িয়ে আছে। ফলে, আমি আমার প্রত্যক্ষ শ্রমের প্রত্যক্ষ সুবিধা নিকটতম স্তর থেকে একবারই পাওয়ার অধিকার রাখি। কিন্তু, মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এ একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট ভ্যালুর পণ্য কিনে আমি দালালীর অধিকার অর্জন করি যা বাস্তবায়ন করতে আমাকে প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়ে নতুন ক্রেতা সংগ্রহ করতে হয়। অতএব, আমি ব্যক্তিগত ভাবে যত বেশী ক্রেতা সংগ্রহ করতে পারবো ঠিক ততজনের কমিশন লাভের বৈধ অধিকার রাখি; কিন্তু কোন ক্রমেই আমার প্রত্যক্ষ শ্রম স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সুদূরবহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারেনা অথচ মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে তা ঘটে চলছে। অর্থাৎ, আমি যদি কাউকে নিয়োগ দেই তাহলে তার মাধ্যমে সৃষ্ট তার নিম্ন পর্যায়ের (তা হাজার মাইল লম্বা হলেও) সমস্ত নতুন চুক্তির প্রত্যেকটির সুবিধা আমি কমিশন আকারে পেতে থাকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে আমার ডাউনলাইন এতোদূর বিস্তৃত হয়ে পড়েছে যাদের পেছনেতথাকথিত তত্ত্বাবধানব্যতীত আমার কোন প্রত্যক্ষ শ্রম (direct labour) নেই; এমনকি তাদের সাথে আমার কোন পরিচয়ও নেই।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর বৈধতার দাবীদাররা শ্রমের বহুস্তর সুবিধা (multi level benefit of labour) কে হালাল করার জন্য এ যাবৎ যে সকল যুক্তি ব্যবহার করেছে, এ পর্যায়ে আমরা তার প্রত্যেকটি পর্যালোচনা সহকারে পাঠকদের সুস্থ বুদ্ধির সামনে তুলে ধরছি।

() সদকায়ে জারিয়াঃ

এই সিস্টেমের প্রবক্তারা শ্রমের বহুস্তর সুবিধার (multi level benefit of labour) মিল খুঁজে পায় সদকায়ে জারিয়ার [2] সাথে। তাদের যুক্তির সারকথা হচ্ছে “সদকায়ে জারিয়ায় ব্যক্তি যদি একবার প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়ে তার ফল দীর্ঘদিন পর্যন্ত পেতে পারে, তাহলে আমরাও মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে একবার প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত এর ফল ভোগ করার বৈধ অধিকারী”।

আপাত দৃষ্টিতে যুক্তিটি বেশ শক্তিশালী মনে হলেও একটু গভীর দৃষ্টি দিলে কয়েকটি দিক থেকে এর অসাড়তা ধরা পড়বে।

প্রথমতঃ সদকায়ে জারিয়া মূলত একটি নিরেট আধ্যাত্মিক বিষয় (purely spiritual in nature) যার সাথে অর্থ ও শ্রম নীতির (finance and labour policy) কোনও সম্পর্ক নেই। সদকায়ে জারিয়ায় দীর্ঘদিন পর্যন্ত যে প্রতিদান/বিনিময় পাওয়া যায় তা হচ্ছে কেবলই সওয়াব; যার কোন আর্থিক মূল্য (financial value) নেই। সদকায়ে জারিয়ার সাথে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর তুলনা ঠিক তখনি সঠিক হতে পারে যখন সদকায়ে জারিয়ার বৈশিষ্টের দাবী অনুযায়ী মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়েও এ রকম ঘোষণা দেয়া হবে যে, “প্রতিটি ব্যক্তি প্রত্যক্ষ শ্রমের ভিত্তিতে সরাসরি কারো কাছে কোম্পানীর পণ্য বিক্রি করলে ঠিক ঐ ক্রেতার আর্থিককমিশন লাভের উপযুক্ত; বাদবাকী যে সকল লোক নতুন ক্রেতার প্রত্যক্ষ শ্রমে পণ্য কিনবে সেখান থেকে আপলাইনের ব্যক্তিবর্গ কিছু লোকের উপকার করার কারণে সদকায়ে জারিয়ার মতো বহুত ফায়দা, অশেষ নেকী কিংবা অগণিত আশির্বাদ (যার কোনটিরও আর্থিক মূল্য নাই) পেতে থাকবেন”। নিরেট সওয়াবের বিষয়কে আর্থিক মূল্যের সাথে মিশিয়ে ফেলা নীতিগত ভাবেই ভুল।

দ্বিতীয়ত, সদকায়ে জারিয়ার ক্ষেত্রে সওয়াবদাতা (আল্লাহ) তার নিজস্ব তহবিল থেকে কর্মসম্পাদন কারীকে দিয়ে থাকেন; তিনি কোন মানুষের তহবিল থেকে কেটে কেটে জমা করে দেননা। পক্ষান্তরে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে কোম্পানী তার নিজস্ব তহবিল থেকে অথবা নিজের পিতৃ সম্পত্তি থেকে এই ধারাবাহিক কমিশন দেয়না; বরং প্রতিটি নতুন ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা বর্ধিত মূল্যের একটি অংশকে কেটে কেটে আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটরদেরকে প্রদান করে। সদকায়ে জারিয়ায় প্রতিদান প্রদানের জন্য অন্যের তহবিলে কাঁচি চালানোর প্রয়োজন পড়েনা; অথচ মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে এই বাড়তি কমিশন গুলো আদায় করা হয় প্রতিটি নতুন ক্রেতার তহবিলে কাঁচি চালানোর মাধ্যমেই। প্রকৃতিগতভাবে এ দু’য়ের মধ্যে এতো বিরাট পার্থক্য থাকার ফলে একটিকে অপরটির সাথে তুলনা দেয়ার অবকাশই থাকেনা।

() পুত্রের আয়ে পিতার অধিকারঃ

 

তাদের দ্বিতীয় যুক্তিটি হচ্ছে, “পিতা যেভাবে পুত্রের পেছনে কয়েক বছর টাকা বিনিয়োগ ও তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে পুত্রের আয়ে স্থায়ী অংশীদার হতে পারে ঠিক সেভাবেই মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে আপলাইন ‘তত্ত্বাবধানের’ দায়িত্ব নিয়ে ডাউনলাইনের আয়ে বৈধ ভাবেই স্থায়ী অংশীদার হতে পারে।”

এ যুক্তিটিও কয়েকটি কারণে সঠিক নয়।

প্রথমতঃ পুত্রের আয়ে পিতার আধিকারটি মূলত কোন রকম তত্ত্বাবধান ও অর্থ বিনিয়োগের সাথে শর্তযুক্ত নয়। পিতা অর্থ বিনিয়োগ না করেও পুত্রের আয়ে অংশীদার। এমনটি হয়েছে মুলত শরীয়ত প্রণেতার পক্ষ থেকে একটি বিশেষ আইনের কারণে (যেখানে পুত্রের আয়ে পিতার অধিকারের কথা বলা হয়েছে)। নতুবা বিষয়টি যদি তত্ত্বাবধান ও  বিনিয়োগের সাথে সম্পৃক্ত হতো তাহলে মেয়ের আয়েও পিতার অধিকার স্বীকার করা হতো (কারণ, মেয়ের পেছনেও পিতার তত্ত্বাবধান ও অর্থ বিনিয়োগ রয়েছে)। অথচ এটা অত্যন্ত সুবিদিত যে, মেয়ে শত কোটি টাকা আয় করলেও মেয়ের জীবদ্দশায় সে সম্পদে পিতার কোন বৈধ অধিকার নেই।

দ্বিতীয়তঃ পুত্রের আয়ে পিতার আয়ের কোন মাল্টিলেভেল ইফেক্ট নেই। অর্থ্যাৎ, পিতা কেবল তার পুত্রের আয়ে অংশীদার; পুত্র কোনো লোককে কাজে নিয়োগ করলে সেখান থেকে কোনো সুবিধা দাবি করার অধিকার পিতার নেই। তাছাড়া পিতা একই সময়ে একাধিক লেভেল (যেমন পুত্র, পৌত্র ও প্রপৌত্র — ) থেকে আর্থিক সুবিধা দাবী করতে পারেনা (যেমনটা দাবী করা হয় মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে) ।

অতএব এটা সুস্পষ্ট যে, পুত্রের আয়ে পিতার বৈধ অধিকারের মধ্যে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর শ্রমের বহুস্তর সুবিধার (multi level benefit of labour) বৈধতার প্রমাণ তো দূরের কথা; কোন ইংগিতও নেই।

() অনাথ শিশুকে শিক্ষিত কর্মক্ষম করে তোলাঃ

 

কখনো কখনো তাদেরকে এ যুক্তির অবতারণা করতে দেখা যায় যে, “ধরুন, একটা অনাথ শিশু আপনার নজরে পড়ল যার কোন আইনগত দায় দায়িত্ব আপনার উপর নেই। একান্ত দয়া পরবশ হয়ে আপনি তাকে অনেক টাকা পয়সা ও শ্রম দিয়ে তাকে শিক্ষিত ও কর্মক্ষম করে তুললেন। এবার বলুন, সে যদি কোন ইনকাম করে তাহলে কি সে ইনকামে আপনার কোন বৈধ অংশ নেই ? আলবৎ আছে। অনুরূপভাবে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আপনি যখন প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়ে এবং এ ব্যবসার মাহাত্ম বুঝিয়ে কোন নতুন ব্যক্তিকে এর অন্তর্ভুক্ত করেন অমনিই তার ভবিষ্যৎ ডাউনলাইনের চুক্তিসমুহের মধ্যেও আপনার একটি বৈধ অংশ সৃষ্টি হয়ে যায়।”

সন্দেহ নেই, এই যুক্তি আবিষ্কারের পেছনে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা খরচ হয়েছে। বুদ্ধির প্রশংসা না করে উপায় নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আগের দু’টি যুক্তির ন্যায় এই যুক্তিটিও শ্রমের বহুস্তর সুবিধার (multi level benefit of labour) বৈধতা প্রমাণে সক্ষম নয়। কারণ-

অনাথ শিশুকে কর্মক্ষম করে তোলার মাধ্যমে আপনি দু’টি জিনিস অর্জন করেছেন। একটি হচ্ছে সওয়াব (যার কোন financial value নেই, অতএব তা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়) এবং অপরটি হ্ল ‘আর্থিক অধিকার / financial right’ (যেহেতু তার পেছনে আপনি নিজের অর্থ ব্যয় করেছেন)। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আপনার আর্থিক অধিকারটি বাস্তব খরচের পরিমাণ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। অর্থ্যাৎ, বাস্তবে তার জন্য যত টাকা খরচ করেছেন ঠিক ততটাকাই আপনি ফেরৎ পাওয়ার (reimbursement) অধিকারী; তার বেশী নয়। এক কথায়, তার ইনকামে আপনার কোন অনির্দিষ্ট, অসীম স্থিতিস্থাপক (indefinite, unlimited and elastic) অধিকার নেই; বরং রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ (definite and limited) অধিকার, যার বাড়তি একটি টাকাও আপনার জন্য বৈধ নয়।

 

তাছাড়া অনাথের ক্ষেত্রেও আপনার শ্রমের কোন বহুস্তর সুবিধা (multilevel effect) নেই।  অর্থ্যাৎ, কেবল ঐ অনাথ শিশুর কাছেই আপনার অধিকার রয়েছে; সে যদি অন্য কারো সাথে চুক্তি করে তাহলে সেই স্তর থেকে উদ্ভূত আয়ে আপনার কোন অধিকার নেই।

মোদ্দাকথা, এই উদাহরণের মাধ্যমেও শ্রমের বহুস্তর সুবিধার (multi level benefit of labour) বৈধতা প্রমাণ সম্ভব নয়।

 () বাড়ী ভাড়া প্রসঙ্গ

তাদের চতুর্থ যুক্তিটি হচ্ছে, “আমি যদি একবার শ্রম দিয়ে একটি বাড়ীর মালিক হই তাহলে সারাজীবন বসে বসে ঐ বাড়ীর ভাড়া ভোগ করি। কই, তখন তো কেউ এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না ? পক্ষান্তরে  আমি যদি মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ে একবার শ্রম দিয়ে একটি ডাউনলাইন তৈরী করে তাদের চুক্তি থেকে উদ্ভূত ইনকামে বসে থেকে ভাগ বসাই তাহলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন ? বাড়ী ভাড়া ক্রমাগত পেতে থাকা বৈধ হলে ডাউনলাইনের ইনকামেও ক্রমাগত ভাগ বসানো বৈধ। কারণ, নীতি সব জায়গায় একরকমই হওয়া উচিত।”

বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা হলে এ যুক্তিটিও ধোপে টিকবেনা। কারণ, বাড়ী ভাড়ার ক্ষেত্রে বাড়ী একটি ভৌতিক বস্তু (physical object) যা ব্যাবহার করা ও ভাড়া দেওয়ার যোগ্য। সাধারনত একটি বাড়ীর পেছনে দু’ ধরনের বিনিয়োগ কার্যকর থাকে। একটি হল ‘অর্থ’ (যা বাড়ীর মালিক যোগান দিয়ে থাকে) এবং অপরটি হল ‘শ্রম’ (যা সরবরাহ করে শ্রমিক পক্ষ)। মালিকের অর্থ ও শ্রমিকের শ্রম – এ দু’য়ের যৌথ ফলাফল হচ্ছে একটি বাড়ী। সূক্ষ্ণ দৃষ্টি প্রয়োগ করুন, যদি শ্রমের বহু স্তর সুবিধা (multilevel benefit of labour) বৈধ হতো, (মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের প্রবক্তরা যাকে বৈধ ভাবছেন) তাহলে ঐ বাড়ীর উপর মালিকের ন্যায় শ্রমিক পক্ষেরও একটি স্থায়ী অধিকার অর্জিত হতো। অর্থ্যাৎ, যতদিন বাড়ী থেকে আয় হতে থাকবে ততদিন সেই আয়ের উপর মালিক ও শ্রমিক দু’ পক্ষই ভাগ বসাতো। কারণ, শ্রমিক পক্ষের শ্রমের ফলেই বাড়ীটি অস্তিত্ত্বে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে কি শ্রমিক পক্ষ বাড়ীর আয়ে স্থায়ী অংশীদার হতে পারে ? মোটেই না। এর কারণ কী ? এর কারণ হল, সর্বাগ্রে দেখতে হবে মানুষ অর্থ বা শ্রম দিয়ে যা উপার্জন করছে তার বৈশিষ্ট্য কী ? তা কী ভাড়া [3] দেওয়ার যোগ্য ? যদি ভাড়া দেয়ার যোগ্য হয় তাহলে বাড়তি পরিশ্রম না করেও স্রেফ বস্তুটি ভাড়া দিয়ে বসে বসে উপকার লাভ করা যেতে পারে। এখানে মালিক পক্ষ অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি বাড়ী অর্জন করেছে (যা ভাড়া দেয়ার যোগ্য)। পক্ষান্তরে শ্রমিক পক্ষ শ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেছে কিছু টাকা (যা ভাড়া দেয়ার অযোগ্য)। দু’ পক্ষই দু’টি স্বতন্ত্র গুণ সম্পন্ন জিনিস অর্জন করেছে। প্রত্যেক পক্ষই নিজের ইনকামের নিরংকুশ মালিক; এক পক্ষের ইনকামে (কিংবা তা থেকে ভবিষ্যতে উদ্ভূত কোন আয়ে) অপর পক্ষের কোন রকম লেজ লাগানো নেই। এখান থেকেও একই কথা প্রমাণিত হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার শ্রমের একস্তর সুবিধা (uni-level benefit) নিকটতম স্তর (nearest level) থেকেই পেয়ে থাকে; বহুস্তর (multi-level) থেকে নয়।

এ বিষয়টি মাথায় রেখে এবার  মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের প্রতিদান স্কীম (remuneration scheme) টি পর্যালোচনা করা যাক। এ সিস্টেমের সর্বোচ্চ চূড়ায় রয়েছে কিছু রাঘব বোয়াল যারা প্রথম দিককার সদস্য। এরপর থেকে যারাই এর সাথে যুক্ত হতে চেয়েছে তাদের প্রত্যেককে বিদ্যমান রাঘব বোয়ালদের রেফারেন্স [4] সাপেক্ষেই পণ্য কিনতে (বা দালালির অধিকার নিতে) বাধ্য করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ, উচ্চতর দালালের অধীনস্ততা না মেনে সরাসরি কোম্পানির  দালাল হওয়ার রাস্তা খোলা রাখা হয়নি। কারণ,তখন উচ্চতর রাঘব বোয়ালদের বসে বসে কিংবা তথাকথিত ‘তত্ত্বাবধানের’ নামে কোটি কোটি টাকা কামানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া, তখন তাদেরকেও সবসময় সরাসরি পণ্য বিক্রয়ের (direct selling of goods) কঠোর শ্রম দিতে হয়। নামকাওয়াস্তে তত্ত্বাবধাননামক শ্রমের মাধ্যমে (তাও আবার অনেক ক্ষেত্রে কাল্পনিক/imaginary) কোটি কোটি টাকা কামানোর সুযোগ থাকলে সরাসরি পণ্য বিক্রয়ের (direct selling of goods) কঠোর শ্রম দিয়ে মাসে মাত্র কয়েক হাজার টাকা ইনকাম করতে যায় কোন বোকা! কারণ, ডাউনলাইন নিজের অর্থগৃধ্নু মানসিকতায় যথাযথ সচেতন হলে তাদের শ্রমেই দালালচক্রের সংখ্যা বাড়তে থাকে যার কমিশন অনায়াসে আপলাইনের উস্তাদদের কাছে পৌঁছে যায়। এখানে একটি সরল প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলাম শ্রম পারিশ্রমিকের মধ্যে যে সুমহান ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করেছে তার অধীনে রকম মতলববাজীর স্থান থাকতে পারে কি ?

সারকথা, বাড়ী ভাড়ার আয়ে কোন রকম বহু স্তর সুবিধা (multi level benefit) নেই, যার সাথে তুলনা করে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের বৈধতা বিবেচনা করা যেতে পারে।

 

 

 () অলস বসে থেকে মুনাফা লাভের দৃষ্টান্ত থেকে প্রমাণ সংগ্রহঃ

তাদের কেউ কেউ আবার বলে উঠছেন যে, “অলস বসে থেকে মুনাফা লাভের দৃষ্টান্ত তো খোদ ট্রাডিশনাল মার্কেটিংয়েও রয়েছে। যেমন একজন বস্ত্র ব্যবসায়ী কয়েক বছর কঠোর শ্রম দিয়ে একটি বিশাল দোকান দিয়ে বসে। কাজ কারবার মূলত সবই করছে কর্মচারীরা; মালিক শুধু আলীশান গদিতে বসে টাকা গুনে গুনে কেবল পকেটে ঢুকাচ্ছে। এটা যদি বৈধ হয়, তাহলে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ে কয়েক বছর কঠোর শ্রম দিয়ে একটি দালাল চক্র সৃষ্টি করে ডাউনলাইনের কমিশনে বসে থেকে ভাগ বসালে অবৈধ হবে কেন ?”

এ উদাহরণে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে, কিছু লোককে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া, তাদের বেতন-ভাতাদি ও আইনগত দায়-দায়িত্বের একটি বোঝা মালিকের স্কন্ধে থাকা। এটা মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের আপলাইন ও ডাউনলাইনের কারবার নয়, যেখানে ডাউনলাইনের পাতি দালালদের ইনকামে আপলাইনের রাঘব বোয়ালদের অধিকার তো ঠিক ই আছে কিন্তু বেতন-ভাতা ও আইনগত দায়-দায়িত্বের কোন কিছুই তাদের ঘাড়ে নেই। অধিকার ও দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে দু’টি ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের ফলে একটিকে অপরটির সাথে তুলনা করা ই সঠিক নয়।

এখানেও যে কথাটি অত্যন্ত জোরের সাথে উল্লেখ্য তা হলো, উক্ত উদাহরণেও (এমনকি মালিক কর্তৃক কোন রকম বেতন-ভাতা দেয়া না হলেও) শ্রমের বহু স্তর সুবিধা (multilevel benefit of labour) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থ্যাৎ, বস্ত্র ব্যবসায়ী তার নিযুক্ত কর্মচারীর মাধ্যমে বিক্রীত পণ্যের লাভ একবারই পাচ্ছে। উক্ত কর্মচারী থেকে কোন ক্রেতা কোন পণ্য কিনে অন্য কোথাও বিক্রি করলে সেখানকার মুনাফায় উক্ত বস্ত্র ব্যবসায়ীর কোন কমিশন থাকছে না; তার পরবর্তী পর্যায়ের বিক্রয়সমুহের ক্ষেত্রে তো কমিশনের প্রশ্ন ই আসে না।

() সম্মতির বাহানাঃ

একটা পর্যায়ে তারা বলে উঠেন যে, “আমরা তো আর কাউকে জোর করে এই ব্যবসায় আনছি না। প্রাপ্ত বয়স্ক লোকেরা স্বেচ্ছায় আমাদের সাথে চুক্তি করছে। পারস্পরিক সম্মতি থাকার কারণে আমাদের এই কারবার জায়েজ। কারণ, আল্লাহ বলেন-

يا ايها الذين امنوا لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل الا ان تكون تجارة عن تراض منكم (النساء 29)

অর্থ্যাৎ, “হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না। তবে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে খেতে পারো।” [5]

প্রথম কথাটি হচ্ছে, আয়াতের প্রথমাংশে “অন্যায়ভাবে” অন্যের সম্পদ খাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে; অতঃপর আলোচিত হয়েছে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে ব্যবসার বিষয়টি। এর মাধ্যমে বুঝা গেল,  কোন একটি বিষয় কুরআন ও হাদীস দ্বারা অবৈধ প্রমাণিত হলে পারস্পরিক সম্মতি তাকে বৈধ করতে পারেনা। এ ক্ষেত্রে আল্লামা আসাদ কর্তৃক উক্ত আয়াতের অনুবাদটি খেয়াল করুন-

O YOU who have attained to faith! Do not devour one another’s possessions wrongfully – not even by way of trade based on mutual agreement. [6]

অর্থ্যাৎ, “হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না- এমনকিপারস্পরিকসম্মতিক্রমেব্যবসারনামদিয়েওনয়।”

তাছাড়া একটি দারিদ্র পীড়িত দেশে মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে একতরফা যে কোন শর্ত দিলেও বেকার যুবকরা সম্মতি দিতে কুন্ঠা বোধ করে না। এরকম পরিস্থিতিতে প্রদত্ত সম্মতি ‘স্বাধীন সম্মতি’ (free consent) হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা- তা নীচে উল্লেখিত মুফাসসিরদের বক্তব্য থেকে কিছুটা আঁচ করা যেতে পারে।

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (রহঃ) লিখেন-

باطل طريقوں سے مراد وه تمام طريقے ہيں جو خلاف حق هوں اور شرعا و اخلاقا ناجائز هوں

অন্যায়ভাবে বলতে এখানে এমন সব পদ্ধতির কথা বুঝানো হয়েছে যা সত্য ও ন্যায়নীতি বিরোধী এবং নৈতিক দিক দিয়েও শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয।…… প্রতারণা ও জালিয়াতির কারবারেও বাহ্যত সম্মতিই দেখা যায়। কিন্তু এখানে সম্মতির পেছনে এই ভুল ধারণা কাজ করে যে, এর মধ্যে প্রতারণা ও জালিয়াতি নেই। [7]

 

আল্লামা আসাদ বলেন-

The believers are prohibited from devouring another person’s possessions wrongfully even if that other person- being the weaker party – agrees to such a deprivation or exploitation under the stress of circumstances.  [8]

 

অর্থ্যাৎ, “ঈমানদারদেরকে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেতে নিষেধ করা হয়েছে; এমনকি অপর পক্ষ (দুর্বল হওয়ার কারণে) পরিস্থিতির চাপে এই বঞ্চনা ও শোষণমূলক চুক্তিতে সম্মতি দিলেও।”

 

 

পদ্ধতিগতদিক (Procedural Aspects)

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি (Theoretical Basis) ও ইসলামের প্রতিষ্ঠিত  অর্থ ও শ্রমনীতির সাথে তার সংঘর্ষের বিষয়টি দীর্ঘ পরিসরে আলোচনা করার পর এ পর্যায়ে আমরা কিছু পদ্ধতিগত সংঘাত নিয়ে আলোচনা করবো।

বর্ধিতমুল্যেবিক্রয়

 

ট্রাডিশনাল মার্কেটিংয়ে একটি পণ্য উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছা পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি মধ্যস্বত্বভোগী থাকে। [যেমন, Producer → agent → whole seller → retailer → consumer/ উৎপাদক → এজেন্ট → পাইকার → খুচরা বিক্রেতা → ভোক্তা ] । কিন্তু, মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের বাহারী প্রচারণার সময় গুটিকতেক মধ্যস্বত্ত্বভোগী বিলোপ করার শ্লোগান দিয়ে তারা নিজেরাই ল্টো ডাউনলাইন আপলাইন নাম দিয়ে শত সহস্র মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি করে চলেছে। এই বিপুল সংখ্যক দালাল গোষ্ঠীকে কমিশনের বখরা দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই কোম্পানীকে বর্ধিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে হয়। কিন্তু প্রচলিত পণ্যদ্রব্যের (যেমন চাল, ডাল, তেল, সাবান সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসমূহ) দাম পাবলিকের জানা থাকায় কোম্পানী যদি এসব পণ্য বর্ধিত মূল্যে বিক্রি করে তাহলে পাবলিককে সহজে জালে আটকানো সম্ভব নয়। আবার প্রচলিত বাজারমূল্যে বিক্রি করলে বিপুল সংখ্যক দালাল গোষ্ঠীর মুনাফার পরিমাণ মারাত্মিক ভাবে কমে যায়। ফলে তারা এক অভিনব ফন্দি আঁটে। আরতাহলোএমনসবপণ্যেরপ্যাকেজতৈরীকরাযেগুলোরদামসম্পর্কেসাধারণনগনেরসঠিককোনধারণানেই।এইপ্রক্রিয়ায়সুলভমূল্যেপণ্যবিক্রিরবাহারীপ্রচারণা  বাস্তবে (জনগণেরঅজ্ঞতাকেপুঁজিকরে) মূল্যবহুগুণবাড়িয়েবিক্রিউভয়কূলইরক্ষাকরাযায়।

ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টলেভেল মার্কেটিং শীর্ষক সেমিনারের উপাখ্যানঃ

বাংলাদেশে প্রচলিত মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের একটি কোম্পানী কর্তৃক নাইজেলা নামক তেল বিক্রির ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। গত কয়েক মাস আগে (১১ই জুলাই ‘২০০৯) এদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি এমএলএম কোম্পানী ঢাকা বিজ্ঞান কলেজে  ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংশীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করে। আমি সে সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেমিনারের একটি বিশাল সময় জুড়ে ওলামায়ে কেরামের কূপমন্ডুকতা তুলে ধরে খানিকটা হাস্যরস সৃষ্টির প্রচেষ্টা চলে। পরে মঞ্চে হাজির হন ঐ কোম্পানীর শরীয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুস সোবহান।  প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রশ্ন উঠে “নাইজেলা” প্যাকেজের দাম নিয়ে। প্রথমদিকে অস্বীকার করার চেষ্টা চললেও  পরে অবশ্য স্বীকার করা হয় যে নাইজেলা তেলের এই প্যাকেজটি অনেক চড়া মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। (উল্লেখ্য, মাত্র ৬০০০ টাকার এই প্যাকেজেই কোম্পানী ২৭৭৫ টাকা লাভ করে বলে স্বীকার করা হয়)। দারিদ্র পীড়িত একটি দেশে এতো চড়া মূল্যে পণ্য বিক্রি ইসলামে জায়েজ কিনা – এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা সাহেব বলেন, “জায়েজ, একশ বার জায়েজ”। কিসের ভিত্তিতে জায়েজ – জানতে চাওয়া হলে তিনি দলিল হিসেবে হযরত আলী (রাঃ) এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। ঘটনাটি হলো, আলী (রাঃ) একদিন বাজারে গিয়ে ৬০ দিরহাম দিয়ে একটি ঘোড়া কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে একজন জিজ্ঞাসা করলেন –

পথিক :     ঘোড়া কত দিয়ে কিনলেন ?

আলী (রাঃ) :             ৬০ দিরহাম দিয়ে।

পথিক :     ঘোড়াটি বিক্রি  করবেন ?

আলী (রাঃ) :             করবো ।

পথিক :     দাম কত ?

আলী (রাঃ) :             আমি কিছু বলবো না। আপনার যা খুশি দিয়েন ।

পথিক :     আমি আপনাকে ১২০ দিরহাম দিবো।

আলী (রাঃ) :             ঠিক আছে ।

এরপর মাওলানা সাহেব আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “দেখছেন, মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যে আলী (রাঃ) ৬০ দিরহামে কিনে ১২০ দিরহামে বিক্রি করলেন। অতএব অতিরিক্ত মূল্য ইসলামে জায়েজ।” আমার পিছনের এক লোক বক্র হাসি দিয়ে বলল, “বাহ ! মাওলানা সাহেবের যুক্তির কী বহর ! এখান থেকে অতিরিক্ত মূল্য ধার্যকরার  বৈধতা তো প্রমাণিত হয়ই না; উলটো বরং এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, বিক্রেতা তার পণ্য দ্রব্যের দামই চাইতে পারে না, ক্রেতা খুশী হয়ে যা দিবে তাতেই তার খুশী থাকা উচিত”।

এ পর্যায়ে আমরা পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য হাঁকানো সংক্রান্ত ইসলামী বিধান আলোচনার চেষ্টা করবো। ব্যবসা বানিজ্যের রীতি-নীতি আলচনার এক পর্যায়ে রাসূল (সাঃ) বলেন,

ان التجار يبعثون يوم القيامة فجارا الا من اتقى الله و بر و صدق (الترمذى 1210)

অর্থ্যাৎ, “ব্যবসায়ীদেরকে কিয়ামতের দিন চরম পাপীষ্ঠ হিসেবে উঠানো হবে, তবে ঐ সকল ব্যবসায়ী বাদে যারা আল্লাহকে ভয় করে, সদাচরণ করে এবং সত্য কথা বলে।” (তিরমিযি, হাদীস নং ১২১০)

আল্লাহকে ভয় করার মানে হচ্ছে আল্লাহর দেয়া নির্দেশ সমুহ মেনে চলা। ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর একটি স্থায়ী নির্দেশনা হল- “অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে না খাওয়া”। আল্লাহ বলেন,

يا ايها الذين امنوا لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل (النساء 29)

অর্থ্যাৎ, “হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না” (নিসা, ২৯)

অন্যায়ভাবে” বলতে মূলত এমন সব কারবার কে বুঝানো হয়েছে যা আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ) নিষিদ্ধ করেছেন। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (রহঃ) লিখেন-

باطل طريقوں سے مراد وه تمام طريقے ہيں جو خلاف حق هوں اور شرعا و اخلاقا ناجائز هوں

অন্যায়ভাবে বলতে এখানে এমন সব পদ্ধতির কথা বুঝানো হয়েছে যা সত্য ও ন্যায়নীতি বিরোধী এবং নৈতিক দিক দিয়েও শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয।

(তাফহীমুল কুরআন, সূরা নিসা, টীকা ৫০)

মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থানঃ

স্থানাভাব বশত আমরা ইসলাম কর্তৃক নিষিদ্ধ সব রকম ব্যবসা পদ্ধতি নিয়ে এখানে আলোচনা করছিনা। শুধু কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি যার দ্বারা বুঝা যাবে, রাসূল (সাঃ) আমাদের অর্থনৈতিক জীবনকে যেভাবে ঢেলে সাজাতে চান তার চৌহদ্দির মধ্যে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের কারবার চলতে পারে কি না।

দ্রব্যমূল্য একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকলে স্বল্প আয়ের মানুষের ভোগান্তির অন্ত থাকে না। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দ্রব্যমূল্য ফিক্সড না করে রাসূল (সাঃ) এমন সব কার্যকারণের (factors) উপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন যেগুলোর প্রভাবে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। তন্মধ্যে একটি হল বর্ধিত মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে পণ্যদ্রব্য আটকে রাখা। এ রকম মজুদদারীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে  রাসূল (সাঃ) বলেন-

المحتكر ملعون (ابن ماجة , التجارة , ح 2153)

অর্থ্যাৎ, “অভিশপ্ত সেই ব্যক্তি যে বর্ধিত মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে পণ্য দ্রব্য আটকে রাখে।” (ইবনে মাজাহ, ব্যবসায় অধ্যায়)

দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আরেকটি বিশেষ কারণ হচ্ছে উৎপাদক ভোক্তার মাঝখানে অতিরিক্ত মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি হওয়া। যাদের কাজ হলো অল্প শ্রমে বেশী মুনাফা অর্জন করা। উদ্দেশ্যে তারা উৎপাদক ভোক্তার মাঝখানে অনর্থক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ উৎপাদক কে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌছার সুযোগ দিলে স্বাভাবিক মূল্যেই পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। তাই তারা ভোক্তার কাছে পৌছার আগেই উৎপাদক/ বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কিনে পুনরায় ভোক্তার কাছে অধিক মুনাফা সহকারে বিক্রি করে। ভোক্তা উৎপাদকের মধ্যখানে যত বেশী মধ্যস্বত্ত্বভোগী থাকবে, ভোক্তার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে দ্রব্যমূল্য ক্রমশ ততই বাড়তে থাকবে। এই মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের চক্র ভেঙ্গে দিয়ে জনগণকে অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্য থেকে  মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন যে, “শহরে বসবাসকারী কোন ব্যক্তি শহরের বাইরে থেকে আগত কোন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পণ্য কিনে পুনরায় তা শহরের বাসিন্দাদের কাছে বিক্রি করতে পারবেনা। (نهي رسول الله صلي الله عليه وسلم ان يبيع حاضر لباد سنن ابى داود ح 3439 , سنن الترمذى ح 1222 , سنن ابن ماجة ح 2177)

এ নিষেধাজ্ঞা জারী হওয়ার ফলে শহরের ভিতরে বসবাসরত মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের হালকা পরিশ্রমে অধিক মুনাফা লাভের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। ফলে তাদের একটি গ্রুপ ভিন্ন ফন্দি আঁটলো। তারা শহর থেকে একটু বের হয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। শহরমুখী ব্যবসায়ীর দল দেখতে পেলে আগ বাড়িয়ে তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে শহরের বাসিন্দাদের কাছে পুনরায় বিক্রি করতো। অর্থাৎ তারা আগের তুলনায় খানিকটা বেশী শ্রম দিয়ে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে তাদের মধ্যস্বত্ত্বভোগের কারবার চালিয়ে যাচ্ছিল। এ কথা জানতে পেরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

نهي رسول الله صلي الله عليه وسلم عن تلقي الجلب والركبان (صحيح مسلم ح 1519 , سنن الترمذى ح 1221 )

অর্থাৎ “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহরবাসীকে শহরমুখী ব্যবসায়ীদের সাথে সাক্ষাৎ করে পণ্য কিনে পুনরায় শহরে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন”।

এ দীর্ঘ আলোচনায় এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, ইসলাম দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি অত্যন্ত সিরিয়াসলি নিয়ে থাকে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যারা জনগণকে বর্ধিত মূল্যে পণ্য কিনতে বাধ্য করে  ইসলাম তাদেরকে অভিশপ্ত ঘোষণা করে। বৃহৎ অর্থনীতির অনিবার্য ক্ষেত্র সমূহে কিছু নিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্ত্বভোগীর অনুমতি দিলেও ইসলাম ভোক্তা উৎপাদকের মাঝখানে অযথামধ্যস্বত্ত্বভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর ঘোর বিরোধী।

 

কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের মধ্যস্বত্ত্বভোগী দালালদের বিরাটসংখ্যাটি বিবেচনা করুন। আপনি তাদের কাছ থেকে এই মুহুর্তে একটি পণ্য কিনতে চাইলে আপনার আপলাইনের কয়েক হাজার অনর্থক দালালের জন্য বরাদ্দকৃত কমিশনের অর্থ পরিশোধ করেই আপনাকে কিনতে হবে। অথচ কোম্পানীর পণ্য আপনার কাছে পরিচিত করার জন্য আপনার উর্ধ্বতন একজন দালালই যথেষ্ট ছিল। আর তখন অসংখ্য দালালের কমিশনের বোঝা না থাকার ফলে প্রচলিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে আপনাকে পণ্যটি দেয়া যেতো। অবৈধ মুনাফাখোরীর বাজার গরম করার জন্য কয়েক হাজার অনর্থক দালালমধ্যস্বত্ত্বভোগীর কমিশনের টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে নতুন প্রত্যেকটি ক্রেতাকে। গ্রাম পর্যায়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা গেছে  তাদের অধিকাংশ ক্রেতাই তাদের উর্ধ্বতন অগণিত মধ্যস্বত্ত্বভোগী দালালের কমিশনের কথা কিছুই জানে না। সেক্ষেত্রে তো তা সুস্পষ্ট প্রতারণার শামিল। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, من غش فليس منا  “যে প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত না” (মুসলিম ও তিরমিযি)

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্ধিত মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে তারা এমন সব পণ্য হাজির করে যার স্বাভাবিক দাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানে না। অনেক সময় আন্দাজও করতে পারে না। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে এমন বর্ধিত মূল্যে বিক্রি সম্ভব নয়। কারণ সেগুলোর দাম সম্পর্কে মোটামুটি সবাই সচেতন। প্রকারের কারবারের সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, পণ্যেরমূল্যসম্পর্কেযথাযথজ্ঞাননেইএমনলোকেরকাছেউচ্চমূল্যেপণ্যবিক্রিকরানিঃসন্দেহেএকপ্রকারজুলম

(ইবনে রুশদ, আল কাওয়ায়েদ, পৃষ্ঠা ৬০১)

আর ইবনে জারীর  তাবারী সূরা নিসা’র ২৯ নং আয়াতে “অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ খাওয়া” –‘র ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন-

يا ايها الذين امنوا لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل اى نهى عن اكلهم اموالهم بالباطل اى بالربا و القمار و البخس و الظلم (جامع البيان المعروف ب تفسير الطبرى ج 4, ص 42 )

“হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না” অর্থ্যাৎ, আল্লাহ এ আয়াতের মাধ্যমে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খাওয়াকে নিষিদ্ধ করেছেন। আর “অন্যায় ভাবে”-‘র মানে হলো- সুদ, জুয়া, অতি কম মূল্যে ক্রয় করা ও অতি বেশি মূল্যে বিক্রি করা।

(জামিউল বায়ান, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২)

বিশেষজ্ঞদেরমতামত

 

শ্রমের বহুস্তর সুবিধা (multi level benefit of labour) এক প্রকার জুয়াবাজী। আল্লাহ বলেন,

يا ايها الذين امنوا انما الخمر و الميسر ………. رجس من عمل الشيطان فاجتنبوه لعلكم تفلحون (المائدة 90)

অর্থ্যাৎ, হে ঈমানদাররা! নিঃসন্দেহে মদ, জুয়া …………… নাপাক ও শয়তানী কাজ। অতএব, এগুলো পরিত্যাগ কর; তবেই তোমরা সফল হতে পারবে। (মায়িদাহ ৯০)

ইসলামে যে সকল  কারণে জুয়াবাজী ও লটারী নিষিদ্ধ, তার অন্যতম হচ্ছে অল্প কিছু টাকা ও শ্রম বিনিয়োগ করে অসংখ্য লোকের জমা দেওয়া বিশাল অংকের  টাকা লাভ করা। এ পদ্ধতিতে শ্রমের সাথে ফলের  কোন রকমের সামঞ্জস্যতা নেই (যেমন, ১০ টাকার টিকিটে ৪০ লক্ষ টাকা জেতা)।  তাছাড়া, এর ফলে লক্ষ লক্ষ লোকের অন্তরে (যারা লটারী জিততে পারেনি) ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি হয়। এ সকল কারণে ইসলাম এ সিস্টেমকে অন্যের সম্পদ অন্যায় ভাবে খাওয়ার শামিল করে।

আপলাইনের দালালরা ডাউনলাইনের দালালদের বিক্রি থেকে তত্ত্বাবধানেরনাম দিয়ে যে বিশাল কমিশন ভোগ করে – তাকে সুস্পষ্ট জুয়াবাজী ও “অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ (اكل اموال الناس بالباطل) –এর অন্তর্ভূক্ত করেছেন ইসলামী আইনের পণ্ডিতেরা। এক্ষেত্রে ওআইসি’র ইন্টারন্যাশনাল ফিকহ একাডেমীর চীফ স্কলার প্রফেসর ড. আব্দুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ’র বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য।  তিনি বলেন “…compound brokerage falls under the category of eating up another’s property unjustly and has an element of gambling in it. The main factor that contributes to this is the fact that compound brokerage automatically implies that a portion from the sales of the down line will be channeled to the up line.”

[The Awakening, November 2008; http:// theawakening.blogspot.com/2008]

মালয়েশিয়ার বিশিষ্ট পণ্ডিত জাহারুদ্দিন আব্দুর রহমান মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের আপলাইন কর্তৃক সুদূর-বহুদূর  পর্যন্ত ডাউনলাইনের কমিশন ভোগকে হারাম গণ্য করে বলেন,

“Generally, commission that is earned through sales of goods and services (like brokerage fee) is permissible in Islam. …However the commission in MLM  and pyramid schemes may convert to haram status if (1) sales commission of the network is tied to his/her personal sale….” (2) Commission originates from an unknown down line because the network is too big. As a result, the upline seem to enjoy commission without the need to put any effort. This could be classified as compound brokerage (broker on broker on broker…) which falls under the category of eating up another’s property unjustly and has an element of gambling in it.”

(www.zaharuddin.net)

ইন্টারন্যাশনাল ফিকহ একাডেমী কর্তৃক প্রদত্ত একটি ফতোয়ায় (legal verdict) মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কে হারাম ঘোষণা করে বলা হয়েছে যে, এ সিস্টেমে আপলাইনের দালালদেরকে যে কমিশন দেয়া হয় তা বৈধ দালালীর ফি’র (brokerage fee) অনুরূপ নয়; কারণ এর মধ্যে জুয়াবাজী নিহিত রয়েছে। (…that the commission paid is not like a brokerage fee, because it involves activities similar to gambling) ।

[দেখুন ফতোয়া নং /২৪, ১৭ জুলাই ২০০৩]

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের কমিশন সিস্টেমে কিভাবে জুয়াবাজী ও অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগজড়িয়ে আছে তার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন শেখ সালীম আল হিলালী। তার ভাষায় – “This type of business is pure gambling because the purpose is to develop continuous network of people. With this network, large number of people t the bottom of the pyramid (down line) pays money to a few people at the top (up line). In this scheme, no new wealth is created; the only wealth gained by any participation is wealth lost by other participants. Each new member pays for the chance to profit from payment of others who might join later.”

[The Awakening, November 2008; http:// theawakening.blogspot.com/2008]

আপলাইন কর্তৃক বহু নীচের ডাউনলাইনের (যাকে সে চিনেও না) কমিশন ভোগ করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন জাহারুদ্দিন আব্দুর রহমান –

If the network is too big and the up line does not even know the down line what else to offer assistance, then why should the up line still attain at the expense of the new member?

(www.zaharuddin.net)

শেষকথাঃ

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং সিস্টেমে অনেক ছোট খাটো পদ্ধতিগত (procedural) সমস্যা রয়েছে, যা এ প্রবন্ধে কলেবরের অভাবে আলোচনা করা সম্ভব হল না। তাছাড়া ঐ সমস্যা গুলো খুব একটা মৌলিক পর্যায়ের নয়;  অর্থাৎ চেষ্টা করলেই সেগুলো সংশোধন করে নেয়া যেতে পারে। তবে তার মৌলিক ভিত্তিটি (Theoretical and Substantive basis) হচ্ছে শ্রমের বহুস্তর সুবিধা (multi level benefit of labour) । কোন কোন লেখক এর নাম দিয়েছেন Chain reaction of labour, কেউবা আবার ব্যক্ত করেছেন Chain pyramidal commission কিংবা compound brokerage ইত্যাদি নামে। ইসলামের শ্রমনীতির সাথে “শ্রমের বহুস্তর সুবিধাতত্ত্ব”টির  (Doctrine of multi-level benefit of labour) রয়েছে সরাসরি সংঘর্ষ। তাছাড়া, ইসলাম যে ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যকে যেভাবে বিন্যস্ত করতে চায় এবং সর্বোপরি মানুষের আন্তঃসম্পর্কে যে সহমর্মিতা সৃষ্টি করতে চায় ‘শ্রমের বহুস্তর সুবিধাতত্ত্ব’-র উপর প্রতিষ্ঠিত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং তার ঠিক বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি করে। অতএব এ রকম অর্থ ও শ্রম দর্শনের অবস্থান ইসলামের ভিতরে নয়; বাইরে ।

و الله اعلم بالصواب

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

 “ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং” শীর্ষক বইয়ের পর্যালোচনা

জনাব আতাউর রহমান বঙ্গী তাঁর বইতে (ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) নেটওয়ার্কিং বিজনেসকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য যে সকল প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো এই প্রবন্ধে  পর্যালোচনা করা হলো। প্রমাণভিত্তিক এই সুস্থ বিতর্কের মাধ্যমে পাঠকবর্গ একটি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন বলে আমরা আশা রাখি।

প্রথার  (عرف Custom) আইনগত মর্যাদাঃ

জনাব আতাউর রহমান বঙ্গী তাঁর প্রমাণ সমগ্রে সর্বপ্রথম যে বিষয়টির উপর জোর দিয়েছেন তা হলো প্রথা বা উ’রফ (عرف Custom).অর্থ্যাৎ,দীর্ঘদিন যাবৎ প্রচলিত থাকার কারণে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতি একটি উ’রফ (عرف Custom)-এ পরিণত হয়েছে যার ফলে তা এখন বৈধতার দাবী রাখে। তাঁর ভাষায়,

সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এমএলএম বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতি একটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি শক্তিশালী উরুফ। এবং এই প্রচলিত পদ্ধতিতে আজ পর্যন্ত কোন সংঘাত পরিচালিত হয়নি। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত এমএলএম-এর বিপণন পদ্ধতিতে কুরআন এবং সুন্নাহর এমন কোন বিরোধপূর্ণ মেরুদণ্ড দেখা যায়নি যে সংঘাত অনিবার্য। এতেই প্রমাণিত হয় যে, এমএলএম-এর বিপণন পদ্ধতি একটি বৈধ তরিকা

 

(আতাউর রহমান বঙ্গীঃ ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং, পৃষ্ঠা ২৯)

এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে কথাটি ভালোভাবে বুঝে নেয়া প্রয়োজন তা হলো, মানব জাতির হিদায়াতের (পথ নির্দেশনার) জন্য আল্লাহ যুগে যুগে যে সকল নবী – রাসূল পাঠিয়েছিলেন তাদের প্রত্যেকের মিশন ছিল এই যে তারা আল্লাহ প্রদত্ত ওহীর মাধ্যমে মানুষের গোটা জীবনকে সংশোধন করে দেবেন। তাদের কাউকে কখনো এই মিশন দিয়ে পাঠানো হয়নি যে তারা ঐশী নির্দেশনাগুলোকে সমকালীন জাতির প্রথাসমূহের লেজুর বানিয়ে দেবেন, কিংবা প্রতিষ্ঠিত রীতি-নীতির (Customs and Usages / العرف) সাথে যোগসজশ করে আল্লাহর দ্বীন যতটুকু মানানো যায় ঠিক ততটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকবেন। এর বিপরীতে তাদেরকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, লোকদেরকে সাফ জানিয়ে দাও এই পৃথিবীর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর কাছেই ন্যাস্ত; জীবনের সকল ক্ষেত্রে কেবল তারই নির্দেশ মেনে চলতে হবে। মোদ্দাকথা, আল্লাহর আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের রীতি-নীতি ও প্রথাগুলোকে (Customs and Usages / العرف) সংশোধন করে দেয়া; প্রথার মাধ্যমে সংশোধিত হওয়া নয়।

এখানে একটি সংশয় নিরসন করা প্রয়োজন যা আইনের বইগুলোর একটি মূলনীতি (قاعدة كلية / legal maxim) থেকে তৈরী হয়। নীতিটি হলোঃ

العرف حجة يجب العمل بها

অর্থ্যাৎ, “প্রচলিত প্রথা একটি অবশ্য মান্য দলিল”।

(Custom is a binding proof)

القواعد الفقهية ، د. عبد العزيزمحمد عزام ، دار الحديث ، القاهرة ۲۰۰٥ ص ۱٨۱

পাঠকের মনে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, ওহী যদি প্রচলিত প্রথা (Custom) কে সংশোধন করার জন্যই এসে থাকে, তাহলে প্রচলিত প্রথা (Custom) কী করে একটি অবশ্য মান্য দলিল হতে পারে; কিংবা দু’টি যদি পরস্পর বিরোধী হয় তাহলে কোনটিকে প্রাধান্য দেয়া হবে? এর উত্তর হলো- ওহীর মূল কাজ হচ্ছে প্রচলিত প্রথা (Custom)কে সংশোধন করে দেয়া; অতঃপর ঐ সংশোধিত প্রথাটি মেনে নেয়া লোকদের জন্য বাধ্যতামূলক। এটি ছাড়াও প্রথার আরো দু’টি ধরন রয়েছেঃ (১)ওহীর নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক প্রথা ও (২) ওহীর নির্দেশনার সাথে সংঘর্ষহীন প্রথা। দ্বিতীয় প্রকারের প্রথাও বাধ্যতামূলক। “প্রচলিত প্রথা একটি অবশ্য মান্য দলিল” – শীর্ষক মূলনীতি (قاعدة كلية / legal maxim) টি মূলত এ রকম প্রথার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।  আর প্রথম প্রকারের প্রথার সাথে ইসলামের কোন রকম আপোষ নেই। কারণ, এই ধরণের প্রথার প্রকোপ থেকে গণমানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। একদিকে ইসলামের অনুসারী হওয়ার দাবী করা এবং অন্যদিকে ঐ প্রথাকে বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নেয়া কিংবা তা সংশোধনের প্রচেষ্টা অব্যাহত না রাখা নিঃসন্দেহে একপ্রকার ভণ্ডামি। মনে রাখতে হবে, নির্বিচারে সকল প্রথা কোনক্রমেই হালাল হওয়ার দলিল নয়। কারণ, পৃথিবীতে প্রত্যেকটি অপরাধ ও অনৈতিক কাজই প্রথা আকারে বিদ্যমান। আল্লামা সারাখসী লিখেছেন,

كل عرف ورد بخلاف الشرع فهو غير معتبر

অর্থাৎ, “শরীয়তের পরিপন্থী কোন প্রথা-ই গ্রহনযোগ্য নয়।”

(Any custom inconsistent with the Shariah is unacceptable.)

المبسوط للسرخسى ۱۰∕١٩٦   , اثر العرف للدكتور سيد صالح ص۲۰٥،۲۰٦ , القواعد الفقهية , د. عبد العزيزمحمد عزام , دار الحديث , القاهرة ۲۰۰٥ ص ۱٨٥

ডঃ আব্দুল আজিজ আযযাম এর ব্যাখায় লিখেছেন,

العرف لا يكون معتبرا فى التشريع اذا خالف النص الشرعى بمعنى ان لا يكون ما تعارف عليه الناس مخالفا للاحكام الشرعية كما لو تعارف الناس شرب الخمر و لعب الميسر و خروج النساء كاشفات عن بعض اجسامهن مما يجب ستره شرعا و غير هذا من المخالفات التى درج عليها الناس فى مختلف العصور فان مثل هذا العرف يكون عرفا فاسدا و يحكم عليه بالبطلان و عدم الاعتبار لمخالفته للشرع الشريف

(القواعد الفقهية ، د. عبد العزيزمحمد عزام ، دار الحديث ، القاهرة ۲۰۰٥ ص ۱٨٥)

অতএব, একটি প্রথা বা উ’রফ (عرف Custom) কত দীর্ঘ সময় ধরে সমাজে চালু আছে তা বিবেচ্য বিষয় নয়। সর্বাগ্রে যে বিষয়টি  পর্যালোচনা করা জরুরী তা হলো- ঐ প্রথাটি কুরআন-সুন্নাহর কোন নীতির পরিপন্থী কি না। কুরআন-সুন্নাহর কোন নীতির পরিপন্থী হলে দীর্ঘ সময় ধরে সমাজে চালু  থাকার অজুহাতে তা বৈধ হয়ে যায় না। বরং তখন বুঝে নিতে হবে যে, দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকার সুবাধে এ প্রথাটি একটি শক্তিশালী কুপ্রথায় পরিণত হয়েছে-যার জঞ্জাল থেকে সমাজ দেহকে মুক্ত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো আশু কর্তব্য হয়ে দাড়িয়েছে।

দ্বিতীয় যে প্রমাণটি তিনি ব্যবহার করেছেন তাও ইসলামী আইনের আরেকটি মূলনীতি ( قاعدة كلية / legal maxim)। আর তা হলোঃ

الضرورات تبيح المحظورات

“প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে বৈধ করে দেয়।”

(Necessity knows no law)

(الاشباه و النظائر للسيوطى ص 83 ، الاشباه و النظائر لابن نجيم ص 85 ، مجلة الاحكام العدلية لعلماء استانة  مادة 21 ، الوجيز فى ايضاح قواعد الفقه الكلية للدكتور محمد صدقى بن احمد البورنو ، الطبعة الثانية ، مكتبة المعارف ، الرياض 1989 ، ص 175 )

 “জরুরতের দৃষ্টিতে এমএলএম” শিরোনামে তিনি লিখেছেন,

এমএলএম পদ্ধতি বিপণন প্রক্রিয়া উন্নত বিশ্বে এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নেরস্মারক হিসাবে কাজ করছে। আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই হচ্ছে ইহকালিন মানুষের চালিকা শক্তি। অর্থনৈতিক কারণে দেখা যাচ্ছে আজ কোথাও ধর্ম কর্মই স্থবির হয়ে পরছে। জরুরতের কারণে অনেক সময় কঠিন হওয়া সত্ত্বেও দুর্বল দলিল পেশ করে মানুষের কল্যানের কারণে সহজ করে দেয়া হয়।

অর্থনৈতিক যেহেতু সবার জন্যই জরুরী সেহেতু জাতি বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকল শ্রেণী মানুষের সম্পৃক্ততা বিবেচনা করে এমএলএম পদ্ধতি বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং-এর বিপণন পদ্ধতির ক্ষেত্রেও দুর্বল মত বা অন্যান্য মাযহাবের মত গ্রহণ করা যেতে পারে।

(পৃষ্ঠা, ৩০)

 

তিনটি কঠিন শর্ত পূরণসাপেক্ষেই কেবল একটি নিষিদ্ধ কাজ সিদ্ধ হয়ঃ

প্রত্যেকটি কাজই তো কোনো না কোনো প্রয়োজনের প্রেক্ষিতেই করা হয়। মানুষ কি প্রয়োজন ছাড়া কোনো কাজ করে? এ কথাটি মাথায় রেখে যখন কোন ব্যাক্তি প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে বৈধ করে দেয় (الضرورات تبيح المحظورات)-শীর্ষক মূলনীতিটির দিকে তাকায়, অমনিই সে ভাবতে থাকে প্রয়োজন যদি সব নিষিদ্ধ কাজকে  বৈধ করে দেয় তাহলে আইনের আর কী প্রয়োজন; কিংবা এ নীতি চলতে থাকলে  কোন কাজটি শেষ পর্যন্ত আর নিষিদ্ধ থাকছে?

এর উত্তর হচ্ছে, প্রয়োজন দেখা দিলেই একটি নিষিদ্ধ কাজ সিদ্ধ হয়ে যায় না।প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে বৈধ করে দেয় (الضرورات تبيح المحظورات) মূলনীতিটি প্রয়োগ করার জন্য তিনটি পূর্বশর্ত পূরণ করতে হয়। কোরআনের যে আয়াত থেকে এ মূলনীতিটি বের করা হয়েছে তাতেই ঐ তিনটি শর্তের উল্লেখ রয়েছে। আয়াতটি হলো,

فمن اضطر غير باغ و لا عاد فلا اثم عليه (البقرة ١٧۳)

অর্থ্যাৎ, “তবে যে ব্যক্তি অক্ষমতার মধ্যে অবস্থান করে আইন ভংগ করার কোন প্রেরণা ছাড়াই প্রয়োজনের সীমা না পেরিয়ে এ নিষিদ্ধ জিনিসগুলোর মধ্য থেকে কোনটা খায়, সে জন্য তার গোনাহ হবে না।”

(বাকারা, ১৭৩)

এ আয়াতের অনুবাদের রেখাচিহ্নিত অংশ থেকেই তিনটি শর্ত পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে। আর তা হলোঃ

(১) যথার্থ অক্ষমতা (যেমন ক্ষুধা বা পিপাসা প্রাণ সংহারক প্রমাণিত হতে থাকা এবং এ অবস্থায় হারাম জিনিস ছাড়া আর কিছু না পাওয়া যাওয়া);

(২) মনের মধ্যে আল্লাহর আইন ভংগ করার ইচ্ছা পোষণ না করা; এবং

(৩) প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করা (যেমন কোন হারাম পানীয়ের কয়েক ঢোক পান করলে অথবা হারাম খাদ্যের কয়েক মুঠো খেলে যদি প্রাণ বাঁচে তাহলে তার বেশী ব্যবহার না করা)।

আল্লামা রশীদ রেজা এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন,

فمن اضطر الى الاكل مما ذكر بان لم يجد ما يسد به رمقه سواه غير باغ له اى غير طالب له ، راغب فيه لذاته و لا عاد متجاوز قدر الضرورة

(تفسير المنار للسيد محمد رشيد رضا ، دار المنار ، الطبعة الثانية ، القاهرة 1947 ، ج 2 ص 98)

অতএব প্রয়োজন দেখা দিলেই কোন নিষিদ্ধ কাজ বৈধ হয়ে যায় না; বরং বৈধতার জন্য তিনটি কঠিন শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তদুপরি সে বৈধতা সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়; কেবল সে ব্যক্তিই এর সুবিধা পেতে পারে যে উক্ত অবস্থার ভুক্তভোগী।

বর্তমানে কোন ব্যক্তি যদি যথার্থই অক্ষম, অসচ্ছল ও নিরুপায় হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য কেবল এমএলএম বিজনেস কেন তার চেয়েও গুরুতর পন্থা অবলম্বন করার রাস্তা খোলা আছে। কিন্তু একটি কাজ অবৈধ প্রমাণিত হলে অনন্যোপায় ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য শিথিলতাকে ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সকলের জন্য বৈধতার গণ সার্টিফিকেট বানিয়ে নেওয়া কোনক্রমেই সঠিক নয়।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে বড় ত্রুটি

 

“কমিশন ও চেইন পিরামিডাল কমিশনের মধ্যকার সূক্ষ্ণ পার্থক্য”-টি মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের বৈধতার প্রবক্তাদের বেশীর ভাগেরই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। ইসলামে কমিশনের জন্য যে বৈধতা রয়েছে তা তারা কোনরকম চিন্তা ভাবনা না করেই চেইন পিরামিডাল কমিশনের মধ্যেও প্রয়োগ করে দিচ্ছেন। আর তাদের মধ্য থেকে হাতে গোনা যে ক’জন “কমিশন ও চেইন পিরামিডাল কমিশনের মধ্যকার সূক্ষ্ণ পার্থক্য”-টি ধরতে পেরেছেন তারাও দলিল-প্রমাণ ও তাত্ত্বিক যুক্তি প্রয়োগ ছাড়াই কোন রকম গোজামিল দিয়ে চেইন পিরামিডাল কমিশনকেও বৈধ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন।

এ বিষয়টি ভালোভাবে বুঝার জন্য আমি আমার পূর্বেকার প্রবন্ধ (“মাল্টি লেভেল মার্কেটিংবৈধতার সংকট”) থেকে কিছু নির্বাচিত অংশ এখানে উল্লেখ করে দিচ্ছি।

মাল্টিলেভেল মার্কেটিং মূলত ডিস্ট্রিবিউটরদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য সেবা বিক্রি করার একটি প্রক্রিয়া (A process of selling of goods and services through a network of distributors) প্রক্রিয়ায় আপলাইন ডাউনলাইন নামে বহু স্তরের (Multi level) ডিস্ট্রিবিউটর তৈরি হয়।

ডাউনলাইনের কোন ব্যক্তি (চাই সে এক হাজার স্তর নিচের ডিস্ট্রিবিউটর হোক এবং সর্বোচ্চ আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটর তাকে নাই বা চিনুক) কর্তৃক বিক্রিত পণ্যদ্রব্যের একটি কমিশন আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটররা পেয়ে থাকে। এই  স্ট্রাকচারটি দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো।

 

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর পদ্ধতি (procedure) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের হলেও এর তত্ত্বগত ভিত্তিটি (theoretical basis) সবসময়ই এক রকম। আর তা হলো, নিম্ন লেভেলের ডিস্ট্রিবিউটর কর্তৃক বিক্রিত পণ্যের একটি কমিশন সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া। এই নীতিটি ইসলামের সাথে কতটা সাংঘর্ষিক তা বুঝার জন্য ইসলামের শ্রম নীতিটি প্রথমে ভালোভাবে বুঝে নেয়া প্রয়োজন।  সূরা নাজমের ৩৯ নং আয়াতটি (وان ليس للانسان الا ما سعي  অর্থাৎ মানুষ ঠিক ততো টুকুরই ফল পাবে যততুকু  সে নিজে করেছে) শ্রমনীতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। এর পরের আয়াতে বলা হচ্ছে (لا تزر وازرة وزر اخري  অর্থাৎ একজন আরেকজনের বোঝা বহন করবেনা) দুটি আয়াত অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির আয় দায় (income and liability) সবসময় ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তবে, শরীয়ত প্রণেতা নিজেই অন্যান্য আয়াত হাদীসে সাধারণ নীতিটির (general principle) কয়েকটি ব্যতিক্রম (exceptions) উল্লেখ করে দিয়েছেন। তন্মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধনী লোকদের সম্পদে অভাবী মানুষের অধিকার এবং আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে সদকায়ে জারিয়া, গোনাহে জারিয়া জীবিত লোক কর্তৃক কোন ভালো কাজের সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পাঠানো (ঈসালে সওয়াব) অন্যতম। এখানে উল্লেখ্য যে, শরীয়ত প্রণেতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সকল ব্যতিক্রম উল্লেখ করেছেন সেগুলো বাদ দিলে সুরা নাজমের ৩৯ নং আয়াতটি ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা শ্রমনীতির একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি (established rule)

 

নাজমের ৩৯ নং আয়াত থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, মানুষ কেবল তার নিজের শ্রমের প্রত্যক্ষ ফল লাভের অধিকারী। কারো নিযুক্ত কর্মচারী** না হলে একজন আরেকজনের শ্রমের ফলে অংশীদার হতে পারেনা। একই ভাবে মানুষ তার শ্রমের ফল কেবল নিকটবর্তী লেভেল থেকেই আশা করতে পারে; কোন ক্রমেই তা বহুস্তর (multi level) পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারেনা ইসলামের এই নীতিটি মানবীয় বুদ্ধি বিবেচনার সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। এমনকি যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করেনা, তারাও অবচেতন ভাবে এই নীতিটি অনুসরণ করে চলছে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার ভাবে বুঝা যাবে।

 

**কারণ ক্ষেত্রে মূল মালিক বেতন ভাতা দিয়ে কর্মচারীর শ্রম টুকু কিনে নেয়। ফলশ্রুতিতে শ্রমের ফলের উপর মালিকের অধিকার জন্মায়। পক্ষান্তরে ডাউনলাইনের কোন ডিস্ট্রিবিউটর (বিশেষ করে অনেক নিম্ন পর্যায়ের) আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটরদের বেতনভুক কর্মচারী (paid employee) নয়।

 

মানুষ সামাজিক জীব (social being) কথাটির পেছনে মানবিকতার তুলনায় অসহায়ত্বের দিকটিই প্রবল। অর্থাৎ, মানুষ পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় প্রাণী। তার এই অসহায়ত্ব তাকে বাধ্য করে সামষ্টিক জীবনযাপন করতে। তার পরিধেয় এক টুকরো বস্ত্রের পেছনে অসংখ্য বনী আদমের শ্রম জড়িত। অগণিত লোকের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ পরিশ্রমের ফলে এক মুঠো ভাত তার খাবার প্লেটে হাজির হয়। এক কথায়, মানুষ তার মৌলিক প্রয়োজনের একটিও অসংখ্য মানুষের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ শ্রম ছাড়া পূরণ করতে পারেনা। এখন একজন ব্যক্তি কতজন লোককে পারিশ্রমিক দিতে নীতিগতভাবে বাধ্যমানবীয় সুস্থ বিবেক বলছে তাকে কেবল ব্যক্তির পারিশ্রমিক দিতে বাধ্য করা যেতে পারে, যে তার পেছনে প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়েছে; পরোক্ষ শ্রম নয়। আর এই নীতিটিই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে সুরা নাজমের ৩৯ নং আয়াতটিতে (وان ليس للانسان الا ما سعي  অর্থাৎ মানুষ ঠিক ততো টুকুরই ফল পাবে যা সে নিজে করেছে)

একজন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক তার প্রত্যক্ষ শ্রমের ফল দাবী করতে পারে, যা সাধারণত তাকে বেতন আকারে প্রদান করা হয়। কিন্তু কোন চুক্তি মূলে শিক্ষকের দাবী বৈধ হিসাবে বিবেচিত হতে পারেনা যে, তার ছাত্ররা যত জনকে শিক্ষিত করে কর্মক্ষম করে তুলবে এবং তারা ভবিষ্যতে যাদেরকে যোগ্য করে তুলবে তাদের প্রত্যেকের আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ উর্ধ্বতন শিক্ষককে কমিশন আকারে দিতে হবে।

 

বলুন তো দেখি, শ্রমের বহুস্তর সুবিধাকে (multi level benefit of labour) মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে বৈধ নির্দোষ মনে করা হলে শিক্ষক সম্প্রদায়ের উক্ত দাবীকে কেন মেনে নেয়া হবেনা ? পৃথিবীর কোন সভ্য সুস্থ মনের অধিকারী জাতি এমন উদ্ভট দাবী মেনে নিবে বলে আমার মনে হয়না। কারণ নীতির ফলাফল তখন কেবল শিক্ষক সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেনা। একই রকম দাবী উঠতে থাকবে কুলি, মজুর, শ্রমিক, ডাক্তার, প্রকৌশলীএক কথায় শ্রমজীবি মানুষের প্রতিটি সেক্টর থেকেই। কারণ ইতোপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানব সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিই অসংখ্য মানুষের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ শ্রমের উপর নির্ভরশীল। ঠাণ্ডা মাথায় একবার ভেবে দেখুনতো, সমাজের প্রতিটি সেক্টর থেকে এরকম দাবী উঠতে থাকলে আমাদের সামগ্রিক জীবনে কী ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে ? আর  যদি বলা হয় শ্রমের বহুস্তর সুবিধাকে (multi level benefit of labour) সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবেনা, তাহলে জিজ্ঞাস্য হচ্ছে এই সীমিতকরণ হবে কিসের ভিত্তিতেবিশেষ করে সব ক্ষেত্রেই যখন আমরাশ্রমের খেলা’- দেখতে পাচ্ছি ?  

 

এতোক্ষণের আলোচনায় বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে শ্রমের বহুস্তর সুবিধা (multi level benefit of labour) কিছুতেই বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারেনা। অথচ অবৈধ নীতিটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ভিত্তি (theoretical basis) ভিত্তি সরিয়ে ফেললে প্রকারের বিজনেস টিকে থাকতে পারে না।

 

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং  শ্রমের বহুস্তর সুবিধা (multi level benefit of labour) তত্ত্বটি কিভাবে জড়িয়ে আছে অংশে আমরা তা আলোচনা করবো।

 

আমি কোন সাধারণ কোম্পানী থেকে পণ্য কিনে অপরজনের কাছে বিক্রির মাধ্যমে লাভবান হওয়ার বৈধ অধিকার রাখি। অনুরূপ ভাবে কোন ক্রেতা সংগ্রহ করে দেয়ার মাধ্যমে কোম্পানীর কাছ থেকে দালালীর কমিশন (brokerage fee) নেয়ার অধিকারও আমার রয়েছে। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই আমার প্রত্যক্ষ শ্রম জড়িয়ে আছে। ফলে, আমি আমার প্রত্যক্ষ শ্রমের প্রত্যক্ষ সুবিধা নিকটতম স্তর থেকে একবারই পাওয়ার অধিকার রাখি। কিন্তু, মাল্টি লেভেল মার্কেটিং একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট ভ্যালুর পণ্য কিনে আমি দালালীর অধিকার অর্জন করি যা বাস্তবায়ন করতে আমাকে প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়ে নতুন ক্রেতা সংগ্রহ করতে হয়। অতএব, আমি ব্যক্তিগত ভাবে যত বেশী ক্রেতা সংগ্রহ করতে পারবো ঠিক ততজনের কমিশন লাভের বৈধ অধিকার রাখি; কিন্তু কোন ক্রমেই আমার প্রত্যক্ষ শ্রম স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সুদূরবহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারেনা অথচ মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে তা ঘটে চলছে। অর্থাৎ, আমি যদি কাউকে নিয়োগ দেই তাহলে তার মাধ্যমে সৃষ্ট তার নিম্ন পর্যায়ের (তা হাজার মাইল লম্বা হলেও) সমস্ত নতুন চুক্তির প্রত্যেকটির সুবিধা আমি কমিশন আকারে পেতে থাকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে আমার ডাউনলাইন এতোদূর বিস্তৃত হয়ে পড়েছে যাদের পেছনেতথাকথিত তত্ত্বাবধানব্যতীত আমার কোন প্রত্যক্ষ শ্রম (direct labour) নেই; এমনকি তাদের সাথে আমার কোন পরিচয়ও নেই।

 

প্রত্যেক পক্ষই নিজের ইনকামের নিরংকুশ মালিক; এক পক্ষের ইনকামে (কিংবা তা থেকে ভবিষ্যতে উদ্ভূত কোন আয়ে) অপর পক্ষের কোন রকম লেজ লাগানো নেই। এখান থেকেও একই কথা প্রমাণিত হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার শ্রমের একস্তর সুবিধা (uni-level benefit) নিকটতম স্তর (nearest level) থেকেই পেয়ে থাকে; বহুস্তর (multi-level) থেকে নয়।

 

বিষয়টি মাথায় রেখে এবার  মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের প্রতিদান স্কীম (remuneration scheme) টি পর্যালোচনা করা যাক। সিস্টেমের সর্বোচ্চ চূড়ায় রয়েছে কিছু রাঘব বোয়াল যারা প্রথম দিককার সদস্য। এরপর থেকে যারাই এর সাথে যুক্ত হতে চেয়েছে তাদের প্রত্যেককে বিদ্যমান রাঘব বোয়ালদের রেফারেন্স ** সাপেক্ষেই পণ্য কিনতে (বা দালালির অধিকার নিতে) বাধ্য করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ, উচ্চতর দালালের অধীনস্ততা না মেনে সরাসরি কোম্পানির  দালাল হওয়ার রাস্তা খোলা রাখা হয়নি। কারণ,তখন উচ্চতর রাঘব বোয়ালদের বসে বসে কিংবা তথাকথিত তত্ত্বাবধানেরনামে কোটি কোটি টাকা কামানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া, তখন তাদেরকেও সবসময় সরাসরি পণ্য বিক্রয়ের (direct selling of goods) কঠোর শ্রম দিতে হয়। নামকাওয়াস্তে তত্ত্বাবধাননামক শ্রমের মাধ্যমে (তাও আবার অনেক ক্ষেত্রে কাল্পনিক/imaginary) কোটি কোটি টাকা কামানোর সুযোগ থাকলে সরাসরি পণ্য বিক্রয়ের (direct selling of goods) কঠোর শ্রম দিয়ে মাসে মাত্র কয়েক হাজার টাকা ইনকাম করতে যায় কোন বোকা! কারণ, ডাউনলাইন নিজের অর্থগৃধ্নু মানসিকতায় যথাযথ সচেতন হলে তাদের শ্রমেই দালালচক্রের সংখ্যা বাড়তে থাকে যার কমিশন অনায়াসে আপলাইনের উস্তাদদের কাছে পৌঁছে যায়। এখানে একটি সরল প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলাম শ্রম পারিশ্রমিকের মধ্যে যে সুমহান ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করেছে তার অধীনে রকম মতলববাজীর স্থান থাকতে পারে কি ?

 

বিশেষজ্ঞদেরমতামত

পলাইনের দালালরা ডাউনলাইনের দালালদের বিক্রি থেকে তত্ত্বাবধানেরনাম দিয়ে যে বিশাল কমিশন ভোগ করেতাকে সুস্পষ্ট জুয়াবাজী অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ (اكل اموال الناس بالباطل) এর অন্তর্ভূক্ত করেছেন ইসলামী আইনের ণ্ডিতেরা। এক্ষেত্রে ওআইসি ন্টারন্যাশনাল ফিকহ একাডেমীর চীফ স্কলার প্রফেসর . আব্দুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য।  তিনি বলেন “…compound brokerage falls under the category of eating up another’s property unjustly and has an element of gambling in it. The main factor that contributes to this is the fact that compound brokerage automatically implies that a portion from the sales of the down line will be channeled to the up line.”

[The Awakening, November 2008; http:// theawakening.blogspot.com/2008]

 

 

মালয়েশিয়ার বিশিষ্ট ণ্ডি জাহারুদ্দিন আব্দুর রহমান মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের আপলাইন কর্তৃক সুদূরবহুদূর  পর্যন্ত ডাউনলাইনের কমিশন ভোগকে হারাম গণ্য করে বলেন,

“Generally, commission that is earned through sales of goods and services (like brokerage fee) is permissible in Islam. …However the commission in MLM  and pyramid schemes may convert to haram status if (1) sales commission of the network is tied to his/her personal sale….” (2) Commission originates from an unknown down line because the network is too big. As a result, the upline seem to enjoy commission without the need to put any effort. This could be classified as compound brokerage (broker on broker on broker…) which falls under the category of eating up another’s property unjustly and has an element of gambling in it.”

(www.zaharuddin.net)

 

ইন্টারন্যাশনাল ফিকহ একাডেমী কর্তৃক প্রদত্ত একটি ফতোয়ায় (legal verdict) মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কে হারাম ঘোষণা করে বলা হয়েছে যে, সিস্টেমে আপলাইনের দালালদেরকে যে কমিশন দেয়া হয় তা বৈধ দালালীর ফি (brokerage fee) অনুরূপ নয়; কারণ এর মধ্যে জুয়াবাজী নিহিত রয়েছে। (…that the commission paid is not like a brokerage fee, because it involves activities similar to gambling)      

[দেখুন ফতোয়া নং /২৪, ১৭ জুলাই ২০০৩]

 

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের কমিশন সিস্টেমে কিভাবে জুয়াবাজী অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগজড়িয়ে আছে তার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন শেখ সালীম আল হিলালী। তার ভাষায় – “This type of business is pure gambling because the purpose is to develop continuous network of people. With this network, large number of people t the bottom of the pyramid (down line) pays money to a few people at the top (up line). In this scheme, no new wealth is created; the only wealth gained by any participation is wealth lost by other participants. Each new member pays for the chance to profit from payment of others who might join later.”

[The Awakening, November 2008; http:// theawakening.blogspot.com/2008]

 

আপলাইন কর্তৃক বহু নীচের ডাউনলাইনের (যাকে সে চিনেও না) কমিশন ভোগ করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন জাহারুদ্দিন আব্দুর রহমান

If the network is too big and the up line does not even know the down line what else to offer assistance, then why should the up line still attain at the expense of the new member?

(www.zaharuddin.net) ”

মধ্যস্বত্ত্বভোগীর রকমফের

 

জনাব বঙ্গী মধ্যস্বত্বভোগী বিলোপসাধনের মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের বাহারী প্রচারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখেছেনঃ

 “যা হোক মূলকথা হলো এই ব্যবসা পদ্ধতির বিষয় বস্তু পণ্য উৎপাদক থেকে ক্রেতা সাধারণের হাতে মধ্য স্বত্ত্বভোগীদেরকে বাদ দিয়ে সহজে পণ্য সামগ্রি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। আর ইসলামিক অর্থনীতিতেও মধ্যস্থভোগীদেরকে নিরোৎসাহিত করা হয়েছে এবং একথাও বলা হয় যে, পণ্য উৎপাদক যখন তার পণ্য নিয়ে বাজারে বা বিক্রয় করতে যাবে তখন তোমরা কেউ তা আগ বাড়িয়ে মধ্যস্বত্ত্বভোগী সেজে ক্রয় করে বেশী দামে বিক্রি না করার জন্য।

তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে লিখেছেন,

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন

عن ابى هريرة رضى الله عنه قال نهى النبى صلى الله عليه و سلم عن التلقى و ان يبيع حاضر لباد-

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-বণিকদের সঙ্গে বা ব্যবসায়ীদের সাথে পূর্বে সাক্ষাৎ করা এবং গ্রামবাসীদের পক্ষে শহরবাসীর বিক্রয় করা নিষেধ করেছেন। (বুখারী শরীফ-৪/৭০, হাদীস নং-২০২৩)

 

কারণ মধ্যস্বত্বভোগিরা যে টাকা বেশি পেয়ে বিক্রি করে তা যদি উৎপাদক সরাসরি বেশি দামে বিক্রি করতে পারে তাহলে উৎপাদক আরো বেশি উৎসাহি হয়ে পণ্য উৎপাদনে মনোযোগী হবে। এতে করে ক্রেতা সাধারণও লাভবান হয়।

( পৃষ্ঠা ২২)

আমার পূর্ব প্রবন্ধেই (“মাল্টি লেভেল মার্কেটিংবৈধতার সংকট”) এর আসল রূপ বিশ্লেষণ করে আমি লিখেছিলামঃ

 

ট্রাডিশনাল মার্কেটিংয়ে একটি পণ্য উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছা পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি মধ্যস্বত্বভোগী থাকে। [যেমন, Producer → agent → whole seller → retailer → consumer/ উৎপাদকএজেন্টপাইকারখুচরা বিক্রেতাভোক্তা ] কিন্তু, মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের বাহারী প্রচারণার সময় গুটিকতেক মধ্যস্বত্ত্বভোগী বিলোপ করার শ্লোগান দিয়ে তারা নিজেরাই ল্টো ডাউনলাইন আপলাইন নাম দিয়ে শত সহস্র মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি করে চলেছে। এই বিপুল সংখ্যক দালাল গোষ্ঠীকে কমিশনের বখরা দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই কোম্পানীকে বর্ধিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে হয়। কিন্তু প্রচলিত পণ্যদ্রব্যের (যেমন চাল, ডাল, তেল, সাবান সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসমূহ) দাম পাবলিকের জানা থাকায় কোম্পানী যদি এসব পণ্য বর্ধিত মূল্যে বিক্রি করে তাহলে পাবলিককে সহজে জালে আটকানো সম্ভব নয়। আবার প্রচলিত বাজারমূল্যে বিক্রি করলে বিপুল সংখ্যক দালাল গোষ্ঠীর মুনাফার পরিমাণ মারাত্মিক ভাবে কমে যায়। ফলে তারা এক অভিনব ফন্দি আঁটে। আরতাহলোএমনসবপণ্যেরপ্যাকেজতৈরীকরাযেগুলোরদামসম্পর্কেসাধারণনগনেরসঠিককোনধারণানেই।এইপ্রক্রিয়ায়সুলভমূল্যেপণ্যবিক্রিরবাহারীপ্রচারণা  বাস্তবে (জনগণেরঅজ্ঞতাকেপুঁজিকরে) মূল্যবহুগুণবাড়িয়েবিক্রিউভয়কূলইরক্ষাকরাযায়।

 

দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আরেকটি বিশেষ কারণ হচ্ছে উৎপাদক ভোক্তার মাঝখানে অতিরিক্ত মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি হওয়া। যাদের কাজ হলো অল্প শ্রমে বেশী মুনাফা অর্জন করা। উদ্দেশ্যে তারা উৎপাদক ভোক্তার মাঝখানে অনর্থক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ উৎপাদক কে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌছার সুযোগ দিলে স্বাভাবিক মূল্যেই পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। তাই তারা ভোক্তার কাছে পৌছার আগেই উৎপাদক/ বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কিনে পুনরায় ভোক্তার কাছে অধিক মুনাফা সহকারে বিক্রি করে। ভোক্তা উৎপাদকের মধ্যখানে যত বেশী মধ্যস্বত্ত্বভোগী থাকবে, ভোক্তার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে দ্রব্যমূল্য ক্রমশ ততই বাড়তে থাকবে। এই মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের চক্র ভেঙ্গে দিয়ে জনগণকে অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্য থেকে  মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন যে, “শহরে বসবাসকারী কোন ব্যক্তি শহরের বাইরে থেকে আগত কোন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পণ্য কিনে পুনরায় তা শহরের বাসিন্দাদের কাছে বিক্রি করতে পারবেনা। (نهي رسول الله صلي الله عليه وسلم ان يبيع حاضر لباد سنن ابى داود ح 3439 , سنن الترمذى ح 1222 , سنن ابن ماجة ح 2177)

 

নিষেধাজ্ঞা জারী হওয়ার ফলে শহরের ভিতরে বসবাসরত মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের হালকা পরিশ্রমে অধিক মুনাফা লাভের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। ফলে তাদের একটি গ্রুপ ভিন্ন ফন্দি আঁটলো। তারা শহর থেকে একটু বের হয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। শহরমুখী ব্যবসায়ীর দল দেখতে পেলে আগ বাড়িয়ে তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে শহরের বাসিন্দাদের কাছে পুনরায় বিক্রি করতো। অর্থাৎ তারা আগের তুলনায় খানিকটা বেশী শ্রম দিয়ে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে তাদের মধ্যস্বত্ত্বভোগের কারবার চালিয়ে যাচ্ছিল। কথা জানতে পেরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

نهي رسول الله صلي الله عليه وسلم عن تلقي الجلب والركبان (صحيح مسلم ح 1519 , سنن الترمذى ح 1221 )

অর্থাৎরাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহরবাসীকে শহরমুখী ব্যবসায়ীদের সাথে সাক্ষাৎ করে পণ্য কিনে পুনরায় শহরে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন

দীর্ঘ আলোচনায় বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, ইসলাম দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি অত্যন্ত সিরিয়াসলি নিয়ে থাকে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যারা জনগণকে বর্ধিত মূল্যে পণ্য কিনতে বাধ্য করে  ইসলাম তাদেরকে অভিশপ্ত ঘোষণা করে। বৃহৎ অর্থনীতির অনিবার্য ক্ষেত্র সমূহে কিছু নিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্ত্বভোগীর অনুমতি দিলেও ইসলাম ভোক্তা উৎপাদকের মাঝখানে অযথামধ্যস্বত্ত্বভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর ঘোর বিরোধী।

 

কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের মধ্যস্বত্ত্বভোগী দালালদের বিরাটসংখ্যাটি বিবেচনা করুন। আপনি তাদের কাছ থেকে এই মুহুর্তে একটি পণ্য কিনতে চাইলে আপনার আপলাইনের কয়েক হাজার অনর্থক দালালের জন্য বরাদ্দকৃত কমিশনের অর্থ পরিশোধ করেই আপনাকে কিনতে হবে। অথচ কোম্পানীর পণ্য আপনার কাছে পরিচিত করার জন্য আপনার উর্ধ্বতন একজন দালালই যথেষ্ট ছিল। আর তখন অসংখ্য দালালের কমিশনের বোঝা না থাকার ফলে প্রচলিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে আপনাকে পণ্যটি দেয়া যেতো। অবৈধ মুনাফাখোরীর বাজার গরম করার জন্য কয়েক হাজার অনর্থক দালালমধ্যস্বত্ত্বভোগীর কমিশনের টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে নতুন প্রত্যেকটি ক্রেতাকে। গ্রাম পর্যায়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা গেছে  তাদের অধিকাংশ ক্রেতাই তাদের উর্ধ্বতন অগণিত মধ্যস্বত্ত্বভোগী দালালের কমিশনের কথা কিছুই জানে না। সেক্ষেত্রে তো তা সুস্পষ্ট প্রতারণার শামিল। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, من غش فليس منا  “যে প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত না” (মুসলিম তিরমিযি)

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্ধিত মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে তারা এমন সব পণ্য হাজির করে যার স্বাভাবিক দাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানে না। অনেক সময় আন্দাজও করতে পারে না। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে এমন বর্ধিত মূল্যে বিক্রি সম্ভব নয়। কারণ সেগুলোর দাম সম্পর্কে মোটামুটি সবাই সচেতন। প্রকারের কারবারের সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, পণ্যেরমূল্যসম্পর্কেযথাযথজ্ঞাননেইএমনলোকেরকাছেউচ্চমূল্যেপণ্যবিক্রিকরানিঃসন্দেহেএকপ্রকারজুলম

(ইবনে রুশদ, আল কাওয়ায়েদ, পৃষ্ঠা ৬০১)

আর ইবনে জারীর  তাবারী সূরা নিসা ২৯ নং আয়াতে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ খাওয়া” –‘ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন

يا ايها الذين امنوا لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل اى نهى عن اكلهم اموالهم بالباطل اى بالربا و القمار و البخس و الظلم (جامع البيان المعروف ب تفسير الطبرى ج 4, ص 42 )

হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো নাঅর্থ্যাৎ, আল্লাহ আয়াতের মাধ্যমে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খাওয়াকে নিষিদ্ধ করেছেন। আর অন্যায় ভাবে”-‘ মানে হলোসুদ, জুয়া, অতি কম মূল্যে ক্রয় করা অতি বেশি মূল্যে বিক্রি করা।

(জামিউল বায়ান, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২)

 

মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বনাম মুদারাবা (Profit Loss Sharing), মুশারাকা (Partnership), কাফালা (Bailment) ও ওয়াকালা (Agency)

 

মুদারাবা (Profit Loss Sharing), মুশারাকা (Partnership), কাফালা (Bailment) ও ওয়াকালা (Agency) – এর প্রত্যেকটিই বৈধ ব্যবসা পদ্ধতি। কিন্তু এগুলোর কোন একটির সাথেও Multilevel Benefit এর কোন রূপ সম্পৃক্ততা নেই; এর প্রত্যেকটিতেই রয়েছে Unilevel Benefit. [Multilevel Benefit Unilevel Benefit এর ব্যাখ্যা উদাহরণ সহকারে জানার জন্য থেকে ১৪ পৃষ্ঠাগুলো আরেকবার পড়ুন।] অতএব এগুলোর বৈধতা থেকে এমএলএম বিজনেসের (যার মূল ভিত্তিই হলো Multilevel Benefit) বৈধতা কিছুতেই প্রমাণিত হয় না।

শ্রমবিহীন মুনাফাকে হালাল করার এক অদ্ভূত যুক্তিঃ

 

বঙ্গী সাহেবের দৃষ্টিতে শ্রম একটি অটো মেশিনের (Auto Machine) নাম যা একবার চাবি দিলে আর কখনো পেছন ফিরে তাকায় না- ঊর্দ্ধগতিতে কেবল সামনের দিকেই ধাবিত হতে থাকে। তাঁর নিজের ভাষায় শুনুনঃ

“এমএলএম পদ্ধতি বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানিগুলোতে একবার যদি কেউ ডিস্ট্রিবিউটর হয়ে কাজ করে পরবর্তীতে যদি কাজ নাও করে      তাহলেও তার শ্রম কোম্পানিতে জড়িয়ে আছে বলে ধরে নেয়া হয়।”

                                 (পৃষ্ঠা ৪৯)

শ্রমের এমন আজব ক্ষমতা (যে একবার প্রয়োগ করা হলে তা অসীম লেভেল পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে এবং বিভিন্ন স্টেশনে বিরতি দিয়ে দিয়ে প্রথম বিনিয়োগকারী বরাবর কেবল মুনাফাই পাঠাতে থাকে) – সম্পর্কে পাঠকবর্গ কতটুকু ওয়াকেফহাল তা আমি জানিনা। আমার জিজ্ঞাসা কেবল এতটুকুই যে, শ্রমের এ তেলেসমাতি মাজেজা আমাদের সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে কেন প্রয়োগ করা হবে না। গোটা মানব সভ্যতাই টিকে আছে মানুষের পারস্পরিক শ্রমের উপর। একবার শ্রম দিয়ে যদি আজীবন তার বেনেফিট দাবী করা বৈধ হয় এবং সকল প্রকার শ্রমের ক্ষেত্রেই তা প্রয়োগ করা হয় (যা অবশ্যই হওয়া উচিত) তাহলে কী সুন্দর(!!!) দৃশ্যের অবতারনা হয় তা প্রথম দিকেই আলোচনা করেছিলাম। এখানে প্রাসঙ্গিকতার কারণে তা আরেকবার উল্লেখ করা হচ্ছে।

মানুষ সামাজিক জীব (social being) কথাটির পেছনে মানবিকতার তুলনায় অসহায়ত্বের দিকটিই প্রবল। অর্থাৎ, মানুষ পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় প্রাণী। তার এই অসহায়ত্ব তাকে বাধ্য করে সামষ্টিক জীবনযাপন করতে। তার পরিধেয় এক টুকরো বস্ত্রের পেছনে অসংখ্য বনী আদমের শ্রম জড়িত। অগণিত লোকের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ পরিশ্রমের ফলে এক মুঠো ভাত তার খাবার প্লেটে হাজির হয়। এক কথায়, মানুষ তার মৌলিক প্রয়োজনের একটিও অসংখ্য মানুষের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ শ্রম ছাড়া পূরণ করতে পারেনা। এখন একজন ব্যক্তি কতজন লোককে পারিশ্রমিক দিতে নীতিগতভাবে বাধ্যমানবীয় সুস্থ বিবেক বলছে তাকে কেবল ব্যক্তির পারিশ্রমিক দিতে বাধ্য করা যেতে পারে, যে তার পেছনে প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়েছে; পরোক্ষ শ্রম নয়। আর এই নীতিটিই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে সুরা নাজমের ৩৯ নং আয়াতটিতে (وان ليس للانسان الا ما سعي  অর্থাৎ মানুষ ঠিক ততো টুকুরই ফল পাবে যা সে নিজে করেছে)

একজন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক তার প্রত্যক্ষ শ্রমের ফল দাবী করতে পারে, যা সাধারণত তাকে বেতন আকারে প্রদান করা হয়। কিন্তু কোন চুক্তি মূলে শিক্ষকের দাবী বৈধ হিসাবে বিবেচিত হতে পারেনা যে, তার ছাত্ররা যত জনকে শিক্ষিত করে কর্মক্ষম করে তুলবে এবং তারা ভবিষ্যতে যাদেরকে যোগ্য করে তুলবে তাদের প্রত্যেকের আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ উর্ধ্বতন শিক্ষককে কমিশন আকারে দিতে হবে।

 

বলুন তো দেখি, শ্রমের বহুস্তর সুবিধাকে (multi level benefit of labour) মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে বৈধ নির্দোষ মনে করা হলে শিক্ষক সম্প্রদায়ের উক্ত দাবীকে কেন মেনে নেয়া হবেনা ? পৃথিবীর কোন সভ্য সুস্থ মনের অধিকারী জাতি এমন উদ্ভট দাবী মেনে নিবে বলে আমার মনে হয়না। কারণ নীতির ফলাফল তখন কেবল শিক্ষক সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেনা। একই রকম দাবী উঠতে থাকবে কুলি, মজুর, শ্রমিক, ডাক্তার, প্রকৌশলীএক কথায় শ্রমজীবি মানুষের প্রতিটি সেক্টর থেকেই। কারণ ইতোপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানব সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিই অসংখ্য মানুষের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ শ্রমের উপর নির্ভরশীল। ঠাণ্ডা মাথায় একবার ভেবে দেখুনতো, সমাজের প্রতিটি সেক্টর থেকে এরকম দাবী উঠতে থাকলে আমাদের সামগ্রিক জীবনে কী ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে ?

 

হয়তো তাদের কেউ বলে উঠবেন আমাদের কোম্পানী তো নিজেই স্বেচ্ছায় এ বিরামহীন মুনাফা দিতে রাজী হচ্ছে। যে মুনাফা দিবে সে রাজী থাকলে অন্য ব্যক্তির তাতে আপত্তির কী আছে? যুক্তিটি আপাতত নির্দোষ মনে হলেও বাস্তবে তা সাংঘাতিক আপত্তিকর। “কোম্পানী নিজেই মুনাফা দিচ্ছে”- কথাটি থেকে মনে হয় কোম্পানী তার তহবিল থেকেই এ মুনাফা দিচ্ছে। কিন্তু তা নয়। বাস্তবতা হলো, কিছু অবৈধ মুনাফালোভী অল্প শ্রমে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়ার উদ্দেশ্যে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এ অভিনব কৌশল উদ্ভাবন করেছে। তাদের স্বরূপ আমি আমার দ্বিতীয় প্রবন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করেছি। এখানে তার পুনরাবৃত্তির আর প্রয়োজন নেই।

BLOG COMMENTS

উপরোক্ত প্রবন্ধ সোনার বাংলাদেশ ব্লগে প্রকাশ করার পর বাকরুদ্ধএম এন হাসান ছদ্মনামে দুজন ব্লগারের বিপরীতে আমি অন্তর্দৃষ্টি শিরোনামে যে জবাব দিয়েছি নিম্নে তা উল্লেখ করা হলঃ

২০ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ০৮:৫৫

বাকরুদ্ব লিখেছেন : আপনি অনেক কষ্ট করেছেন মনে হচ্ছে লেখাটি লেখার জন্য।কিন্তু কুরআনের আয়াতের ভুল ব্যখ্যা করেছেন বা সঠিক ব্যখ্যাটা আপনার লেখায় আসেনি।সুরা নজমের ৩৮/৩৯ নাম্বার আয়াত হচ্ছে আপনার আলোচনার ভিত্তি,এই আয়াতদ্বয়কে মিসকোট করেছেন তাই পুরো আলোচনাই ভিত্তিহীন।পোষ্টে সচিন্তিত মাইনাস দিলাম।

২০ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ০৯:২৮

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : প্রিয় বাকরুদ্বঃ আপনি যদি মনে করেন, ঐ আয়াতটির সঠিক ব্যাখ্যা এ রকম নয় তাহলে “সঠিক ব্যাখ্যাটি” আমাদেরকে জানিয়ে কৃতার্থ করবেন আশা রাখি। তাছাড়া, চেইন পিরামিডাল কমিশনের বৈধতার ব্যাপারে আপনার কাছে কোন প্রমাণ বা যুক্তি থাকলে তাও জানানোর ব্যবস্থা করুন। আমি পরবর্তী পর্বে বিশেষজ্ঞদের মতামত উল্লেখ করতে যাচ্ছি। সেগুলোর সাথেও আপনার দ্বিমত থাকলে আপনার মতামত জানাতে কার্পন্য করবেন না। কোন কিছুকে ভুল/সঠিক বলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কেন ভুল/সঠিক – তা বিশ্লেষণের দায়িত্ব মন্তব্যকারীর উপরই বর্তায়। ধন্যবাদ।

২০ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ১০:০৫

বাকরুদ্ব লিখেছেন : এমএলএম ভুল কি শুদ্ধ সেই হিসেবে যাওয়ার আগে,আপনি যে আয়াতগুলোকে শ্রমের মুলনীতি হিসেবে গ্রহন করেছেন তার ব্যখ্যা জরুরী।
সুরা নজমের ৩৮ ও ৩৯ নাম্বার আয়াতকে ব্যখ্যা করতে হলে আমাদেরকে আরো কয়েকটা আয়াত পেছন থেকে শুরু করতে হবে,যেখান থেকে এই আয়াতের ক্রমধারা শুরু হয়েছে।

৩৩) হে নবী, তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছো যে আল্লাহর পথ থেকে ফিরে গিয়েছে
৩৪) এবং সামান্য মাত্র দিয়ে ক্ষান্ত হয়েছে?(এই আয়াতের ব্যখ্যাটুকু তাফহিমুল কুরআন থেকে নেয়া হয়েছে)
উক্ত আয়াতদুটিতে কুরাইশদের বড় নেতাদের অন্যতম ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার ব্যপারে রাসুলকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে;

এখানে কুরাইশদের বড় নেতাদের অন্যতম ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে ইবনে জারীর তাবারী বর্ণনা করেছেন যে, ব্যক্তি প্রথমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত গ্রহণ করতে মনস্থির করে ফেলেছিল কিন্তু তার এক মুশরিক বন্ধু জানতে পারলো যে, সে মুসলমান হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে সে তাকে বললো তুমি পিতৃধর্ম ত্যাগ করো না যদি তুমি আখেরাতের আযাবের ভয় পেয়ে থাকো তাহলে আমাকে এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দাও, তোমাদের পরিবর্তে আমি সেখানকার আযাব ভোগ করার দায়িত্ব গ্রহণ করছি ওয়ালিদ একথা মেনে নিল এবং আল্লাহর পথে পথে প্রায় এসে আবার ফিরে গেল কিন্তু সে তার মুশরিক বন্ধুকে যে পরিমাণ অর্থ দেবে বলে ওয়াদা করেছিল তার সামান্য মাত্র দিয়ে অবশিষ্ট অংশ বন্ধ করে দিল ঘটনার প্রতি ইংগিত করার উদ্দেশ্য ছিল মক্কার কাফেরদের একথা জানিয়ে দেয়া যে, আখেরাত সম্পর্কে নিরুদ্বেগ এবং দীনের তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞতা তাদেরকে কি ধরনের মূর্খতা নির্বুদ্ধিতার মধ্যে নিমগ্ন করে রেখেছে

তারপর,ক্রমধারায় ৩৮ ও ৩৯ নাম্বার আয়াতে এসে বলা হয়েছে;
৩৮) একথা যে, “কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না৷

আয়াত থেকে তিনটি বড় মূলনীতি পাওয়া যায় এক, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে তার কাজের জন্য নিজের দায়ী দুই, একজনের কাজের দায়দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া যেতে পারে না তবে সেই কাজ সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে তার কোন ভূমিকা থাকলে ভিন্ন করা তিন, কেউ চাইলেও অন্য কারো কাজের দায়দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করতে পারে না আর প্রকৃত অপরাধীকে কারণে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে না যে, তার শাস্তি ভোগ করার জন্য অন্য কেউ এগিয়ে আসছে

৩৯) একথা যে, “মানুষ যে চেষ্টা সাধনা করে তা ছাড়া তার আর কিছুই প্রাপ্য নেই.

একথাটি থেকেও তিনটি মূলনীতি পাওয়া যায় এক, প্রত্যেক ব্যক্তি যা পরিণতি ভোগ করবে তা তার কৃতকর্মেরই ফল দুই, একজনের কর্মফল অন্যজন ভোগ করতে পারে না তবে কাজের পেছনে তার কোন ভূমিকা থাকলে তা ভিন্ন কথা তিন, চেষ্টাসাধনা ছাড়া কেউ কিছু লাভ করতে পারে না
কোন কোন ব্যক্তি তিনটি মূলনীতিকে ভুল পন্থায় অর্থনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে এরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, কোন ব্যক্তি নিজের কাষ্টার্জিত আয় () ছাড়া কোন কিছুর বৈধ মালিক হতে পারে নাকিন্তু একথা কুরআন মজীদেরই দেয়া কিছু সংখ্যক আইন নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক উদাহরণ হিসেবে উত্তরাধিকার আইনের কথা বলা যেতে পারে আইন অনুসারে কোন ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদে বহু সংখ্যক লোক অংশ পায় এবং বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃত হয় কিন্তু উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদ তার শ্রম দ্বারা অর্জিত নয় শত যুক্তি দেখিয়েও একজন দুগ্ধপোষ্য শিশু সম্পর্কে একথা প্রমাণ করা যাবে না যে, পিতার পরিত্যক্ত সম্পদের তার শ্রমের কোন ভূমিকা আছে অনুরূপভাবে যাকাত সাদকার বিধান অনুসারে শুধুমাত্র শরয়ী নৈতিক অধিকারের ভিত্তিতে একজনের অর্থসম্পদ অন্যেরা লাভ করে থাকে এভাবে তারা সম্পদের বৈধ মালিকানা লাভ করে কিন্তু সেই সম্পদ সৃষ্টির ব্যাপারে তার শ্রমের কেন অংশ থাকে না অতএব কুরআনের কেন একটি আয়াত নিয়ে বিচার –বিশ্লেষণ করে কুরআনের অন্যান্য শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কুরআনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী

এইতো গেল তাফহিমুল কুরআনের ব্যখ্যা।এবার দেখি আধুনিক যুগের আরেকটি জনপ্রিয় কমেন্টারি,মোহাম্মদের আসাদের ব্যখ্যা:

that no bearer of burdens shall be made to bear another’s burden; (53:38)
This basic ethical law appears in the Qur’an five times – in 6:164, 17:15, 35:18, 39:7, as well as in the above instance, which is the oldest in the chronology of revelation. Its implication is threefold: firstly, it expresses a categorical rejection of the Christian doctrine of the “original sin” with which every human being is allegedly burdened from birth; secondly, it refutes the idea that a person’s sins could be “atoned for” by a saint’s or a prophet’s redemptive sacrifice (as evidenced, for instance, in the Christian doctrine of Jesus’ vicarious atonement for mankind’s sinfulness, or in the earlier, Persian doctrine of man’s vicarious redemption by Mithras); and, thirdly, it denies, by implication, the possibility of any “mediation” between the sinner and God.and that nought shall be accounted unto man but what he is striving for;(53:39)

the basic, extremely well-authenticated saying of the Prophet, “Actions will be [judged] only according to the conscious intentions [which prompted them]; and unto everyone will be accounted only what he consciously intended”, i.e., while doing whatever he did. This Tradition is quoted by Bukhari in seven places the first one as a kind of introduction to his Sahi~ – as well as by Muslim, Tirmidhi, Abn Da’ud, Nasa’i (in four places), Ibn Majah, Ibn Hanbal, and several other compilations. In this connection it is to be noted that in the ethics of the Qur’an, the term “action” (‘amal) comprises also a deliberate omission of actions, whether good or bad, as well as a deliberate voicing of beliefs, both righteous and sinful: in short, everything that man consciously aims at and expresses by word or deed.(Page: 1109-1110)
তাফসীরে ইবনে কাসীরেও সিমিলার ব্যখ্যা এসেছে,যেখানে ঐ আয়াতগুলো পাপ-পুন্যের ব্যখ্যায় ব্যবহার করা হয়েছে,কোন ভাবেই ব্যবসা বা শ্রমের নীতির জন্য ব্যবহার করা হয়নি।

ফাইনালি, আপনি বরং একজন এমএলএম কে কেন জায়েজ বলেছে তার বইয়ের কাউন্টার করতে চেয়েছেন এবং তা করতে যেয়ে কুরআনের আয়াতের মিসকোট এবং অপব্যখ্যা করেছেন,হয়তবা মনের অজান্তেই অথবা অন্য কারো লেখাকে কপি পেষ্ট করতে যেয়ে। এমএলএম কে নাজায়েজ বলার পক্ষে আরো অনেক যুক্তি থাকতে পারে কিন্তু আপাতত আপনার যুক্তি ধোপে টিকলনা।
আমি মুল ইস্যতেই আলোচনা রাখলাম,সাইড ইস্যুতে আলোচনা অদরকারী।
ধন্যবাদ

২১ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ১২:৩৪
অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : আপনার দীর্ঘ জবাবের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। তবে এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলা জরুরী মনে করি। আশা করি আপনার জ্ঞানগর্ভ মতামত দিয়ে আমাকে সাহায্য করবেন।

প্রথমত, আপনি যে সকল তাফসীর গ্রন্থের রেফারেন্স দিয়েছেন এ আয়াতের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা দেয়ার পূর্বে আমি সেসব তাফসীরের সংশ্লিষ্ট অংশগুলো গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ে নিয়েছি। বিষয়টি এমন নয় যে, আমি কারো কাছ থেকে কপি করে পেস্ট করে দিয়েছি।

দ্বিতীয়ত, তাফসীর শাস্ত্রের ক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখা দরকার। তা হল, কোন আয়াতের বিশেষ আংগিকের ব্যাখ্যাকে নিছক এ কারণেই অগ্রহনযোগ্য বলে উড়িয়ে দেয়া যেতে পারে না যে, এ বিশেষ দিকটি অন্য কোন তাফসীর গ্রন্থে লেখা হয় নি। তাফসীর শাস্ত্র মূলত একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত নতুন তাফসীর লেখা হচ্ছে। এবং প্রায় প্রতিটি নতুন তাফসীরেই নতুন আঙ্গিকে অসংখ্য আয়াতের তাফসীর পেশ করা হয়েছে। উদাহরনস্বরূপ, আপনি যে দু’টি তাফসীর গ্রন্থের কথা শুরুর দিকে উল্লেখ করেছেন (অর্থাৎ মাওলানা মওদুদী’র (রঃ) তাফহীমুল কুরআন ও মুহাম্মদ আসাদের The Message of the Quran) এগুলোর কথাই ধরুন। এসব তাফসীরগ্রন্থে অসংখ্য আয়াতের এমন আঙ্গিকে তাফসীর পেশ করা হয়েছে যা পূর্বের তাফসীর গ্রন্থসমূহে আলোচিত হয় নি। নিছক এ অজুহাত তুলে এ তাফসীরগ্রন্থসমূহের ঐ বিশেষ অংশসমূহকে প্রত্যাখ্যান করা হলে তা হবে এক অন্যায়। (আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, ঠিক এ ধরণের ঠুনকো অজুহাতে কিছু লোক তাফহীমুল কুরআনকে কুরআনের অপব্যাখ্যা আখ্যা দিয়ে বাদ দেয়ার চেষ্টা করছে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষ আসাদের ব্যাখ্যাকে সোদী আরবে একপ্রকার নিষিদ্ধ করে রেখেছে।)

তৃতীয়ত, আমি মনে করি কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা অনেকদূর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে। সে সম্প্রসারিত ব্যাখ্যাটি ঠিক তখনি পরিত্যায্য হবে যখন তা হবে কুরআনের অপরাপর আয়াত বা সুন্নাতে রাসূল (সাঃ) থেকে উৎসারিত বিধানের বিপরীত।

চতুর্থত, মাওলানা মওদুদী (রঃ) যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন আমার প্রবন্ধে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লিখেছি, “এ দু’টি আয়াত অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির আয় ও দায় (income and liability) সবসময় ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তবে, শরীয়ত প্রণেতা নিজেই অন্যান্য আয়াত ও হাদীসে এ সাধারণ নীতিটির (general principle) কয়েকটি ব্যতিক্রম (exceptions) উল্লেখ করে দিয়েছেন। তন্মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধনী লোকদের সম্পদে অভাবী মানুষের অধিকার এবং আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে সদকায়ে জারিয়া, গোনাহে জারিয়া ও জীবিত লোক কর্তৃক কোন ভালো কাজের সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পাঠানো (ঈসালে সওয়াব) অন্যতম। এখানে উল্লেখ্য যে, শরীয়ত প্রণেতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সকল ব্যতিক্রম উল্লেখ করেছেন সেগুলো বাদ দিলে সুরা নাজমের ৩৯ নং আয়াতটি ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও শ্রমনীতির একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি (established rule) ।”

অর্থাৎ, ইসলামী শরীয়ত যে সকল জায়গায় শ্রম ছাড়াই অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে সেগুলোর সাথে এ আয়াতে উল্লেখিত নীতির কোন সংঘর্ষ নেই। কারণ, সেগুলো আয়াতের ব্যাতিক্রমধর্মী উদাহরন। আর এটি আইন বিজ্ঞানের (jurisprudence) একটি স্বতঃসিদ্ধ নীতি যে, আইন প্রণেতা আইন দেয়ার পাশাপাশি ব্যতিক্রম (exception)ও বলে দেয়ার অধিকার রাখেন।

পঞ্চমত, এ আয়াতের শব্দ প্রয়োগ অত্যন্ত ব্যাপক। আমি যে ব্যাখ্যা দিয়েছি তার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এ আয়াতের ব্যাপকতার মধ্যে। এ কোন আজগুবী আবিষ্কার নয়।

সর্বশেষ, আমার ব্যখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করতে চাইলে কুরআনের কোন আয়াত কিংবা হাদীসের রেফারেন্সে দেখাতে হবে যে আমার ব্যাখ্যাটি তার সাথে কীভাবে সাংঘর্ষিক। অযথা “অন্য কোন তাফসীরে এভাবে বলা হয়নি” — নিছক এ কারণে প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা বুদ্ধিবৃত্তির (intellect) প্রতি নিঃসন্দেহে যুলুমের নামান্তর।

২১ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ০১:৫৭

এম এন হাসান লিখেছেন : ধন্যবাদ আপনাকে এই বিষয়ে একটি ভাল আলোচনা পেশ করার জন্য।তবে বাকরুদ্ব’এর মন্তব্যের জবাবে বলা আপনার কথার সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারলাম না।

এমএলএম হালাল বা হারাম হবার ব্যপারে বিভিন্ন যুক্তি রয়েছে,সেগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।কিন্তু আপনি যেই আয়াতগুলো বেইস ধরে এমএলএম কে নাজায়েজ বলেছেন তা সঠিক বলে মনে হচ্ছেনা।তাফসীর কারক যিনিই হউন,তার ব্যাখ্যাটা জরুরি।উপরে তিনটি তাফসীর থেকে রেফারেন্স দেয়া হয়েছে ঐ আয়াতগুলোর ব্যাপারে,এরপরও সন্দেহ থাকা উচিত কিনা ভেবে দেখা দরকার।আধুনিক দুটি তাফসীর বাদ দিলেও তাফসীর ইবনে কাসির তো ক্লাসিকাল তাফসীর,তাই না?

নিচে এম এল এম এর পক্ষে বিপক্ষে আরো লেখার কয়েকটা লিংক দিলাম,আপনার কাজে আসবে আশাকরি।

Fatwa from the Standing Committee, সৌদি আরব। এখানে এটাকে না জায়েজ বলা হয়েছে।

আবার নিচের লিংকে পুরো ইসলামিক মডেল অফ এম এল এম নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

Islamic Model of Multi-level Marketing (MLM)

নিচে মালয়েশিয়ার এক শায়খ,পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা করেছেন;
Multi Level Marketing : Shariah View

ওনার কনক্লুশানটা আমার পছন্দ হয়েছে;
I am aware that rulings regarding MLM are not yet concluded and are still open for discussions. Even Syeikh Dr Abd Sattar Abu Ghuddah,(অন্য কোন আলেম সম্ভবত) during our discussion, pointed out that the MLM issue is still new to him. It is difficult to find writings of Middle Eastern scholars regarding MLM because MLM has yet to enter the Arab countries massively. Therefore, it is the responsibility of the South East Asian scholars to elaborate on this topic to provide the general public with guidelines about Shariah issues in MLM. This short writing is only a preliminary opinion intended to remind all of us about the ambiguity or doubtness that is embedded in MLM schemes. Readers should not be annoyed and irritated by the article. It is only a reminder for those who are concerned about the legality of their income and a forewarning for those who ponder upon the infinite life after death.
এই বিষয় নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ রয়েছে।পিরামিড স্কিম আর এমএলএম কে এক করে দেখে অতি সহজে হারাম উপসংহারে পৌছা আমার মতে যুক্তিযুক্ত হবেনা।
ধন্যবাদ

২১ ডিসেম্বর ২০১০; দুপুর ০১:৪৭
অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : সুপ্রিয় এম এন হাসান! আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে সকল লিঙ্ক উল্লেখ করেছেন উক্ত প্রবন্ধ লিখার আগে আমি সেসব লিঙ্ক সহ অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও পুস্তিকা অধ্যয়ন করে নিয়েছি। তারপরও আপনার হেল্পিং মাইন্ডের জন্য আরেকবার ধন্যবাদ।

আপনার সাথে আমার আলোচ্য বিষয় এখন দু’টি; (১) তাফসীরের বৈশিষ্ট্য ও (২) চেইন পিরামিডাল কমিশনের বৈধতা।

(১) তাফসীরের বৈশিষ্টের ব্যাপারে জনাব “বাকরুদ্ধ” ও আপনি কেউই এ বিষয়টির জবাব দিচ্ছেন না যে, “অন্যান্য তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ নেই – নিছক এ কারণেই কেন একটি ব্যাখ্যা অগ্রহনযোগ্য হবে?” আপনাদের কাছে আপনাদের মতের স্বপক্ষে কুরআন-সুন্নাহ ও সুস্থ বিবেকের কোন প্রমাণ থাকলে তা তুলে ধরুন। নতুবা এমন নীতিকে আমি সুস্পষ্টভাবেই ভ্রান্ত মনে করি। কারণ, কোন যুগের মুফাসসিরের পক্ষেই সমস্ত আঙ্গিকে কুরআনের সব আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে দেয়া সম্ভবপর নয়। আমরা আমাদের পূর্বসূরীদেরকে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকেই সর্বোচ্চ মাত্রার শ্রদ্ধা দিয়ে সম্মান করি। কারণ, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল থেকে আমরা দ্বীনের প্রগাঢ় জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পাই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা সব বিষয়ের সমাধান করে চলে গেছেন এবং এখন আর নতুন কিছুই বলা যাবে না। একবার গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, এ কথাকে একবার মেনে নিলে ইবনে কাসীরের পরবর্তী অধিকাংশ তাফসীরগ্রন্থকে নিছক এ কারণেই বাদ দিতে হবে যে এগুলোতে এমন অনেক কথা বলা আছে যা ইবনে কাসীর ও তাঁর পূর্বেকার তাফসীর গ্রন্থসমূহে নেই।

আমি আবারো বলছি, কুরআনের কোন আয়াতের কোন ব্যাখ্যাকে অগ্রহনযোগ্য বলার জন্য অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, ঐ ব্যাখ্যাটি কুরআনের অন্যান্য আয়াত ও হাদীস থেকে উৎসারিত বিধি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আমার এ ব্যাখ্যাটি কীভাবে কুরআনের অন্যান্য আয়াত ও হাদীস থেকে উৎসারিত বিধি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তা প্রমাণ করার দায়িত্ব প্রত্যাখ্যানকারীকেই দেয়া উচিত। নিছক ভাবাবেগের অনুবর্তী হয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের এ রীতিকে প্রত্যাখ্যান করা কিছুতেই সঠিক হতে পারে না।

তাছাড়া, ইবনে কাসীর বিষয়টির কেবল আধ্যাত্মিক দিকটি আলোচনা করেছেন; তিনি কখনো এ কথা লিখেননি যে, এ আয়াত কোন ক্রমেই আমাদের অর্থনৈতিক জীবনে প্রযোজ্য হবে না। এমনটা লিখলে তাকেই বরং প্রমাণ করতে হতো যে, কীসের ভিত্তিতে তিনি এ সাধারণ (عام) আয়াতটিকে বিশেষায়িত (خاص) করে নিচ্ছেন।

তবে মাওলানা মওদুদী যে কারণে এ আয়াতটিকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চান নি, আমি আমার মূল প্রবন্ধে (এবং “বাকরুদ্ধের” জবাবে) তা সবিস্তারে আলোচনা করেছি। ঐ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাওলানা মওদুদীর উদবেগের সমাধান করা হয়েছে।

(২) মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের প্রফিট ডিস্ট্রিবিউশন স্কীমটি কোন ক্রমেই সাধারণ কমিশনের মত নয়। এ কমিশন পদ্ধতির স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে কেউ লিখেছেন “চেইন পিরামিডাল কমিশন” কেউ বলেছেন “কম্পাউন্ড ব্রোকারেজ”। আমি নিজে অবশ্য এক বিশেষ ধরণের পরিভাষা ব্যবহার করি। আর তা হলো Multilevel Effect of Labour বা শ্রমের বহুস্তর প্রতিক্রিয়া. এসব পরিভাষা প্রয়োগে আপনার দ্বিমত থাকলে তা অত্যন্ত স্বাভাবিক; আপনি ইচ্ছে করলে অন্য কোন পরিভাষা সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু, পরিভাষা যাই হোক না কেন এগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য একই। অর্থাৎ এ প্রফিট ডিস্ট্রিবিউশন স্কীমটি কোন ক্রমেই সাধারণ কমিশনের মত নয়।

পরিশেষে, মনে রাখতে হবে এ প্রবন্ধে বহুমুখী বিষয় আলোচিত হয়েছে যেগুলোর কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় হচ্ছে Multilevel Effect of Labour বা শ্রমের বহুস্তর প্রতিক্রিয়া। আমি এখানে দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, Multilevel Effect of Labour প্রকৃতপক্ষে শ্রমের “প্রকৃতি-বিরোধী”। সুরা নাজমের ঐ আয়াতটির প্রেক্ষিতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে Multilevel Effect of Labour ইসলামের প্রাণসত্তার বিপরীত।
আরেকটি অনুরোধ জানিয়ে আমার জবাবী মন্তব্য শেষ করবো। তা হল, আপনাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে Multilevel Effect of Labour বা শ্রমের বহুস্তর প্রতিক্রিয়া ইসলামসম্মত কি না। আপনার জবাব কী? যদি হ্যাঁ বাচক হয় তাহলে জিজ্ঞাস্য হচ্ছে শ্রমের এই প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ও অস্বাভাবিক মাজেজা কোন যুক্তিতে বৈধ? আর প্রশ্নটির জবাব নেতিবাচক হলে তার দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করুন

Multilevel Effect of Labour বা শ্রমের বহুস্তর প্রতিক্রিয়ার ইস্যুটি কোন ছেলেখেলা নয়; নয় কোন আমুদে বিতর্কের খোরাক। ভোগবাদী অর্থনীতি ও শোষণমূলক শ্রমনীতির এই জটিল যুগে এ ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিংশ শতকের শুরু থেকে ইসলামী রাষ্ট্রতত্ত্বের যে ব্যাপক পুনর্জাগরণবাদী কার্যক্রম শুরু হয়েছে তারই দাবী হিসেবে এ ইস্যুটি আশু সমাধানযোগ্য। “আগে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক, পরে সমাধান করবো” এমন চিন্তা কেবল নীতিগত ভুলই নয়; পরিণতির দিক দিয়েও তা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
অশেষ ধন্যবাদ।
jiarht@gmail.com

২২ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ০৬:৪৫

এম এন হাসান লিখেছেন : ভাই,আপনি মুল আলোচনার বাহিরে চলে যাচ্ছেন কেন?তাফসীর কারক বা তাফসীরের বৈশিষ্ট আলোচনার বিষয় কি?
বিষয় ছিল এমএলএম এবং শ্রমনীতি।
আপাতত এমএলএম বাদ কেননা গোড়ায় গলদ।শ্রমনীতির ক্ষেত্রে সুরা নজমের ৩৮ ও ৩৯নাম্বার আয়াতের এপ্লিকেশন কিভাবে করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করুন।আমিও বাকরুদ্ধের সাথে একমত যে,ঐদুটি আয়াত কোনভাবেই শ্রমের সাথে সম্পর্কিত নয়,আমি নিজে আজ দেখার চেষ্টা করেছি,আরো কয়েকজন আলেমের সাথেও কথা বলেছি।আপনি কিভাবে উক্ত দুটি আয়াতকে ইসলামি শ্রমনীতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন যেখানে উক্ত দুটি আয়াত সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও অর্থে নাজিল হয়েছে।শরীয়ত প্রণেতা বলেছেন বলতে কি বঝাতে চান?এই শরীয়ত প্রণেতাটা কে?
আপনি কোন তাফসীর থেকে এই ব্যখ্যা নিয়েছেন তা উল্লেখ করুন।
আমি আবারো বলছি,এমএলএম কে নাজায়েজ বলার জন্য আরো অনেক কারন রয়েছে কিন্তু ঐ দুটি আয়াতকে কেন অযথা ব্যবহার মিসকোট করতে হবে সেটা বুঝে আসছেনা।বুঝিয়ে বলেন প্লিজ।
ধন্যবাদ

২২ ডিসেম্বর ২০১০; দুপুর ১২:১৩

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : এ কোন্ sickness – তা আমার বুঝে আসে না। আপনি প্রতিবারই তাফসীর সংক্রান্ত এক ডেয়ারিং মূলনীতি বর্ণনা করে চলেছেন অথচ আপনার মতের স্বপক্ষে না আছে কুরআন-সুন্নাহর কোন টেক্সট, আর না আছে কোন সুস্থ যুক্তি।

আপনি প্রথম মন্তব্যে বললেন, “তাফসীর কারক যিনিই হউন,তার ব্যাখ্যাটা জরুরি।উপরে তিনটি তাফসীর থেকে রেফারেন্স দেয়া হয়েছে ঐ আয়াতগুলোর ব্যাপারে,এরপরও সন্দেহ থাকা উচিত কিনা ভেবে দেখা দরকার।আধুনিক দুটি তাফসীর বাদ দিলেও তাফসীর ইবনে কাসির তো ক্লাসিকাল তাফসীর,তাই না? ” তাফসীর ইবনে কাসির তো ক্লাসিকাল তাফসীর – এর মাধ্যমে কী বুঝাতে চেয়েছেন তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। তবে এতোটুকুতো পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে যে, যেহেতু ইবনে কাসির বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেননি সেহেতু আয়াতটির এরূপ ব্যাখ্যা কিছুতেই হতে পারে না। আমি মনে করি, এরূপ কোন নীতির স্বপক্ষে কুরআন-সুন্নাহর কোন প্রমাণ পেশ করার সাধ্য কারো নেই।

আপনার যুক্তিটি পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে উসুলে তাফসীরের উপর। অথচ আমি যখন উসুলে তাফসীর নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করে দেখিয়ে দিলাম যে, আপনার এই কল্পিত মতবাদের পক্ষে না আছে কুরআন-সুন্নাহর কোন টেক্সট আর না আছে কোন সুস্থ যুক্তি। এর জবাবে আপনি বলতে চাইলেন, “ভাই,আপনি মুল আলোচনার বাহিরে চলে যাচ্ছেন কেন?”

তারপর আপনি বলেছেন, “ঐদুটি আয়াত কোনভাবেই শ্রমের সাথে সম্পর্কিত নয়”। আপনার এ ব্যাখ্যার পেছনে একটি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন, “আপনি কিভাবে উক্ত দুটি আয়াতকে ইসলামি শ্রমনীতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন যেখানে উক্ত দুটি আয়াত সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও অর্থে নাজিল হয়েছে।” আপনার যুক্তির সারকথা হল, যেহেতু এ আয়াত এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছিল সেহেতু এর অর্থ ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই কেবল প্রযোজ্য। আমি মনে করি, এ যুক্তি ঠিক নয়। এর স্বপক্ষে আমি কুরআন থেকে অসংখ্য প্রমাণ দিতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামে একাধিক বিবাহের অনুমতি সংক্রান্ত আয়াত
و ان خفتم ان لا تقسطوا فى اليتامى فانكحوا ما طاب لكم من النساء مثنى و ثلاث و رباع
কিছু লোক এভাবে যুক্তি দিচ্ছে যে, যেহেতু এ আয়াত উহুদ যুদ্ধোত্তর ইয়াতীম শিশুদের সমস্যা সমাধানের বিশেষ প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে সেহেতু কেউ একাধিক বিবাহ করতে চাইলে তাকে অবশ্যই কোন একটি যুদ্ধের পরেই করতে হবে, কিছুতেই যুদ্ধের আগে একাধিক বিবাহ করতে পারবে না। কারণ, একাধিক বিবাহের অনুমতি কেবল যুদ্ধের পরের অবস্থার সমাধানের জন্য নাযিল হয়েছিল, যুদ্ধের আগের অবস্থাতে প্রযোজ্য হওয়ার জন্য নয়। এখানেই শেষ নয়। তারা আরো শর্তারোপ করছে যে, যেহেতু কুরআনের আয়াতের মধ্যেই ইয়াতীম শিশুর উল্লেখ আছে সেহেতু কেউ একাধিক বিয়ে করতে চাইলে তাকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে সেও ইয়াতীম শিশুর সমস্যা সমাধান করছে; অন্যথায় সে একাদিক বিবাহের বৈধতা পাবে না। [লক্ষ্য করে দেখুন, “নিছক বিশেষ প্রেক্ষাপটে নাযিল হওয়ার প্রেক্ষিতে কোন আয়াতের ব্যাখ্যা সীমাবদ্ধ রাখা”র নীতির দৃষ্টিতে এদের যুক্তির ভিত্তি আপনার তুলনায় অনেক দৃঢ়। কারণ, তাদের শর্তাবলীর উপস্থিতি খোদ কুরআনের শব্দাবলীতেই রয়েছে। পক্ষান্তরে, আপনার শর্ত (অর্থাৎ, নাজমের আয়াত কেবল সওয়াব-গুনাহের ক্ষেত্রেই কেবল প্রযোজ্য হবে, কিছুতেই অর্থ ও শ্রম দর্শনে আসবে না) কুরআনের শব্দাবলীতে নেই; নিছক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকিয়ে চালিয়ে দিয়েছেন কেবল]

তারপরও বহু বিবাহ সম্পর্কে ঐসব মহোদয়ের শর্তারোপকে আমরা পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে বাতিল বলে ঘোষণা করি। কারণ, এ আয়াত নাযিল হওয়ার পরে রাসুল (সাঃ) তাঁর কোন বক্তব্যের মাধ্যমে সেসব শর্তের উল্লেখ করেন নি; বরং তাঁর কার্যাবলী ও মৌন সমর্থনের মাধ্যমে ঐ সকল শর্তকে বাতিল করে দিয়েছেন। অর্থাৎ, ইয়াতীম শিশুর সমস্যা জড়িত থাকা ছাড়াই সাহাবায়ে কেরাম একাধিক বিয়ে করেছিলেন এবং রাসুল (সাঃ) সেখানে কোন রূপ বাধা বা শর্তারোপ করেন নি।

এই দীর্ঘ (হয়তো irritatingও বটে) আলোচনার মাধ্যমে আমি দেখানোর চেষ্টা করলাম যে, কুরআনের যে আয়াত যে প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছিল, পরবর্তীতে প্রয়োগের জন্য সবসময় সে প্রক্ষাপটের উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে না। মাঝে মধ্যে এরূপ প্রেক্ষাপটের গো ধরলে রাসুল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমল তাকে সজোরে প্রত্যাখ্যান করে।

এখন প্রশ্ন দেখা দেয়, কুরআনের আয়াত যে প্রেক্ষাপটে নাযিল হয় সেই প্রেক্ষাপটের আইনগত মর্যাদা কী? এর উত্তর হল, প্রেক্ষাপটের ব্যাপারে সার্বজনীন কোন রুল নেই। অর্থাৎ, প্রত্যেকটি মুহকাম আয়াতের ক্ষেত্রেই আলাদাভাবে দেখতে হবে যে, ঐ প্রেক্ষাপট একটি শর্তরূপে গন্য হবে কি না। এ ক্ষেত্রে কুরআনের অপরাপর আয়াত, সুন্নাহ ও আছার থেকে আমরা পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে পারি।

এবার দৃষ্টি দিন নাজমের ৩৮ ও ৩৯ নং আয়াতের দিকে। আয়াতদ্বয়ের মধ্যে এমন কোন শব্দও নেই যা দ্ব্যার্থহীভাবে বলে দেয় যে, “এ আয়াত কেবল সওয়াব ও গুনাহের ক্ষেত্রেই কেবল প্রযোজ্য হবে; সাবধান অন্য কোথাও প্রয়োগ করার চেষ্টা করো না”।

আমাদের ফকীহদের কথাই ধরুন। তারা এ আয়াতকে সওয়াব-গুনাহে সীমাবদ্ধ না রেখে ফৌজদারী আইনেও (criminal law / الحدود و الجنايات) নিয়ে এসেছেন। এরই ভিত্তিতে পৃথিবীর প্রত্যেকটি সভ্য জাতির আইনবিজ্ঞানে vicarious liability বা পরার্থ দায় বিষয়ক স্থায়ী মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে যে, কোন ব্যক্তির অপরাধের দায়ভার অন্য কেউ ইচ্ছে করলেও নিতে পারবে না। অপরাধীকেই আইন ভঙ্গের শাস্তি ভোগ করতে হবে। ফিকহের বইগুলো খুলে দেখুন, আমাদের ফকীহগন এ আয়াতকে কত ব্যাপকভাবে criminal jurisprudence এ প্রয়োগ করেছেন।

আমি আগেই বলেছি, কুরআন হচ্ছে জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। এর আয়াতগুলো বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই elastic (স্থিতিস্থাপক); নিছক এক জায়গায় এর প্রয়োগ সীমিত থাকে না। তবে অবশ্যই এ প্রকার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ ও আছারের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এগুলোকে লংঘন করে এমন কোন স্থিতিস্থাপক ব্যাখ্যাই গ্রহনযোগ্য হবে না। আমি যেভাবে এ আয়াতের ব্যাখ্যাকে সম্প্রসারিত করেছি তাতে কুরআন-সুন্নাহ ও আছারের কোন নীতির লংঘন হয়ে থাকলে তা ধরিয়ে দিন।
আপনি জানতে চেয়েছেন, “শরীয়ত প্রণেতা বলেছেন বলতে কি বঝাতে চান?এই শরীয়ত প্রণেতাটা কে? ” এর সহজ উত্তর হচ্ছে মুসলিম হিসেবে আল্লাহ ও রাসুল (সাঃ) কে ছাড়া আমরা আর কোন legislator বা শরীয়ত প্রণেতার কনসেপ্টই স্বীকার করি না।

রয়ে গেল আপনার সর্বশেষ প্রশ্ন, “আপনি কোন তাফসীর থেকে এই ব্যখ্যা নিয়েছেন”। – আমি কোন বিশেষ তাফসীর গ্রন্থ বা কোন ব্যক্তি বিশেষের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ ব্যাখ্যা লিখি নি। কুরআন, সুন্নাহ, আছার, ফিকহ, আধুনিক আইন, অর্থ ও শ্রমদর্শন ও আধুনিক মানুষের সমস্যাদি স্টাডি করে আল্লাহ প্রদত্ত যৌক্তিক চিন্তাশক্তি (rational thinking power) প্রয়োগ করে আমি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। কোন ব্যাখ্যাকে বাতিল বলে গন্য করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহ ব্যতিরেকে অন্য কোন মানদণ্ডকে আমরা স্বীকারই করি না।

অসংখ্য ধন্যবাদ।
jiarht@gmail.com

২৩ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ১২:০৫

এম এন হাসান লিখেছেন : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং : বৈধতার সংকট পোষ্টে মাওলানা মওদুদী ও মুহাম্মদ আসাদ চষে এসে,এখন বলছেন,

আমি কোন বিশেষ তাফসীর গ্রন্থ বা কোন ব্যক্তি বিশেষের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ব্যাখ্যা লিখি নি কুরআন, সুন্নাহ, আছার, ফিকহ, আধুনিক আইন, অর্থ শ্রমদর্শন আধুনিক মানুষের সমস্যাদি স্টাডি করে আল্লাহ প্রদত্ত যৌক্তিক চিন্তাশক্তি (rational thinking power) প্রয়োগ করে আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি কোন ব্যাখ্যাকে বাতিল বলে গন্য করার জন্য কুরআন সুন্নাহ ব্যতিরেকে অন্য কোন মানদণ্ডকে আমরা স্বীকারই করি না

এনিওয়ে, ঠিক এই বিষয়টাই জানতে চাচ্ছিলাম।আমার নিকটস্থ মসজিদের ইমামও জানতে চাচ্ছিলেন আপনি যুগের নতুন কোন মুজাদ্দিদ কিনা।
আমার উত্তর পেয়ে গেছি। এই ব্লগে ইজতিহাদ করার মত লোক আছে,এই তথ্যটাই জানতাম না।
সাধারনত কুরআন-হাদীসের বিষয় নিয়ে আমি “ইসলামিষ্ট”দের সাথে তর্কে লিপ্ত হইনা কিন্তু আপনার এখানে জড়িয়ে গেলাম।
ধন্যবাদ আপনার প্রচেষ্টার জন্য।

২৩ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ০২:১৩
অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : আপনি লিখেছেন, “মাল্টি লেভেল মার্কেটিং : বৈধতার সংকট পোষ্টে মাওলানা মওদুদী ও মুহাম্মদ আসাদ চষে এসে,এখন বলছেন …..” আপনার বক্তব্য থেকে মনে হয় যে, আমি উক্ত দু’জন মুফাসসীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে “মাল্টি লেভেল মার্কেটিং : বৈধতার সংকট” প্রবন্ধ লিখেছি, আর এখন কিনা বলছি আমি কারোদ্বারা প্রভাবিত হয় নি। আপনি যদি এমনটিই বুঝে থাকেন তাহলে এর দায় দায়িত্ব আপনারই। নতুবা খোলা মন নিয়ে ঐ প্রবন্ধ পাঠ করলে পরিস্কার ধরতে পারতেন যে, ঐ প্রবন্ধে নিছক ঐ দুই ব্যক্তি নয় অসংখ্য পণ্ডিত ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছি; অথচ তাদের কাছ থেকেই আমি আমার মূল থিম গ্রহণ করি নি। কারণ, আমরা আমাদের শ্রদ্ধেয় মনীষীদের যথাযথ সম্মান করি, কিন্তু কারো পুজা করার রীতিতে আমরা বিশ্বাসী নই। অতএব, আমার বক্তব্যে আপনি যে স্ববিরোধীতার ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করেছেন তা আপনার অসতর্ক অধ্যয়নের ফল।

যা হোক, জানতে পারলাম যে তাজদীদ ও ইজতিহাদ বিষয়ে আপনি ও আপনার পাশের মসজিদের ইমাম বিস্মিত হয়েছেন। আসলে আমাদের দেশে তাজদীদ, ইজতিহাদ, তাফাক্কুহ – এ শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ না জানার কারণে কিছু লোকের মধ্যে এগুলো ভীতিকর শব্দ মনে হচ্ছে। আসলে আল্লাহর দ্বীনের সার্বিক বিজয় কোন ব্যক্তির একক অবদানের দ্বারা কখনো সম্ভব নয়। অতএব, যে বা যারাই কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী হয়ে আল্লাহর দ্বীনের সার্বিক বিজয়ের জন্য চেষ্টা সাধনা করে থাকে, স্বাভাবিক অর্থে এরা সবাই তাজদীদের কাছে লিপ্ত। দুনিয়ার লোক তাকে মুজতাহিদ কিংবা জাহিল, অথবা মুজাদ্দিদ কিংবা পথভ্রষ্ট – যা ই বলুক না কেন, প্রত্যেকে তার অবদান অনুযায়ী আল্লাহর কাছে বিনিময়ের অধিকারী হবেন।

আপনার সর্বশেষ মন্তব্যের মাধ্যমে আমিও নিশ্চিত হলাম যে, কোন তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই নিছক বাগাড়ম্বর দিয়েই উসুলে তাফসীরের নামে এক আজব মূলনীতি (অর্থাৎ, “কোন ব্যাখ্যা কুরআন, সুন্নাহ, আছার, ফিকহ এর পরিপন্থী না হওয়া সত্তেও নিছক এ কারণেই অগ্রহনযোগ্য যে, এ ব্যাখ্যা অন্য কোন তাফসীর গ্রন্থে লেখা হয় নি”) ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
এ আলোচনায় অংশ নেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক তাৎপর্য উপলব্দি করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

২১ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ০১:৫৬

যুমার৫৩ লিখেছেন : “এই মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের চক্র ভেঙ্গে দিয়ে জনগণকে অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্য থেকে মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন যে, “শহরে বসবাসকারী কোন ব্যক্তি শহরের বাইরে থেকে আগত কোন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পণ্য কিনে পুনরায় তা শহরের বাসিন্দাদের কাছে বিক্রি করতে পারবেনা।”

… এই বিষয়টি কি আরো একটু ব্যাখ্যা করবেন? উদাহরণ হিসাবে ধরুন, ঢাকার শহরের বাইরে অনেক ডেয়ারি ফার্ম আছে। এখন ঢাকার এক লোক বাইরে থেকে আসা গোয়ালাদের কাছ থেকে দুধ কিনে নেয় ও সংরক্ষণ করে। তারপর সে ঢাকার লোকদের কাছে দুধ বিক্রি করে বেশি দামে। এরকম ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী কী হবে?

২১ ডিসেম্বর ২০১০; দুপুর ০৩:৫৬

87281
অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : প্রিয় যুমার ৫৩: এই বিষয়টির ব্যাখ্যায় আমি কয়েক লাইন পরেই লিখেছিলাম, “এ দীর্ঘ আলোচনায় এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, ইসলাম দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি অত্যন্ত সিরিয়াসলি নিয়ে থাকে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যারা জনগণকে বর্ধিত মূল্যে পণ্য কিনতে বাধ্য করে ইসলাম তাদেরকে অভিশপ্ত ঘোষণা করে। বৃহৎ অর্থনীতির অনিবার্য ক্ষেত্র সমূহে কিছু নিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্ত্বভোগীর অনুমতি দিলেও ইসলাম ভোক্তা ও উৎপাদকের মাঝখানে অযথা মধ্যস্বত্ত্বভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর ঘোর বিরোধী। ”

অতঃপর আপনি তার “আরো একটু ব্যাখ্যা” চেয়েছেন। আসলে আমি এখানে ইসলামী অর্থব্যবস্থার প্রাণসত্তা আলোচনা করে দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, রাসুল (সাঃ) অযথা মধ্যমস্বত্বভোগীদের কবল থেকে গণমানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্য কত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন। এসব হাদীসের কেন্দ্রীয় বিষয় (central theme / focal point) হচ্ছে সাধারণ মানুষের উপকার সাধন এবং অতি নগন্য শ্রমে অত্যধিক মুনাফাখোরীর রাস্তা বন্ধ করণ। ইসলাম নির্বিচারে সবরকমের মধ্যস্বত্বকে নিষিদ্ধ করে নি। কেবল সেই প্রকার মধ্যস্বত্বভোগ নিষিদ্ধ যেখানে উপরোক্ত দু’টি বিষয়ের কোন একটি জড়িত।

আপনার উদাহরণের ব্যাপারে বলতে চাই, ইসলাম আমাদেরকে কিছু মৌলিক ও ব্যাপক নীতি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল, আমরা যাতে আমাদের প্রত্যেকের ভিতরকার “তাকওয়া”কে ব্যবহার করি।

“ঢাকার এক লোক বাইরে থেকে আসা গোয়ালাদের কাছ থেকে দুধ কিনে নেয় ও সংরক্ষণ করে। তারপর সে ঢাকার লোকদের কাছে দুধ বিক্রি করে বেশি দামে। এরকম ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী কী হবে? ” এর উত্তরে আমি রাসূল (সাঃ) এর হাদীসের প্রাণসত্তার আলোকে বলতে চাই, “যদি এর মাধ্যমে শহরবাসীদেরকে চড়ামূল্যের ভোগান্তির শিকার হতে হয়, অথবা কেউ যদি এর মাধ্যমে নগন্য শ্রমে অত্যধিক মুনাফাখোরীর পথ ধরতে চায়, তাহলে আমি তার বৈধতার কোন কারণ দেখছি না। তবে অনেকসময় শহরবাসীর স্বার্থেই মধ্যস্থতাকারী অপরিহার্য হয়ে উঠে। সেরকম ক্ষেত্রে অত্যধিক মুনাফাখোরীর দোষে দুষ্ট না হলে, মধ্যস্থতার মধ্যে আমি আপত্তিকর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আল্লাহই ভালো জানেন।” ধন্যবাদ


[1] কারণ ক্ষেত্রে মূল মালিক বেতন ভাতা দিয়ে কর্মচারীর শ্রম টুকু কিনে নেয়। ফলশ্রুতিতে শ্রমের ফলের উপর মালিকের অধিকার জন্মায়। পক্ষান্তরে ডাউনলাইনের কোন ডিস্ট্রিবিউটর (বিশেষ করে অনেক নিম্ন পর্যায়ের) আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটরদের বেতনভুক কর্মচারী (paid employee) নয়।

[2] সদকায়ে জারিয়া মূলত এমন কোন কল্যাণ মূলক কাজ যার বিনিময় সওয়াব আকারে উক্ত ব্যক্তি তার মৃত্যুর পরেও ততদিন পেতে থাকে যতদিন কল্যাণ মূলক কাজের প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকে।যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো মসজিদ নির্মাণ উপকারী জ্ঞান বিতরণ। যতদিন মসজিদ আবাদ থাকবে এবং যতদিন জ্ঞান থেকে মানুষ উপকার লাভ করবে ততদিন উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুর পরেও এর প্রতিদান সওয়াব আকারে পেতে থাকবে।

[3] মনে রাখতে হবে, বস্তুই কেবল ভাড়া দেয়ার যোগ্য যা ব্যবহার শেষে ( বস্তুটিই) আবার মূল মালিক কে ফেরৎ দিতে হয়; এবং ব্যাবহার বাবদ কিছু বিনিময় মূল মালিক কে দিতে হয়। বাড়ী গাড়ী ভাড়া এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পক্ষান্তরে, এমন কোন বস্তু ভাড়া দেয়ার যোগ্যই নয় যা নিজে নিঃশেষিত না হয়ে উপকার দিতে পারে না (যেমন, টাকাপয়সা খাদ্যদ্রব্য) তবে তা ধার বা ঋণ (loan) আকারে দেয়া যেতে পারে; কিন্তু সে ক্ষেত্রে মূল বস্তুর অতিরিক্ত কোন রকমের সুবিধা নেয়া যাবেনা। কারণ, তা সুস্পষ্ট সুদ। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, كل قرض يجر منفعة فهو ربا  অর্থ্যাৎ, যে ঋণ কোন প্রকার উপকার/লাভ নিয়ে আসে তা সুদ (Every loan drawing any benefit is riba)

[4] এখানে কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন ব্যাংকের নতুন একাউন্ট হোল্ডার হতে বিদ্যমান একাউন্ট হোল্ডারের রেফারেন্স প্রয়োজন পড়ে। সেটি আপত্তিকর না হলে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ে রেফারেন্স বাধ্যতামুলক হলে অসুবিধা কোথায় ? এর জবাবে বলা যায়, ব্যাংকে রেফারেন্স দাবি করার পেছনে মূলত সিকিউরিটি ইস্যু জড়িত; সেখানে কোন প্রকার আর্থিক মতলববাজী নেই। অর্থ্যাৎ, ব্যাংকের রেফারীকে রেফারেন্সের কারণে কোন আর্থিক সুবিধা দেয়া হয় না পক্ষান্তরে, মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ে উচ্চতর দালালের রেফারেন্স বাধ্যতামুলক হওয়ার পেছনে জঘন্য রকমের আর্থিক মতলববাজী হীনস্বার্থ জড়িত রয়েছে।

[5] নিসা, ২৯

[6] Asad: The Message of the Quran, pp 142-4

[7] তাফহীমুল কুরআন, সূরা নিসা, টীকা ৫০

[8] Asad: The Message of the Quran, pp 142-4

Leave a comment

Filed under Uncategorized

বন্ধকী সম্পত্তি থেকে উপকৃত হওয়া প্রসঙ্গ

সম্পত্তিকে বড় আকারে মোটামুটি দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যথাঃ (১) ভাড়াযোগ্য ও (২) ভাড়ার অযোগ্য।

“ভাড়াযোগ্য” বলতে এমন সব সম্পত্তিকে বুঝায় যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবহার করার পর (স্বয়ং ঐ বস্তুটিই) মালিককে ফেরৎ দেয়া হয় এবং ব্যবহার মূল্য (use value) বাবদ কিছু ক্ষতিপূরণও দিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, হাসান একটি গাড়ীর মালিক। হাবিব দু’ দিনের জন্য হাসানের গাড়ীটি এক হাজার টাকার বিনিময়ে ভাড়া নিল। এটি একটি বৈধ চুক্তি। কারণ, এখানে এমন একটি বস্তু ভাড়া দেয়া হচ্ছে যা মূলত ভাড়া দেয়ার যোগ্য। অর্থাৎ মেয়াদ শেষে মূল বস্তুটিই মালিককে ফেরৎ দেয়া হবে। আর দু’ হাজার টাকা ঐ গাড়িটির ব্যবহার মূল্য (use value)- ‘র ক্ষতিপূরণ  হিসেবে বিবেচিত হবে।

“ভাড়ার অযোগ্য” বলতে এমন সম্পত্তিকে বুঝায় যা নিজে নিঃশেষিত না হয়ে উপকার প্রদান করতে পারে না। আর নিঃশেষিত হওয়ার কারণে হুবহু ঐ বস্তুটি মূল মালিককে ফেরৎ দেয়া আর সম্ভব হয় না। যেমন, টাকা-পয়সা ও খাদ্যদ্রব্য। ধরুন, আমার কাছে উদ্বৃত্ত এক লাখ টাকা আছে। আমার কাছ থেকে এই টাকা নিয়ে আপনি লাভবান হতে চাইলে টাকাগুলো নিশ্চয়ই খরচ করে ফেলতে হবে। আর খরচ করে ফেললে মেয়াদ শেষে আপনি অবশ্যি এর সমপরিমান টাকা দিতে পারবেন; কিন্তু হুবহু ঐ টাকাগুলো আমাকে আর ফেরৎ দেয়া সম্ভব হবেনা (অথচ ভাড়া যোগ্য পণ্য হওয়ার জন্য মূল বস্তুটি ফেরৎ দেয়ার যোগ্যতা থাকা জরুরী।)

ধান, চাল, গমসহ খাদ্যদ্রব্যগুলোর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। এর কোন একটিও নিঃশেষিত না হয়ে উপকার প্রদান করতে পারেনা। আর নিঃশেষিত হয়ে গেলে হুবহু ফেরৎ দেয়ার সুযোগও শেষ হয়ে যায়। অতএব, এসব বস্তু ভাড়া দেয়ার যোগ্য নয়; তবে এগুলো ধার/ঋণ আকারে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু ধার/ঋণ দিয়ে মূল বস্তুর অতিরিক্ত কিছু গ্রহন করাকে হারাম সাব্যস্ত করে রাসূল (সাঃ) বলেন,

كل قرض يجر منفعة فهو ربا”

“যে সকল ধার/ঋণ কোন প্রকার লাভ নিয়ে আসে – তার প্রত্যেকটিই সুদী কারবার”।

আমাদের সমাজে বন্ধক / কট নামে যে চুক্তি প্রচলিত আছে – তা মূলত ১৭৫৭-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত  কার্যকর বৃটিশ শাসনের ঘৃন্য কু প্রভাবগুলোর অন্যতম। ১৮৩৫ সালে প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে রাষ্টের আইন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ থেকে কুরআন-সুন্নাহ কে উৎখাত করে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত বৃটিশ আইন ব্যবস্থা (secular British laws) চাপিয়ে দেয়া হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে পাকিস্তান এবং তা থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করার পরেও মুসলিম অধ্যুষিত এ অঞ্চলগুলোর আইন কাঠামোতে এখনও ঐ সব নোংরা পদার্থ রয়ে গেছে। প্রকাশ্যে আমরা সবাই নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করলেও কুরআন- সুন্নাহ সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে ঐ আইন পরিবর্তন করার জন্য আমরা সরকারের উপর সামষ্টিকভাবে চাপ প্রয়োগ করার কোন প্রয়োজন বোধ করি না। অথচ আমাদের অনেক ছোটখাট প্রয়োজন আমরা সরকারের উপর প্রবল চাপ প্রয়োগ করে আদায় করে নিই। কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী আইন কানুন চালু থাকার ব্যাপারে আমাদের এই নির্লিপ্ততা, নিস্পৃহতা ও ঔদাসীন্যের সামষ্টিক দায় কিয়ামত দিবসে আমরা এড়াতে পারব বলে আমার মনে হয় না।

বর্তমানে প্রচলিত বন্ধক / কট প্রথাটির ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহ নয়; বরং গোলামীর যুগের একটি বৃটিশ আইন। আর তা হল The Transfer of Property Act, 1882 (সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২) – ‘র ৫৮ ধারার ‘ঘ’ দফা। এই দফা’র সার কথাটি পরবর্তী পৃষ্ঠায় ব্যাখ্যা করা হল।

হাসান                                              হাবিব

হাসান তার একখণ্ড জমি হাবিবের কাছে বন্ধক / কট দিয়ে ৫০,০০০ টাকা নিল। যতদিন পর্যন্ত হাসান ৫০,০০০ টাকা শোধ করতে না পারবে ততদিন হাবিব এই জমি থেকে উপকৃত হতে থাকবে। The Transfer of Property Act, 1882 (সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২)-’র  উক্ত ধারায় এই ধরণের বন্ধককে Usufructuary Mortgage নামে অভিহিত করা হয়েছে।

আপাত দৃষ্টিতে এই চুক্তিটি আপত্তিকর মনে হয় না। কারণ এই সময়টাতে দু’পক্ষই (হাসান ও হাবিব) দু’জনের সম্পত্তি থেকে লাভবান হচ্ছে। অর্থ্যাৎ হাবিবের ৫০,০০০ টাকা নিয়ে হাসান ব্যবসা করে যেভাবে লাভবান হচ্ছে  সেভাবে হাসানের জমি চাষাবাদ করে কিংবা পত্তন দিয়ে হাবিবেরও লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। নির্দিষ্ট সময়ান্তে হাসানের জমি যেহেতু পুরোটাই হাসানের কাছে ফিরে আসছে, সেহেতু হাবিবের টাকা পুরোটাই হাবিবের কাছে ফিরে আসাও সম্পূর্ণ যুক্তিসংগত।

কিন্তু একটু গভীর দৃষ্টি দিলেই দেখা যাবে, হাসান ও হাবিব দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী বস্তুর মালিক। হাসানের আছে জমি (যা ভাড়া/lease দেয়ার যোগ্য); অন্যদিকে হাবিবের রয়েছে টাকা (ইসলামের নির্দেশ অনুযায়ী যা ভাড়া/ lease দেয়ার অযোগ্য)। অতএব হাসানকে টাকা প্রদানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সময়টুকুতে হাসানের জমি থেকে উপকৃত হওয়ার কোন বৈধ সুযোগ হাবিবের নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, টাকা থেকে লাভবান হওয়ার বৈধ উপায় কী ? এর উত্তর হল, টাকা থেকে দু’টি উপায়েই বৈধভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে;

(১)  টাকা নিয়ে সরাসরি ব্যবসায় নেমে পড়া (ব্যক্তিগতভাবে কিংবা লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে অংশীদারীত্বের মাধ্যমে। [যথাযথ ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাথে মুদারাবা চুক্তি অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে ব্যবসার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ছোট সাইজের অংশীদারীত্বমূলক কারবারে লোকসানের ঝুঁকি অনেক বেশী। এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশীদারীত্বমূলক প্রজেক্টগুলোতে বিশাল আকারের পুঁজি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করার কারণে সামষ্টিকভাবে লোকসানের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কিছু লোক অবশ্য ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন প্রজেক্টে সুদী কারবারের অভিযোগ আনেন। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, যেহেতু ইসলামী ব্যাংকগুলো আমাদের সামনে পরিপূর্ণ শরীয়াহ মোতাবেক কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের কার্যক্রমগুলোকে প্রতিনিয়ত শরীয়াহ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের কথা বলে, সেহেতু সাধারণ মানুষ তাদের সাথে অংশীদারীত্বের চুক্তিতে যেতে পারে। এতসব প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরেও যদি তারা কোন সুদী কারবারে জড়িত হয়, তাহলে সুদী কারবার + মিথ্যা ওয়াদা/প্রতারনার গোনাহের দায়ভার পুরোপুরি ব্যাংকের উপরই বর্তাবে; গ্রাহকের উপর নয়। কারণ, সাধারণ মানুষের পক্ষে ব্যাংকের মাঠ পর্যায়ের গতিবিধি পুরোপুরি তদারকি করা সম্ভব নয়।] ); অথবা,

(২) টাকা দিয়ে ভাড়াযোগ্য কোন পণ্য কিনে তা ভাড়া দিয়ে লাভবান হওয়া (যেমন কোন পুকুর, জমি কিংবা যানবাহন ক্রয় করে ভাড়া / lease দেওয়া ইত্যাদি)।

মনে রাখতে হবে, উপরোক্ত দু’টি পদ্ধতির প্রতিটিতে লাভের সম্ভাবনা ও লোকসানের ঝুঁকি –   উভয়ই বিদ্যমান। আর এর ফলেই এ সকল কারবার পদ্ধতি ইসলামে বৈধ হিসেবে বিবেচিত। কারণ, কোন লাভ “বৈধ”  হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য লোকসানের ঝুঁকি বহন করাও জরুরী। রাসূল (সাঃ) বলেন,

الغنم بالغرم و الغرم بالغنم

 (Profit is with risk and risk is with profit)

“ঝুঁকি যেখানে লাভ সেখানে এবং লাভ যেখানে ঝুঁকিও ঠিক সেখানেই।”

আমাদের সমাজে অবশ্য একটি কথা প্রচলিত আছে যে, বন্ধকী সম্পত্তির খাজনা আদায় করে দিলে কিংবা প্রতি বছর মূল টাকা থেকে কিছু টাকা কেটে দিলে বন্ধকী সম্পত্তি ভোগ দখল করা বৈধ। আসলে এটি রাসূলের (সাঃ) একটি হাদীসের অসতর্ক ব্যাখ্যার ফল। হাদীসটি হচ্ছে নবী (সাঃ) বলেন,

الظهر يركب بنفقته اذا كان مرهونا و لبن الدر يشرب بنفقته اذا كان مرهونا

অর্থ্যাৎ, “বন্ধকী জন্তুর খাবার ও রক্ষনাবেক্ষন বাবদ যে পরিমাণ অর্থ খরচ করা হবে উক্ত জন্তুর উপর সওয়ার হয়ে ঠিক সেই পরিমাণ সফর করা যাবে এবং  বন্ধকী জন্তু যদি দুগ্ধ প্রদানকারিনী হয় তাহলে তার খাবার ও রক্ষনাবেক্ষন বাবদ যে পরিমান অর্থ খরচ করা হবে উক্ত জন্তু থেকে ঠিক সেই পরিমাণ  দুগ্ধ পান করা যাবে।”  (বুখারী)

এখান থেকে এই ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে যে, বন্ধকী জন্তুর পেছনে কিছু খরচ করলে যদি তা থেকে উপকৃত হওয়া বৈধ হয়, তাহলে বন্ধকী সম্পত্তির খাজনা বাবদ কিছু টাকা খরচ করলে কিংবা প্রতি বছর মূল টাকা থেকে কিছু টাকা কেটে দিলে উক্ত জমি থেকে উপকৃত হওয়া নিঃসন্দেহে বৈধ হবে। আসলে এটি একটি ভুল ধারণা। হাদীসটির দিকে ভাসা ভাসা দৃষ্টি দেয়ার ফলেই এই ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এই হাদীসটিতে খরচ ও উপকৃত হওয়ার পরিমাণের মধ্যে আনুপাতিক ভারসাম্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইবনে কাইয়্যিম আল জাওযিয়্যাহ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, দুধের পরিমাণ যদি খরচের টাকার পরিমাণ থেকে বেশী হয় তাহলে বাড়তি দুধটুকুর দাম মূল মালিককে দিতে হবে। কারণ, বন্ধকী সম্পত্তি মূলত একপ্রকার সিকিউরিটি (অর্থ্যাৎ ঋণের টাকা ফেরৎ পাওয়ার নিশ্চয়তার জন্যই কেবল বন্ধকের বৈধতা দেয়া হয়েছে); এটি ভোগ দখলের বৈধতার সার্টিফিকেট নয়। এই হাদীসের প্রয়োগ জমি জমা সহ অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে ঠিক তখনই সঠিক হবে যখন খাজনা বাবদ যে পরিমাণ অর্থ খরচ করা হবে অথবা প্রতি বছর যে পরিমান অর্থ কেটে রাখা হবে,  ঠিক ততটুকু উপকার ই উক্ত বন্ধকী সম্পত্তি থেকে নেয়া হবে; কোন ক্রমেই এর বেশী নয়।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ও দ্বৈত সার্বভৌমত্বের সংঘাতঃ প্রসংগ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী অপরাধ (Emergence of a New State and the Conflict of Dual Sovereigns: Case of War Crimes and Crimes against Humanity)

সূচীপত্র

ভূমিকাঃ

আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ

১৯৭১ সালের যুদ্ধের প্রকৃতিঃ

দালাল আদেশঃ

আবুল মনসুর আহমদের মূল্যায়নঃ

স্বাধীনতা বিরোধীতা বনাম যুদ্ধাপরাধঃ

দায়মুক্তি আদেশঃ

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রচেষ্টাঃ ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩’

সিমলা চুক্তিঃ

দিল্লী চুক্তিঃ

সাধারণ ক্ষমাঃ

দালাল আদেশ রহিতকরণঃ

এক নজরে আইনগত পদক্ষেপ সমূহঃ

মীমাংসীত ইস্যুর পুনরুত্থান (Resurrection) প্রেক্ষাপট:

কেন ‘বিশেষ’ ট্রাইবুনালের প্রয়োজন?

দিনবদলের সরকার ও যুদ্ধাপরাধের বিচারঃ

‘যুদ্ধাপরাধী’ থেকে ‘মানবতা বিরোধী’:

দলমত নির্বিশেষে ‘অপরাধী’র বিচারের পূর্বাভাষ!

 

 

চিত্র

 

চিত্র ১: যুদ্ধ চলাকালে অখণ্ড রাষ্ট্রের ‘দুশমন’ হিসেবে হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকার

চিত্র ২:প্রকাশ্য রাজপথে ‘দালাল’ বধ উৎসব

নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ও দ্বৈত সার্বভৌমত্বের সংঘাতঃ

প্রসংগ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী অপরাধ

(Emergence of a New State and the Conflict of Dual Sovereigns: Case of War Crimes and Crimes against Humanity)

 

অপরাধের বিচার হতে হবেন্যায়বিচারের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কোন ব্যক্তি ই এর সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারে না। আর যুদ্ধাপরাধ! তা তো নিঃসন্দেহে একটি ঘৃন্যতম অপরাধ-যার বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরী। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বিগত ৩৮ বছর ধরে নোংরা রাজনীতির যে বীভৎস চিত্র আমরা দেখেছি তা জাতি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতারই একটি দিক মাত্র। আমরা চাই এর একটি স্থায়ী ও গ্রহনযোগ্য সমাধান হোক। 

আন্তর্জাতিক  আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান – উভয় দিক দিয়েই ১৯৭১ সালের যুদ্ধ বিশ্বের অপরাপর যুদ্ধ থেকে অনেকটা ভিন্ন প্রকৃতির। আন্তর্জাতিক যুদ্ধগুলোর সাথে এ যুদ্ধের যেটুকু মিল খুঁজে পাওয়া যায় তার চেয়ে অনেক বেশী মিল খুঁজে পাওয়া যায় ১৮৬১-১৮৬৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া গৃহযুদ্ধের (Civil War) সাথে। আন্তর্জাতিক মানের যে কোন বিশ্বকোষ থেকে দুই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ঘটনাপ্রবাহ ও কার্যধারা তুলনামূলকভাবে অধ্যয়ন করলে এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিস্কারভাবে ফুটে উঠে। ডিসেম্বরের সপ্তাহ খানেকের কথা বাদ দিলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তির সাথে আভ্যন্তরীন উদীয়মান নয়া সার্বভৌম শক্তির সংঘাতের দিকটিই প্রবল। নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে প্রায়শঃ এরকম সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠে।  সে কারনেই অন্যান্য দেশের যুদ্ধাপরাধ ও তার বিচার প্রক্রিয়ার সাথে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ ও তার বিচার প্রক্রিয়ার আইনগত পার্থক্য বিরাট। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নুরেমবার্গ ট্রাইবুনাল ও টোকিও ট্রাইবুনালের সাথে এর আইনগত মিল খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। কারণ, ঐ সকল যুদ্ধ মূলত আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সম মানের সার্বভৌম (sovereign equals) শক্তি সমূহের সংঘাতের ফল।  এজন্য বিষয়টি একটু সবিস্তারে আলোচিত হওয়া উচিত।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ধর্ষণ, নিরীহ মানুষ হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লু্ণ্ঠন – এগুলো সার্বজনীন অপরাধ। অর্থাৎ, কোন দেশের আইন ব্যবস্থায় এগুলো আগে থেকেই নিষিদ্ধ থাকুক আর না থাকুক – সর্বাবস্থায় এগুলো অপরাধ। আর এসব অপরাধ যুদ্ধকালে সংঘটিত হলে তা আরো নিকৃষ্ট মাত্রার অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হয়। কারণ, যুদ্ধকালে মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যারা এসব অপকর্ম করে তারা নিঃসন্দেহে মানবতার চরম শত্রু, যুদ্ধের যেকোন পক্ষ দ্বারাই তা সম্পাদিত হোক না কেন। মানবতার বৃহত্তর নিরাপত্তার স্বার্থেই এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

কিন্তু ধর্ষণ, নিরীহ মানুষ হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন ইত্যাদি কর্ম সম্পাদিত না করে নিছক যুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করার আইনগত অবকাশ আছে কিনা – সর্বাগ্রে এ বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত। [1] কারণ, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক হীনস্বার্থে ‘যুদ্ধ বিরোধিতা’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ – দু’টিকে একসাথে গুলিয়ে ফেলার কারণে এমন এক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে একদিকে মানবতার শত্রু আসল যুদ্ধাপরাধীরা রয়ে গেছে ধরা-ছোঁইয়ার বাইরে, অপর দিকে গোটা জনসাধারণ (বিশেষ করে তরুন প্রজন্ম) আটকা পড়েছে বিভ্রান্তির গোলক ধাঁধায়। অতএব সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকেরই এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারনা থাকা উচিত।

 

আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ

কোন নাগরিকের উপর একই সময় দু’টি পৃথক সার্বভৌম শক্তির নির্দেশ বাধ্যকরী হতে পারে কি? আইনগতভাবে এর উত্তর সবসময়ই নেতিবাচক হতে বাধ্য। একটি উদাহরন দিলে বিষয়টি পরিস্কার বুঝা যাবে।

ধরি, ‘ক’ এবং ‘খ’ দু’টি পৃথক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। আপনি ‘ক’ রাষ্ট্রের নাগরিক।  ‘ক’ এবং ‘খ’ দু’টি পরস্পর বিরোধী নির্দেশ জারী করে আইনটি মেনে চলার জন্য আপনাকে আদেশ দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ‘ক’ এবং ‘খ’ উভয়ের পরস্পর বিরোধী নির্দেশ মেনে নেয়া আপনার পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয়। এর কারণ মূলত দু’টি। প্রথমত, কোন ব্যক্তির পক্ষে দু’টি পরস্পর বিরোধী নির্দেশ একই সময়ে কার্যকর করা অসম্ভব। আর দ্বিতীয়ত, আপনি যে সার্বভৌম শক্তির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রনাধীন (directly controlled) এলাকায় বসবাস করছেন আইনগতভাবে আপনি কেবল তারই নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য। তবে হ্যাঁ, আপনি যে এলাকায় বসবাস করছেন ‘খ’ যদি তার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রন (direct control) নিয়ে সফলতার সাথে প্রশাসন পরিচালনা করতে সক্ষম হয় সেই দিন থেকে আপনি আগের সার্বভৌম শক্তি ‘ক’ কে বাদ দিয়ে ‘খ’ কে আপনার এলাকার কার্যত সার্বভৌম শক্তি (de facto sovereign) হিসেবে মেনে নিতে পারেন। অন্যান্য দেশ কর্তৃক ‘খ’ এর এই দখলকে স্বীকৃতি দেয়া হলে তা হয়ে যাবে আইনগত সার্বভৌম শক্তি (de jure sovereign)। তখন থেকে আপনি তার নির্দেশ মেনে নিতে আইনগতভাবে বাধ্য। তবে কোন অবস্থাতেই এই নয়া সার্বভৌম শক্তি ‘খ’এর কোন অধিকার নেই যে, এই এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রন গ্রহন করার পূর্বে আপনি এই নয়া শক্তির যে ‘বিরোধিতা’ করেছিলেন সেজন্য সে আপনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা (waging war against the state) কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহ (sedition and high treason) ইত্যাদি দায়ে আপনাকে অভিযুক্ত করবে। কারণ, আপনি এমন একটি সময়ে ‘খ’এর বিরোধিতা করেছিলেন যখন সে এই এলাকার কার্যত সার্বভৌম শক্তি (de facto sovereign) কিংবা আইনগত সার্বভৌম শক্তি (de jure sovereign)-কোনটিই ছিল না। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, রাষ্ট্র বিরোধিতা কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহ ইত্যাদি অভিযোগে আপনাকে অভিযুক্ত করতে চাইলে ঐ নয়া সার্বভোম শক্তিকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, সে কার্যত বা আইনগত সার্বভৌমত্ব অর্জন করার পরে আপনি তার বিরুদ্ধে সেসমস্ত অপরাধের কোন একটি সম্পাদন করেছেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ কেবল একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রের (full-fledged state) বিরুদ্ধেই হওয়া সম্ভব। পরিপূর্ণ রাষ্ট্রসত্তা (full-fledged statehood) অর্জন করার পূর্বের কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রদ্রোহের আওতায় নিয়ে আসার বিষয়টি আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান – উভয় দিক থেকেই ভ্রান্ত।

১৯৭১ সালের যুদ্ধের প্রকৃতিঃ

আইনবিজ্ঞানের এই মূলনীতিটি সামনে রেখে ১৯৭১ সালের যুদ্ধটিকে দেখা প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করার মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান একটি একক সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়ে সমগ্র পাকিস্তানে একক সার্বভৌমত্বের বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সাধ্য কারো নেই।  ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে চট্টগ্রাম থেকে এ অঞ্চলকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার মধ্য দিয়ে এ এলাকায় দ্বৈত সার্বভৌমত্বের পরস্পর বিরোধী দাবী শোনা গেল। একদিকে পূর্ব থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তি পাকিস্তান দাবী করছে যে, এই অঞ্চলে তার সার্বভৌমত্ব কার্যকর; অতএব জনগনের উচিত নয়া সার্বভৌমত্বের দাবীদারদের কবল থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীকে সহযোগীতা করা। শুধু তাই নয়, যদি কেউ নয়া  শক্তিকে সহযোগীতা করে, তাহলে তাকে পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২১ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহযোগীতার দায়ে মৃত্যুদণ্ড অথবা জরিমানাসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। অন্যদিকে নয়া শক্তি এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রের সীমান্ত এলাকা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় নিজেরাই সরকার গঠন করে জনগনকে এই মর্মে আহ্বান জানায়, যেহেতু ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করা সত্ত্বেও আমাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি, সেহেতু আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদেরকে এই এলাকার সার্বভৌম শক্তি হিসেবে ঘোষণা করছি। অতএব জনগনের উচিত আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে আমাদেরকে এই এলাকার সার্বভৌম শক্তি হিসেবে মেনে নেয়া। 

এই হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনগনকে উদ্দেশ্য করে দু’টি পৃথক সার্বভৌম শক্তির দাবীদারদের পরস্পর বিরোধী নির্দেশ। জনগন এখন কী করবে? পূর্বেই দেখে এসেছি নির্দেশ দু’টি যেহেতু পরস্পর বিরোধী, সেহেতু একই সময়ে উভয়টি মেনে চলা অসম্ভব। তাহলে নির্দেশ দু’টির যে কোন একটিকে বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। [2]কোনটিকে বেছে নিবে তারা? একদল বেছে নিল আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তিকে। এর কারণ মূলত দু’টি। প্রথমত, তারা যদি নয়া শক্তিকে ‘সহযোগীতা’ দেয় তাহলে পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২১ ধারা অনুযায়ী তাদের জন্য শাস্তি অবধারিত। দ্বিতীয়ত, তারা তখনো নয়া শক্তিকে কার্যত কিংবা আইনগত (de facto or de jure) – কোন দিক থেকেই সার্বভৌম মনে করতে পারছে না। কার্যত সার্বভোম মনে না করার কারণ হল, এই নয়া শক্তি এখনো এ এলাকার বাস্তব নিয়ন্ত্রন (practical control) নিতে পারে নি। প্রশাসনিক সমস্ত কার্যক্রম এখনো পর্যন্ত পরিচালিত হচ্ছে আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তির নির্দেশে। আর আইনগত সার্বভৌম (de jure sovereign) নয় এ কারণে যে, তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তির কাছ থেকে ক্ষমতা লাভ করে নি। আর এমন মনে করারও কোন সুযোগ নেই যে, তারা সার্বভোমত্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। কারণ, সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য। এক বনে দুই বাঘের রাজত্ব কদাচ চললেও চলতে পারে; কিন্তু একই রাষ্ট্রে পরস্পর বিরোধী দুই সার্বভৌমত্বের উপস্থিতি অকল্পনীয়। তাছাড়া, দেশের সীমান্ত এলাকায় শপথ নিয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের একটি প্রাদেশিক রাজধানীতে নিজেদের প্রবাসী সরকারের দফতর প্রতিষ্ঠা করা সত্ত্বেও নয়া সার্বভোমত্বের পতাকাবাহীরা নিজেদের আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র কর্তৃকও স্বীকৃত (recognized)হয়নি।  [এখানে উল্লেখ্য যে, মার্চ মাসের ২৬ তারিখে যুদ্ধ ঘোষণা করা হলেও ভারত নয়া সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে ডিসেম্বরের ৬ তারিখে অর্থাৎ, যুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে।]  অন্যদিকে তাদের দৃষ্টিতে আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তিটি আইনগত ও কার্যত (de facto and de jure)  – উভয় দিক থেকেই সার্বভৌম। কারণ, এ এলাকা পুরোপুরি তার দখলে এবং তার সার্বভৌমত্ব গোটা বিশ্বের অপরাপর প্রায় সকল সার্বভৌম শক্তি কর্তৃক স্বীকৃত (recognized)।

জনতার আরেকটি গ্রুপ বেছে নিল নয়া সার্বভৌম শক্তির দাবীদারকে। তাদের যুক্তির সারবত্তা হল, যেহেতু আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তি আমাদেরকে অন্যায়ভাবে আমাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছে, সেহেতু জাতিসংঘ সনদ (The Charter of the United Nations) সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইনে বিঘোষিত ‘জনতার আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার’ (People’s right to self determination) –‘র ভিত্তিতে বর্তমান রাষ্ট্রকে ভেংগে আমরা আমাদের নতুন রাষ্ট্র গড়ে নেওয়ার পূর্ণ অধিকারী।  বিপরীত দিকে আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তিও আন্তর্জাতিক আইনের আরো সুস্পষ্ট নীতি অর্থাৎ, ‘রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার অলংঘনীয়তা’ নীতি  (Inviolability of national sovereignty and territorial integrity) প্রয়োগ করে নয়া সার্বভৌমত্বের দাবীদারকে দমন করার সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহন করল।

উপরোক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের লোকদেরকে আমরা নিম্নোক্ত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করতে পারিঃ

  • অখণ্ড রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী
  • অখণ্ড রাষ্ট্রের সমর্থক জনগোষ্ঠী
  • নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকামী সশস্ত্র বাহিনী
  • নতুন রাষ্ট্রের সমর্থক জনগোষ্ঠী
  • নির্লিপ্ত জনগোষ্ঠী
  • ভারতীয় ইষ্টার্ন কমাণ্ডভুক্ত সেনাবাহিনী

যুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান[3]

এই বহুমুখী সংঘাতে অগনিত লোকের প্রানহানি ঘটে; কেউ মুখোমুখি লড়াইয়ে, আবার কেউ ব্যক্তি/গোষ্ঠিকেন্দ্রিক জিঘাংসাবৃত্তির শিকার হয়ে। ধর্ষণ, নিরীহ মানুষ হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন ইত্যাদি বদকর্মও সম্পাদিত হয় ব্যপকভাবে। একপক্ষ অপর পক্ষকে শত্রুবাহিনীর ‘চর’ বা ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে হরদম খতম করতে থাকে। নীচের ছবিটি ‘চর’ বা ‘দালাল’ নিধনের একটি দৃশ্য।

চিত্র ১: যুদ্ধ চলাকালে অখণ্ড রাষ্ট্রের দুশমন হিসেবে হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকার [4]

এই ব্যাপক সংঘাতের একটি পর্যায়ে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইষ্টার্ন কমাণ্ডের জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরার নিকট অখণ্ড রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর পক্ষে লেঃ জেঃ আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজির আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে এই এলাকায় এতদিনকার প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তির অবসান ঘটল। তার স্থান দখল করল  নতুন সার্বভৌম শক্তি ‘বাংলাদেশ’।

অরোরার নিকট নিয়াজির আত্মসমর্পন  [5]

 

নতুন শক্তি ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই নতুন উদ্যমে ‘দালাল’ নিধনে মেতে উঠে। আইন শৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। তথাকথিত ‘দালাল’ নিধন প্রকল্পে ভবলীলা সাংগ হয়অসংখ্য নিরীহ মানুষের। নীচের ছবিটি ‘দালাল’ নিধন মহোৎসবের একটি চিত্রঃ

Christian Simonpietri / Sygma / Corbis

চিত্র ২: ১৬ই ডিসেম্বরের অব্যবহিত পরেই (অর্থ্যাৎ, যুদ্ধ সমাপ্তির পর) নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকামী সশস্ত্র যোদ্ধা কর্তৃক ঢাকার প্রকাশ্য রাজপথে জনতার সামনে প্রাক্তন রাষ্ট্রের দালাল (Collaborator) বধ উৎসব। [6]

দালাল আদেশঃ

আইন অশৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির মধ্যেই ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ (The Bangladesh Colloborators (Special Tribunals) Order, 1972) জারী করা হয়।

Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972
Presidents Order
No.8 of 1972

Whereas certain persons, individually or as members of organizations, directly or
indirectly, have been collaborators of the Pakistan Armed Forces, which had illegally
occupied Bangladesh by brute force and have aided or abetted the Pakistan Armed Forces
of occupation in committing genocide and crimes against humanity and in committing
atrocities against men, women and children and against the person, property and honor of
the civilian population of Bangladesh and have otherwise aided or co-operated with or
acted in the interest of Pakistan Armed Forces of occupation or contributed by any act,
word or sign towards maintaining, sustaining, strengthening, supporting or furthering the
illegal occupation of Bangladesh by the Pakistan Armed Forces or have waged war or
aided or abetted in waging war against People’s Republic of Bangladesh.
And whereas such collaboration contributed towards the perpetration of a reign of terror
and the commission of crimes against humanity on a scale which has horrified the moral
consciences of the people of Bangladesh and of right thinking people throughout the
world; And whereas it is imperative that such persons should be dealt with effectively and be adequately punished in accordance with the due process of law; And whereas it is expedient to provide for the setting up of Special Tribunals for expeditious and fair trial of the offences committed by such persons; Now therefore, in pursuance of the proclamation of Independence of Bangladesh Order, 1972 in exercise of all powers enabling him in that behalf, the President is pleased to make the following Order :

1. 1) This Order may be called the Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order,
1972
2) It extends to the whole of Bangladesh.
3) It shall come into force at once and shall be deemed to have taken effect on the 26th
day of March,
1971.
In this Order, –
a) ‘Code’ means Code Of Criminal Procedure, 1898 (Act V of 1898)
b) ‘Collaborator’ means a person who has-
(i) Participated with or aided or abetted the occupation army in maintaining, sustaining,
strengthening, supporting or furthering the illegal occupation of Bangladesh by such
army;
(ii) rendered material assistance in anyway whatsoever to the occupation army by any act,
whether by words, signs or conduct;
(iii) Waged war or abetted in waging war against the People’s Republic Of Bangladesh;
(iv) Actively resisted or sabotaged the efforts of the people and the liberation forces of
Bangladesh in their liberation struggle against the occupation army;
(v) by a public statement or by voluntary participation in propaganda within or outside
Bangladesh on or by association in any delegation or committee or by participation in
purported by-elections attempted to aid or aided the occupation army in furthering its
design of perpetrating its forcible occupation in Bangladesh.
Explanation- a person who has performed in good faith functions which he was required
by any purported law in force at the material time to do shall not be deemed to be a
collaborator;
Provided that a person who has performed functions as direct object or result of which
was the killing of any member of the civil population or the liberation forces of
Bangladesh or the destruction of their property or the rape of or the criminal assault on
their womenfolk, even if done under purported law passed by the occupation army, shall
be deemed to be a collaborator.
c) “Government” means the Government of the People’s Republic of Bangladesh:
d) “Liberation Forces” includes all forces of the People’s Republic of Bangladesh
engaged in the liberation of Bangladesh;
e) “Occupation Army” means the Pakistan Armed Forces engaged in the occupation of
Bangladesh.
f) “Special Tribunal” means a Tribunal under this order.

3(1) Any Police Officer or any person empowered by the Government in that behalf may,
without a warrant, arrest any person who may reasonably be suspected of having been a
collaborator.
(2) Any Police Officer on any person making an arrest under clause (1) shall forthwith
report such arrest
to the Government together with a pr�cis of the information or materials on the basis of
which the arrest has been made, and, pending receipt of the order of the Government,
may, by order in writing, commit any person so arrested to such custody as the
Government may by general or special order specify.
(3) On receipt of a report under clause (2), the Government may by order in writing,
direct such person to be detained for an initial period of six months for the purpose of
inquiry into the case.
(4) The Government may extend the period of detention if, in the opinion of the
Government, further time is required for completion of the inquiry.
(5) Any person arrested or detained before the commencement of this Order who is
alleged to be a collaborator, shall be deemed to be arrested and detained under this Order
and an order in writing authorizing such detention shall be made by the Government:
Provided that the initial period of detention of six months in the case of such person shall
be computed from the date of this arrest.
4. Notwithstanding anything contained in the Code or in any other law for the time being
in force, any collaborator who has committed any offence specified in the Schedule shall
be tried and punished by a Special Tribunal set up under this Order and no other Court shall have any jurisdiction to take cognizance of any such offence.
5. (1) The Government may set up as many Special Tribunals as it may deem necessary
to try and punish offences under this Order for each district or for such area as may be
determined by it.
(2) A Special Tribunal shall consist of one member.
(3) No person shall be qualified to be appointed a member of a Special Tribunal unless he
is or has been a Sessions Judge or an Additional Sessions Judge or an Assistant Sessions
Judge.
6. (1) A Special Tribunal consisting of a Sessions Judge or an Additional Session Judge
shall try and punish offences enumerated in parts I and II of the Schedule.
(2) A Special Tribunal consisting of a Sessions Judge or an Additional Session Judge
shall try and punish offences enumerated in parts III and IV of the Schedule.
7. A Special Tribunal shall not take cognizance of any offence punishable under this
Order except upon a report in writing by an officer-in-charge of a police station.
8. (1) the provisions of the Code insofar as they are not inconsistent with the provisions
of this Order, shall apply to all matters connected with, arising from or consequent upon a
trial by a Special Tribunal.
9. (1) A Special Tribunal shall not be bound to adjourn a trial for any purpose unless such
an adjournment is, in its opinion, necessary in the interests of justice.
(2) No trial shall be adjourned by reason of the absence of any accused person if such
accused person
is represented by counsel, or if the absence of the accused person or his counsel has been
brought about by the accused person himself, and the Special Tribunal shall proceed with
the trial after taking necessary steps to appoint as advocate to defend an accused person
who is not represented by counsel.
10. A Special Tribunal may, with a view to obtaining the evidence of any person
supposed to have been directly or indirectly concerned in, or privy to the offence, tender
a pardon to such person on condition of his making a full and true disclosure of the whole
circumstances within his knowledge relative to the offence and to every other person
concerned, whether as principal or abettor, in the commission thereof and any pardon so
tendered shall, for the purpose of section 339 and 339A of the Code, be deemed to have
been tendered under section 338 of the Code.
11. Notwithstanding anything contained in any other law for the time being in force, (
a) any collaborator who is convicted for any of the offences specified in part I of the
Schedule shall be punished with the death or transportation for life and shall also be
liable to a fine;
(b) any collaborator who is convicted for any of the offences specified in part II of the
Schedule shall be punished with rigorous imprisonment for a term not exceeding ten
years and shall also be liable to a fine;
(c) any collaborator who is convicted for any of the offences specified in part III of the
Schedule shall be punished with rigorous imprisonment for a term not exceeding five
years and shall also be liable to a fine;
(d) any collaborator who is convicted for any of the offences specified in part IV of the
Schedule shall be punished with rigorous imprisonment for a term not exceeding two
years and shall also be liable to a fine;
12. Without prejudice to any sentence passed by Special Tribunal, the property
immovable, movable, or any portion thereof, of a collaborator may, on his conviction, be
forfeited to the Government, upon an order in writing made in this behalf by the
Government.
13. If any accused in convicted of and sentenced for more then one offence, the sentences
of imprisonment shall run concurrently or consecutively, as determined by the Special
Tribunal.
14. Notwithstanding anything contained in the Code no person who is in custody,
accused or convicted of any offence punishable under this order shall be released on bail.
15. The provisions of Chapter XXVII of the Code shall apply to a sentence of death
passed by a Special Tribunal.
16. (1) A person convicted of any offence by a Special Tribunal may appeal to the High
Court.
(2) The Government may direct a Public Prosecutor to present an appeal to the High
Court from an order of acquittal passed by a Special Tribunal, upon intimation to the
Special Tribunal by the Public Prosecutor that such an appeal is being filed, the person in
respect of whom the order of acquittal was passed shall continue to remain in custody.
(3) The period of limitation for an appeal under clause (1) shall be 30 days from the date
of sentence and for an appeal under clause (2) shall be 30 days from the date of the order
of acquittal.
(4) The appeal may lie on matters of fact as well as law.
17. (1) If the Government has reasons to believe that a person, who, in the opinion of the
Government, is required for the purpose of any investigation, enquiry or other
proceedings connected with an offence punishable under this Order, is absconding or is
otherwise concealing himself or remaining abroad to avoid appearance, the Government,
may, by a written proclamation published in the official Gazette or in such other manner
as may be considered suitable to make it widely known:
(a) direct the person named in the proclaimed to appear at a specified place at a specific
time;
(b) direct attachment of any property, moveable and immoveable or both, belonging to
the proclaimed person.
Explanation-“Property belonging to the proclaimed person shall include property,
movable and immovable, standing in the name of his wife, children, parents, minor
brothers, sisters or dependents or any demander.”
(2) If the property ordered to be attached is a debt or other movable property the
attachment shall be made,-
(a) by seizure; or
(b) by the appointment of an administrator; or
(c) by an order in writing prohibiting the delivery or such property to the proclaimed
person or to anyone on his behalf; or
(d) by all or any two of the methods mentioned in sub-clauses(a), (b) and (c) as the
Government may direct.
(3) If the property ordered to be attached is immovable, the attachment shall be made in
the case of land paying revenue to Government, by the Deputy Commissioner of the
district in which the land is situate, and in all other case,-
(a) by taking possession of the property;
or
(b) by the appointment of an administrator; or
(c) by an order in writing prohibiting the payment of rent or delivery of the property to
the proclaimed person or to anyone on his behalf; or
(d) by all or any two of this methods mentioned in sub-clauses (a), (b) and (c) as the
government may direct.
(4) If the property ordered to be attached consists of livestock or is of a perishable nature,
the Government may, if it thinks if expedient, order immediate sale thereof, and in such
case the sale shall abide by the order of the Government.
(5) The powers, duties and liabilities of an administrator appointed under this Article
shall be the same as those of a receiver appointed under Chapter XXXVI of the Code of
Civil Procedure, 1908 (Act V of 1908).
(6) If any claim is preferred to, or objection made to the attachment of, any property
attached under this Article, within seven days from the date of such attachment, by any
person other than the proclaimed person, on the ground that the claimant or objector has
an interest in such property, and that such interest is not liable to attachment under this
Article, the claim or objection shall be inquired into, and may be allowed or disallowed in
whole or in part:
Provided that any claim preferred or objection made within the period allowed by this
clause may, in the event of the death of the claimant or objector, be continued by his legal
representative.
(7) Acclaim or an objection under clause (6) may be preferred or made before such
person or authority as is appointed by the Government.
(8) Any person whose claim or objecting has been disallowed in whole or in part by an
order under clause (6) may, within a period of one month from the date of such order,
appeal against such order to an appellate authority, constituted by the Government, for
such purpose, but subject to the order of such appellate authority, the order shall be
conclusive.
(9) If the proclaimed person appears within the time specified in the proclamation, the
Government may make an order releasing the property from the attachment.
(10) If the proclaimed person does not appear within the time specified in the
proclamation, the Government may pass an order forfeiting to the Government the
property under attachment.
(11) When any property has been forfeited to the Government under clause (10), it may
be disposed of in such manner as the Government directs.
18. Notwithstanding the provisions of the Code or of any other law for the time being in
force, no action or proceeding taken or purporting to be taken under this Order shall be
called in question by any Court, and there shall be no appeal from any order or sentence
of a Special Tribunal save as provided in section 16.
SCHEDULE
PART I
Offences under sections 121, 121-A, 302, 304, 307, 376, 396 of the Penal Code and
attempts to commit or the abetment of the commission of any of such offences.
PART II
Offences under sections 308, 325, 326, 328, 329, 330, 331, 333, 354, 363, 364, 365, 367,
368, 369, 380, 382, 386, 388, 389, 392, 393, 394, 395, 397, 435, 436, 437, 438, 449 and
450 of the Penal Code and attempts to commit or the abetment of the commission of any
such offences.
PART III
Offences under sections 324, 332, 338, 343, 346, 348, 427, 428, 429, 430, 431 and 440 of
the penal code and attempts to commit or the abetment of the commission of any of the
offences.
PART IV

(a) Offences under sections 336, 337, 341, 342, 352, 357, 374, 426, 447 and 448 of the
penal code and attempts to commit or the abetment of the commission of any of the
offences.
(b) Any act which is mentioned is clause (b) of Article 2 of this order but which is not
covered by any of the parts in this schedule.

মনে রাখতে হবে এই আইনের উদ্দেশ্য দলমত নির্বিশেষে যুদ্ধকালীন অপরাধীদের বিচার করা নয়; বরং এই এলাকায় আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তির শুধু তথাকথিত ‘দালাল’দের হেনস্তা করা। ‘অপরাধের’ বিচার না করে ‘যুদ্ধ বিরোধিতার’ বিচার শুরু হল। অথচ ‘অপরাধ’ ও ‘যুদ্ধ-বিরোধিতা’ কখনো এক নয়। ন্যায় বিচারের দাবী ছিল দল-মত নির্বিশেষে ‘অপরাধীর’ বিচার করা। তা না করে তথাকথিত ‘দালালের’ বিচার প্রচেষ্টা চলল। উক্ত দালাল আদেশে দালালের এমন ব্যাপক সংজ্ঞা দেয়া হয় যাতে ২৬ শে মার্চ তারিখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যায়নি এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে দালাল বানানোর সুযোগ রয়ে গেল। সে সময়কার একটি সার্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের Bangladesh: Era of Sheikh Mujibur Rahman বইতেঃ

“…the wide definition of ‘collaborator’ which could include almost every one in the country who did not cross the border…. But as soon as the whole spectrum of law was put into operation it started receiving adverse reaction not so much for the intent of the law itself but for the way in which it was implemented. The police force by itself being weak and disorganized and the Awami League’s complete political control over the country provided a unique scope to go for motivated action under the cover of the law. While the law provided a due process for justice it also provided by its boundless powers to large section of the Awami League workers for revenge, extortion, torture, harassment, humiliation and blackmail. As a result, a large number of people were arrested or victimized on personal consideration. On the other hand, because of this role played by the Awami League in interfering with the process of law, some actual collaborators who could procure the party blessing either by bribery or personal relationship or patronage could get away from the wrath of the law. [7]

আবুল মনসুর আহমদের মূল্যায়নঃ

 

ন্যায়বিচার শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হল। ব্যথিত হল অনেক সচেতন বিবেক। তাদেরই অন্যতম ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রবীন রাজনীতিবিদ, পাকিস্তানের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রথিতযশা কথা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ। “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” গ্রন্থে তিনি তৎকালীন সরকারের এই আত্মঘাতি পদক্ষেপকে ‘চাঁদে কলঙ্ক’ আখ্যায়িত করে লিখেছেনঃ

“কিন্তু অকস্মাৎ ২৪শে জানুয়ারি আমাদের রাজনৈতিক চাঁদে কলঙ্ক দেখা দিল। কলঙ্ক ত নয়, একেবারে রাহু, সে রাহুতে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হইল। রাহু দুইটি। প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার নম্বর ৮ ও ৯। একটার নাম দালাল আইন। আরেকটার নাম সরকারী চাকুরী আইন। উভয়টাই সর্বগ্রাসী ও মারাত্মক। একটা গোটা জাতিকে, অপরটা গোটা প্রশাসনকে দ্বিখণ্ডিত করিয়াছে। সে সবের প্রতিকার দুঃসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। অথচ এ দুইটা পদক্ষেপই ছিল সম্পূর্ণ অনাবশ্যক।

সব দমননীতিমূলক আইনের মতই দালাল আইনেরও ফাঁক ছিল নির্বিচারে অপপ্রয়োগের। হইয়াও ছিল দেদার অপপ্রয়োগ। ফলে নির্যাতন চলিয়াছে বেএন্তেহা। যে আওয়ামী লীগ নীতিতঃই নিবর্তনমূলক আইনের বিরোধী, একজন লোককেও বিনা-বিচারে একদিনও আটক না রাখিয়া দেশ শাসন যে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য, সেই আওয়ামী লীগেরই স্বাধীন আমলে অল্পদিনের মধেই ত্রিশ চল্লিশ হাজার নাগরিক গ্রেফতার হইয়াছেন এবং বিনা-বিচারে প্রায় দুই বছর কাল আটক আছেন। বেশী না হইলেও প্রায় সম-সংখ্যক লোক বাড়ী-ঘর ছাড়িয়া ভিন্ন-ভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করিয়া বেড়াইতেছেন। গ্রেফতারিত ব্যক্তিরা যামিনাদি ব্যাপারে আদালতি সুবিধা পাইতেছেন না। অতি অল্প-সংখ্যক লোক ছাড়া কারো বিরুদ্ধে চার্জশীট হইতেছে না। এমনকি, তদন্তও শেষ হয় নাই। এ সবই সর্বাত্মক দমন আইনের উলংগ রূপ ও চরম অপপ্রয়োগ। [8]

 

স্বাধীনতা বিরোধীতা বনাম যুদ্ধাপরাধঃ

বিচার নিয়ে অতিমাত্রায় ‘রাজনীতি’ করার  ফলে আসল অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল। স্বাধীনতার বিরোধিতা ও যুদ্দাপরাধ প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হতে লাগল। এ প্রসংগে আবুল মনসুর আহমদ কিছু ঐতিহাসিক উদাহরণ দিয়ে বলেনঃ

“তবু এটাই এ আইনের  চরম মারাত্মক রূপ নয়। নাগরিকদের ব্যক্তিগত ভোগান্তি ছাড়াও এ আইনের একটা জাতীয় মারাত্মক দিক আছে। এই আইন গোটা জাতিকে ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘দেশদ্রোহী’ এই দুই ভাগে বিভক্ত করিয়াছে। অথচ দেশবাসীর চরিত্র তা নয়। ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিব যখন দেশে ফিরেন, তখন তিনি কোন দলের নেতা ছিলেন না। নেতা ছিলেন তিনি গোটা জাতির। তাঁর নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত হইয়া মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের যে স্বাধীনতা আনিয়াছিলেন সেটা কোন দল বা শ্রেণীর স্বাধীনতা ছিল না। সে স্বাধীনতা ছিল দেশবাসী সকলের ও প্রত্যেকের। এমনকি যাঁরা স্বাধীনতার বিরোধিতা করিয়াছিলেন তাঁদেরও। সব দেশের স্বাধীনতা লাভের ফল তাই। ভারতের স্বাধীনতা আনিয়াছিলেন কংগ্রেস; অনেকেই তার বিরোধিতা করিয়াছিলেন। পাকিস্তানের স্বাধীনতা আনিয়াছিলেন মুসলিম লীগ। অনেকেই তার বিরোধিতা করিয়াছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর সবাই সে স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করিতেছেন। স্বাধীনতার বিরোধিতা করার অপরাধে কাউকে শাস্তি ভোগ করিতে হয় নাই। কোন দেশেই তা হয় না। কারণ, স্বাধীনতার আগে ওটা থাকে রাজনৈতিক মতভেদ। শুধু স্বাধীনতা লাভের পরেই হয় ওটা দেশপ্রেম ও দেশদ্রোহিতার প্রশ্ন। সব স্বাধীনতা সংগ্রামের বেলাই এটা সত্য। বাংলাদেশের ব্যাপারে এটা আরো বেশী সত্য। বাংলাদেশের সংগ্রাম শুরু হয় নিয়মতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে। সে নির্বাচনে স্বাধীনতা নির্বাচনী ইশু ছিল না। আওয়ামী লীগও অন্যান্য পার্টির মতই পাকিস্তান-ভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচীর ভিত্তিতে নির্বাচন লড়িয়াছিল।” [9]

দায়মুক্তি আদেশঃ

দালাল আদেশের নামে একতরফা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। যুদ্ধ চলাকালে ও যুদ্ধোত্তর পর্যায়ে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকামী লোকদের হাতেও অসংখ্য নিরীহ মানুষ হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের অভিযোগ উঠতে থাকে। জনতা তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু, তৎকালীন সরকার একটি আইন জারী করে তার নিজ বলয়ের  লোকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার রাস্তা বন্ধ করে দেয়। পুরো আইনটি নীচে উদ্ধৃত করা হল।

THE BANGLADESH NATIONAL LIBERATION STRUGGLE (INDEMNITY) ORDER, 1973

(PRESIDENT’S ORDER NO. 16 OF 1973).

  [28th February, 1973]

WHEREAS it is expedient to provide for indemnity to persons in the service of the Republic and to other persons in respect of act done in connection with the national liberation struggle, the maintenance or restoration of order;

NOW, THEREFORE, in pursuance of paragraph 3 of the Fourth Schedule to the Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, and in exercise of all powers enabling him in that behalf, the President is pleased to make the following Order:-

1. (1) This Order may be called the Bangladesh National Liberation Struggle (Indemnity) Order, 1973.

(2) It shall come into force at once and shall be deemed to have taken effect on the 26th day of the March, 1972.

2. No suit, prosecution or other legal proceeding shall lie in any Court against any person for or on account of or in respect of any act done during the period from the 1st day of March, 1971 to the 16th day of December, 1971, in connection with the struggle for national liberation or for maintenance or restoration of order up to the 28th day of February, 1972.

[১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত যে সকল কাজ সম্পাদিত হয়েছে অথবা ১৯৭২ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত আইন শৃংখলা বজায় রাখার জন্য যে সকল কাজ সম্পাদিত হয়েছে তার কোন একটির জন্যও কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন প্রকার মামলা-মকদ্দমা কিংবা অন্য কোন আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। ]

3. A public prosecutor shall, upon the Government certifying that a case against any person in the service of the Republic or against any other person for or on account of or in respect of any act done by him during the period from the 1st day of March, 1971, and the 28th day of February, 1972, is an act done in connection with national liberation struggle or for maintenance or restoration of order, apply to the court and upon submission of such application the court shall not proceed further with the case, which shall be deemed to be withdrawn, and the accused person shall forthwith be discharged.

4. The Government may make rules for carrying out the purposes of this Order.

যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৫শে মার্চের রাতের আক্রমনের পর থেকে। অথচ উক্ত আইনের মাধ্যমে ১লা মার্চ থেকে কৃত প্রত্যেকটি কাজের দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে। অধিকন্তু, যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বরে। অথচ দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে পরবর্তী বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কৃত প্রত্যেকটি কাজের জন্য। যুদ্ধকালীন সময়টাকে না হয় বাদই দিলাম। তারপরও প্রশ্ন জাগে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের ২৫ দিন এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের আড়াই মাস এমন কী ঘটেছিল যার জন্য যথারীতি আইন করে দায়মুক্তি দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল? ‘দালাল’ বধের ফটো (চিত্র ২)থেকে এর উত্তর কিছুটা আঁচ করা যেতে পারে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রচেষ্টাঃ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩

 

দালাল আইনে এদেশীয় ‘দালাল’দের বিচার চলতে থাকা অবস্থায় ‘যুদ্ধাপরাধী’দের বিচারের দাবী বেশ জোরদার হয়ে উঠে। কিছুদিনের মধ্যে তৎকালীন সরকার ১৯৫ জন ‘যুদ্ধাপরাধী’র তালিকা প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, তালিকার সবাই ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা। উক্ত তালিকায় এ এলাকার কোন ব্যক্তির নাম ছিল না। এদেশীয় লোকদের দালাল আইনে গ্রেফতার করে ‘দালাল’ হিসেবে বিচার করা হচ্ছিল; ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে নয়।

‘যুদ্ধাপরাধী’দেরকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য তৎকালীন সরকার ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন’ (The International Crimes (Tribunals) Act, 1973) জারী করে। শুরু থেকেই এ আইনটি একটি কালা কানুন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কারণ, এ আইনের মাধ্যমে বিচার সংশ্লিষ্ট মৌলিক মানবাধিকারগুলোকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। সাংবিধানিক আইনের স্বীকৃত মূলনীতি অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি যে কোন আইন অসাংবিধানিক ও বাতিল বলে পরিগণিত হতে বাধ্য। [10] উক্ত কালা কানুনটির বিরুদ্ধে অসাংবিধানিকতার অভিযোগ ওঠা অবশ্যম্ভাবী – এরকম আশংকার প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার সাংবিধানিক আইনের নিয়মানুযায়ী উক্ত আইনের খসড়া থেকে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি  ধারাগুলোকে সংশোধন করার পরিবর্তে (উক্ত আইন পাশ করার মাত্র ৫ দিন আগে ১৫ ই জুলাই) খোদ সংবিধানকে সংশোধন করে বলে দিল যে, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকল্পে প্রণীত আইনের কোন বিধান এই সংবিধানের কোন বিধানের পরিপন্থি হওয়ার কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া গন্য হইবে না[11] অন্য কথায়, উক্ত আইনটি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি হওয়া সত্বেও শুদ্ধ হিসেবে গন্য হবে।

সিমলা চুক্তিঃ

কিন্তু গোল বাধে অন্য জায়গায়। মূলত যাদের বিচার করার জন্য এই মহা আয়োজন সেই ১৯৫ ‘যুদ্ধাপরাধী’ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রনে নেই; যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই ভারত তাদের বিশাল বহরকে নিজ দেশে নিয়ে আটকে রেখেছে। ইতোমধ্যে ১৯৭২ সালের ২৮শে জুন থেকে ২রা জুলাই ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভূট্টো সিমলায় মিলিত হয়ে ‘নতুন সূচনা’ (New Beginning) ও ‘অতীত ভুলে যাও, সন্মুখপানে তাকাও’ (Forget the past and look to the future) – নীতিতে ঐকমত্য প্রকাশ করে। আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে কিছু বলা না হলেও সিমলা চুক্তিকে (Simla Agreement) যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ মনে করা হয়। কারণ, চুক্তিতে দুই পক্ষই সকল প্রকার মতপার্থক্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অথবা অন্য কোন শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের ব্যাপারে একমত পোষণ করে। আর সে সময় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সবচেয়ে দৃশ্যমান মতপার্থক্য ছিল যুদ্ধবন্দী ইস্যুটি। এরই প্রেক্ষিতে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন’ (The International Crimes (Tribunals) Act, 1973) জারী করে।

ভারতে অবস্থানরত পাকিস্তানের যুদ্ধবন্দী [12]

দিল্লী চুক্তিঃ

কিন্তু, ১৯৭৩ সালের ২৮শে আগস্ট দিল্লী চুক্তির (Delhi Agreement) মাধ্যমে ভারতে আটক পাকিস্তানের যুদ্ধবন্দীদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার (REPATRIATION) সুযোগ করে দেয়া হয়।

AGREEMENT BETWEEN THE GOVERNMENT OF INDIA AND THE GOVERNMENT OF THE ISLAMIC REPUBLIC OF PAKISTAN
REGARDING REPATRIATION OF PERSONS  

New Delhi, 28 August 1973

Desirous of solving the humanitarian problems resulting from the conflict of 1971 and thus enabling the vast majority of human beings referred to in the Joint Indo-Bangladesh Declaration to go to their respective countries, India and Pakistan have reached the following agreement :

(i) The immediate implementation of the solution of these humanitarian problems is without prejudice to the respective positions of the Parties concerned relating to the case of 195 prisoners of war referred to in clauses (vi) and (vii) of this paragraph;

(ii) Subject to clause (i) repatriation of all Pakistani prisoners of war and civilian internees will commence from the utmost despatch as soon as logistic arrangements are completed and from a date to be settled by mutual agreement;

(iii) Simultaneously, the repatriation of all Bangalees in Pakistan, and all Pakistanis in Bangladesh referred to in clause (v) below, to their respective countries will commence;

(iv) In the matter of reparticiation of all categories of persons the principle of simultaneity will be observed throughout as far as possible;

(v) Without prejudice to the respective positions of Bangladesh and Pakistan on the question of non-Bangalees, who are stated to have “opted for repatriation to Pakistan”, the Government of Pakistan guided by considerations of humanity, agrees, initially, to receive a substantial number of such non-Bangalees from Bangladesh.  It is further agreed that the Prime Ministers of Bangladesh and Pakistan or their designated representatives will thereafter meet to decide what additional number of persons, who may wish to migrate to Pakistan, may be permitted to do so.  Bangladesh has made it clear that it will participate in such a meeting only on the basis of sovereign equality;

(vi) Bangladesh agrees that no trials of the 195 prisoners of war shall take place during the entire period of repatriation and that pending the settlement envisaged in clause (vii) below these prisoners of war shall remain in India;

(vii) On completion of repartriation of Pakistan prisoners of war and civilian internees in India; Bangalees in Pakistan and Pakistanis in Bangladesh referred to in clause (v) above, or earlier, if they so agree, Bangladesh, India and Pakistan will discuss and settle the question of 195 prisoners of war.  bangladesh has made it clear that it can participate in such a meeting only on the basis of sovereign equality.

The Special representatives are confident that the completion of repatriation provided for in this Agreement would make a signal contribution to the promotion of reconciliation in the sub-continent and create an atmosphere favorable to a constructive outcome of the meeting of the three countries;

(viii) The time schedule for the completion of repatriation of the Pakistani prisoners of war and civilian internees from India, the Bangalees from Pakistan and the Pakistanis referred to in clause (v) above from Bangladesh, will be worked out by India in consultation with Bangladesh and Pakistan, as the case may be.  The Government of India will make the logistic arrangements for the Pakistani prisoners of war and civilian internees who are to be repatriated to Pakistan.  The Government of Pakistan will make logistic arrangements within its territory upto agreed points of exit for the repatriation of Bangladesh nationals to Bangladesh.  The Government of Bangladesh will make necessary arrangements for the transport of these persons from such agreed points of exit to Bangladesh.  The Government of Bangladesh will make logistic arrangements within its territory upto agreed points of exit for the movement of the Pakistanis referred to in clause (v) above who will go to Pakistan.  The Government of Pakistan will make necessary arrangements for the transport of these persons from such agreed points of exit to Pakistan.  In making logistic arrangements the Governments concerned may seek the assistance of international humanitarian organisations and others;

(ix) For the purpose of facilitating the repatriation provided for in this Agreement, the representatives of the Swiss Federal Government and any international humanitarian organisation entrusted with this task shall have unrestricted access at all times to Bangalees in Pakistan and to Pakistanis in Bangladesh referred to in clause (v) above.  The Government of Bangladesh and the Government of Pakistan will provide all assistance and facilities to such representatives in this regard including facilities for adequate publicity for the benefit of the persons entitled to repatriation under this Agreement;

(x) All persons to be repatriated in accordance with this Agreement will be treated with humanity and consideration.

The Government of India and the Government of Pakistan have concurred in this Agreement.  The Special Representative of the Prime Minister of India, having consulted the Government of Bangladesh has also conveyed the concurrence of Bangladesh Government in this Agreement.

DONE in New Delhi on August 28, 1973 in three originals, all of which are equally authentic.

Sd/-                                                                                     Sd/-
P.N.HAKSAR                                                            AZIZ AHMED
Special Representative                                              Minister of State for
of the Prime Minister of India                      Defence and Foreign Affairs,
Government of Pakistan

সাধারণ ক্ষমাঃ

অতঃপর ৩০ নভেম্বর ১৯৭৩ একটি সাধারণ ক্ষমা (General Amnesty) ঘোষণার মাধ্যমে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ- এই চারটি অপরাধে অভিযুক্তদের বাদে বাকিদের ক্ষমা করে দেয়া হয়। ফলে হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া বাকি সবাই মুক্তি পায়। এখানে উল্লেখ্য যে, বেশীর ভাগ লোকের মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের মহত্বের তেমন কোন দখল নেই। কারণ, (আবুল মনসুর আহমদের উদ্ধৃতিতেই যা বিদ্যমান) হাতে গোনা কিছু লোক বাদ দিয়ে বাকিদের বিরুদ্ধে সরকার কোন চার্জশীটও দাখিল করতে পারে নি। ফলে সরকার দেশ-বিদেশে এই ইস্যুতে বেশ চাপের মুখে পড়ে। তাছাড়া, উপরোক্ত চারটি অপরাধ বাদ দিলে এমন কোন অপরাধ থাকে না যদ্দরুন অসংখ্য মানুষকে বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটক রাখা যেতে পারে। এ প্রসংগে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন,

“… সেই আওয়ামী লীগেরই স্বাধীন আমলে অল্প দিনের মধ্যেই ত্রিশ-চল্লিশ হাজার নাগরিক গ্রেফতার হইয়াছেন এবং বিনা-বিচারে প্রায় দুই বছর কাল আটক আছেন। …তা না করিয়া যে পদক্ষেপ নেওয়া হইল, তার ফল হইল বিরূপ। ১০ই জানুয়ারি যেখানে শেখ মুজিবের বিরোধী একজনও ছিলন না, কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে চল্লিশ হাজার লোক তাঁর বিরোধী হইলেন। কয়েক মাস পরে চল্লিশ হাজার বাড়িয়া চল্লিশ লাখ হইল। তাদের বিরোধিতা সক্রিয় না হইলেও ক্রিয়াশীল হইল। নেতৃত্বের প্রতি জনগনের আস্থায় ফাটল ধরিল। অনাস্থা হইতে সন্দেহ, সন্দেহ হইতে অবিশ্বাস, অবিশ্বাস হইতে শত্রুতা পয়দা হইল। পল্লী-গ্রামের স্বাভাবিক সামাজিক নেতৃত্ব যে আলেম সমাজ ও মাতব্বর শ্রেণী, তাঁদের প্রভাব তছনছ হইয়া গেল। ছাত্র-তরুনদের উপর শিক্ষক-অধ্যাপকদের আধিপত্যের অবসান ঘটিল। সে সামগ্রিক সন্দেহ, দলাদলি ও অবিশ্বাসের মধ্যে মুক্তি-যোদ্ধাদের অস্ত্র প্রত্যর্পণ ব্যাহত হইল। দেশের আইন-শৃংখলার প্রতি কারো শ্রদ্ধা থাকিল না। স্বভাব-দুস্কৃতিকারীরা এর সুযোগ গ্রহন করিল। সে সর্বজনীন অশান্তি ও বিশৃংখলা পুলিশ বাহিনীর আওতার বাহিরে চলিয়া গেল।” [13]

সাধারণ ক্ষমার মহত্ব প্রসংগে তিনি লিখেছেন,

“তারপর প্রায় দুই বছর পরে যখন সরকার তথাকথিত দালালদের ‘ক্ষমা’ করিলেন, তখন সে ক্ষমার মহত্ত্ব ত থাকিলই না, দুই বছরের তিক্ততায় তা রাষ্ট্রের কোন কল্যাণেই লাগিল না। চাকা আর উল্টা দিকে ঘুরিল না।” [14]

[প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা  ]   

 

 

 

 

ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (Tripartite Agreement):

 

১৯৫ যুদ্ধবন্দীর (যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করেছিল) বিষয়টি তখনো পর্যন্ত অমীমাংসীত রয়ে গেল। ইতোমধ্যে  ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে ‘ক্ষমা কর ও ভুলে যাও’ (Forgive and forget) – নীতির ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়ার জন্য অনুরোধ করে। এর জবাবে শেখ মুজিবুর রহমান জানিয়ে দিলেন, ‘বাংলাদেশের জনগন ক্ষমা করতে জানে’ (The people of Bangladesh know how to forgive)। অতঃপর লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ যোগদান করে। এসকল ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষিতে ১৯৫ যুদ্ধবন্দীর বিষয়টি চূড়ান্তভাবে  মীমাংসা করার উদ্দেশ্যে ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ নয়া দিল্লীতে এক ত্রিপক্ষীয় (ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) চুক্তি (Tripartite Agreement) স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫ যুদ্ধবন্দীর বিচারের ইতি টানা হয়।

Tripartite Agreement between India, Bangladesh and Pakistan for normalisation of relations in the subcontinent

New Delhi, April 9, 1974.

1. On July 2, 1972, the President of Pakistan and the Prime Minister of India signed an historic agreement at Shimla under which they resolved that the two countries put an end to the conflict and confrontation that have hitherto marred their relations and work for the promotion of a friendly and harmonious relationship and the establishment of durable peace in the sub-continent. The Agreement also provided for the settlement of “their differences by peaceful means through bilateral negotiations or by any other peaceful means mutually agreed upon.”

2. Bangladesh welcomed the Shimla Agreement. The Prime Minister of Bangladesh strongly supported its objective of reconciliation, good neighborliness and establishment of durable peace in the sub-continent.

3. The humanitarian problems arising in the wake of the tragic events of 1971 constituted a major obstacle in the way of reconciliation and normalisation among the countries of the sub-continent. In the absence of recognition, it was not possible to have tripartite talks to settle the humanitarian problems, as Bangladesh could not participate in such a meeting except on the basis or sovereign equality.

4. On April 17, 1973 India and Bangladesh took a major step forward to break the deadlock on the humanitarian issues by setting aside the political problems of recognition. In a Declaration issued on that date they said that they “are resolved to continue their efforts to reduce tension, promote friendly and harmonious relationship in the sub-continent and work together towards the establishment of a durable peace.” Inspired by this vision and “in the larger interests of reconciliation, peace and stability in the sub-continent” they jointly proposed that the problem of the detained and stranded persons should be resolved on humanitarian considerations through simultaneous repatriation of all such persons except those Pakistani prisoners of war who might be required by the Government of Bangladesh for trial on certain charges.

5. Following the Declaration there were a series of talks between India and Bangladesh and India and Pakistan. These talks resulted in an agreement at Delhi on August 28, 1973 between India and Pakistan with the concurrence of Bangladesh, which provided for a solution of the outstanding humanitarian problems.

6. In pursuance of this Agreement, the process of three-way repatriation commenced on September 19, 1973. So far nearly 300,000 persons have been repatriated which has generated an atmosphere of reconciliation and paved the way for normalisation of relations in the sub-continent.

7. In February 1974, recognition took place thus facilitating the participation of Bangladesh in the tripartite meeting envisaged in the Delhi Agreement, on the basis of sovereign equality. Accordingly His Excellency Dr. Kamal Hossain, Foreign Minister of the Government of Bangladesh, His Excellency Sardar Swaran Singh, Minister of External Affairs, Government of India and His Excellency Mr. Aziz Ahmed, Minister of State for Defense and Foreign Affairs of the Government of Pakistan met in New Delhi from April 5th to April 9th, 1974 and discussed the various issues mentioned in the Delhi Agreement in particular the question of the 195 prisoners of war and the completion of the three-way process of repatriation involving Bengalese in Pakistan, Pakistanis in Bangladesh and Pakistani prisoners of war in India.

8. The Ministers reviewed the progress of the three-way repatriation under the Delhi Agreement of August 28, 1973. They were gratified that such a large number of persons detained or stranded in the three countries had since reached their destinations.

9. The Ministers also considered steps that needed to be taken in order expeditiously to bring the process of the three-way repatriation to a satisfactory conclusion.

10. The Indian side stated that the remaining Pakistani prisoners of war and civilian internees in India to be repatriated under the Delhi Agreement, numbering approximately 6,500, would be repatriated at the usual pace of a train on alternate days and the likely short-fall due to the suspension of trains from April 10th to April 19th, 1974 on account of Kumbh Mela, would be made up by running additional trains after April 19th. It was thus hoped that the repatriation of prisoners of war would be completed by the end of April 1974.

11. The Pakistan side stated that the repatriation of Bangladesh nationals from Pakistan was approaching completion. The remaining Bangladesh nationals in Pakistan would also be repatriated without let or hindrance.

12. In respect of non-Bengalese in Bangladesh, the Pakistan side stated that the Government of Pakistan had already issued clearances for movement to Pakistan in favour of those non-Bengalees who were either domiciled in former West Pakistan, were employees of the Central Government and their families or were members of the divided families, irrespective of their original domicile. The issuance of clearances to 25,000 persons who constitute hardship cases was also in progress. The Pakistan side reiterated that all those who fall under the first three categories would be received by Pakistan without any limit as to numbers. In respect of persons whose applications had been rejected, the Government of Pakistan would, upon request, provide reasons why any particular case was rejected. Any aggrieved applicant could, at any time, seek a review of his application provided he was able to supply new facts or further information to the Government of Pakistan in support of his contention that he qualified in one or other of the three categories. The claims of such persons would not be time-barred. In the event of the decision of review of a case being adverse, the Governments of Pakistan and Bangladesh might seek to resolve it by mutual consultation.

13. The question of 195 Pakistani prisoners of war was discussed by the three Ministers, in the context of the earnest desire of the Governments for reconciliation, peace and friendship in the sub-continent. The Foreign Minister of Bangladesh stated that the excesses and manifold crimes committed by these prisoners of war constituted, according to the relevant provisions of the U.N. General Assembly Resolutions and International Law, war crimes, crimes against humanity and genocide, and that there was universal consensus that persons charged with such crimes as the 195 Pakistani prisoners of war should be held to account and subjected to the due process of law. The Minister of State for Defense and Foreign Affairs of the Government of Pakistan said that his Government condemned and deeply regretted any crimes that may have been committed.

14. In this connection the three Ministers noted that the matter should be viewed in the context of the determination of the three countries to continue resolutely to work for reconciliation. The Ministers further noted that following recognition; the Prime Minister of Pakistan had declared that he would visit Bangladesh in response to the invitation of the Prime Minister of Bangladesh and appeal to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the, past, in order to promote reconciliation. Similarly, the Prime Minister of Bangladesh had declared with regard to the atrocities and destruction committed in Bangladesh in 1971 that he wanted the people to forget the past and to make a fresh start, stating that the people of Bangladesh knew how to forgive.

15. In the light of the foregoing and, in particular, having regard to the appeal of the Prime Minister of Pakistan to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past, the Foreign Minister of Bangladesh stated that the Government of Bangladesh had decided not to proceed with the trials as an act of clemency. It was agreed that the 195 prisoners of war may be repatriated to Pakistan along with the other prisoners of war now in the process of repatriation under the Delhi Agreement.

16. The Ministers expressed their conviction that the above agreements provide a firm basis for the resolution of the humanitarian problems arising out of the conflict of 1971. They reaffirmed the vital stake the seven hundred million people of the three countries have in peace and progress and reiterated the resolve of their Governments to work for the promotion of normalisation of relations and the establishment of durable peace in the sub-continent.

Signed in New Delhi on April 9th, 1974 in three originals, each of which is equally authentic.

Sd/-                                           Sd/-                                             Sd/-

(KAMAL HOSSAIN)           SWARAN SINGH)                   (AZIZ AHMED)

Minister of Foreign Affairs        Minister of External Affairs                 Minister of State for

Government of Bangladesh.          Government of India.                    Defense and foreign Affairs

Government of Pakistan

ত্রিপক্ষীয় (ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) চুক্তিতে (Tripartite Agreement) উপস্থিত (বা থেকে) বাংলাদেশের পক্ষে ডঃ কামাল হোসেন, ভারতের শরণ সিং ও পাকিস্তানের আজিজ আহমেদ।

ফলে যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন’ (The International Crimes (Tribunals) Act, 1973) জারী করা হয়েছিল,  ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ ‘ক্ষমা কর ও ভুলে যাও’ (Forgive and forget) – নীতির ভিত্তিতে নয়া দিল্লীতে স্বাক্ষরিত এই ত্রিপক্ষীয় (ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) চুক্তির (Tripartite Agreement) মাধ্যমে তার ইতি  টানা হয়।

দালাল আদেশ রহিতকরণঃ

 

উক্ত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর দালাল আইনে আর নতুন কোন মামলা দায়ের করা হয়নি। অধিকন্তু, অনেকের মতে দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। বিভিন্ন মহল থেকে এই আত্মঘাতি আইন বাতিলের দাবিও উঠেছিল বার বার। এরই প্রেক্ষিতে পচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭৫ একটি অধ্যাদেশের (The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) (Repeal) Ordinance, 1975) মাধ্যমে দালাল আদেশ বাতিল করা হয়।

VOLUME    XIX

THE BANGLADESH COLLABORATORS (SPECIAL TRIBUNALS) (REPEAL) ORDINANCE, 1975

(ORDINANCE NO. LXIII OF 1975).

[ 31st December, 1975 ]

     An Ordinance to repeal the Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972

WHEREAS it is expedient to repeal the Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972 (P.O. No. 8 of 1972), and to provide for certain matters ancillary thereto;

NOW, THEREFORE, in pursuance of the Proclamations of the 20th August, 1975, and 8th November, 1975, and in exercise of all powers enabling him in that behalf, the President is pleased to make and promulgate the following Ordinance:-

 

 

SECTIONS

1.Short title: This Ordinance may be called the Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) (Repeal) Ordinance, 1975.

2.Repeal of P.O. No. 8 of 1972: 2. (1) The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972 (P.O. No. 8 of 1972), hereinafter referred to as the said Order, is hereby repealed.

(2) Upon the repeal of the said Order under sub-section (1), all trials or other proceedings thereunder pending immediately before such repeal before any Tribunal, Magistrate or Court, and all investigations or other proceedings by or before any Police Officer or other authority under that Order, shall abate and shall not be proceeded with.

(3) Nothing in sub-section (2) shall be deemed to affect –

(a) the continuance of any appeal against any conviction or sentence by any Tribunal, Magistrate or Court under the said Order; or

(b) except to the extent provided in that sub-section, the operation of section 6 of the General Clauses Act, 1897 (X of 1897).

এভাবেই ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন সমস্যার আইনগত পরিসমাপ্তি ঘটে।

 

এক নজরে আইনগত পদক্ষেপ সমূহঃ

 

  • ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ (The Bangladesh Colloborators (Special Tribunals) Order, 1972)
  • ২রা জুলাই ১৯৭২ সিমলা চুক্তি (The Simla Agreement)
  • ২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম (দায় মুক্তি) আদেশ (The Bangladesh National Liberation Struggle (Indemnity) Order, 1973)
  • ২০ জুলাই ১৯৭৩  ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন’ (The International Crimes (Tribunals) Act, 1973)
  • ২৮শে আগস্ট ১৯৭৩  দিল্লী চুক্তি (The Delhi Agreement)
  • ৩০ নভেম্বর সাধারণ ক্ষমা (General Amnesty)
  • ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (Tripartite Agreement between India, Bangladesh and Pakistan for normalization of relations in the subcontinent, New Delhi, April 9, 1974.)
  • ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭৫ বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ (The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) (Repeal) Ordinance, 1975)

 

মীমাংসীত ইস্যুর পুনরুত্থান (Resurrection) প্রেক্ষাপট:

 

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেনি। ১৭টি আসনে বিজয়ী হওয়ার প্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামী কোয়ালিশন সরকার গঠনের ব্যালান্সিং পয়েন্টে চলে আসে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রয়োজনে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগীতা চায়। জামায়াত বিএনপি কে সমর্থন দেয়ার পরপরই আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীতার অভিযোগ এনে আন্দোলন শুরু করে। তারপর তারা ঘাদানিকের ব্যানারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘জনতার আদালত’ তৈরী করে অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ডজনখানেক অভিযোগ উত্থাপন করে প্রতিকী বিচারে  তাঁর ফাসি ঘোষণা করে। কিন্তু, এ সকল ইস্যু আদালতে নিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট অধ্যাপক গোলাম আযমকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে। [15] ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর আওয়ামী লীগ এ ইস্যুটি নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্য করে নি।

 

 

কেন বিশেষ ট্রাইবুনালের প্রয়োজন?

 

কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে ভরাডুবি হওয়ার পর আওয়ামী লীগ ইস্যুটি আবার সামনে নিয়ে আসে। ‘পরের মাথায় লবন রেখে বরই খাওয়ার’ স্টাইলে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ কমপক্ষে শুরু করে দেয়ার জন্য এক এগারোর অগনতান্ত্রিক মইন-ফখর সরকারের উপর তারা প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু  এক এগারোর সরকার তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিল। এ পরামর্শ তাদের পছন্দ হওয়ার কথা নয়। কারণ, তারা চাচ্ছিল পছন্দসই কয়েকজন বিচারক দিয়ে একটি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে খুব দ্রুত তাদের রাজনৈতিক পথের ‘কাঁটাগুলোকে’ সরিয়ে দিতে। অথচ বিষয়টি আদালতে নিয়ে গেলে নিজেদের পছন্দমত রায় পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। সে সময় তাদের এক তাত্ত্বিক মন্ত্রক আবেদ খান বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে এরকম আশংকাই প্রকাশ করেছিলেন। ‘আইনি হওয়া সত্ত্বেও বিষয়টি আপনারা আদালতে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন না কেন’ – বিবিসি সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে আবেদ খান বলেছিলেন, “দেখুন! আমরা গোলাম আযমের বিষয়টি আদালতে নিয়ে গিয়েছিলাম। আদালত কিন্তু তার নাগরিকত্ব দিয়ে দিয়েছে।”

ইতোমধ্যে তারা নিজেদের প্রভাব বলয়ের মিডিয়াগুলো ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। অথচ, যথাযোগ্য আদালত কর্তৃক অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে ‘অপরাধী’ হিসেবে অভিহিত করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

দিনবদলের সরকার ও যুদ্ধাপরাধের বিচারঃ

 

হতদরিদ্র মানুষকে ভাগ্য পরিবর্তনের আকাশ কুসুম স্বপ্ন আর রকমারী প্রতিশ্রুতির মায়াবী চাদরে জড়িয়ে আন্দোলনকারীরা দুই তৃতীয়াংশেরও বেশী আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য মিডিয়া ট্রায়ালের পাশাপাশি সরকার বহু ভেবে চিন্তে আইনের কেতাব থেকে ১৯৭৩ সালের কালা কানুনটিকে [‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন’ (The International Crimes (Tribunals) Act, 1973)] খুঁজে বের করে। অথচ ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ নয়া দিল্লীতে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই আইনটির মূল উদ্দেশ্যের ইতি টানা (dropped) হয়েছিল। তাছাড়া, বিচার সঙ্ক্রান্ত মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থি হওয়ার দিক দিয়েও এ আইনটি শুরু থেকেই বেশ কুখ্যাতি অর্জন করেছে।

যুদ্ধাপরাধী থেকে মানবতা বিরোধী:

 

“‘যুদ্ধাপরাধী’দের বিচার বাংলার মাটিতে হবেই”-শীর্ষক প্রচারণা যখন বেশ তুংগে, ঠিক তখনি সরকারের এক মন্ত্রী বিদেশ থেকে ফিরে সবাইকে চমকে দিয়ে ঘোষণা দিলেন, “সরকার ‘যুদ্ধাপরাধী’দের নয়, বরং ‘মানবতা বিরোধী’দের বিচার করবে।” অমনি সরকারের বাকি সবাই তাঁর সাথে কণ্ঠ মিলালেন।

পাঠকবর্গ নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে এ যাবৎ তারা চার চার বার শব্দ পরিবর্তন করেছেন। যুদ্ধের অব্যবহিত পরে ‘দালাল’, নব্বইয়ের দশকে ‘স্বাধীনতা বিরোধী’,নতুন শতকের শুরু থেকে মাস খানেক আগ পর্যন্ত ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও সর্বশেষ ‘মানবতা বিরোধী’। কিন্তু, অনেকেই বুঝে উঠতে পারছেন না যে, হঠাৎ এই শব্দ পরিবর্তনের কারণ কী। আমার মতে, এটা তাদের মানসিক অস্থিরতার ফল। একটি শব্দ ব্যবহারের পর তাদের বিবেক হয়তো বলে উঠে, “না! এটা দিয়ে নয়; বরং ঐ প্রক্রিয়ার অগ্রসর হলে অতি সহজে কেল্লা ফতে করা যাবে।” তাছাড়া, তাঁরা অনেক দেরীতে হলেও অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, যুদ্ধাপরাধ মূলত সংঘটিত হয় সামরিক বাহিনী দ্বারা। তাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের জিগির তোলে যাদেরকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিতে চান তারা সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার ফলে এই শব্দ ব্যবহারে বহুবিধ সমস্যা রয়েছে। তাই তাঁরা ‘মানবতা বিরোধী’ নামক একটি নিরিবিলি শব্দ বেছে নিয়েছেন। তাছাড়া, ‘মানবতা বিরোধী’ অপরাধ প্রমাণ করার জন্য খুব বেশী কষ্টেরও প্রয়োজন নেই। এমন প্রত্যেকটি অপরাধই ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ যা মানুষের বিবেকবোধকে নাড়া দেয় (crimes that shake human conscience)। ব্যস! প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর কী চাই!

দলমত নির্বিশেষে অপরাধীর বিচারের পূর্বাভাষ!

বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই সাহেবের (যার বিরুদ্ধে প্রায়শঃ একাত্তরের অনেক অপকর্মের অভিযোগ উত্তাপন করা হয়) অন্তর্ভুক্তি ও তার পিতার নাম রাজাকার বাহিনীর তালিকায় ১৪ নম্বরে থাকায় খোদ আওয়ামী লীগের ভিতরে ক্ষোভের সঞ্চার হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর বেয়াইর পিতা ‘রাজাকার’ হলেও ‘যুদ্ধাপরাধী’ ছিলেন না। অথচ স্বাধীনতার পর থেকেই তাদের ডিকশনারীতে ‘রাজাকার’ শব্দটি পাকিস্তানের দালাল, স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী ইত্যাকার শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গত জোট সরকারের শাসনামলেও তারা একটি শ্লোগানে (‘দেশবাসী হুশিয়ার, মন্ত্রিসভায় রাজাকার’) রাজাকার শব্দটিকে একই অর্থে ব্যবহার করেছিল।   অতএব, প্রস্তাবিত ‘মানবতা বিরোধী’দের বিচার পক্ষপাতদুষ্টতা থেকে কতটুকু মুক্ত থাকবে তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে কিছুটা আঁচ করা যেতে পারে।

jiarht@gmail.com


[1] অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, উপরোল্লেখিত কর্ম সম্পাদন না করে যুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতা করা কীভাবে সম্ভব। এর উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ এটি সম্ভব। ধরুন, একজন লোক সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে (practical battle field) অংশগ্রহন করল। অনিবার্যভাবে দুপক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটল। এখন বলা যেতে পারে লোকটি ‘এক পক্ষের যুদ্ধের’ সক্রিয় বিরোধিতা করেছে; কিন্তু তার বিরুদ্ধে ‘নিরীহ’ মানুষ হত্যার দায়সংক্রান্ত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা যেতে পারে না। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের কাজই হল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা।

[2] কেউ বলতে পারেন, উপরোক্ত নির্দেশদ্বয়ের কোনটিকে মেনে না নিয়ে চুপচাপ ঘরে বসে থাকার সুযোগও তো ছিল। এর জবাবে বলা যেতে পারে যে, প্রস্তাবটি আপাতত নির্জঞ্জাল ও নিরাপদ মনে হলেও তা মূলত মাত্রাতিরিক্ত ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা প্রসূত। রাষ্ট্রের চরম ক্রান্তিলগ্নে এহেন নির্লিপ্ততা ভীরু কাপুরুষদের কাছে খুবই পছন্দনীয় হলেও খোদ রাষ্ট্রের জন্য এমন জনগোষ্ঠী এক ধরনের দুঃসহ বোঝাস্বরূপ। কারণ, এ প্রকৃতির লোকেরা রাষ্ট্রযন্ত্রের তাবৎ সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে অতিশয় সচেতন; অথচ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তাদের অবস্থা অনেকটা ‘আমরা কী জানি?’ অথবা ‘তাতে আমাদের কী?’ কিংবা ‘বাপু আমরা রাজনীতি বুঝি না; ওসব রাজনৈতিক ব্যাপার রাজনীতিবিদরাই এর সমাধান করবেন’ – ধরনের। এমন নির্লিপ্ত ও মাত্রাতিরিক্ত স্বার্থতাড়িত লোক আর যাই হোক অন্তত রাষ্ট্রের চরম ক্রান্তিলগ্নে অনুসরনীয় আদর্শ স্থানীয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।]

[3] উইকিপিডিয়া Indo-Pak War of 1971

[4]সুত্রঃ টাইম ম্যাগাজিন আর্কাইভ:  http://www.time.com/time/photogallery/0,29307,1844754,00.html

[5] টাইম ম্যাগাজিন আর্কাইভ ও উইকিপিডিয়া

[6] সূত্রঃ টাইম ম্যাগাজিন আর্কাইভ http://www.time.com/time/photogallery/0,29307,1844754_1772102,00.html

[7] Moudud Ahmed, Bangladesh: Era of Sheikh Mujibur Rahman, University Press Limited, Dhaka, 1991, pp. 60-61

[8] আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, বাংলা একাডেমী ২০০১, পৃষ্ঠা ৪৬৮-৪৬৯

[9] আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, বাংলা একাডেমী ২০০১, পৃষ্ঠা ৪৬৮-৪৬৯

[10] বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬ (১)

[11] বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৭ (৩)]

[12] উইকিপিডিয়া, Indo- Pak War

[13] আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, বাংলা একাডেমী ২০০১, পৃষ্ঠা ৪৬৯-৪৭০

[14] আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, বাংলা একাডেমী ২০০১, পৃষ্ঠা ৪৭০

[15] Bangladesh v. Golam Azam, 46 DLR (AD)

Leave a comment

Filed under Uncategorized

দাদার সম্পত্তিতে নাতির অধিকার

১৪ মে ২০১০ দৈনিক নয়া দিগন্তের ইসলামী দিগন্ত পাতায় সম্পত্তিতে নাতিপুতির অধিকার শীর্ষক একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। লিখেছেন জনৈক মাওলানা সৈয়দ জিল্লুর রহমান। এই প্রবন্ধে তিনি দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে, দাদার উপস্থিতিতে ছেলে মারা গেলে নাতি অন্য ছেলের উপস্থিতিতে দাদার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে কোন অংশ পাবেনা মর্মে যে নিয়মটি চালু আছে তা মোটেই কুরআন সম্মত নয়। তাঁর ভাষায় তাদের (অর্থাৎ যারা উক্ত আইনটির বৈধতার প্রবক্তা) সব দালিলিক ভিত্তিও যৌক্তিকতার দিক থেকে দুর্বল ও ভিত্তিহীন। তারপর তিনি নাতির অধিকার প্রমাণ করার জন্য বেশ কয়েকটি যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। সে সকল যুক্তি প্রমাণের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা ই বর্তমান প্রবন্ধটির মূল উদ্দেশ্য।   

সূচীপত্র

উত্তরাধিকারের মূলনীতিঃ

প্রথম যুক্তিঃ

দ্বিতীয় যুক্তিঃ

তৃতীয় যুক্তিঃ

উত্তরনের উপায়ঃ

প্রথম প্রশ্নঃ

জবাবঃ

দ্বিতীয় প্রশ্নঃ

জবাবঃ

তৃতীয় প্রশ্নঃ

জবাবঃ

নির্দেশ মূলত দু’ ধরণেরঃ

কারণঃ

 

উত্তরাধিকারের মূলনীতিঃ

র্বাগ্রে মনে রাখতে হবে যে, উত্তরাধিকার বন্টনের জন্য কুরআন যে মূলনীতি নির্ধারণ করেছে তা এই নয় যে, যারা অভাবগ্রস্ত অথবা সহানুভুতি পাওয়ার যোগ্য তাদেরকে এই সম্পত্তি দেয়া হবে। বরং তা হচ্ছে এই যে, আত্মীয়তার দিক থেকে যে ব্যক্তি মৃতের “নিকটতর” (الاقرب) কেবল তারাই তার উত্তরাধিকারী হবে। নিকটতর আত্মীয়ের বর্তমানে অপেক্ষাকৃত দূর সম্পর্কের আত্মীয় ওয়ারিস হবে না।

للرجال نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون و للنساء نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون

অর্থাৎ, “মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা যে ধন-সম্পত্তি রেখে গেছে তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছে। আর মেয়েদেরও অংশ রয়েছে সেই ধন-সম্পত্তিতে, যা মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে।” (নিসা ৭)

কারা কারা মৃত ব্যক্তির নিকটতম তা মানবীয় বুদ্ধি বিবেচনার মাধ্যমে উদ্ঘাটনের জন্য ছেড়ে না দিয়ে কুরআন নিজেই তার ব্যাখ্যা প্রদান করেছে (দ্রষ্টব্য সূরা নিসার উত্তরধিকার আয়াতসমূহ)। এখানেই শেষ নয়; ব্যাখ্যার মাঝখানেই কুরআন পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছেঃ

لا تدرون ايهم اقرب لكم نفعا فريضة من الله ان الله كان عليما حكيما

অর্থাৎ, “তোমরা জানো না তাদের কে কে উপকারের দিক দিয়ে তোমাদের বেশী নিকটবর্তী। এসব অংশ আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ অবশ্যী সকল সত্য জানেন এবং সকল কল্যানময় ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন।” (নিসা ১১)

প্রথম যুক্তিঃ

মাওলানা সাহেবের প্রথম যুক্তি হচ্ছে, আরবী ابن (পুত্র) শব্দটি নাতিকেও অন্তর্ভুক্ত করে।অতএব কুরআন পুত্রের জন্য সম্পত্তিতে যে অধিকার রেখেছে তাতে নাতিও সমানভাবে অংশীদার। তাঁর কথাকে প্রমাণ করার জন্য তিনি কুরআনের দু’টি আয়াত উদ্ধৃত করেছেন। প্রথমটি সূরা নিসার এই আয়াত- و حلائل ابنائكم الذين من اصلابكم (তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ)। পুত্রের স্ত্রীর অনুরূপ প্রপৌত্রের স্ত্রীকেও বিয়ে করা হারাম। এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে ابن শব্দটি পুত্র- প্রপৌত্র উভয়কেই বুঝায়। অতএব উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও প্রপৌত্র পুত্রের সমান হিসেবে বিবেচিত হওয়া সম্পূর্ণ যৌক্তিক।

এর উত্তরে বলা যেতে পারে, ধরি কোন এক ব্যক্তির তিনজন পুত্র রয়েছে। তন্মধ্যে একজন চার পুত্র রেখে মারা গেছে।

পিতা

প্রপৌত্র ৪

প্রপৌত্র ২

প্রপৌত্র ৩

প্রপৌত্র ১

পুত্র ২

পুত্র ৩

পুত্র ১ (মৃত)

এক্ষেত্রে সম্পত্তিকে মোট ছয়টি ভাগ করে পুত্র ও প্রপৌত্র প্রত্যেকেই সমান উত্তরাধিকার লাভ করবে। মাওলানা সাহেব কি এই বিভাজন মেনে নিতে প্রস্তুত? উত্তর যদি ইতিবাচক হয় তাহলে জিজ্ঞাস্য হচ্ছে এতিম নাতির প্রতি আরোপিত ‘বেইনসাফি’ (?) ঠেকাতে গিয়ে সরাসরি পুত্রদের প্রতি কোন ধরণের ইনসাফ কায়েম করা হচ্ছে? সরাসরি পুত্র পাচ্ছে মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ, অন্যদিকে নাতিরা পাচ্ছে ছয় ভাগের ৪ ভাগ; অথচ তাদের পিতা জীবিত থাকলে মাত্র এক ভাগের মালিক হতেন।

মাওলানা সাহেব উত্তরাধিকার প্রসংগে বিয়ে সংক্রান্ত আইনের শব্দ (ابن) কে যেভাবে টেনে এনেছেন তাতে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, দাদার জন্য নাতবউ হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে ছেলে বা নাতির জীবিত না থাকার শর্ত না থাকলে নাতি যেহেতু (মাওলানা সাহেবের যুক্তি অনুযায়ী) পুত্রের সমতুল্য, তাহলে নাতি কর্তৃক সম্পত্তি লাভের ক্ষেত্রে তার পিতা জীবিত না থাকার শর্ত কুরআন-হাদীসের কোন জায়গা থেকে বের করা হচ্ছে? কারণ, তার পিতা জীবিত থাকুক বা নাই থাকুক- সর্বাবস্থায়ই সে দাদার(ابن)  পুত্র হওয়ার ক্ষেত্রে তার পিতার সমান। অতএব আমাদের উক্ত উদাহরণে পুত্র ১ যদি জীবিতও থাকতো তাহলেও সম্পত্তিতে  চার প্রপৌত্রের প্রত্যেকেই স্বীয় পিতার সমান অংশ লাভ করত। বাকী ছেলেদের সন্তান সন্তুতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একবার ভেবে দেখুনতো, কুরআন কি সত্যিই উত্তরাধিকার স্কীমের মাধ্যমে কয়েক পুরুষের অধস্তন প্রপৌত্রদেরকে সরাসরি পুত্রদের স্তরে টেনে এনে সমান অংশ দেয়ার অবকাশ রেখেছে? কুরআন-হাদীসের কোথাও এরকম অবকাশ থেকে থাকলে তা আমাদেরকে পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হোক।

আমরা মনে করি, বিয়ে সংক্রান্ত আইনের শব্দকে উত্তরাধিকার আইনে হুবহু প্রয়োগ করা নীতিগতভাবেই ভুল। কারণ, প্রথমটির উদ্দেশ্য বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পারিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এক্ষেত্রে কুরআন কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার উর্দ্ধতন কিংবা অধস্তন পুরুষের বউকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছে। এতদুদ্দেশ্যে অধস্তন পুরুষ বুঝানোর জন্য ‘পুত্র’ (ابن) শব্দটি (যা আরবি বাকরীতি অনুযায়ী পুত্র ও প্রপৌত্র উভয়ের অর্থ প্রকাশে সমর্থ)ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে আইনের প্রকৃতি ই দাবি করে (ابن) দ্বারা কেবল সরাসরি ছেলে উদ্দেশ্য নয়; বরং তার সকল অধস্তন পুরুষও এর অন্তর্ভুক্ত।তাছাড়া বিয়ে সংক্রান্ত আইনে ‘পুত্র’ (ابن) শব্দটির ব্যাপক অর্থ গ্রহন করার মাধ্যমে কারো কোন অর্থনৈতিক স্বার্থ সঙ্কুচিত করা হচ্ছেনা। পক্ষান্তরে উত্তরাধিকার আইন মূলত অর্থনৈতিক আইন, যেখানে কোন একটি শব্দার্থের অসতর্ক সম্প্রসারণের ফলে গোটা কাঠামোটিই ভেঙ্গে পড়ে; দেখা দেয় নানা অনাকাঙ্খিত বেইনসাফি (এ ব্যাপারে আমাদের উপরোক্ত উদাহরনটিই যথেষ্ট)। অতএব বিয়ে সংক্রান্ত আইনের (ابن) শব্দের তাৎপর্যকে উত্তরাধিকার আইনে হুবহু প্রয়োগ করার কোন যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবকাশ নেই।

মাওলানা সাহেব আরেকটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন (و اعلموا انما اموالكم و اولادكم فتنة আনফাল ২৭)-অর্থাৎ, ‘জেনে রাখ তোমাদের সন্তান-সন্ততি পরীক্ষা’। একথা স্বতঃসিদ্ধ যে নিছক সরাসরি পুত্রই পরীক্ষার উপকরণ নয়; প্রপৌত্রগনও এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, এই আয়াতে যে ‘সন্তান-সন্ততি’ (اولاد) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে হুবহু একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে উত্তরাধিকার আইনের আয়াতটিতে – يوصيكم الله فى اولادكم  (নিসা ১১)-অর্থাৎ, ‘আল্লাহ তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন…’। অতএব এখানেও  সন্তান মানে কেবল সরাসরি পুত্র অর্থ না হয়ে নাতিদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। আমরা মনে করি, এখানে আবার সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে যা দেখা দিয়েছিল বিয়ে সংক্রান্ত আইনে ابن (পুত্র) শব্দটির ব্যাপক অর্থকে উত্তরাধিকার আইনে টেনে আনার ক্ষেত্রে। আনফালের ২৭ নম্বর আয়াতটি মূলত একটি সতর্কীকরণ। অর্থাৎ, পৃথিবীতে সন্তান-সন্ততি পরীক্ষার উপকরণ। কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই চলবেনা; অধীনস্ত লোকদের ব্যাপারেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ  করা হবে। তাছাড়া এই মর্মে হুশিয়ার করে দেয়াও এই আয়াতের উদ্দেশ্য যে, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা যেন তোমাদেরকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লংঘনে উদ্বুদ্ধ না করে। এদের মাধ্যমে আল্লাহ মূলত তোমাদেরকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। বক্তব্যের ধরনই এখানে বলে দেয় যে, ‘সন্তান-সন্ততি’ (اولاد) শব্দটি এখানে কেবল সরাসরি পুত্রদেরকে বুঝানো হয়নি; তার অধস্তনরাও এর অন্তর্ভুক্ত। অথচ উত্তরাধিকার আইন মূলত সম্পত্তি বন্টনের আইন যার সুনির্দিষ্ট প্রকৃতিই দাবী করে যে এখানে ‘সন্তান-সন্ততি’ (اولاد) শব্দটি দ্বারা আনফালের ১৭ নং  আয়াতের মত নাতি নাতনিদের অধস্তন সকলকে সন্তান হওয়ার দিক থেকে এক কাতারে হাজির করানো কিছুতেই উদ্দেশ্য হতে পারেনা।

দ্বিতীয় যুক্তিঃ

তাঁর দ্বিতীয় যুক্তিটি সূরা নিসার ৩৩ নং আয়াতকে (و لكل جعلنا موالى مما ترك الوالدان و الاقربون)কেন্দ্র করে। তিনি আয়াতটির অনুবাদ করেছেন এভাবে, “আর পুরুষ নারীর সকলকে আমরা আছাবা বানিয়েছি তাদের পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন যা কিছু রেখে যাবেন তাতে”। অথচ আয়াতটির বিশুদ্ধ অনুবাদ হচ্ছে

Ø      و جعلنا  موالى لكل (شيء) مما ترك الوالدان و الاقربون

অর্থাৎ, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা কিছু রেখে গেছে আমরা তার প্রত্যেকটি বস্তুর জন্য হকদার বানিয়ে রেখেছি।

অথবা,

Ø      و جعلنا  لكل (واحد) من الوالدين و الاقربين موالى لما ترك

অর্থাৎ, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য  আমরা তার পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে হকদার বানিয়ে রেখেছি।

তন্মধ্যে প্রথম অনুবাদটি ই ব্যাকরণ ও বাক্য বিন্যাসের দিক থেকে সর্বাধিক গ্রহনযোগ্য।কিন্তু মাওলানা সাহেব যে অনুবাদ করেছেন (“আর পুরুষ নারীর সকলকে আমরা আছাবা বানিয়েছি তাদের পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন যা কিছু রেখে যাবেন তাতে”) তা কেবল তখনই সম্ভব হত যদি কুরআনের আয়াতটি নিম্নরূপ হত-

و كلا (اى كل واحد من الرجال و النساء) جعلنا موالى لما ترك الوالدان و الاقربون

“আমরা পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে (নারী ও পুরুষের)প্রত্যেক কে হকদার বানিয়ে রেখেছি।”

মাওলানা সাহেব যে অনুবাদ করেছেন কুরআনের বাক্যবিন্যাসের মধ্যে এর কোন সুযোগ নেই। কারণ, তাঁর অনুবাদের ফলে ل  (‘জন্য’) preposition টিকে কুরআনের আয়াত থেকে বিলুপ্ত করে দেয়া জরুরী হয়ে পড়ে। আর দ্বিতীয়ত, কুরআনের এই আয়াতে একমাত্র object (কর্ম) হচ্ছে موالى (হকদার) শব্দটি। অথচ মাওলানা সাহেবের অনুবাদে প্রত্যেক নারী ও পুরুষ শীর্ষক আরেকটি object (কর্ম)-র আমদানী করা হয়েছে যা কুরআনের আয়াতে নেই। অধিকন্তু, এই নতুন আমদানীকৃত object (কর্ম)-র উপর ই মাওলানা সাহেব তাঁর যুক্তির প্রাসাদ নির্মান করে দেড় সহস্রাব্দীর সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিসকে ‘নারীকে নিরংকুশভাবে পুরুষের মত আছাবা (موالى হকদার) হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের’ অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। অতঃপর তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, কন্যার সাথে প্রপৌত্র যেভাবে অংশ পায়, ঠিক সেভাবে পুত্রের সাথেও প্রপৌত্র উত্তরাধিকারে অংশীদার হবে। তাঁর ভাষায়, “এ আয়াতে নারী-পুরুষের সবাইকে আছাবা ঘোষনা করা হয়েছে। সুতরাং নারী সন্তানের সাথে নাতিপুতি পাবে, পুরুষ সন্তানের সাথে পাবেনা- এ রকম বক্তব্য চলবে না”। অথচ আমরা ইতোপূর্বে দেখিয়েছি যে কুরআনের বাক্যটির ‘আমরা নারী-পুরুষের সবাইকে আছাবা বানিয়েছি শীর্ষক অনুবাদটি ভুল। আয়াতটিতে শুধু এতটুকু বলা হয়েছে যে, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়ের পরিত্যক্ত প্রত্যেকটি সম্পদের জন্য আল্লাহ হকদার (موالى আছাবা) বানিয়ে রেখেছেন। হ্যাঁ, এই হকদার কারা- তা এই আয়াতে বলা হয়নি; বরং তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে রাসূলের (সাঃ) হাদীসে। নবী (সাঃ) বলেন, ما ابقت السهام فلاولى عصبة ذكر অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট অংশের মালিকরা স্ব স্ব অংশ নিয়ে যাবার পর অবশিষ্ট অংশ পুরুষ হকদারদের জন্য (বুখারী, হাদীস নং ৬৭৩২; মুসলিম, হাদীস নং ১৬১৫; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৬৫৭)।

তৃতীয় যুক্তিঃ

তাঁর তৃতীয় যুক্তি হচ্ছে, ‘অধিকতর কাছের আত্মীয় তুলনামূলক দূরের আত্মীয়কে বঞ্চিত করে’- মুলনীতিটি ভিন্ন স্তরের আত্মীয়ের ক্ষেত্রে খাটেনা। তাঁর কথা থেকে পরিস্কার বুঝা যায় পিতা ও নাতি যেরকম ভিন্ন স্তরের তিনি পুত্র ও প্রপৌত্রও সেরকম ভিন্ন স্তরের মনে করেন। অতএব, পিতা (অধিকতর কাছের আত্মীয়)জীবিত থাকলে প্রপৌত্র (তুলনামূলক দূরের আত্মীয়) যেভাবে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়না, ঠিক সেভাবে এক পুত্রের  (অধিকতর কাছের আত্মীয়)উপস্থিতি অপর পুত্রের নাতিকে (তুলনামূলক দূরের আত্মীয়)বঞ্চিত করতে পারেনা।

এ যুক্তিটি কয়েকটি কারণে গ্রহনযোগ্য নয়। প্রথমত, ইসলাম উত্তরাধিকার নির্ধারনের ক্ষেত্রে বংশধরদেরকে ascendants ও descendants হিসেবে ভাগ করে দিয়েছে। এ হিসেবে পিতা ascendant ও পুত্র descendant গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। মৃত ব্যক্তির পিতা পুত্র দু’টি স্বতন্ত্র গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে যে আইনগত তফাত সৃষ্টি হয়েছে তা নির্বিচারে পুত্র ও প্রপৌত্রদের (যাদের সবাই একই গ্রুপের descendantঅন্তর্ভুক্ত) ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে দেয়া কিছুতেই সঠিক হতে পারেনা।

Grandfather

Sons = GRADE 1

Father = GRADE 2

Brothers = GRADE 3

Uncles = Grade 4

উপরোক্ত চার্ট থেকে পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে যে, পিতা, ভাই ও চাচাদের তুলনায় পুত্রগন প্রথম গ্রেডে রয়েছে। তার/তাদের উপস্থিতিতে উপরোক্ত কারোরই আছাবা হওয়ার সুযোগ নেই। আবার এটিও স্বতঃসিদ্ধ যে, পুত্র ও প্রপৌত্র প্রথম গ্রেডেই পড়েছে (কারণ, অন্য কোন গ্রেডে তাকে রাখার সুযোগ নেই)। অর্থাৎ, মাওলানা সাহেব পুত্র ও পৌত্রকে যেভাবে ভিন্ন স্তরের প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তা ধোপে টিকছেনা। মোদ্দাকথা হচ্ছে, যেহেতু উভয়েই একই স্তরের এবং পুত্র পৌত্রের তুলনায় মৃত ব্যক্তির অধিকতর নিকটবর্তী, সেহেতু স্বাভাবিক নিয়মে পুত্রের উপস্থিতি পৌত্রকে বঞ্চিত করবে।

মাওলানা সাহেবের চতুর্থ ও পঞ্চম যুক্তি  প্রথম তিনটি যুক্তির বিশুদ্ধতার উপর নির্ভরশীল। অথচ আমরা দেখিয়েছি, তাঁর প্রথম তিনটি যুক্তি টেকসই নয়। তাই, শেষ দু’টি যুক্তির পর্যালোচনা নিস্প্রয়োজন।

 

উত্তরনের উপায়ঃ

দুস্থ নাতির সমস্যা নিরসনকল্পে পেশোয়ার হাই কোর্টের শরীয়াহ বেঞ্চ ১৯৮০ সালে যে পরামর্শ দিয়েছিল তা খুবই যুক্তিসংগত (দ্রষ্টব্যঃ পি.এল.ডি.(১৯৮০)পেশোয়ার, ৪৭)। সেই পরামর্শের সারকথা ছিল, বাধ্যতামূলক ওসিয়্যত (compulsory bequest) ইসলামী আইনের প্রানসত্তার পরিপন্থি। অতএব, এই পথে না গিয়ে আইনের মাধ্যমে দুস্থ নাতিকে জেলা জজের শরনাপন্ন হওয়ার সুযোগ দেয়া হোক। নাতি প্রকৃতপক্ষেই দুস্থ হলে জেলা জজ দাদাকে ওসিয়্যতের বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করানোর চেষ্টা করবেন। তাতে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া গেলে দুস্থ নাতির দেখাশোনা ও ভরনপোষনের যাবতীয় দায় দায়িত্ব দাদা ও (তার অনুপস্থিতিতে) নিকটতর সচ্ছল আত্মীয়ের উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। আর তাদের প্রত্যেকেই অসচ্ছল হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দুস্থ নাতিকে সহযোগিতার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কারন, রাষ্ট্রীয় তহবিলের অন্যতম উদ্দেশ্যই হল দুস্থ লোকদের সহযোগিতা করা।

উপরোক্ত পদ্ধতিতে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে প্রথমেই একটি সার্বজনীন বাধ্যতামূলক আইন তৈরী করে ঢালাওভাবে সকল নাতিকে সম্পত্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহনে বহুবিধ সমস্যা রয়েছে, যেমনঃ প্রথমত, অনেক সময় দেখা যায় নাতি (তার সদ্যপ্রয়াত পিতা কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে) যথেষ্ট সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছে; অথচ তার চাচারা রয়ে গেছে দারিদ্র সীমার নীচে। এ পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে সকল নাতির জন্য বাধ্যতামূলক ওসিয়্যতের (compulsory bequest) আশ্রয় গ্রহন মূলত ‘তেলা মাথায় তেল ঢালা’ ও দরিদ্রকে আরো বেশী দারিদ্রের দিকে ঠেলে দেয়ার নামান্তর। দ্বিতীয়ত, নাতি যদি প্রকৃতই দুস্থ হয়ে থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ব্যয়ভার বহন (অনেকেই যার পরামর্শ দিয়ে থাকেন) করার পূর্বে তার নিকটাত্মীয়দের সামর্থ যাচাই করা উচিত। তারা সমর্থ হলে দুস্থ নাতির ব্যয়ভার তাদেরই বহন করা অধিকতর যুক্তিসংগত। কারণ, রাষ্ট্রীয় তহবিল মূলত আমজনতার সম্পদে সৃষ্টি। নিকটাত্মীয়ের অনুপস্থিতি কিংবা অক্ষমতার প্রেক্ষিতেই কেবল দূরতম আত্মীয়ের (অর্থাৎ, আমজনতার) সম্পদ ব্যবহার করা যেতে পারে। রাসূল (সাঃ) এর একটি বক্তব্য থেকে এ বিষয়ের ইংগিত পাওয়া যায়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবী (সাঃ) বলেন, انا ولى من لا ولى له অর্থাৎ, যার কোন অভিভাবক নেই আমিই তার অভিভাবক। (মুসনাদে আহমদ)

و الله اعلم بالصواب

উপরোক্ত প্রবন্ধ সোনার বাংলাদেশ ব্লগ-এ পোস্ট করার পর চোরাবালি-১৯৮১ ছদ্মনামে এক ব্লগার বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেন। আমি অন্তর্দৃষ্টি নামে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছি। পাঠকদের অবগতির জন্য নীচে তা উল্লেখ করা হল। (http://sonarbangladesh.com/blog/jiaorrahman/18084)

প্রথম প্রশ্নঃ

২২ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ১০:৫১

চোরাবালি-১৯৮১ লিখেছেন : লেখকের কাছে প্রথম প্রশ্নপিতা জীবিত থাকা অবস্থায় পুত্রের মৃত্যুতে পুত্রের সন্তানাদির দায় দায়িত্ব কার? এবং প্রসঙ্গে কোরান থেকে যুক্তি দিবেন দয়া করে

জবাবঃ

২২ ডিসেম্বর ২০১০; সন্ধ্যা ০৭:২৪

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন :“পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় পুত্রের মৃত্যুতে ঐ পুত্রের সন্তানাদিকে আমরা দু’ ভাগে ভাগ করতে পারি; (১) অপ্রাপ্তবয়স্ক ও (২) প্রাপ্তবয়স্ক।
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান কর্মক্ষম হলে তার দায় দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। তবে কর্মক্ষম না হলে অন্যান্য গরীব মানুষের দারিদ্র নিরসনের জন্য ইসলাম যেসব ব্যবস্থা রেখেছে তা তার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হবে। তবে নিকটাত্মীয় হওয়ার প্রেক্ষিতে দাদা, চাচা ও ভাই প্রমুখের কাছ থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে। এসব নীতির ভিত্তি হল নিমোক্ত আয়াতগুলোঃ

و فى اموالهم حق للسائل و المحروم

“আর আল্লাহ-সচেতন লোকদের সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার” (আয যারিয়াত ১৯)
مسكينا ذا متربة

“ধূলি মলিন মিসকিনকে (খাবার খাওয়ানো)” (আল বালাদ ১৬)

و ات ذا القربى حقه

নিকটাত্মীয়কে তার অধিকার দিয়ে দাও” (বনী ইসরাইল ২৬)

و بالوالدين احسانا و بذى القربى

“পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়ের সাথে সদাচরণ করো” (আন নিসা ৩৬)

অন্যদিকে সন্তান যদি অপ্রাপ্ত বয়স্ক হয় তাহলে তার দায় দায়িত্ব আবার দু’ ধরণেরঃ (১) লালন পালন সংক্রান্ত দায় ও (২) আর্থিক দায়। প্রথম প্রকারের দায় পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে ১০ বছর পর্যন্ত আর কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কা হওয়া পর্যন্ত সন্তানের মাকেই পালন করতে হবে। আর আর্থিক দায় প্রথমত বর্তায় পিতার উপর। তার অনুপস্থিতিতে যথাক্রমে দাদা ও চাচার উপর বর্তায়। তারা সবাই আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে ঐসব সন্তানের দায় দায়িত্ব সোজা সাপ্টা সরকারকেই নিতে হবে। এসব নীতির ভিত্তি হল নিমোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহঃ

و الوالدات يرضعن اولادهن

“আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে দুগ্ধ পান করাবে” (আল বাকারাহ ২৩৩)

و على المولود له رزقهن و كسوتهن بالمعروف

“আর সন্তানের পিতার দায়িত্ব মায়েদের খোর পোশ দেয়া” (আল বাকারাহ ২৩৩)

و على الوارث مثل ذلك

“আর (পিতা মারা গেলে তার) ওয়ারিশকে অনুরূপ দায়িত্ব পালন করতে হবে” (আল বাকারাহ ২৩৩)

يتيما ذا مقربة

“নিকটবর্তী ইয়াতীমকে (খাবার খাওয়ানো)” (আল বালাদ ১৫)

ابدا بنفسك ثم بمن تعول

“নিজের প্রয়োজন পূরণ করার পর তাদের অধিকার আদায় কর যাদের দায় দায়িত্ব বর্তেছে তোমার উপর” (নাইলুল আওতার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৩২১-৩২৪)

من ابر قال امك ………ثم الاقرب فالاقرب

“…… আমি কার অধিকার আদায় করবো? রাসূল (সাঃ) বললেন, “তোমার মায়ের ……… অতঃপর তোমার সর্বাধিক নিকটবর্তী আত্মীয়ের, অতঃপর তার পরের অধিক নিকটবর্তী আত্মীয়ের” (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাইলুল আওতার)

انا ولى من لا ولى له

“কারো কোন অভিভাবক না থাকলে আমিই তার অভিভাবক”। (মুসনাদে আহমদ)
Charity begins at home

দ্বিতীয় প্রশ্নঃ

২৩ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ১০:৩০

চোরাবালি-১৯৮১ লিখেছেন : পিতা জীবিত অবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি স্ত্রী সন্তান/সন্ততী রেখে মারা যায়, তাহলে দাদার সম্পত্তি যে নাতী নাতনী পুত্রবধু পাবে না কথাটি কোথাও বলা আছে?

জবাবঃ

২৩ ডিসেম্বর ২০১০; সন্ধ্যা ০৬:৩৯

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : “পিতা জীবিত অবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি মারা যায় স্ত্রী সন্তান/সন্ততী রেখে মারা যায় তা হলে, দাদার সম্পত্তি যে ঐ নাতী নাতনী পুত্রবধু পাবে না এ কথাটি কোথাও বলা আছে?”
এ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর পেতে হলে প্রথমে ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের নীতিমালা ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। ইসলাম পূর্ব আরবে উত্তরাধিকারের কোন স্থায়ী রীতি ছিল না। কখনো বন্ধু বরাবর সমস্ত সম্পত্তি উইল করে নিজের বংশধরদের বঞ্চিত করা হত। আবার কখনো পরিবারের একজন শক্তিশালী লোক সবাইকে বঞ্চিত করে সমস্ত সম্পত্তি একাই দখল করে নিত। এমতাবস্থায় ইসলাম উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে স্থায়ী আইন জারি করার ক্ষেত্রে ক্রমধারা অবলম্বন করে।

প্রথমে নির্দেশ দেয়া হল এভাবেঃ

كتب عليكم اذا حضر احدكم الموت ان ترك خيرا الوصية للوالدين و الاقربين بالمعروف حقا على المتقين

“তোমাদের কারোর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে এবং সে ধন-সম্পত্তি ত্যাগ করে যেতে থাকলে পিতামাতা ও নিকটতম (আত্মীয়)দের জন্য ন্যায়সঙ্গত ভাবে অসিয়ত করে যাওয়াকে তার জন্য ফরজ করা হয়েছে, আল্লাহ-সচেতন লোকদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক” (আল বাকারাহ ১৮০)
দ্বিতীয় ধাপে বলা হলঃ

يوصيكم الله فى اولادكم ……………………………….. وصية من الله
“তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন ……. এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ” (নিসা ১১-১২)

এই ধাপে এসে নিকটাত্মীয় (৮ জন নারী ও ৪ জন পুরুষ) কে কতটুকু অংশ পাবে – আল্লাহ তা সুস্পষ্টভাবে বলে দেন।
তৃতীয় স্তরে পরিস্কার ঘোষণা দেয়া হল:

و لكل جعلنا موالى مما ترك الوالدان و الاقربون
“পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা কিছু রেখে গেছে আমরা তার প্রত্যেকটি বস্তুর জন্য হকদার বানিয়ে রেখেছি।” (নিসা ৩৩)

অর্থাৎ, আইনপ্রণেতা নিজেই “প্রত্যেকটি বস্তুর জন্য হকদার বানিয়ে রেখেছেন” (নিসা ৩৩)। কে পাবে আর কে পাবে না তা আমাদের মর্জি মাফিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হয় নি।

১২ জন (৮ জন নারী ও ৪ জন পুরুষ) ব্যক্তির অংশ কুরআন নির্ধারিত করে দিয়েছে। তন্মধ্যে ছেলে ও তার অধস্তন সন্তানাদি, সহোদর ভাই ও চাচার অংশ কুরআন নির্ধারণ করে নি। কুরআন এর দায়িত্ব দিয়েছে রাসূল (সাঃ) কে। রাসূল (সাঃ) তার বক্তব্যের মাধ্যমে বলে দিয়েছেন যে, কুরআন যাদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে তারা সম্পত্তি নেয়ার পর বাকিটুকুর অধিকারী হবে পুরুষ আত্মীয়রা। [নবী (সাঃ) বলেন, ما ابقت السهام فلاولى عصبة ذكر অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট অংশের মালিকরা স্ব স্ব অংশ নিয়ে যাবার পর অবশিষ্ট অংশ পুরুষ হকদারদের জন্য (বুখারী, হাদীস নং ৬৭৩২; মুসলিম, হাদীস নং ১৬১৫; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৬৫৭)] এসব অবশিষ্টাংশের অধিকারী পুরুষ আত্মীয়দের জন্য হাদীসে “আসাবা / residuary” নামে এক বিশেষ পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।
হাদীসে “আসাবা / residuary” (অবশিষ্টাংশের অধিকারী পুরুষ আত্মীয়) কে নিম্নোক্ত চার গ্রুপে ভাগ করা হয়েছেঃ

(১) পুত্র ও তার অধস্তন সন্তান
(২) পিতা ও তার ঊর্ধতন পুরুষ
(৩) ভাই ও তার অধস্তন সন্তান
(৪) চাচা ও তার অধস্তন সন্তান

এখন প্রশ্ন দেখা দেয় এদের মধ্যে সম্পত্তি বন্টনের ভিত্তি বা মূলনীতি কী? কুরআনের আয়াতে তা স্পস্ট করে বলে দেয়া হয়েছেঃ

للرجال نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون و للنساء نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون
অর্থাৎ, “মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা যে ধন-সম্পত্তি রেখে গেছে তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছে। আর মেয়েদেরও অংশ রয়েছে সেই ধন-সম্পত্তিতে, যা মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে।” (নিসা ৭)
و لكل جعلنا موالى مما ترك الوالدان و الاقربون
“পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা কিছু রেখে গেছে আমরা তার প্রত্যেকটি বস্তুর জন্য হকদার বানিয়ে রেখেছি।” (নিসা ৩৩)

এসব আয়াতের সুস্পষ্ট শব্দ الاقربون (নিকটাত্মীয়রা) দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলে দিচ্ছে যে, উত্তরাধিকার বন্টনের জন্য কুরআন যে মূলনীতি নির্ধারণ করেছে তা এই নয় যে, যারা অভাবগ্রস্ত অথবা সহানুভুতি পাওয়ার যোগ্য তাদেরকে এই সম্পত্তি দেয়া হবে। বরং তা হচ্ছে এই যে, আত্মীয়তার দিক থেকে যে ব্যক্তি মৃতের “নিকটতর” (الاقرب) কেবল তারাই তার উত্তরাধিকারী হবে। নিকটতর আত্মীয়ের বর্তমানে অপেক্ষাকৃত দূর সম্পর্কের আত্মীয় ওয়ারিস হবে না।

অর্থাৎ, এদের মধ্যে الاقرب يحجب الابعد (The nearer in degree excludes the far remote “নিকটবর্তী আত্মীয় অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী আত্মীয়কে বঞ্চিত করবে”) নীতি প্রযোজ্য হবে।

কুরআনের উপরোক্ত আয়াত থেকে উৎসারিত নীতির ভিত্তিতেই এই বিধান বিধিবদ্ধ হয়েছে যে, “দাদার উপস্থিতিতে ছেলে মারা গেলে নাতি অন্য ছেলের উপস্থিতিতে দাদার সম্পত্তি থেকে কোন বাধ্যতামূলক অংশ পাবে না”। কারণ, নাতির তুলনায় উক্ত ছেলে অধিকতর নিকটবর্তী আত্মীয়।

পুত্রবধু আসাবার অন্তর্ভুক্ত নয়; তাই তারও কোন নির্ধারিতঅংশ নেই।[নবী (সাঃ) বলেন, ما ابقت السهام فلاولى عصبة ذكر অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট অংশের মালিকরা স্ব স্ব অংশ নিয়ে যাবার পর অবশিষ্ট অংশ পুরুষ হকদারদের জন্য (বুখারী, হাদীস নং ৬৭৩২; মুসলিম, হাদীস নং ১৬১৫; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৬৫৭)]

তবে তাদের এই বিশেষ অবস্থার সমাধানের জন্য ইসলামের প্রেসক্রিপশন ইতোমধ্যেই আমি আমার মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি। এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন বোধ করছি না।

তৃতীয় প্রশ্নঃ

২৪ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ১০:৩৬

চোরাবালি-১৯৮১ লিখেছেন : নিসা/৮- “আর ভাগাভাগির সময়ে যখন উপস্থিত থাকে আত্মীয়-স্বজন ও এতীমরা ও গরীবরা, তখন তা থেকে তাদের দান করো, আর তাদের সাথে ভালভাবে কথাবার্তা বলো।– এ কথাটিও বলা আছেএটিও একটি নির্দেশ

 

আসলে মানুষ মাত্রই সম্পদ লোভী তাই তার সম্পদ কাউকে দিতে নারাজ; আর কথায় আছে না দেয়ার হাজারো অজুহাত; পুত্রের রেখে যাওয়া সন্তানাদির দায়িত্ব পিতারমৃত সন্তানের অংশ মোতাবেক ঐ এতিম সন্তানাদির দিলে আল্লাহ্ কখনই অখুশি হবেন না বা এটি আল্লাহ্ নির্দেশ অমান্য করার মধ্যেও পরে না; বরং সেটি সমাজ তথা ইসলাম ধর্মের একটি ভাল নিদর্শনকিন্তু আমরা আমাদের স্বার্থের জন্য তাদেরকে বঞ্চিত করছি আর ধর্মকে করে ফেলছি বিতর্কিত
নিতা/৩৩- আর প্রত্যেকের জন্য আমরা উত্তরাধিকার নির্ধারিত করেছি যা পিতামাতা ও নিকট আত্মীয়রা রেখে যায়আর যাদের সঙ্গে তোমাদের ডান হাতের দ্বারা অঙ্গীকার করেছ তাদের ভাগ তা হলে প্রদান করোআল্লাহ নিঃসন্দেহে সব-কিছুতেই সাক্ষ্যদাতা


কোন ব্যক্তি যখন তার পুত্র-সন্তান বিবাহ করায় তখন সে ঐ কন্যার পিতা-মাতা বা নিক আত্মীয়ের কাছে হাতে হাত ধরে অঙ্গীকার করে যে “আজ থেকে এর মান সম্মান দায়-দায়িত্ব আমার” কিন্তু সেটি অলিখিত বলে আমরা কেওকি জীবনে পালন করি? সেটিও কিন্তু তার অঙ্গীকার ছিলআর প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব তার পিতার অঙ্গীকারগুলো পালন করা


তোমাদের কারোর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে এবং সে ধন-সম্পত্তি ত্যাগ করে যেতে থাকলে পিতামাতা ও নিকটতম (আত্মীয়)দের জন্য ন্যায়সঙ্গত ভাবে অসিয়ত করে যাওয়াকে তার জন্য ফরজ করা হয়েছে, আল্লাহ-সচেতন লোকদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক” (আল বাকারাহ ১৮০) —– এই নির্দেশ কি প্রত্যাহার করা হয়েছে? পিতা যদি এটি করে যেতে না পারে তা হলে ভাগ বাটোরার সময় আমরা এটাকে বেজ হিসাবে নিচ্ছিনা কেনন্যায় সঙ্গত ভাবে করে দিলেই তো হয়

জবাবঃ

২৪ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ০৮:৫

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : আপনার মন্তব্যে যে সকল আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন প্রথমে সেগুলোর ব্যাখ্যা করে নেয়া জরুরী। তারপর দেখা দরকার আপনার সাথে একমত পোষণ করা যায় কি না।

আপনার ঊদ্ধৃতির প্রথম আয়াতটি হলঃ

و اذا حضر القسمة اولوا القربى و اليتمى و المساكين فارزقوهم منه و قولوا لهم قولا معروفا

অর্থাৎ “ধন-সম্পত্তি ভাগ বাঁটোয়ারার সময় আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনরা এলে তাদেরকেও ঐ সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে দাও এবং তাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলো।” (নিসা ৮)

সম্পদে ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি দেয়া সত্ত্বেও অসংখ্য আয়াত ও হাদীসের মাধ্যমে সারাক্ষণ দান-খয়রাতে উদ্বুদ্ধ করেছে ইসলাম। নিসার উপরোক্ত আয়াতটি সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। এ আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে আপনি লিখেছেন, “এটিও একটি নির্দেশ।” নির্দেশ তো বটে। তবে কোন ধরণের নির্দেশ তা নির্ণয় করার আগে মনে রাখতে হবে কুরআন-সুন্নাহতে দেয়া নির্দেশসূচক বাক্যগুলো মূলত দু’ধরণেরঃ

নির্দেশ মূলত দু’ ধরণেরঃ

(১)  قضاء legally binding / আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক  (অর্থাৎ  এমন ধরণের নির্দেশ যা কার্যকর করার দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিরই নয়; ইসলামী রাষ্ট্রেরও বটে। সোজা কথায় যা ইসলামী রাষ্ট্রের বিচার প্রশাসনের (Administration of justice) আওতাধীন এবং যার ব্যত্যয় ঘটলে রাষ্ট্র তার سلطان  (বল প্রয়োগকারী শক্তি / coercive authority) ব্যবহার করার পূর্ন অধিকারী)। যেমন, যাকাত দেয়ার নির্দেশ ও সুদী কারবার না করার নির্দেশ ইত্যাদি।

(২)ديانة  morally binding / নৈতিকতা বা তাকওয়ার দিক দিয়ে বাধ্যতামূলক  (অর্থাৎ  এমন ধরণের নির্দেশ যা কার্যকর করার দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিরই; ইসলামী রাষ্ট্রের নয়। সোজা কথায় যা ইসলামী রাষ্ট্রের বিচার প্রশাসনের (Administration of justice) আওতাধীন নয় এবং যার ব্যত্যয় ঘটলে রাষ্ট্র তার سلطان  (বল প্রয়োগকারী শক্তি / coercive authority) ব্যবহার করার পূর্ন অধিকারী নয়। অন্য কথায় এসব বিধি নিষেধের দায়ভার ব্যক্তির তাকওয়ার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সামর্থ থাকার পরও কেউ যদি তা পালন না করে আল্লাহর আদালত তার বিচার করার জন্য প্রস্তুত; দুনিয়ার আদালতকে এসব বিষয় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।) যেমন একে অপরকে সালাম দেয়ার নির্দেশ, ছোট কর্তৃক বড়কে সম্মান করার নির্দেশ – এসবই নির্দেশ; তবে administration of justice এর আওতা বহির্ভূত (beyond jurisdiction)।

কারণঃ

মানুষের স্থূল মস্তিস্ক প্রসূত আইনের মত ইসলামী আইন মানুষের সকল বিষয়ে রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দেয় না। কিছু বিষয় রেখে দেয় তার স্রষ্টার সাথে হিসেব কষার জন্য। এ আইন মানবীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের পুলিশ, মেজিস্ট্রেট ও জজের ভয় দেখিয়ে মানুষকে সংশোধন করার চেয়ে অনেক বেশী জোর দিয়েছে তার স্রষ্টাকে ভয় করার জন্য। কারণ, কিছু নির্দেশকে পুলিশ, মেজিস্ট্রেট ও জজের এখতিয়ারের বাইরে রেখে আল্লাহ পরীক্ষা নিতে চান – যারা বাস্তব জীবনে তাঁর অন্যান্য নির্দেশ (যেখানে রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে) মেনে চলছে তারা কি রাষ্ট্রের ভয়ে তা মেনে চলছে, নাকি আল্লাহর ভয়ে। যদি আল্লাহর ভয়ের কারণে মেনে থাকে তাহলে তাদেরকে এসব নৈতিক নির্দেশও (moral obligations অর্থাৎ যেখানে রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়া হয় নি) মেনে নিতে হবে; কারণ উভয় নির্দেশ আল্লাহরই দেয়া। আর যদি নিছক রাষ্ট্রের ভয়ে আইন মান্য করে থাকে তাহলে আল্লাহর নিকট ঐ আইন মেনে চলারও কোন পুরষ্কার পাওয়া যাবে না। কারণ, আল্লাহর ভয় সেখানে গৌণ হয়ে পড়েছে। [ا تخشونهم فالله احق ان تخشوه ان كنتم مؤمنين  “তোমরা কি তাদেরকে ভয় করো? যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো, তাহলে আল্লাহকে ভয় করাই তোমাদের জন্য অধিক সমীচীন” – তাওবাহ ১৩] এ হচ্ছে আল্লাহর পরীক্ষা। [ليميز الله الخبيث من الطيب  মূলত আল্লাহ কলুষতাকে পবিত্রতা থেকে ছেঁটে আলাদা করবেন – আনফাল ৩৭]। তিনি মূলত দেখতে চান যে, কারা কারা একমাত্র আল্লাহর ভয়ে আইন মেনে চলছে। সকল নির্দেশকে রাষ্ট্র কর্তৃক হস্তক্ষেপযোগ্য করা হলে “আইনের আনুগত্য” আর “তাকওয়ার মানদণ্ড” হিসেবে থাকে না।

এখন বিবেচ্য বিষয় হল সূরা নিসার ৮ নং আয়াতের (“ধন-সম্পত্তি ভাগ বাঁটোয়ারার সময় আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনরা এলে তাদেরকেও ঐ সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে দাও এবং তাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলো।”) নির্দেশটি কোন  প্রকারের নির্দেশ; আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক (legally binding), নাকি নৈতিকতা বা তাকওয়ার দিক দিয়ে বাধ্যতামূলক (morally binding)। এর উত্তর হল, এটি দ্বিতীয় প্রকারের নির্দেশ। অর্থাৎ, সম্পত্তি বন্টনের সময় আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনরা এলে তাদেরকেও ঐ সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে দেয়া উত্তরাধিকারীদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু, তারা ইচ্ছে করে না দিলে তা আদালতের হস্তক্ষেপযোগ্য (cognizable) নয়।

যদি প্রশ্ন করা হয়, কীভাবে বুঝা গেল নিসার ৮ নং আয়াতটি নিছক নৈতিকতা বা তাকওয়ার দিক দিয়ে বাধ্যতামূলক; আইনগতভাবে নয়? তার উত্তরে বলা যেতে পারে, কুরআন উত্তরাধিকার বন্টনের ক্ষেত্রে ১২ জনের ব্যাপারে কে কতটুকু পাবে তা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছে। বাকী অংশ নির্ধারনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে নবী (সাঃ) কে। তিনি হাদীসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিয়েছেন যে, কুরআনে উল্লেখিত ব্যাক্তিবর্গ স্ব স্ব অংশ নেয়ার পর বাকীটুকুর অধিকারী কেবল মৃত ব্যাক্তির পুরুষ আত্মীয়রা। [বিস্তারিত প্রমাণাদি আমার মূল প্রবন্ধ ও দ্বিতীয় জবাবে উল্লেখ করা হয়েছে]। সেক্ষেত্রেও কাউকে দেয়া বা না দেয়ার বিষয়টি আমাদের মর্জির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে কুরআনে উল্লেখিত উত্তরাধিকার নীতির [ الاقرب /doctrine of proximity / নিকটবর্তীতা নীতি] ভিত্তিতে ফায়সালা হয়েছে যে, নিকটবর্তী আত্মীয়ের উপস্থিতিতে দূরবর্তী আত্মীয় বঞ্চিত হবে। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রেই কে কতটুকু পাবে এবং কে কাকে বঞ্চিত করবে তা স্পষ্ট করেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু, যদি নিসার ৮ নং আয়াতের ভিত্তিতে আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনদেরকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে কিছু দেয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হত,  তাহলে কুরআনে অথবা হাদীসে তাদের নির্দিষ্ট অংশ অথবা কমপক্ষে তাদের মধ্যে উত্তরাধিকার বন্টনের নীতি পরিষ্কার করে উল্লেখ করা হত। অথচ কুরআন-সুন্নাহর কোথাও এ বিষয়ে আলোচনা করা হয় নি।

আর এরূপ পরিস্থিতিতে যদি আমরা নিজেরাই এদের অংশ বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারণ করে দিতে যাই তাহলে দু’টি কারণে তা অগ্রহণযোগ্য।

প্রথমত, এভাবে কারো অংশ বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারণ করে দিলে, তা হবে এখতিয়ার বহির্ভুত (ultra vires and beyond jurisdiction)। কারণ, এমতাবস্থায় কুরআন ও সুন্নাহ যার জন্য যে অংশ নির্ধারণ করে রেখেছে সে তার থেকে কম পাবে। শরীয়ত প্রণেতা (অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল) ব্যাতীত এভাবে কারো অংশ বাধ্যতামূলকভাবে কমিয়ে দেয়ার অধিকার অন্য কারো নেই। [প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ্য যে, এভাবে একবার উত্তরাধিকার আইনে এখতিয়ার বহির্ভুত (ultra vires and beyond jurisdiction) ক্ষমতাকে স্বীকার করা হলে তা ভাইরাসের মত ইসলামের আইন কাঠামোর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। কেউ হয়তো বলে উঠবে, ইসলামের যাকাত বিধানেও ন্যায় বিচার করা হয় নি। কারণ, সেখানে মাত্র শতকারা আড়াই ভাগ যাকাত দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ হারটি পুনঃনির্ধারণ করে কমপক্ষে শতকরা দশ ভাগ করা উচিত। এমন দাবীকে আমরা এখতিয়ার বহির্ভুত (ultra vires and beyond jurisdiction) বলে প্রত্যাখ্যান করি। আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।]

দ্বিতীয়ত, নিসার ৮ নং আয়াতে দুস্থ নাতি ও পুত্রবধু কারো উল্লেখ নেই; সেখানে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে “আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনদের” কথা। এদের সংখ্যা অগণিতও হতে পারে। কুরআনের উদ্দেশ্য কখনো এটি নয় যে উত্তরাধিকার বন্টনের সময় যত আত্মীয় স্বজন [চাই সে অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হোক না কেন (কারণ, আয়াতটিতে তাদের গরীব হওয়ার কোন শর্ত লাগানো হয় নি)], ইয়াতীম ও মিসকীন হাজির হবে তাদের সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট অংশ দিতে হবে। একবার ভেবে দেখুন, এ আয়াতটিকে “আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক” ধরে নিলে কী অদ্ভূত অবস্থার সৃষ্টি হয়! ।

অতএব, ১২ জন উত্তরাধিকারী ও ৪ শ্রেণীর আসাবার উত্তরাধিকার আইনগত নির্দেশ; অন্যদিকে আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকিনদের কিছু অংশ পাওয়ার বিষয়টি নিছক নৈতিক নির্দেশ এবং সাধারণত আদালতের এখতিয়ার বহির্ভুত।

তারপর আপনি লিখেছেন, “মৃত সন্তানের অংশ মোতাবেক ঐ এতিম সন্তানাদির দিলে আল্লাহ্ কখনই অখুশি হবেন না বা এটি আল্লাহ্ নির্দেশ অমান্য করার মধ্যেও পরে না

আসলে আল্লাহ কিসে খুশি এবং কিসে খুশি নন তা আমরা জানি কুরআন থেকে; কোন ব্যক্তি বিশেষের ভালো লাগা না লাগা থেকে নয়। আমি জানি না, আপনি যা লিখেছেন তার তাৎপর্য জেনেশুনে লিখেছেন, নাকি ইসলাম বিদ্বিষ্ট বর্ণচোরাদের একপেশে ও স্বল্প অধ্যয়ন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখেছেন।

স্থূল মস্তিস্কের কিছু লোক বলে, “কই, স্থলাভিষিক্ত নীতি (Doctrine of representation) কুরআন-হাদীসের কোথায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে?” অতঃপর তারা অনুসন্ধানে লাগে এমন একটি আয়াত খুঁজে বের করার জন্য যেখানে গুরুগম্ভীর ভাষায় বলা হয়েছে, “ওহে ইমানদারেরা! সাবধান, উত্তরাধিকার আইনে তোমাদিগের জন্য স্থলাভিষিক্ত নীতি কঠোরভাবে নিষেধ করিয়া দেওয়া হইলো; যাহারা ইহার অন্যথা করিবে আমি অবশ্যই তাহাদিগকে নরকের আগুনে পুড়িয়া অঙ্গার বানাইবো”। কুরআনের কোথাও অনুরূপ গুরুগম্ভীর বাক্য না পাওয়ার ফলে তারা বলতে থাকে, “কুরআন স্থলাভিষিক্ত নীতি (Doctrine of representation)কে নিষিদ্ধ করে নি। মোল্লারাই অযথা দেড় সহস্রাব্দি ধরে ইয়াতীম নাতিকে ঠকিয়েছে”। এদের কূপমণ্ডুকতা দেখে বিধাতাও হয়তো হাসেন। আরো মজার ব্যাপার হল, এদের  কারো কারো আবার আধুনিক ইউরোপীয় আইনে পাণ্ডিত্য হাসিলের সনদও রয়েছে। অথচ, উত্তরাধিকার আইনের এ অংশে তারা আইনবিজ্ঞানের ন্যুনতম জ্ঞানটুকুও কাজে লাগাতে পারেননি। আইনবিজ্ঞানের একটি অতি সাধারণ নীতি হল এই যে, দেশে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে রকমারী প্রথা চালু থাকলে রাষ্ট্র যদি ঐসব প্রথার পরিপন্থী সুনির্দিষ্ট কোন আইন জারি করে তাহলে তা হবে ঐ বিষয়ে সিদ্ধান্তকরী আইন; এ কথা স্পষ্টভাবে বলে দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই যে, এতদ্বারা অমুক অমুক প্রথাকে নিষিদ্ধ করা হল।

আইনবিজ্ঞানের উপরোক্ত নীতি মাথায় রেখে ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দিন। এ আইন যখন নাযিল হচ্ছিল তখন পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নিজেরাই নিজেদের পছন্দমত আইন কানুন মেনে চলছিল। সে সময় হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত ছিল (যা এখনো আছে) স্থলাভিষিক্ত নীতি (Doctrine of representation)। এ নীতি অনুযায়ী ছেলে মারা গেলে নাতি ছেলের জায়গায় চলে আসে এবং চাচা ভাতিজা সমান উত্তরাধিকার লাভ করে। রোমান, মিশরীয়, পারস্য প্রভৃতি জাতিসমূহের মধ্যেও বিভিন্ন রকমের প্রথা কার্যকর ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ গোটা বিশ্বের সংস্কার সাধনের উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে আইন নাযিল করেছেন। উত্তরাধিকার আইন সেই স্থায়ী আইনের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। এ আইনে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির প্রথাগুলোকে বাদ দিয়ে কুরআন তার নিজের স্টাইলে উত্তরাধিকার নীতি ঘোষণা করেছে। আর তা হল, নিকটবর্তীতার নীতি (Doctrine of Proximity)। [للرجال نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون و للنساء نصيب مما ترك الوالدان و الاقربون অর্থাৎ, “মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা যে ধন-সম্পত্তি রেখে গেছে তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছেআর মেয়েদেরও অংশ রয়েছে সেই ধন-সম্পত্তিতে, যা মা-বাপ ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা রেখে গেছে” (নিসা ৭)]  অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল উত্তরাধিকারের কেবল হকদার বলে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি; الاقربون দ্বারা আইনের সুস্পষ্ট নীতিও বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের মূলনীতি হল “মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তীরাই তার উত্তরাধিকারে আইনগত হকদার এবং অধিকতর নিকটবর্তী আত্মীয়ের উপস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী আত্মীয় বঞ্চিত হবে”। ইসলামী আইনে “স্থলাভিষিক্ত নীতি”র কোন স্থান নেই। এরপরও যদি কারো কাছে হিন্দুয়ানী “স্থলাভিষিক্ত নীতি” ভালো লাগে, তাহলে অযথা তাকে কে বলেছে ইসলামের অনুসারী হতে? ইসলাম “স্থলাভিষিক্ত নীতি”কে সজোরে প্রত্যাখ্যান করে।

আল্লাহ ঘোষণা করেছেন নিকটবর্তীতার নীতি; কিন্তু আপনি চাচ্ছেন স্থলাভিষিক্ত নীতি। এবার আপনার বিবেককেই জিজ্ঞাসা করুন, এমনটা করলে আল্লাহ্ কখনো খুশি হবেন কিনা বা এটি আল্লাহ নির্দেশ অমান্য করার মধ্যে পড়ে কি নাআপনার বিবেক যদি বলে, আল্লাহ এরপরও খুশি হবেন এবং তা আল্লাহর আইন অমান্য করার মধ্যে পড়বে না, তাহলে কী করলে আল্লাহ অখুশি হন এবং কী ধরণের পদক্ষেপ নিলে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার মধ্যে পড়ে – তা দয়া করে একটু জানাবেন কি?

আপনি লিখেছেন, কিন্তু আমরা আমাদের স্বার্থের জন্য তাদেরকে বঞ্চিত করছি আর ধর্মকে করে ফেলছি বিতর্কিত

জানি না আপনি “আমরা” বলে কাদেরকে বুঝাচ্ছেন। তবে আমি পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই যে, গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে কুখ্যাত স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের ঘাড়ের উপর সওয়ার হয়ে যেসব গণবিচ্ছিন্ন কুশীলব “মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (The Muslim Family Laws Ordinance (MFLO), 1961)” নামে চরম ইসলাম বিদ্বেষী আইন জারি করিয়েছে এবং তা টিকে থাকতে যে বা যারাই সহযোগিতা করছে – তারাই হল সেসব লোক যারা নিজেদের হীন স্বার্থকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে জনগনের টাকায় গড়ে উঠা রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ভাণ্ডার থেকে দুস্থ নাতি ও পুত্রবধুসহ গরীব দুখী মানুষকে তাদের কুরআন প্রদত্ত ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে; আর ইসলামকে করে ফেলেছে বিতর্কিত।

আপনি লিখেছেন, “পুত্রের রেখে যাওয়া সন্তানাদির দায়িত্ব পিতার

এ ব্যাপারে আপনার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। তবে মনে রাখতে হবে, পিতার এ দায়িত্ব কীভাবে পালিত হবে, ইসলাম তার যথেষ্ট সুন্দর ব্যবস্থা করে রেখেছে [যা আমি আমার মূল প্রবন্ধে এবং আপনার প্রথম মন্তব্যের জবাবে বিস্তারিত তুলে ধরেছি]; আপনি যে স্থলাভিষিক্ত নীতির কথা বলছেন তা ইসলামী আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলাম নিজেই সার্বজনীন। অতএব, ইসলামী সমাধান বাদ দিয়ে হিন্দু বা অন্য কোন জাতির কাছ থেকে মূলনীতি ধার করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা মূলত আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা ছাড়া আর কিছু নয়।

এরপর আপনি জিজ্ঞাসা করেছেন, “তোমাদের কারোর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে এবং সে ধন-সম্পত্তি ত্যাগ করে যেতে থাকলে পিতামাতা ও নিকটতম (আত্মীয়)দের জন্য ন্যায়সঙ্গত ভাবে অসিয়ত করে যাওয়াকে তার জন্য ফরজ করা হয়েছে, আল্লাহ-সচেতন লোকদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক” (আল বাকারাহ ১৮০) —– এই নির্দেশ কি প্রত্যাহার করা হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলবো যে, উইল সংক্রান্ত উপরোক্ত আয়াতটি পুরোপুরি প্রত্যাহার/বাতিল করা হয়নি; তবে এর প্রয়োগ সীমিত করা হয়েছে। নিসার ১১-১২ আয়াতে উত্তরাধিকারের বিস্তারিত বিধি বিধান নাযিল হওয়ার পর নবী পাক (সাঃ) উইলের ব্যাপারে দু’টি বিধান জারি করেছেন; (১) কোন উত্তরাধিকারী বরাবর উইল করা যাবে না, এবং (২) এক তৃতীয়াংশের বেশী সম্পদ উইল করা যাবে না।

তারপর আপনার মন্তব্য মিশ্রিত সর্বশেষ প্রশ্নটি হল, পিতা যদি এটি করে যেতে না পারে তা হলে ভাগ বাটোরার সময় আমরা এটাকে বেজ হিসাবে নিচ্ছিনা কেনন্যায় সঙ্গত ভাবে করে দিলেই তো হয়

ন্যায় সঙ্গত ভাবে করে দিলেই তো হয়” – আপনার এটুকু অংশের সাথে আমারও কোন দ্বিমত নেই। নবী পাক (সাঃ) উইল সংক্রান্ত আয়াতকে পুরোপুরি রহিত না করে মাত্র দু’টি শর্ত দিয়েছেন যাতে আমাদের আলোচ্য সমস্যা সহ অন্যান্য স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে অসহায় মানুষ বরাবর উইল করার সুযোগ থাকে। আমিও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দাদার উইলের মাধ্যমেই এ সমস্যার প্রাথমিক সমাধান সম্ভব। কিন্তু, আপনি “ন্যায় সঙ্গতভাবে” বলার আগে লিখেছেন, “পিতা যদি এটি করে যেতে না পারে তা হলে ভাগ বাটোরার সময় আমরা এটাকে বেজ হিসাবে নিচ্ছিনা কেন” অর্থাৎ, আপনি বাধ্যতামূলক অসিয়ত (compulsory bequest) এর কথা বলছেন। কিন্তু, তা সম্ভব নয়। কেন সম্ভব নয় – তা আমার মূল প্রবন্ধের শেষ দু’টি প্যারাতে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে আবার তা তুলে ধরছিঃ

“দুস্থ নাতির সমস্যা নিরসনকল্পে পেশোয়ার হাই কোর্টের শরীয়াহ বেঞ্চ ১৯৮০ সালে যে পরামর্শ দিয়েছিল তা খুবই যুক্তিসংগত (দ্রষ্টব্যঃ পি.এল.ডি.(১৯৮০)পেশোয়ার, ৪৭)। সেই পরামর্শের সারকথা ছিল, বাধ্যতামূলক ওসিয়্যত (compulsory bequest) ইসলামী আইনের প্রানসত্তার পরিপন্থি। অতএব, এই পথে না গিয়ে আইনের মাধ্যমে দুস্থ নাতিকে জেলা জজের শরনাপন্ন হওয়ার সুযোগ দেয়া হোক। নাতি প্রকৃতপক্ষেই দুস্থ হলে জেলা জজ দাদাকে ওসিয়্যতের বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করানোর চেষ্টা করবেন। তাতে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া গেলে দুস্থ নাতির দেখাশোনা ও ভরনপোষনের যাবতীয় দায় দায়িত্ব দাদা ও (তার অনুপস্থিতিতে) নিকটতর সচ্ছল আত্মীয়ের উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। আর তাদের প্রত্যেকেই অসচ্ছল হলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দুস্থ নাতিকে সহযোগিতার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কারন, রাষ্ট্রীয় তহবিলের অন্যতম উদ্দেশ্যই হল দুস্থ লোকদের সহযোগিতা করা।

উপরোক্ত পদ্ধতিতে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে প্রথমেই একটি সার্বজনীন বাধ্যতামূলক আইন তৈরী করে ঢালাওভাবে সকল নাতিকে সম্পত্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহনে বহুবিধ সমস্যা রয়েছে, যেমনঃ প্রথমত, অনেক সময় দেখা যায় নাতি (তার সদ্যপ্রয়াত পিতা কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে) যথেষ্ট সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছে; অথচ তার চাচারা রয়ে গেছে দারিদ্র সীমার নীচে। এ পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে সকল নাতির জন্য বাধ্যতামূলক ওসিয়্যতের (compulsory bequest) আশ্রয় গ্রহন মূলত ‘তেলা মাথায় তেল ঢালা’ ও দরিদ্রকে আরো বেশী দারিদ্রের দিকে ঠেলে দেয়ার নামান্তর। দ্বিতীয়ত, নাতি যদি প্রকৃতই দুস্থ হয়ে থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ব্যয়ভার বহন (অনেকেই যার পরামর্শ দিয়ে থাকেন) করার পূর্বে তার নিকটাত্মীয়দের সামর্থ যাচাই করা উচিত। তারা সমর্থ হলে দুস্থ নাতির ব্যয়ভার তাদেরই বহন করা অধিকতর যুক্তিসংগত। কারণ, রাষ্ট্রীয় তহবিল মূলত আমজনতার সম্পদে সৃষ্টি। নিকটাত্মীয়ের অনুপস্থিতি কিংবা অক্ষমতার প্রেক্ষিতেই কেবল দূরতম আত্মীয়ের (অর্থাৎ, আমজনতার) সম্পদ ব্যবহার করা যেতে পারে। রাসূল (সাঃ) এর একটি বক্তব্য থেকে এ বিষয়ের ইংগিত পাওয়া যায়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবী (সাঃ) বলেন, انا ولى من لا ولى له অর্থাৎ, “যার কোন অভিভাবক নেই আমিই তার অভিভাবক”। (মুসনাদে আহমদ)”

এর সাথে মিলিয়ে পড়তে হবে বর্তমান জবাবের প্রথম অংশটি, যেখানে আমি “আইনগতভাবে বাধ্য ও নৈতিকভাবে বাধ্য” – এ দু’ ভাগে কুরআনের নির্দেশগুলোকে ভাগ করেছি। উইলের বিষয়টি মূলত দ্বিতীয় প্রকারের নির্দেশ যা আদালতের এখতিয়ার বহির্ভুত।

পরিশেষে, মনে রাখতে হবে প্রায় দেড় সহস্রাব্দি কুরআনের উত্তরাধিকার আইন অবিকৃত অবস্থায় চলার পর গত শতকের ষাটের দশকে “স্থলাভিষিক্ত নীতি (Doctrine of representation)” প্রবর্তন করার পেছনে ইসলামকে অজ্ঞ মানুষের সামনে কুৎসিতভাবে উপস্থাপন করা ও নিজেদের হীন স্বার্থকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে জনগনের টাকায় গড়ে উঠা রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ভাণ্ডার থেকে দুস্থ নাতি ও পুত্রবধুসহ গরীব দুখী মানুষকে তাদের কুরআন প্রদত্ত ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা – এ দু’টি উদ্দেশ্য ছাড়া তৃতীয় কোন উদ্দেশ্য আছে বলে আমার জানা নেই; আপনার জানা থাকলে আমাদেরকে জানিয়ে কৃতার্থ করবেন আশা রাখি।

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

 

চতুর্থ প্রশ্নঃ

২৬ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ০৯:৪১

চোরাবালি-১৯৮১ লিখেছেন : প্রথমেই বলিয়াছিলাম, না দেয়ার হাজার অজুহাত, হাজার ব্যাখ্যা। আপনি যেহেতু না দেয়ার পক্ষে তাই এ প্রসঙ্গে আপনার যত ব্যাখ্যা বেরুবে সবই না দেয়ার পক্ষে; আপনার মত আমি আরবীতে পন্ডিত না; আমি যা পড়া লেখা করেছি বাংলায়; তাই আপনার সাথে আমি যুক্তিতে যাব না। নেয়ার সময় সেটি বাধ্যতামূলক হয়ে গেল আর দেয়ার সময় সেটি বাধ্যতামূলক না; প্রয়োগ সীমিত কি কোথাও বলা আছে যে এইটার প্রয়োগ সীমিত। আপনাদের মত এই সব ব্যাখ্যাবাজরাই ধর্মটাকে বিতর্কিত করে চলেছে যুগে যুগে।

জবাবঃ

২৭ ডিসেম্বর ২০১০; বিকেল ০৪:৫৩

অন্তর্দৃষ্টি লিখেছেন : আপনি লিখেছেন, “তাই আপনার সাথে আমি যুক্তিতে যাব না”। অথচ পরের লাইনেই যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছেন এই বলে, “নেয়ার সময় সেটি বাধ্যতামূলক হয়ে গেল আর দেয়ার সময় সেটি বাধ্যতামূলক না; প্রয়োগ সীমিত কি কোথাও বলা আছে যে এইটার প্রয়োগ সীমিত।”
আপনার অসংলগ্ন কথাবার্তাই প্রমাণ করে যে সুস্থ বিতর্ক করার ন্যুনতম যোগ্যতাটুকুও আপনি অর্জন করেননি।
গভীর মনোযোগ সহকারে প্রশ্নোত্তরগুলো পাঠ করে দেখুন, কুরআন-সুন্নাহ ও মানবীয় যুক্তি প্রয়োগ করে কতভাবে আপনার প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে আপনার কাছে না আছে কুরআন-সুন্নাহর কোন প্রমাণ, আর না আছে কোন সুস্থ যুক্তি। কোনরূপ প্রমাণ ছাড়াই আপনি গো ধরে আছেন আপনার কথা মেনে নেয়ার জন্য।

মনে রাখবেন। প্রশ্নোত্তরের এই বিষয়টি আমাদের দু’ পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ইতোমধ্যেই পঠিত হয়েছে শতাধিক পাঠক কর্তৃক। এভাবে বক্তব্য দিয়ে আপনার পাণ্ডিত্য জাহির করছেন, নাকি দেড় সহস্রাব্দি জুড়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের বিপরীতে অযৌক্তিক কথা বলে নিজেকে কুপমণ্ডুক প্রমাণ করছেন – তা বিচার করবে সাধারণ পাঠকরাই।
দাদা নাতির ক্ষেত্রেও ইসলামের সমাধান সর্বাধিক গ্রহনযোগ্য সমাধান। তারপরও ইসলামের সমাধান পছন্দ না হলে, যার সমাধান পছন্দ হয় তার উম্মত বলে নিজেকে পরিচিত করানোই অধিকতর যুক্তিসংগত। কুপমণ্ডুক ইসলামবিদ্বিষ্টদের মতের অনুসারী হয়ে ইসলামের দরদী সেজে “ধর্মটাকে বিতর্কিত” করা থেকে রক্ষা করার ভান করা স্থুলমাত্রার প্রতারণা।
ফাউল তর্ক না করে আপনার কাছে কোন যুক্তিসংগত প্রমাণ থাকলে তা ধুলে ধরুন। ইসলামের সোজা পেরেক অবশ্য মানসিকতার বাঁকা ছিদ্রপথে ঢুকার কথা নয়।
ধন্যবাদ।

Leave a comment

Filed under Uncategorized

ইতিহাসের আয়নায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

ইখতিয়ার উদ্দিনের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ শতকে (১২০৪) বাংলায় মুসলমানেরা শাসন ক্ষমতা লাভ করে। মুঘল শাসনামলে (১৫২৬১৭৫৭) এই ক্ষমতা আরো সুসংহত হয়। বিচ্ছিন্ন কিছু সময়ের কথা বাদ দিলে এই দীর্ঘ সময় জুড়ে রাষ্ট্রীয় আইনের উৎস ছিল কুরআন, সুন্নাহ তা থেকে উৎসারিত ফিকহ (law) মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর (১৬১৮ ১৭০৭) যথারীতি চল্লিশ জন আইন বিশেষজ্ঞের একটি কমিশন (Law Commission) তৈরী করেন। বেশ কয়েক বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এই কমিশনআল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহনামে একটি আইন সংহিতা (law code) তৈরী করেন। ছয় খণ্ডে সমাপ্ত এই আইন গ্রন্থে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য বিষয়াবলীর আইনগত দিকসমূহ আলোচিত হয়েছে। সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর উক্ত আইনগ্রন্থটিকেরাষ্ট্রীয় আইন” (law of the land) হিসেবে কার্যকর করেন। সে সময় আল্লাহর আইনকে মসজিদ মাদরাসায় সীমাবদ্ধ রেখে রাষ্ট্র শাসনের ক্ষেত্রে মুসলমানরা নিজেদেরকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করার কোন দাবী করেছে বলে ইতিহাসে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাদেরই বংশধর আমরা। অথচ আমাদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে  “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”, “রাষ্ট্র হতে হবে সম্পূর্ণ ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত” “প্রগতিশীল বাংলাদেশের জন্য ধর্ম রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ অপরিহার্যধর্মীয় রাষ্ট্র নয়, ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত (secular) রাষ্ট্রই মানবাধিকারের নিশ্চায়কইত্যাদি ধারণার উৎসাহী প্রবক্তা প্রচারক। এদের প্রায় সবাইকে আবার আদমশুমারী ভোটার তালিকায় মুসলিম হিসেবে নিবন্ধিত হতে দেখা যায়। প্রতি ওয়াক্তে না হলেও শুক্রবারে জুমআর নামাজে বছরে দুইবার ঈদের নামাজেও তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। এমন লোকের সংখ্যাও একেবারে কম নয় যারা উপরোক্ত শ্লোগানসমূহের আগ্রহী প্রচারক না হলেও এসবের প্রতি নিষ্ঠাবান বিশ্বাসী। এই বিবর্তন কী করে হল? বক্ষ্যমান নিবন্ধে এই জিজ্ঞাসারই জবাব খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

শাসন ক্ষমতায় ইংরেজঃ

­­­­­

১৭৫৭ সালে পলাশীর নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে বঙ্গ রাজ্যের রঙ্গমঞ্চে মহানায়ক রূপে আবির্ভূত হয় ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী । ১৭৬৫ সালে সংঘটিত বক্সারের যুদ্ধের পর দিল্লী সম্রাটকে কিছু বাৎসরিক বখশিসের ওয়াদা দেয়ার মাধ্যমে ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী  বাংলা, বিহার ও উরিষ্যার দেওয়ানী (revenue) আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। সূচনা হয় বস্তুবাদী (materialistic) ইংরেজ শাসনের। তবে, ‘ইংরেজ’ – এক দূরদর্শী জাতির নাম। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত ভারতীয় মুসলিমদের মাইন্ড সেট দেখে তারা পরিস্কার বুঝতে পারে যে, ঠিক এই মুহুর্তে পুরোপুরি ধর্মহীন বস্তুবাদী আইন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা বুমেরাং হতে পারে। কারন, তখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জনতার মধ্য থেকে একটি ধর্মহীন ও নিরেট বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থার সমর্থক দালাল গোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়নি। ‘ধীরে চলো’ নীতির ভিত্তিতে প্রায় পৌনে এক শতাব্দী (১৭৫৭-১৮৩৫) ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলতে থাকে বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থার সমর্থক দালাল গোষ্ঠী গড়ে তোলার কাজ। এই সময়ে আদালতে বিচারক পদে অধিষ্ঠিত হয় বস্তুবাদী ইংরেজ। তিনি অবশ্য বৃটিশ বস্তুবাদী আইনের পরিবর্তে ইসলামী আইন অনুসারে মুসলিমদের বিচার ফায়সালা করে দিতেন। কিন্তু, আরবী ভাষা ও ইসলামী আইনের সাথে পরিচিতি না থাকার কারণে তাকে সহযোগিতা করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয় মুসলিম মৌলভী। এই প্রেক্ষিতে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস চার্লস হেমিলটনকে দিয়ে ইসলামী আইনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিদায়া’র ইংরেজি অনুবাদ করিয়ে নেন, যাতে ইসলামী আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইংরেজ বিচারককে আর মুসলিম মৌলভীর সহযোগিতা নিতে না হয়।

শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে বিতর্কঃ 

­­­­­­

১৮১৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর চার্টার নবায়নের সময় এ এলাকার লোকদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। এ অর্থ কোন শিক্ষার পেছনে খরচ করা হবে – এ নিয়ে যথারীতি বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। মুসলিমদের একটি অংশ দাবী করলো, এতদিন ধরে চলে আসা আরবি শিক্ষার পেছনে এ অর্থ খরচ করা হোক। হিন্দুদের পক্ষ থেকে একটি গ্রুপ সংস্কৃত এবং অপর গ্রুপ ইংরেজি শিক্ষার প্রস্তাব দিল।

স্থানীয় বস্তুবাদী ইংরেজ তৈরীর উদ্দেশ্যে শিক্ষা ও আইনব্যবস্থার পুনর্গঠনঃ 

 

ইতোমধ্যে লর্ড বেন্টিঙ্ক গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পাশ্চাত্যের খোদাদ্রোহী ও বস্তুবাদী জীবন দর্শন এ এলাকার জনগোষ্ঠীর উপর আনুষ্ঠানিকভাবে চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ড থেকে খ্যাতনামা আইনজ্ঞ লর্ড ম্যাকলে (Macaulay) কে পাঠানো হয়। আইন ও শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান লর্ড ম্যাকলে বৃটিশ পার্লামেন্টের নিকট Minute on Indian Education নামে একটি প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। তাতে তিনি ইংরেজদের স্বার্থে এ এলাকায় কী ধরনের জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা দরকার তা বিশদভাবে তুলে ধরেন। উক্ত রিপোর্টের এক জায়গায় তিনি বলেন, “We must at present do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern; a class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect.”  অর্থাৎ, “বর্তমানে আমাদেরকে এমন এক শ্রেণীর লোক তৈরীর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে যারা আমাদের এবং আমাদের লক্ষ লক্ষ প্রজার মধ্যে দোভাষীর কাজ করেতে পারবে; এমন এক শ্রেণী যারা রক্ত-মাংসে ভারতীয় হলেও রুচিবোধ, মতামত, নীতি – নৈতিকতা ও বুদ্ধিমত্তায় হবে পরিপূর্ণ ইংরেজ।” এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৮৩৬ সালে উপমহাদেশের আইন ও শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী প্রভাবকে খতম করে পাশ্চাত্যের খোদাবিমুখ ও নিরেট বস্তুবাদী ধ্যান ধারনা প্রয়োগ হতে থাকে।

পাশ্চাত্যে নাস্তিক্যবাদ ও সেক্যুলারিজমের উৎপত্তিঃ

 

এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, চতুর্দশ শতকে ইউরোপে রেনেসাঁ শুরু হবার পর থেকে পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের একটি বড় অংশ নাস্তিক্যবাদকে (atheism) প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আরেকটি অংশ ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রকাশ্যে অস্বীকার না করে তাঁকে নিষ্ক্রিয় ঈশ্বরে পরিণত করে নাস্তিক ও আস্তিকের মধ্যে সমঝোতার পথ বেছে নেয়। এই মধ্যপন্থী মতের নাম দেয়া হয় ‘সেক্যুলারিজম’ (Secularism)।

সেক্যুলারিজম’: ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মহীনতা

 

আমাদের দেশে ‘সেক্যুলারিজমের’ অনুবাদ ও তাৎপর্য নিয়ে সেক্যুলারদের পক্ষ থেকে প্রায়শঃ বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। সাধারণত শব্দটির বাংলা অনুবাদ করা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। আর তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘সেক্যুলারিজমের’ তাৎপর্য হল,  “প্রত্যকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার সুযোগ পাবে; একজনের ধর্ম আরেকজনের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া যাবে না”।

অনুদিত শব্দটি মূল শব্দের তাৎপর্য তুলে ধরতে কতটুকু সক্ষম তার উপর নির্ভর করে  কোন বিদেশী শব্দ অনুবাদের স্বার্থকতা। এদিক থেকে বিবেচনা করলে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি secularism এর স্বার্থক অনুবাদ নয়। কারণ, এ অনুবাদটি সেক্যুলারিজমের সঠিক তাৎপর্যের পরিবর্তে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দ থেকে মনে হয় যে, এই দর্শন ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, অর্থাৎ, প্রতিটি ধর্মকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়। আসলে তা নয়। সেক্যুলারিজমের সঠিক তাৎপর্য হচ্ছে, সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থার বৃহত্তর পরিমন্ডলে ধর্মের প্রভাব (আগে থেকে থাকলে  তা ) উৎখাত করা এবং (আগে থেকা না থাকলে) নতুন করে উপরোক্ত পরিমণ্ডলে ধর্মের নির্দেশাবলী যাতে কিছুতেই ঢুকতে না পারে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংস্থাসমূহকে ব্যবহার করা।* অর্থাৎ, সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ধর্মকে উৎখাত (eviction) ও প্রতিরোধ (prevention) করা ই  সেক্যুলারিজমের মূল উদ্দেশ্য। এ দৃষ্টিকোণ থেকে “ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত সমাজ/রাষ্ট্র তত্ত্ব” হতে পারে secularism এর সঠিক উদ্দেশ্য জ্ঞাপক অনুবাদ।

* Oxford Advanced Learners Dictionary তে প্রদত্ত secularism ও secularise শব্দের অর্থ নিম্নে দেওয়া হলঃ

Secularism: the belief that religion should not be involved in the organization of society, education, etc. (সেক্যুলারিজমঃ সমাজ, শিক্ষা ইত্যাদির গঠনে ধর্ম জড়িত হওয়া উচিত নয় – শীর্ষক চিন্তাধারা।)

Secularise: to make sth SECULAR; to remove sth from the control or influence of religion: a secularized society (সেক্যুলারাইজঃ কোন কিছুকে সেক্যুলার বানানো; কোন কিছুকে ধর্মের নিয়ন্ত্রন ও প্রভাব থেকে সরিয়ে দেয়া, যেমন সেক্যুলার সমাজ।)

বাংলাদেশের বাস্তব উদাহরণঃ

সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ধর্মকে উৎখাত (eviction) ও প্রতিরোধ (prevention) করা ই যে সেক্যুলারিজমের মূল উদ্দেশ্য তা বুঝার জন্য ইউরোপের কোন ইতিহাস গ্রন্থ পড়তে হবে না; খোদ বাংলাদেশের ইতিহাসেই তার বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ১৯৭২ সালে গণপরিষদ কর্তৃক যে সংবিধান গৃহীত হয় তাতে ‘সেক্যুলারিজম’ (তাদের ভাষায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’) কে মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ঘোষণা করে তাকে সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হল। [আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা) ]

সেক্যুলারিজমকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ঘোষণার পর তা বাস্তবায়নের জন্য ধর্ম উৎখাত ও প্রতিরোধ (eviction and prevention) – উভয়বিধ পদক্ষেপই নেয়া হল। ঐতিহ্যবাহী কবি নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে ‘ইসলাম’ শব্দ কেটে কবি নজরুল কলেজ করা হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে ‘রাব্বি যিদনী ইলমা’ [অর্থাৎ, হে প্রভু, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও (আল কুরআন, সূরা ত্বা-হা, আয়াত ১১৪)] কেটে দেয়া হল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও ফজলুল হক মুসলিম হল থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেয়া হল। [সম্প্রতি অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মুসলিম শব্দটি ফিরে এসেছে]। অথচ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল থেকে ‘জগন্নাথ’ (যা হিন্দুদের ঈশ্বরের নাম) শব্দটি কাটা হল না। [আমরা বলছি না যে, এ শব্দটি কেটে দেয়া উচিত ছিল। আমরা শুধু এটুকুই বুঝাতে চাচ্ছি যে, এদেশের ইতিহাসে সেক্যুলারিজম মানেই শুধু ইসলামের প্রতি একতরফা উগ্র বিদ্বেষ পোষণ এবং অপর দিকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির নাম দিয়ে হিন্দু ধর্মের রীতি-নীতির অনুসরণ।] রেডিও টেলিভিশনে সালাম – কুরআন তেলাওয়াত বন্ধ করে দেয়া হল। আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও অখণ্ড পাকিস্তানের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ  সে সময়ের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে ‘অতি প্রগতিবাদী নেতৃত্ব’  শিরোনামে লিখেছেন,

প্রবাসী সরকার ঢাকায় ফিরার সঙ্গে – সঙ্গে প্রমাণিত হইল যে এটা (অর্থাৎ, যুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশ একটি সেকিউলার রাষ্ট্র, মুসলিম রাষ্ট্র নয়) সরকারী অভিমত। দেশে ফিরিয়াই তাঁরা যা দেখাইলেন, তাতে রেডিও-টেলিভিশনে কোরান-তেলাওয়াত, ‘খোদা হাফেয’, ‘সালামালেকুম’ বন্ধ হইয়া গেল। তার বদলে ‘সুপ্রভাত’, ‘শুভ সন্ধ্যা’ ও ‘শুভ রাত্রি’ ইত্যাদি সম্বোধন প্রথা চালু হইল। [আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, বাংলা একাডেমী ২০০১, পৃষ্ঠা ৪৫৯]

এগুলো ছিল উৎখাত নীতি (eviction policy) বাস্তবায়নের কিছু দিক। আর ভবিষ্যতে যাতে ইসলামের নির্দেশাবলী সমাজ ও রাষ্ট্রে কিছুতেই প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সে উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হল প্রতিরোধ নীতি (prevention policy)। এ নীতি বাস্তবায়নের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যই হল সংগঠনের স্বাধীনতা। অর্থাৎ, কোন উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য যে কোন ব্যক্তিরই সংগঠন তৈরী করার অধিকার রয়েছে।  জনগনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সেই সংগঠনের উদ্দেশ্যের সাথে একমত পোষণ করলেই কেবল তা রাষ্ট্র ও সমাজে কার্যকর হবে। গণতন্ত্রের এই স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বজন স্বীকৃত নীতিকে লংঘন করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন গ্রুপ ইসলামী আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার যে কোন আন্দোলনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ’৭২ এর সংবিধানে ৩৮ অনুচ্ছেদটি ছিল নিম্নরূপঃ

জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে;

 

     তবে শর্ত থাকে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোন সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সঙ্ঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোন সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোন প্রকারে তাহার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোন ব্যক্তির থাকিবে না।

অর্থাৎ, রাষ্ট্র ও সমাজে কার্যকর করার জন্য যে কোন দর্শন (চাই তা উগ্র নাস্তিক্যবাদ, শোষণমূলক পুঁজিবাদ কিংবা সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্রের নামে চরম একদেশদর্শী গুণ্ডা রাষ্ট্রতত্ত্বই হোক না কেন) নিয়ে রাজনীতি ও সংগঠন করা যাবে; কিন্তু কিছুতেই ধর্মীয় নির্দেশাবলী বাস্তবায়নের জন্য সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চালানো যাবে না। এখন প্রশ্ন হল, যে দেশের সিংহভাগ মানুষ আল্লাহকে নিজেদের ইলাহ (সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী) হিসেবে স্বীকার করে ও আল্লাহর নির্দেশ সর্বাগ্রে শিরোধার্য মনে করে সে দেশে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য সঙ্ঘবদ্ধ হওয়া যাবে না অথচ আল্লাহর নির্দেশাবলীকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে মানুষ নিজেরাই আইন প্রণয়নের পূর্ণ অধিকারী এমন দর্শন প্রতিষ্ঠা করার জন্য অসংখ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্থা তৈরী করার উন্মুক্ত লাইসেন্স থাকবে – এহেন নীতি কার কারা, কেন এবং কার স্বার্থে প্রণয়ন করেছিল?

সেকুলারিজম কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা?

এখন প্রশ্ন হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী ছিল? বীর জনগণকে কিসে মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও প্রাণোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল? তাদের উদ্দেশ্য কি এই ছিল যে, “ইনশাল্লাহ, আমরা যদি দেশকে মুক্ত করতে পারি তাহলে আল্লাহ প্রদত্ত আইন কানুনগুলোকে নির্বাসনে পাঠিয়ে সেক্যুলারিজম কায়েম করে আমরা নিজেরাই আইন প্রণয়নের সর্বময় ক্ষমতার মালিক-মোক্তার বনে যাবো”? এই প্রশ্নের উত্তর মুক্তিযুদ্ধের নয় নম্বর সেক্টর কমাণ্ডার মেজর জলিলের ভাষায় শুনুন,

“আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বিশেষ একটি মহলের ধারণা – ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা কি হবে তার মীমাংসা হয়ে গেছে। এ ধরণের উদ্ভট খেয়ালী মন্তব্য কেবল  দুঃখজনকই নয়, বিবেক এবং ‌‌‌‌‍‍ জ্ঞান বিবর্জিতও বটে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং নেতৃত্বদানকারী একজন সেক্টর কমাণ্ডার হিসেবে আমি ঐ সকল বন্ধুদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯৭১ সালে আমরা বাঙ্গালী জনগন পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক  আকস্মিকভাবে চাপিয়ে দেয়া একটি অঘোষিত যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং রক্ষা করার জন্যই যুদ্ধ করেছি কেবল। এটা ছিল স্বাধীনতা আদায়ের যুদ্ধ, কোন ধর্মযুদ্ধ নয় যে, যুদ্ধ বিজয়ের পরবর্তীকালে বিশেষ কোন ধর্মকে পরাজিত বলে বিবেচনা এবং বর্জন করতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের আওতায় ধর্ম সংকুচিত কিংবা পরাভূত হতে যাবে কেন, কোন যুক্তিতে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মীয় অনুপ্রেরণা মোটেও অনুপস্থিত ছিলনা। প্রতিটি যোদ্ধার শ্বাসে-নিঃশ্বাসে, রণক্ষেত্রের প্রতিটি ইঞ্চিতে স্মরণ করা হয়েছে মহান স্রষ্টাকে – তার কাছে কামনা – প্রার্থনা করা হয়েছে বিজয়ের জন্য, নিরাপত্তার জন্য। অধিকাংশ যোদ্ধাই যেহেতু ছিল এদেশের সংখ্যাগুরু মসলিম জনগণেরই সন্তান, সেহেতু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর বুলেট, মর্টারের সন্মুখে আল্লাহ এবং রসূলই ছিল তাদের ভরসাস্থল। সুতরাং  ’৭১ –এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ইসলাম অনুপস্থিত ছিল বলে যারা যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন, তারা কেবল বাস্তবতাকেই অস্বীকার করছেন।” (মেজর (অবঃ) এম এ জলিল, কৈফিয়ত ও কিছু কথা, পঞ্চম প্রকাশ, ঢাকা, পৃষ্ঠা ২৫-২৬)

সেক্যুলারিজমকে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে প্রচার করে তাদের পরিচয় বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন,

তবু যারা মুক্তিযুদ্ধে ধর্মীয় চেতনার অনুপস্থিতি আবিষ্কার করতে চান, তাদের অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের ধারে কাছেও ছিল না। (প্রাগুক্ত ২৬)

মুক্তিযুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রতত্ত্ব কতভাগ লোকের প্রেরণা যুগিয়েছিল সে প্রসঙ্গে মেজর জলিলের বিশ্লেষণ নিম্নরূপঃ

“‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনারর নির্দিষ্ট রূপ যে ছিল না তা নয়, তবে সে চেতনা সীমাবদ্ধ ছিল একটা বিশেষ মহলের মধ্যে এবং তারা হচ্ছে তৎকালীন ছাত্র সমাজের সর্বাধিক সচেতন মহলেরও একটা ক্ষুদ্র অংশবিশেষ – বিশেষ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সেই অংশটি যার নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র নেতা সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ প্রমুখ। এই অংশটির চিন্তা-চেতনায় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানী চক্র থেকে মুক্ত করে এই অঞ্চলকে বাঙালীর জন্যে একটি স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল। (মেজর (অবঃ) এম এ জলিল, অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা, সপ্তম প্রকাশ, পৃঃ ৩২)

অন্যান্য সংগঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

এর বাইরে যে ছাত্র সমাজ বা রাজনৈতিক সংগঠন ছিল তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ছিল গতানুগতিক দেশপ্রেমিকদের দায়িত্বস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধের উপরিউক্ত নির্দিষ্ট চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়। (প্রাগুক্ত)

অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধার চেতনাবোধ প্রসংগে তিনি লিখেছেন,

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সেই সুনির্দিষ্ট চেতনার ধারাবাহিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়নি বলেই অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই জানত না তারা কোন লক্ষ্য অর্জনেরে স্বার্থে ঐ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা কেবল একটা কথাই জানতো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীসহ সকল অবাঙ্গালীকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাড়িয়ে দেশকে মুক্ত করতে হবে। পুনরায় বাপ-দাদার ভিটায় স্বাধীনভাবে ফিরে যেতে হবে। এর অধিক তারা আর কিছুই জানতনা বা বুঝত না। (অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা, সপ্তম প্রকাশ, পৃঃ ৩৩)

 

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সেক্যুলারিজমঃ

অনেকসময় সেক্যুলারিজমের প্রবক্তাদেরকে এ যুক্তির অবতারনা করতে দেখা যায় যে, ধর্ম ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়; সামস্টিক জীবনে এর কোন প্রয়োজন নেই। এটি একটি হাস্যকর যুক্তি। কারণ, মানুষের ব্যক্তিজীবন সামস্টিক জীবনেরই একটি অপরিহার্য অংশ। একটি ব্যক্তি ব্যক্তিগত জীবনে সৎ, আর সামাজিক জীবনে অসৎ – তা কিছুতেই সম্ভব নয়। কারণ, কেউ ব্যক্তি জীবনে সৎ হতে চাইলে তাকে সামাজিক জীবনে সততার পরিচয় দিয়েই সৎ হতে হবে। অনুরূপভাবে সত্যবাদিতা, আমানতদারী, বিশ্বস্ততা, ধার্মিকতা ও পরোপকার ইত্যাদি গুণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ, এসকল গুনে গুনান্বিত হতে চাইলে সামাজিক জীবনে এ সকল গুণের পরিচয় দিতে হবে। যদি কোন রাষ্ট্র আইন করে বলে দেয় যে, সামাজিক জীবনে এ সকল গুনের চর্চা করা যাবেনা এবং জনগনও নিষ্ঠার সাথে রাষ্ট্রের এই আইন মেনে চলে তাহলে সে সমাজে এ সকল গুণের অধিকারী লোক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সুদের বিষয়টি ধরা যাক। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে নির্দেশ দেয় সুদী কারবার থেকে দূরে থাকতে। [لا تاكلوا الربا তোমরা সুদ খেয়ো না– (আলে ইমরান ১৩০)   فان لم تفعلوا فاذنوا بحرب من الله و رسوله অর্থাৎ, সুদী কারবার পরিত্যাগ না করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও (আল বাকারাহ – ২৭৯)] এখন যতক্ষন পর্যন্ত রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে সুদী কারবারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করবে ততক্ষন পর্যন্ত কোন ব্যক্তির পক্ষে সুদমুক্ত জীবন যাপন করা সম্ভব হবে না। অতএব, রাষ্ট্র যদি সেক্যুলারিজমের দোহাই দিয়ে ইসলামের “সুদ খেয়ো না” – শীর্ষক নিষেধাজ্ঞাটি রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর না করে, তাহলে দেশের কেউ সুদমুক্ত জীবন যাপন করতে পারবে না । [1] অর্থাৎ, সামাজিক জীবনে এ আইন কার্যকর না থাকলে ব্যাক্তি জীবনেও তা কার্যকর রাখা অসম্ভব। কারণ, ব্যক্তি একাকী কোন বানিজ্যিক চুক্তি করতে পারে না।

অনুরূপভাবে যাকাত প্রসঙ্গ। আল্লাহ ধনী মানুষের সম্পদে গরীব মানুষের অধিকার ঘোষণা করেছেন। (و فى اموالهم حق للسائل و المحروم অর্থাৎ, ধনী মানুষের সম্পদে রয়েছে গরীব মানুষের অধিকার আয যারিয়াত ) ইসলামী আইনের পরিভাষায় তার নাম যাকাত। রাষ্ট্র আইন করে বাধ্যতামূলক ভাবে যাকাত আদায় না করলে গরীব মানুষ তার ইসলাম প্রদত্ত অধিকার যথাযথ ভাবে পেতে পারে না। অনেকে হয়তো বলতে পারেন, লোকজন স্বেচ্ছায় যাকাত আদায় করে দিলেই তো গরীব মানুষ তার অধিকার পেয়ে যায়; বাধ্যতামূলক আইন প্রনয়নের মাধ্যমে যাকাত আদায়ের কী প্রয়োজন?  আমাদের উত্তর হলো- স্বেচ্ছায় যাকাত আদায় করে দিলে তো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ না করলেও চলে। কিন্তু, আমরা দেখতে পাচ্ছি লোকজন স্বেচ্ছায় তা আদায় করছে না। এর কারণ কী? এর সুস্পষ্ট কারণ হল, মানুষ আদতেই স্বার্থপর। আর্থিক বিষয়ে মানুষের এই স্বভাব আরো প্রকট হয়ে উঠে। আর রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ঠিক এখানেই। এজন্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্রকে বলা হয় “বল প্রয়োগকারী সংস্থা” (agency with coercive power) । জনগন স্বেচ্ছায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে না চাইলে রাষ্ট্রকে তার বল প্রয়োগকারী শক্তির (coercive power) প্রয়োগ করতে হয়। অন্যথায় রাষ্ট্র নিস্প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

এদেশে আয়কর কায়েম আছে কিন্তু যাকাত কায়েম নেই

বাংলাদেশের একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে আরো সহজ হবে। এদেশে আয়কর (income tax) কায়েম আছে; অথচ যাকাত কায়েম নেই। কারণ, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের (The Income Tax Ordinance, 1984) মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমানের বেশী উপার্জনকারীর উপর আয়কর প্রদান বাধ্যতামূলক করা ও অনাদায়ে জেল-জরিমানাসহ বিভিন্ন দণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে কারো পক্ষেই আয়কর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে সরকার এ খাত থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করে নিতে পারছে। অন্যদিকে ১৯৮২ সালে প্রণীত হয় যাকাত তহবিল অধ্যাদেশ (The Zakat Fund Ordinance, 1982)। এরপরও প্রায় নব্বই শতাংশ সচ্ছল লোক যাকাত আদায় করছে না। কারণ, এ আইনের কোন বাধ্যতামূলক (binding) দিক নেই। এ আইনে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিকরা ইচ্ছা করলে তাদের যাকাত এই তহবিলে জমা দিতে পারবে। ব্যস! অর্থাৎ, কেউ ইচ্ছে করলে যাকাত দিবে, কেউ ইচ্ছে না করলে দিবে না; রাষ্ট্র এ নিয়ে কোনপ্রকার মাথা ঘামাবে না। কেউ না দিলে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা কিংবা অন্য কোন দণ্ডের ব্যবস্থা করবে না (যার ব্যবস্থা রয়েছে আয়কর প্রদান না করার ক্ষেত্রে)। একবার চিন্তা করে দেখুন তো, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (VAT = Value Added Tax) যদি যাকাত তহবিল অধ্যাদেশের মত ঐচ্ছিক হতো, তাহলে জনগনের শতকরা দশ ভাগের বেশী লোক কি স্বেচ্ছায় তা আদায় করতো? আর সরকারও কি এ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে পারতো?

শাসকগোষ্ঠী যে কারণে যাকাতকে বাধ্যতামূলক করেনিঃ

১৯৮২ সালের যাকাত তহবিল অধ্যাদেশ (The Zakat Fund Ordinance, 1982) ও ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ (The Income Tax Ordinance, 1984) – দু’টি আইনই মুসলিম নামধারী শাসকেরাই প্রবর্তন করেছিল। এখন প্রশ্ন হল, যাকাতকে ঐচ্ছিক (optional) আর আয়করকে বাধ্যতামূলক (compulsory) করার কারণ কী?  তার কারণ মূলত দু’টি; (১) বৃটিশের গোলামির শাসনামল থেকে চলে আসা সেকুলারিজম (সমাজ, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় আইন কানুন থাকবে সম্পূর্ণ ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত) নীতি, ও (২) যাকাতের গরীব বান্ধব (poor friendly) নীতি।

প্রথম নীতিটির (Secularism) কারণে আমাদের সমাজের মেধাবী ও সম্ভাবনাময় ছাত্রদের বৃহত্তম অংশ ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ধর্মের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের জ্ঞানটুকু অর্জন না করেই বড় হয়ে উঠেছে এবং কালক্রমে তারাই আমাদের শাসনযন্ত্রের উপর আসন গেড়ে বসেছে। লর্ড ম্যাকলে প্রবর্তিত সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থায় তারা ধারাবাহিক এই শিক্ষাই পেয়ে এসেছে যে, – “যুক্তিবাদের (Rationalism) দাবী অনুযায়ী কোন বস্তু সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবার আগ পর্যন্ত তাকে অস্তিত্বহীন (non-existent), অথবা কমপক্ষে সংশয়পূর্ণ (doubtful), মনে করতে হবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে স্রষ্টার অস্তিত্ব সংশয়পূর্ণ; অর্থাৎ, এখনো তা প্রমাণিত সত্য নয়। আর মহাবিশের স্রষ্টা যদি থেকেও থাকে তাহলে তিনি কেবল ‘প্রথম কার্যকারণ’ (First Cause)। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করে   থাকলেও তিনি কিছু চিরন্তন ‘প্রাকৃতিক আইন’ (natural laws) তৈরী করে দিয়েছেন যার অধীনে মহাবিশ্ব সক্রিয় রয়েছে। তিনি সেই  প্রাকৃতিক আইনে আর কোন হস্তক্ষেপ করছেন না; কিংবা চেষ্টা করলেও তিনি আর হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। [2] ধর্মগুলো স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত কোন নির্দেশমালা নয়; এগুলো বরং সামাজিক উদ্ভাবনীরই (social inventions) একটি অংশ। সমাজের মানুষকে নিয়ন্ত্রন করার উদ্দেশ্যে জ্ঞানী লোকেরা যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম আবিস্কার করেছে। ধর্ম কেবল মানুষের আধ্যাত্মিক  বিষয়াবলী (spiritual affairs) নিয়ন্ত্রন করার মন্ত্র বিশেষ। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিষয়াবলীর কোন সমাধান ধর্মে নেই; আর থাকলেও তা আলোকিত যুগের (The Age of Enlightenment) ইউরোপীয় নাস্তিক দার্শনিকদের প্রদত্ত সেক্যুলার সমাধানের তুলনায় অনেক নিম্ন মানের”। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রে আসীন হয়ে তারা ধর্ম সম্পর্কে ছাত্রজীবনে রপ্ত করা বিশেষ দৃষ্টিভংগীর প্রতিফলন ঘটাতে থাকে। মুসলিম জনতার চাপের মুখে মাঝে মধ্যে ইসলামী বিষয়েও তারা আইন প্রণয়নে বাধ্য হয়। কিন্তু এ বিষয়ের প্রতি আন্তরিকতা না থাকার ফলে আইন প্রণয়নের মধ্যেও অসচেতন মুসলমানদেরকে প্রায়ই সুকৌশলে ধোঁকা দিয়ে থাকে। যাকাত অধ্যাদেশ সেই ধোকারই একটি অংশ। মুসলিম জনতাকে তারা একথা বুঝানোর চেষ্টা করে যে, “আরে মিয়া! আমরাও তো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রবক্তা। দেখছো না, আয়কর আদায়ের মত করে যাকাত আদায়ের জন্যও আমরা অধ্যাদেশ জারি করেছি”? বস্তুত, এটি একটি শুভংকরের ফাঁকি। কারণ, যাকাত অধ্যাদেশের বাধ্যতামূলক দিক (binding aspect) না থাকার ফলে যাকাত পরিত্যাগকারীদের গায়ে আঁচড়টুকু লাগারও সুযোগ নেই।

আর দ্বিতীয় নীতিটির মূলকথা হল

(চলবে)


[1] আমাদের দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার বাস্তব সাক্ষী। বস্তুবাদী বৃটিশ প্রবর্তিত খোদাদ্রোহী আইনের বিষাক্ত শিকড়টি এখনো আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থা থেকে সমূলে উৎপাটিত  না করার ফলে আপনি সুদ না নিলেও অনেক ক্ষেত্রে আপনি সুদ দিতে বাধ্য থাকবেন। অথচ, রাসূল (সাঃ) এর হাদীস অনুযায়ী  لعن رسول الله صلى الله عليه و سلم اكل الربا و مؤكله    সুদ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের উপর রাসূল (সাঃ) অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন  (সুনানুত তিরমিযি, ৩য় খণ্ড, হাদীস নং ১২০৬)। কারণ, সুদ দাতা সুদ প্রদানের মাধ্যমেই সুদখোরের রমরমা ব্যবসা জিইয়ে রেখেছিল। তাছাড়া, সব সমাজেই সুদ গ্রহীতার তুলনায় সুদ দাতার সংখ্যা বেশী। তারা যদি সংঘবদ্ধভাবে রুখে দাড়াতো, তাহলে সমাজে মুষ্টিমেয় সুদখোরের সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পারতো না।

[2] Science seems to have uncovered a set of laws that, within the limits set by the uncertainty principle, tell us how the universe will develop with time, if we know its state at any one time. These laws may have originally been decreed by God, but it appears that he has since left the universe to evolve according to them and does not intervene in it.  Stephen Hawking, A Brief History of Time,            pp

Leave a comment

Filed under Uncategorized

The National Women Development Policy (2008) and the Issue of Non-compliance with the Quran and Sunnah

Before parliamentary elections our major political parties frequently give a promise to the nation that “NO LAW INCONSISTENT WITH THE QURAN AND SUNNAH SHALL BE PASSED”. Later on too often laws are passed by the Parliament despite the allegation that the said law is inconsistent with the Quran and Sunnah. With very few exceptions the Government side generally propagates through the public media that the law is NOT repugnant to the Quran and Sunnah and in this course they utter certain words taught by the ideologically biased western orientalists who are notorious for citing fragmented verses of the Quran and Sunnah omitting the preceding and subsequent verses and thereby drawing a forceful and wrong conclusion just to misguide the readers who have no direct access to the sources of Islam. No serious initiative is taken by the Government to scrutinize the issue through the experts and as a consequence general people become confused. The same thing has happened in the case of The National Women Development Policy (NWDP) also. The present article aims at scrutinizing the Policy in the light of the Quran and Sunnah.

 

Man and woman jointly constitute “human being”. Each of them is equally important for the existence of this species on the surface of the earth. But unfortunately sound relationship between these two components of mankind is seldom found in human history. Most of the nations in the course of history were in extremely marginalized positions. Sometimes the woman has been reduced to the position of a maid, treated as other chattels, deprived of all rights of inheritance and ownership, regarded as an embodiment of sin and misfortune and refused all opportunities for developing and unfolding her personality. This was one extremism. On the other hand the same woman is raised to prominence in a manner that she is worshipped as a deity, her virginity is a matter of worshipping and she is given absolute freedom leading to a storm of immorality and licentiousness and rendering a plaything for carnal indulgence.

Islam gives us its own idea about the relationship between man and woman and prescribes rules of behaviour between them. Mankind is not obliged to accept those prescriptions rather they are at liberty to accept those prescriptions or simply reject them. But he who wants to be, or to remain, a Muslim  must have to accept the prescriptions given in the Quran and Sunnah in toto. It is the demand of simple logic that if you reject rules and regulations of an association you can not remain a member of that association. This fact is mentioned in the Quran: وما كان لمؤمن و لا مؤمنة اذا قضى الله امرا ان يكون لهم الخيرة من امرهم و من يعص الله و رسوله فقد ضل ضلالا مبينا (الاحزاب ۳٦)   A believing man or woman does not have any right to have an option in their affairs when a matter has been decided by Allah and His Rasool; and whosoever disobeys Allah and His Rasool has indeed strayed into a clearly wrong path. [2]

According to Islam both man and women are EQUAL in dignity, BUT their social functions, rights and responsibilities are in many respects DIFFERENT. [The Quran says  لهن مثل الذى عليهن بالمعروف و للرجال عليهن درجة (البقرة ٢٢٨) Women have rights similar to their duties in an equitable manner, although men have a degree high over them.[3]] In certain cases man gets certain rights to which woman is not entitled and vice versa. In other words the very idea of complete equalization of man and woman in all types of rights, duties and functions goes against established principles of Islam. On the other hand the basis of CEDAW ratified by Bangladesh is the notion: “…the full and complete development of a country, the welfare of the world and the cause of peace require the maximum participation of women on equal terms with men in all fields “.

Inequalities of man and woman in Islam:

Man is the guardian of woman

الرجال قوامون على النساء بما فضل الله بعضهم على بعض و بما انفقوا من اموالهم (النساء ٣٤)  Men are the managers of the affairs of women because Allah has made the one superior to the other and men spend of their wealth on women [4]

الرجل راع على اهله و هو مسؤل (البخارى) Man is the supervisor of his family and he will be asked about his supervision. [5]

Financial liability and working place:

Financial liability has been imposed upon man [و على المولود له رزقهن و كسوتهن بالمعروف (البقرة ٢٣٣ )  The reasonable cost of their maintenance and clothing shall be the responsibility of the child’s father[6]]  and a woman has been exempted from any sort of financial liability. Islam has exempted them from outdoor activities with a commandment of staying at homes.

Allah says  و قرن فى بيوتكن و لا تبرجن تبرج الجاهلية الاولى (الاحزاب ٣٣ )  Stay in your homes and do not go about displaying your beauty as women used to do in the days of ignorance. [7]

But if necessity arises she can go out of home duly complying with other laws of Islam.

Restrictions on travel: A woman is not given as freedom as is given to a man. No long travel is valid for a woman without a man whom she can not marry. But no such restriction is imposed upon a man.

Inheritance property: Male: female = 2: 1 (للذكر مثل حظ الانثيين)

Woman’s right to unilateral right to dower: Man has no such right

Burden of maintenance upon man: Woman does not have to bear this burden

Polygamy permitted but not polyandry

Muslim woman can not marry a Christian / Jew but a Muslim male can

Wearing hijab is binding upon a woman, not upon man

On the other hand the UDHR, CEDAW and other international instruments of human rights are purely based on materialistic philosophy of equality of man and woman and therefore in many points contradictory with divine revelations. Keeping this aspect into consideration the Government of Bangladesh, upon accession of CEDAW, made the following reservation:

“The Government of the People’s Republic of Bangladesh does not consider as binding upon itself the provisions of articles 2, 13 (a) and 16 (1) (c) and (f) as they conflict with Sharia law based on Holy Quran and Sunna.”

Articles of CEDAW Bangladesh had reservation for:

Article 2

States Parties condemn discrimination against women in all its forms, agree to pursue by all appropriate means and without delay a policy of eliminating discrimination against women and, to this end, undertake:

(a) To embody the principle of the equality of men and women in their national constitutions or other appropriate legislation if not yet incorporated therein and to ensure, through law and other appropriate means, the practical realization of this principle;

(b) To adopt appropriate legislative and other measures, including sanctions where appropriate, prohibiting all discrimination against women;

(c) To establish legal protection of the rights of women on an equal basis with men and to ensure through competent national tribunals and other public institutions the effective protection of women against any act of discrimination;

(d) To refrain from engaging in any act or practice of discrimination against women and to ensure that public authorities and institutions shall act in conformity with this obligation;

(e) To take all appropriate measures to eliminate discrimination against women by any person, organization or enterprise;

(f) To take all appropriate measures, including legislation, to modify or abolish existing laws, regulations, customs and practices which constitute discrimination against women;

(g) To repeal all national penal provisions which constitute discrimination against women.

Article 13

States Parties shall take all appropriate measures to eliminate discrimination against women in other areas of economic and social life in order to ensure, on a basis of equality of men and women, the same rights, in particular:

(a) The right to family benefits;

(b) The right to bank loans, mortgages and other forms of financial credit;

(c) The right to participate in recreational activities, sports and all aspects of cultural life.

Article 16

1. States Parties shall take all appropriate measures to eliminate discrimination against women in all matters relating to marriage and family relations and in particular shall ensure, on a basis of equality of men and women:

(a) The same right to enter into marriage;

(b) The same right freely to choose a spouse and to enter into marriage only with their free and full consent;

(c) The same rights and responsibilities during marriage and at its dissolution;

(d) The same rights and responsibilities as parents, irrespective of their marital status, in matters relating to their children; in all cases the interests of the children shall be paramount;

(e) The same rights to decide freely and responsibly on the number and spacing of their children and to have access to the information, education and means to enable them to exercise these rights;

(f) The same rights and responsibilities with regard to guardianship, wardship, trusteeship and adoption of children, or similar institutions where these concepts exist in national legislation; in all cases the interests of the children shall be paramount;

(g) The same personal rights as husband and wife, including the right to choose a family name, a profession and an occupation;

(h) The same rights for both spouses in respect of the ownership, acquisition, management, administration, enjoyment and disposition of property, whether free of charge or for a valuable consideration.

2. The betrothal and the marriage of a child shall have no legal effect, and all necessary action, including legislation, shall be taken to specify a minimum age for marriage and to make the registration of marriages in an official registry compulsory.

 

Lifting Reservation by Bangladesh:

On 23 July 1997, the Government of Bangladesh notified the Secretary-General that it had decided to withdraw the reservation relating to articles 13 (a) and 16 (1) (c) and (f) made upon accession. [8]

But question arises as to if those provisions were anti-Islamic in 1984, what did make them Islamic / pro-Islamic in 1997 ?

The National Women Development Policy (NWDP) 2008

The National Women Development Policy (NWDP) 2008 is nothing but the reflection of CEDAW in our national level. CEDAW has been mentioned three times in the Policy (see paras 1.1, 1.2 and 3.2). Now just  go through the following provisions of the Policy and compare with the above mentioned principles of Islam:

. সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সকলক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় বিগত বছরগুলোতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সাথে দেখেছে।

. জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য

উন্নয়নের মূলস্রোতধারার সকলস্তরে নারীকে সম্পৃক্ত করা ও তার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির মূল লক্ষ্য। এছাড়াও জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে।

জাতীয় উন্নয়ন নীতির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যসমূহ

১.১ জাতীয় জীবনের সকলক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা;

Though Islam does not impose absolute prohibition upon out door activities of woman, it always encourages women to concentrate on humanizing the next generations and specifically assigned them for that purpose because there is no substitute of MOTHER in humanizing the next generation. If the new generation is not humanized in homes the future world will be full of “human-faced animals” as is clearly visible in materialistic societies where women have been dragged into all fields of national level depriving the children from the constant love and affection of mothers. Just go through the following sayings of the Prophet (PBUH) and think whether this type of phrase  জাতীয় জীবনের সকলক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা can go in line with the Islamic principles.

On the death of Persian Emperor her daughter was made the ruler. On hearing this the Prophet (PBUH) said    لن يفلح قوم ولوا امرهم امرئة  No nation shall succeed who make a woman their ruler. [9]

In another occasion  the Prophet (PBUH) said, “….. when your collective responsibility is vested upon women, the abdomen of the earth is better for you than its surface.” [10]

১.১০ রাজনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে, আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং পারিবারিকজীবনেরসর্বত্রনারীপুরুষেরসমানাধিকারপ্রতিষ্ঠা;

Here the Policy talks about sports of woman but does not make it clear whether that sport will be telecast or not. If it is not telecast rather it is arranged exclusively within female area then there can be no objection because then it will be treated as nothing but physical exercise. But the words “সর্বত্র নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা” makes it a bit more complicated because the sports of men are generally telecast through the media. So equal rights in sports generally include the right to be publicised / telecast as well. If that is true, can there be any place of displaying women sports before all within the boundary of Islam which strictly prohibits intermingling of man and woman after certain age and command to lower their sights without marriage ?

قل للمؤمنين يغضوا من ابصارهم و يحفظوا فروجهم ذلك ازكى لهم ….و قل للمؤمنات يغضضن من ابصارهن و يحفظن فروجهن  (النور ٣٠_٣١)

“Enjoin the believing men to lower their gaze and guard their private parts , this is more righteous way for them”. [11]

Besides Islam has very specifically and unequivocally prescribed the rights and duties of the spouses (as have already been mentioned) in family life which are NOT EQUAL in all cases. Somewhere women get more rights and somewhere more rights are given to men. Equality has not been maintained in distribution of DUTIES as well. In spite of all these DIFFERENCES how can the phrase পারিবারিকজীবনেরসর্বত্রনারীপুরুষেরসমানাধিকারপ্রতিষ্ঠাbe applied without violating the principles of Islam?

৩.২ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) বাস্তবায়নেরজন্যপ্রয়োজনীয়পদক্ষেপগ্রহণকরা;

৮.৪ নাটক ও চলচ্চিত্রনির্মাণেনারীকেউৎসাহিতকরারলক্ষ্যেসরকারীঅনুদানেরব্যবস্থাকরা

.১৩ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জরুরী বিষয়াদি যথা: স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবনব্যাপী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, তথ্য, উপার্জনের সুযোগ, সম্পদ, ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিতস্থাবর/অস্থাবরসম্পত্তিরক্ষেত্রেনারীরসমানসুযোগএবংনিয়ন্ত্রণেরঅধিকারদেয়াএবংসেইলক্ষ্যেপ্রয়োজনীয়নতুনআইনপ্রণয়নকরা;

১১.২ বাংলাদেশদূতাবাসগুলোতেরাষ্ট্রদূতসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, পরিকল্পনা কমিশন ও বিচার বিভাগের উচ্চপদে নারীনিয়োগেরউদ্যোগগ্রহণকরা;

১১.৩ জাতিসংঘের বিভিন্ন শাখা ও অঙ্গ সংগঠনে এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিকসংগঠনেরাষ্ট্রীয়প্রতিনিধিবাপ্রার্থীহিসেবেনারীকেনিয়োগ/মনোনয়নদেয়া;


[1] JIAOR RAHMAN MUNSHI, a student of LL.M. @ the University of Dhaka [jiarht@gmail.com]

[2] Ahzab 36

[3] Baqara 228

[4] Nisa 34

[5] Bukhari

[6] Baqara 233

[7] Ahzab 33

[8] The complete text of the reservation is published in United Nations, Treaty Series, vol. 1379, p. 336. (available in the website of CEDAW)

[9] Bukhari

[10] Tirmiji

[11] Nuur 32-33

Leave a comment

Filed under Uncategorized